রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বলা যাবে? 

সাড়ে তিন দশক পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। 

বিরোধীদল প্রার্থী দেওয়ার পর যদি তিনি বাছাইয়ে টিকে থাকেন এবং তারপর মনোনয়ন প্রত্যাহার না করলে ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে অনুষ্ঠিত হবে ভোট। 

তখন কাগজে-কলমে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হলেও বাস্তবের হিসাব কি বলছে ভিন্ন কথা? 

জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যেই তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। বিরোধীদলীয় প্রার্থী হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের নাম এসেছে।

অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র কেনা হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি প্রার্থীর নাম। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই হতে পারেন বিএনপির প্রার্থী।

বিরোধী দলের প্রার্থী শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকলেও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণে ফলাফল অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত। অর্থাৎ ভোট হবে, কিন্তু ফল নিশ্চিত। 

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এর আগে চারবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে। তিনবার সরাসরি ভোটে, একবার সংসদ সদস্যদের পরোক্ষ ভোটে। 

কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, ক্ষমতাসীন দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফলাফলকে করেছে একতরফা। 

এতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কে বসবেন, তা অনেক সময় নির্ধারিত হয়েছে ভোটের মাঠে নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই।

তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কি কেবলই একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা এবং ক্রমেই আলংকারিক হয়ে উঠেছে?

প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে। কারণ, বঙ্গভবন কখনোই শুধু সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের ঠিকানা ছিলো না।

গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক উত্থান-পতনে রাষ্ট্রপতির পদ হয়ে উঠেছে ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক সংকট, সামরিক অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

বাংলাদেশের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন দুইজন রাষ্ট্রপতি, একজন মারা গেছেন দায়িত্ব পালনকালে। 

আবার রাজনৈতিক চাপ, মতবিরোধ ও নানা চক্রান্তের মুখে পদ ছাড়তে হয়েছে আরও কয়েকজনকে।

তাই ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে আবার যখন ভোটের আয়োজন হচ্ছে, তখন প্রশ্ন শুধু কে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, তা নিয়ে নয়। 

বড় প্রশ্ন হলো- এবারের ভোট আয়োজন কি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্যিই ফিরিয়ে আনছে? নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠতার অংকে আগেই নির্ধারিত হয়ে আছে ফল? 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতির পদটি আসলে কতটা ক্ষমতার, কতটা আলংকারিক?

বাংলাদেশে চারবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন 

বাংলাদেশে মোট ১২ বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে। এরমধ্যে ৮ বারই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।   

মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকারে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে তিনি কারাগারে থাকায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। 

১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে রাষ্ট্রপতি মনোনীত হন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও ব্যক্তিগত কারণে ১৯৭৩ সালের ২৪ই ডিসেম্বর স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন তিনি। 

এরপর প্রথমে ভারপ্রাপ্ত এবং পরে ১৯৭৪ সালের ২৪এ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মুহম্মদুল্লাহ। এটাই ছিলো প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, যদিও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। 

চাপ ও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ১৯৭৭ সালের ২১এ এপ্রিল জিয়াউর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। 

দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর দুই মাস পর ১৯৭৮ সালের ১২ই জুন দেশের প্রথম সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জিয়াউর রহমান। 

১৯৮১ সালের ৩০এ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হলে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত এবং পরে নভেম্বরে নির্বাচনে জিতে রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। 

১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। পরে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। 

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তার পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে বিএনপি।

ওই বছরই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য বিএনপি মনোনয়ন দেন তখনকার স্পিকার আবদুর রহমান বিশ্বাসকে। 

বিরোধী দল আওয়ামী লীগের প্রার্থী হন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। 

এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০২, ২০০৯, ২০১৩, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালের নির্বাচনে সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন? 

কেন বিনা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন? 

২০০১ সাল থেকে ছয়টি সংসদ নির্বাচনেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় গেছে বিজয়ীরা। আর এর ফলে সংসদীয় ব্যবস্থায় পরোক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরো সংকুচিত হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। 

কারণ, চাইলেই কোনো সংসদ সদস্য দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অন্য কাউকে ভোট দিতে পারেন না। 

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একজন এমপি নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্যপদই বাতিল হয়ে যেতে পারে। এটাকে সংসদীয় ভাষায় বলা হয় 'ফ্লোর-ক্রসিং'।

নিজের দল রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে যাকে মনোনীত করবেন, তাকেই ভোট দিতে বাধ্য থাকবেন সেই দলের সব সংসদ সদস্য। 

লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলছেন,  “এটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ারও সুযোগ নাই। ব্যবস্থাটা এমন করে রাখা হয়েছে যে, উনাকেই (রাষ্ট্রপতি) শুধু ক্ষমতাহীন করে রাখা হয়নি, এই পদের নির্বাচনটাও খুব তাৎপর্যহীন বা মনোযোগ পাওয়ার মতো হয় নাই।” 

“কারণ, নির্বাচনি ব্যবস্থা বা সংসদ সদস্যদের শেকল পরানো থাকে সংবিধানের ধারা দ্বারা। আজকে বিএনপির মনোনীত কোনো প্রার্থী কি তাদের দলের মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেবেন? বা জামায়াতের কেউ তাদের মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেবেন? তার মানে এক ধরনের দলীয় বাধ্যবাধকতার মধ্যেই তাদের ভোট দিতে হবে।” 

আলতাফ পারভেজ বলেন, “তার মানে কী? বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাকে চাইবেন তিনিই রাষ্ট্রপতি হবেন। দেবতুল্য ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সেই পদ ২০ বছর আগে যেরকম ছিলো, এখনও তাই।” 

“রিফর্ম করি নাই। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাহীনতা ও তাৎপর্যহীনতা সংস্কারহীন অবস্থায় এরকমই হবে,”  মন্তব্য করেন তিনি।

শুধু রাষ্ট্রপতিই না, বাংলাদেশের পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘তীব্র অবিশ্বাস’-এর মধ্যে। সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন- অতীতে প্রশ্ন উঠছে সব ভোট নিয়েই। 

বাংলাদেশে এই নির্বাচনি ব্যবস্থার ক্ষত কতটা, তা তুলে ধরেছেন মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার। 

ইউনিভার্সিটি অব সিডনিতে তার পিএইচডির থিসিস ছিলো, “বাংলাদেশে নির্বাচন এবং নির্বাচনি দুর্নীতি: বেসামরিক, সামরিক ও অদলীয় শাসন ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিত”। 

ওই গবেষণায় তিনি লিখেছেন, “স্বাধীনতা-পূর্ব ও স্বাধীনতা-পরবর্তী উভয় সময়েই বেসামরিক ও সামরিক শাসকেরা নিজেদের স্বার্থে নির্বাচনকে প্রভাবিত বা ম্যানিপুলেট করেছেন। তারা বিরোধী দলে থাকাকালীন নির্বাচনি অপকর্মের সমালোচনা করলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর তা নিয়ন্ত্রণে অনিচ্ছুক ছিলেন।” 

“বরং নির্বাচনকে ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার (বেসামরিক শাসকদের ক্ষেত্রে) এবং শাসনের বৈধতা পাওয়ার উপায় (সামরিক শাসকদের ক্ষেত্রে) হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।” 

গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে প্রধান রাজনৈতিক সংকট এবং ভুল বোঝাবুঝিগুলো প্রায়ই তৈরি হয় নির্বাচনকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব ও ইস্যু থেকে।

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি পদ ‘আলংকারিক’ হলেও এই পদের গুরুত্ব কম না। কারণ, ক্ষমতা হস্তান্তরের শেষ উপায় ও ব্যক্তি হলেন রাষ্ট্রপতি।