মন্তব্য প্রতিবেদন

তারেক রহমানের ‘ফেরা’ - ৬৩১৪ দিনের অপেক্ষার অবসান, এরপর?

“দীর্ঘ ৬ হাজার ৩শ ১৪ দিন পর বাংলাদেশের আকাশে!” ফ্লাইট রেডারে সম্ভবত এযাবৎকালের সবচাইতে বেশিবার ট্র্যাক করা বিমানের উড়োজাহাজটি বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশের পরপরই এটির একজন আরোহী এই স্ট্যাটাসটি দিলেন।

বিজি - ২০২, একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের উড়োজাহাজ। বিজনেস ক্লাসে বসে আছেন তিনি। তার আসন নম্বর ওয়ান-এ। বিমানে ওঠার পর এটি তার দ্বিতীয় ফেসবুক পোস্ট। 

প্রথম পোস্টটি ছিল আরেকটি ছবি - উড়োজাহাজের আসনে বসে কিছু ডকুমেন্ট পড়ছেন তিনি - ক্যাপশনে লেখা ‘ফেরা’। 

আর তৃতীয় পোস্টটি ছিল সকাল সাড়ে দশটায় - “অবশেষে সিলেটে, বাংলাদেশের মাটিতে!” এই পোস্ট ও ক্যাপশনগুলোই বলে দিচ্ছে কী পরিমাণ উচ্ছ্বসিত হয়ে আছেন তিনি। 

‘লিডার আসছেন’! গত কয়েকদিন ধরে উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন।

সকাল দশটার কিছু পর বিজি-২০২ সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের মধ্যে দিয়েই অবসান হয়ে গেলো বাংলাদেশে গত বেশ কিছুদিন ধরে চলা কিছু সন্দেহ, সংশয় এবং বিতর্কের। 

২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর দেশ ছেড়েছিলেন তারেক রহমান, ফিরলেন ১৭ বছরের বেশি সময় পর। ইমেজ: বিএনপির ফেইসবুক পেইজ।

বাংলাদেশের সব রাস্তা যেন এসে মিশেছে ঢাকার উপকণ্ঠ পূর্বাচল সংলগ্ন একটি সড়কে, যেটি ২০২৪-এর ৫ই অগাস্টের পর নতুন নাম পেয়েছে - ‘জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ে’। 

সাড়ে সতেরো বছর আগে - ১১ই সেপ্টেম্বর, যেদিন কাঁদতে কাঁদকে ঢাকা ছেড়েছিলেন তিনি, একটি হুইল চেয়ারে চড়ে - সেদিন এই বিমানবন্দরটি ছিলো তার পিতার নামে - ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। 

অনেকের বর্ণনায়, সেসময়ের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে একটি মুচলেকা দিতে হয়েছিল তাকে - আর কোনোদিন দেশে এবং রাজনীতিতে ফিরবেন না তিনি।

গোয়েন্দা গল্প যারা পড়েন বা স্পাই মুভি দেখেন, তারা ‘ডুরেস’ বলে একটা ইংরেজি শব্দ হয়ত শুনে থাকবেন। হুমকি বা চাপের মুখে, কিংবা প্রতিকূল পরিবেশ বোঝাতে ইংরেজি ডুরেস শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সেবার ‘মুচলেকা’ দিয়েছিলেন কি দেন নাই সেই ব্যাপারে নিশ্চিত নই আমি - তবে এটা নিশ্চিত, তারেক রহমান ২০০৮ সালে নিঃসন্দেহে একটা ‘ডুরেস’ পরিস্থিতিতে ছিলেন। 

তারেক রহমানকে বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও আমরা সেদিন দেখেছিলাম টেলিভিশনে - দীর্ঘ কারাবাস আর রিমান্ডের নামে চালানো নির্যাতনে তিনি একজন ভেঙে পড়া মানুষ। কপালে পট্টি - হয়ত কোনো ক্ষতচিহ্ন ঢেকে রাখার চেষ্টা। 

বৃহস্পতিবার যখন সারা দুনিয়া পালন করছে বড়দিন, শিশুরা যখন অপেক্ষা করছে প্রিয় সান্তা ক্লজের জন্য, সেদিন তারেক রহমান ফিরলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের ‘সান্তা ক্লজ’ হয়ে - অনেকেই বলছেন একথা। 

বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আশা করেন, আগামী নির্বাচনে জিতে সরকার প্রধান হবেন তারেক রহমান। তার ফেরার মধ্যে দিয়ে সেটির মোমেন্টাম সম্ভবত তৈরি হয়েও গেছে। ইমেজ: বিএনপির ফেইসবুক পেইজ।

বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঢাকার যে বিমানবন্দরটিতে নেমেছেন তারেক রহমান, সেটি তার পিতার নাম হারিয়েছে বহু আগে - বাংলাদেশের প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির মাঠে নাম পরিবর্তন নতুন নয়। 

তারেক রহমান যখন বিভুঁইয়ে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন, তখন বিমানবন্দরটির নামটি বদলে দিয়েছিলেন তখনকার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম বদলে ফেলা সহজ নয়। সেবার হাসিনাকে নাড়তে হয়েছিল বিস্তর কলকাঠি, পোড়াতে হয়েছিল বহু কাঠখড়, ব্যয় করতে হয়েছিল বহু অর্থ।

পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নামে সবকিছুর নামকরণের একটা প্রবণতা শেখ হাসিনার মধ্যে থাকলেও, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পিতার নামের সাইনবোর্ড সেবার ঝোলাননি তিনি। বরং এমন একটি নাম বেছে নিয়েছিলেন - একজন সুফী - যিনি বাংলাদেশের মুসলিম উম্মার কাছে অতি সম্মানিত, অতি পবিত্র একজন মানুষ।

হযরত শাহজালাল (রঃ) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর এখান থেকে সরাসরি জুলাই-৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে তৈরি একটি মঞ্চে আসবেন তারেক রহমান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

বিমানবন্দরের নাম বদলাতে যেমন বেগ পেতে হয়েছিল শেখ হাসিনার, তার আমলেই তৈরি পূর্বাচল নতুন শহরের তিনশো ফিট নামে পরিচিত ‘শেখ হাসিনা এক্সপ্রেসওয়ে’র নাম বদলাতে সেরকম কিছুই করতে হয়নি। ২০২৪ সালের অগাস্টের পর এই সড়কটির নাম বদলাতে লেগেছে স্রেফ কলমের এক খোঁচা, আর সাইনবোর্ড বদল বাবদ সামান্য কিছু অর্থ।

বাংলাদেশের সব চোখ সম্ভবত তাকে নিয়ে যাবতীয় খবরাখবরের আটকে আছে - টেলিভিশনে, সোশ্যাল মিডিয়ায়। সমস্ত কান উৎকীর্ণ হয়ে থাকবে ঢাকার কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দখল করে থাকা লাখ লাখ নেতাকর্মীর উদ্দেশে তারেক রহমান কী বলবেন সেই দিকে।

তারেক রহমানের গণঅভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে তিনি ছাড়া আর কোনো দ্বিতীয় বক্তা থাকছে না বলে জানিয়েছে বিএনপি।

তারেক যেখানে বসে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন, সেখান থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে একটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন তার মা - খালেদা জিয়া- বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দুই বারের বিরোধী দলীয় নেত্রী, একবারের ফার্স্ট লেডি - দীর্ঘ শিকার দমনপীড়নের - যার ইস্পাতকঠিন চরিত্রের জন্য তাকে তার অনুসারীরা সম্বোধন করেন ‘আপসহীন নেত্রী’ বলে।

তারেক রহমানের এই ‘ফেরা’টা কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ? এমন রাজকীয় প্রত্যাবর্তন কি এর আগে হয়েছে?

১৯৭২ সালের দশই জানুয়ারি নিঃসন্দেহে এমন একটি দিন এসেছিল - যেবার পাকিস্তান থেকে ইংল্যান্ড ও ভারত হয়ে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে এসে নেমেছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে বহনকারী বিমান। সেবার তিনি একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেশে ফিরেছিলেন। এসে দেশের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন। এর পরে এসেছিলেন শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা - ১৯৮১ সালের ১৭ই মে দিল্লি থেকে ঢাকা ফিরে তিনি তার পিতার হত্যাকাণ্ড পরবর্তী বিপর্যস্ত আওয়ামী লীগের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন।

৮ই অগাস্ট ২০২৪ সালে ফিরেছিলেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস - তিনি অবশ্য মুজিবের মত বিদেশের কারাগারে বন্দী কিংবা হাসিনা ও তারেকের মত নির্বাসনে ছিলেন না - কিন্তু তার প্রত্যাবর্তনও হয়েছিল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে - দেশে ফিরে তিনি অভ্যুত্থান বিপর্যস্ত দেশের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন। প্রফেসর ইউনূসের ফিরে আসাও ব্যাপক উচ্ছ্বসিত ও আশাবাদী করেছিল বাংলাদেশের মানুষকে - ১৬ মাস পর অনেকেই এখন সেই উচ্ছ্বাস হারিয়েছেন, আশাহত হয়েছেন।

এবার তারেক রহমানের ‘ফেরা’ - বিএনপির তো নিঃসন্দেহে, বাংলাদেশের অনেক চিন্তকও মনে করেন, বাংলাদেশে এখন যে বিভাজনের রাজনীতি, যে এলোমেলো অবস্থা, সেটা থেকে উত্তরণের একমাত্র প্রতীক হতে পারেন তারেক রহমান। তিনি দলের দায়িত্ব নিয়েছেন অনেক আগেই, অসুস্থ মায়ের স্থলাভিষিক্ত আছেন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে। বেশ কয়েকবছর ধরেই তিনি বিএনপির ডি ফ্যাক্টো নেতা।

বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ আশা করেন, আগামী নির্বাচনে জিতে সরকার প্রধান হবেন তারেক রহমান। তার ফেরার মধ্যে দিয়ে সেটির মোমেন্টাম সম্ভবত তৈরি হয়েও গেছে। 

তারেক রহমানের দেশে ফেরা উপলক্ষে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ব্যানার-পোস্টারে ছেয়ে গেছে।

কিন্তু এখনো তাকে পাড়ি দিতে হবে বহু পথ - এরই মধ্যে প্রশ্ন আছে তার দেশ শাসনের অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে, বাংলাদেশের বিভাজনের রাজনীতিতে তিনি ঠিক কতটা ভূমিকা পালন করবেন সেটা নিয়ে, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় তার দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা সময়ে যে দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে, সেই অভিযোগ কীভাবে মোকাবিলা করবেন সেটা নিয়ে, এবং দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্যের পরিবেশ, বেকারত্ব পরিস্থিতি যে অবস্থায় পৌঁছেছে, সেটা কীভাবে সামাল দেবেন তা নিয়েও।

২০০১ সালে তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে যেবার তারেক রহমানকে ‘নেক্সট ইন লাইন’ ঘোষণা করেছিলেন খালেদা জিয়া, তার পরের ৫ বছর তার কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক প্রশংসা হয়েছে, তেমন সমালোচনাও কম হয়নি। দলের সিনিয়রেরাও এই কম বয়েসি নেতাকে সন্দেহের চোখে দেখেছেন। দিনে দিনে অনেকের চোখে তিনি পরিণত হয়েছিলেন ‘উদ্ধত রাজপুত্র’ হিসেবে।

হাওয়া ভবন নিয়ে বিতর্ক, সহযোগী-বন্ধুদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ- এক পর্যায়ে তাকে ভিলেনে পরিণত করেছিল। সতেরো বছরের নির্বাসন জীবনে নিজেকে আপাদমস্তক বদলে ফেলেছেন তারেক রহমান। বিশ্লেষকদের চোখে সেই ‘উদ্ধত রাজপুত্র’ এখন এক ‘পরিশিলীত এক প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ’ যাকে নিয়ে বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে বিরাট স্বপ্ন, প্রত্যাশা, আশাবাদ। 

তারেক রহমানের সাথে তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে।

অনেকের চোখে তিনি কোভিড পরবর্তী বাস্তবতায় সবচাইতে দীর্ঘ সময় ধরে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এ থাকা একজন নেতা, যিনি লন্ডনের একটি অ্যাপার্টমেন্টের ছোট্ট একটি কামরায় একটি ছোট্ট টেবিলের সামনে সাধারণ একটি চেয়ারে বসে বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের এখনকার সবচাইতে বড় রাজনৈতিক দলটি চালিয়ে এসেছেন। এই সময়ে তার কিছু ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রশংসা করা যায় - জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অপরাজনীতির অভিযোগ যতবার উঠেছে, ততবারই বিনা বাক্যব্যয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিয়েছেন।

তৃণমূলে তার যোগাযোগ নিয়ে প্রশংসা শোনা যায়, তার দলের নেতাকর্মীদের মুখেই - ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদেরও নাকি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন তারেক রহমান। ২০১৮ সালের যে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি, সেবার মনোনয়ন বাণিজ্যের অনেক অভিযোগ উঠেছিল বিএনপির বিরুদ্ধে, কিন্তু ২০২৬ এর নির্বাচনে বিএনপি যেসব মনোনয়ন দিয়েছে, সেসব নিয়ে এমন অভিযোগ খুব একটা শোনা যায়নি এখন পর্যন্ত। 

কথায়, বক্তৃতায়, আচরণে তারেক রহমানের মাঝে অনেকে দেখতে পান তার পিতার ছায়া।

বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় আসার জন্য তারেক রহমান এখন পুরোপুরি প্রস্তুত এমন মত বিশ্লেষকদের। 

দীর্ঘ নির্বাসন জীবন এবং ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ শেষে তারেক রহমান এখন ঢাকায়, বাংলাদেশে। এবার শুরু তার মাঠের রাজনীতি। তারেক রহমান এবং তার দল বিএনপির জন্য এখন যে মোমেন্টাম তৈরি হয়েছে, সেটা ধরে রেখে ৪৯ দিন পর যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে সেখানে কতটা সফল হতে পারবেন তিনি, সেটাই এখন দেখার বিষয়।