হঠাৎ ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানে এত ফেইসবুক রিল কেন?

বাংলাদেশে ফেইসবুক ওপেন করলেই এখন নব্বই দশকের শুরুর দিকের ক্লাসিক বাংলা ব্যান্ডের গান “শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হল আকাশে” দিয়ে রিলস দেখা যাচ্ছে। গানের সাথে শাড়ি পরে, চুলে ফুল গুঁজে ভিডিও দিচ্ছেন নারীরা। রিলসের এই ট্রেন্ডে আছেন পুরুষরাও, অবশ্য শাড়ি পরে নয়!

তবে ব্যাপারটা নেহায়েতই শুধু ট্রেন্ড না। এটি একটি প্রতিবাদ। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে রিলিজ হওয়া ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডের বিরহের গান ২০২৬ সালে এসে হয়ে উঠেছে সাইবার বুলিয়িং, মোরাল পুলিশিং আর ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এক ডিজিটাল যুদ্ধে।

গানটি ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে সিলেটের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিউটি রাণী পাল নীল শাড়ি পরে স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটাহাঁটি করার একটি রিল পোস্ট করেছিলেন ফেইসবুকে। আর তারপরই শিকার হলেন নেটিজেনদের একটা অংশের হেনস্তা আর ট্রলের।

পোস্টের কমেন্ট সেকশন ভরে উঠে তার পোশাক, শিক্ষকতার যোগ্যতা নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ও অপমানজনক মন্তব্যে। এমনকি ভিডিও করার কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি ওঠে।

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক বিউটি রাণী পাল ২০২৬ সালে জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আর এই ট্রলিং আর সাইবার বুলিয়িংয়ের প্রতিবাদে গত কয়েকদিনে বাংলাদেশের হাজার হাজার শিক্ষিকা রিলস পোস্ট করে চলেছেন। যোগ দিয়েছেন পুরুষরাও।

“একজন বিউটি রাণীকে থামাতে গেলে জন্ম হবে হাজারো বিউটি রাণীর। কথায় কথায় শিক্ষকদের মানহানি করা বন্ধ হউক,” নিজের ভিডিও পোস্ট করে ফেইসবুকে লিখেছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ইশরাত নূর শিলা।

ফেইসবুক ব্যবহারকারী কণিকা রহমান তার পোস্টে বলেছেন যারা সিলেটের সেই প্রধান শিক্ষিকার ব্যাপারে “নোংরা মন্তব্য” করেছেন তাদের “মুখে থাপ্পড়” হিসেবে তার ভিডিও।

“শিক্ষকদের সম্মান দেয়াটা হয়তো পরিবার থেকে শিখেন নাই তাই বলে অসম্মান করতে হবে এই শিক্ষাটা কোথায় পেলেন,” লিখেছেন তিনি।

চট্টগ্রামের শিক্ষিকা জয়ন্তী ভৌমিক প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক হলে কি মানুষ হওয়ার অধিকার থাকে না।

“শিক্ষক যদি হাসেন, সমস্যা! সাজেন, সমস্যা! পরিপাটি থাকেন, সমস্যা! ভ্রমণে যান, সমস্যা! ছবি পোস্ট করেন, সমস্যা! তাহলে কি শিক্ষক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হওয়ার অধিকারটাও জমা দিতে হবে?”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল ও পিএইচডি গবেষক খাতুনে জান্নাত বলছেন সমাজের একটা অংশের ধারণা শিক্ষক মানেই অভাবের জীবন।

“একজন শিক্ষক যদি সুন্দর পোশাক পরেন—তাহলেই কেন কিছু মানুষের চোখে সেটা অস্বাভাবিক লাগে?” গানটি দিয়ে নিজের একটি ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন তিনি।

তার পোস্টে তিনি প্রশ্ন রেখে গেছেন, “শিক্ষকের সম্মান কি শুধু মঞ্চের বক্তব্যে থাকবে, নাকি আমাদের চিন্তা, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও প্রতিফলিত হবে?”

খাতুনে জান্নাতের মতো শিক্ষক তন্দ্রা তনুও বলছেন অনেকেরই ধারণা শিক্ষক মানেই ‘ছেঁড়াফাটা কাপড়, ক্লান্ত মুখ আর অভাবের প্রতীক’।  

“…যখন কোনো প্রাথমিক শিক্ষক বা শিক্ষিকা পরিচ্ছন্ন পোশাকে, হাসিমুখে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়ান তখন তাদের সহ্য হয় না। মনে হয়, শিক্ষক হাসবে কেন ? ভালো থাকবে কেন? দুঃখিত, সময় বদলেছে,” ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন তিনি।

 লায়লা নূর পিংকি নামে কুমিল্লার একজন শিক্ষিকা বলেছেন বিউটি রাণী পালের রিলসের প্রতিক্রিয়ায় হাজার হাজার শিক্ষককের এই গান দিয়ে পোস্টের কারণে মানুষ “অন্তত কিছুটা হলেও লায়লা-মামুনদের ভিডিও” থেকে মুক্তি পেয়েছে। যার জন্য  শিক্ষকরা “কিছুটা হলেও ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।”

অনেক শিক্ষিকা তাদের পোস্টে লিখেছেন, তার রোবট নন। তারা ক্লাসে পড়ান কিন্তু তার বাইরে অন্য যেকোনো মানুষের মতোই সাজতে, হাসতে, আনন্দ করতে এবং নিজের মতো করে জীবনযাপন করতে পারেন।

প্রতিবাদের এই ‘ডিজিটাল মিছিলে’ যোগ দিয়েছেন পুরুষরাও।

সাজিদ আরেফিন নামে একজন সহকারী শিক্ষক গানটির সাথে স্কুলের ভেতরে হেঁটে বেড়ানোর ভিডিও পোস্ট করে বলেছেন নাচতে পারেন না তাই হেঁটেই ভিডিও দিয়েছেন।

“এটা কেবল একটি প্রতিবাদী ভিডিও। আমার হাঁটা আপনার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মনে হলেও এই মুহুর্তে আমি হেঁটেছি শুধুই আমার সহকর্মীকে সোশ্যাল মিডিয়ায় নাচের ভিডিও আপ্লোড করার কারনে গুজব ছড়িয়ে হেনস্তা করায়।”

বিপুল বিশ্বাস নামে একজন ফেইসবুক ব্যবহারকারী ইউকেলেলে বাজিয়ে গানটি গেয়ে ভিডিও পোস্ট করে লিখেছেন, “এই গানটায় হোক প্রতিবাদের সুর।“

ফেইসবুক ব্যবহারকারী রিমু সিদ্দিক গানের সাথে নিজের ভিডিও পোস্ট করে মন্তব্য করেছেন একজন শিক্ষকের বৃষ্টি উপভোগ করার মধ্যে দোষের কিছু নাই বরং সেটা অশালীন বা অপরাধ এমন ধারণা সমাজকে আরও সংকীর্ণ করে।

“বিউটি রানী পালের বৃষ্টির গানে আমারও একটুখানি বৃষ্টি উপভোগ। বৃষ্টি কখনো উল্লাস, কখনো আনন্দ, কখনো বিরহ আবার কখনো বেদনা। প্রত্যেকে নিজের অনুভূতি দিয়ে বৃষ্টিকে উপলব্ধি করে। তাই প্রকৃতিকে উপভোগ করা অশালীনতা বা অপরাধ হিসেবে দেখার কোনো কারণ দেখি না,” লিখেছেন তিনি।

হ্যাশট্যাগ #হোকপ্রতিবাদ, #teahcersunity, #standwithteacher দিয়ে বাংলাদেশের ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের এমন পোস্ট এখন অসংখ্য।

নেটিজেনদের এক অংশের ট্রল আর কুরুচিকর মন্তব্যের বিপরীতে ক্ষোভের প্রতিবাদে বিউটি পালের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশের এমন আরও হাজার হাজার শিক্ষক আর তার সাথে সাধারণ মানুষ।

একের পর এক রিল পোস্ট হয়েছে, কোনটাতে ক্যাপশন আছে আবার অনেকে কোন ব্যাখ্যাই দেননি। নিজের মতো একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন।

তবে সবার কথা একই; একজন মানুষের পোশাক, সাজগোজ, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা নিজেকে প্রকাশের ধরনের সাথে তার পেশাগত যোগ্যতা বা মর্যাদাকে মিলিয়ে দেখার কিছু নেই।

এই পুরো ঘটনার পর শিক্ষক আর নেটিজেনদের পোস্টে এই কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে পেশাগত দায়িত্বের সাথে ব্যক্তি স্বাধীনতার কোন বিরোধ নেই। একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক একই সাথে একজন স্বাধীন মানুষ, যিনি তার কাজের বাইরে ব্যক্তিজীবন কীভাবে কাটাবেন সেটা ঠিক করার অধিকার তার নিজেরই।