জ্বালানি তেল নিয়ে চলমান আলাপটা ক্রমান্বয়ে গভীরতর হচ্ছে। দেশে প্রয়োজন মতো জ্বালানি তেল আছে নাকি নেই, থাকলে কতটুকু আছে বা নেই তা নিয়ে যে আলাপ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির শুরু থেকে চলে এসেছে, পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি-প্রত্যাশী যানবাহনের দীর্ঘ সারির মধ্য দিয়ে যার নৈমিত্তিক প্রতিফলন আমরা দেখে এসেছি, সেটি আসলে আমাদের জ্বালানি সমস্যার বাহ্যিক (সুপারফিসিয়াল) একটি দিক।
মার্চের শেষ দিক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো থেকে যে খবরাখবর আসতে শুরু করেছে, সেগুলোই আমাদের সমস্যার প্রকৃত চিত্র। এই সময়ে আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধান আবাদের জন্য সেচ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আর সেচের জন্য প্রয়োজন ডিজেল।
আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি তেল হচ্ছে ডিজেল। সারাবছরে আমাদের ডিজেলের যে চাহিদা তার প্রায় ৬৭ শতাংশ প্রয়োজন হয় এই সেচ মৌসুমে। অবশ্য এর পুরোটাই শুধু সেচের জন্য নয়। পরিবহন একটা বড় ডিজেল ব্যবহারকারী খাত। রয়েছে কিছু কিছু শিল্প। আছে সমুদ্রে মাছ ধরার কয়েক হাজার ট্রলারসহ অনেক নৌযান।
সুতরাং তেলের আলাপটা এখন পৌঁছে গেছে সমস্যার মূল জায়গায় - ডিজেলে। সেই খবরাখবরই এখন আসতে শুরু করেছে। তেল নিয়ে এই আলাপটা এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা ডিজেলকেন্দ্রীক কয়েকটি চিত্রের প্রতি নজর দিতে পারি।
১. চুয়াডাঙ্গায় জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিপণন স্বাভাবিক রাখতে গত মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো জ্বালানি কার্ড (ফুয়েল কার্ড) বিতরণ করছিল স্থানীয় প্রশাসন। সকাল ৯টা থেকে জেলার চারটি উপজেলা পরিষদে এই কার্ড বিতরণ শুরু হয়। এই জ্বালানি কার্ড সংগ্রহ করতে গিয়ে স্ট্রোক করে বখতিয়ার রহমান নামের একজন কৃষক/এনজিওকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আলমডাঙ্গা উপজেলা পরিষদ চত্বরে এই ঘটনা ঘটে। মারা যাওয়া ব্যক্তি উপজেলার ভেদামারী গ্রামের রফিউদ্দিন মোল্লার ছেলে।
২. পাবনার ঈশ্বরদীর ৪০ জন কৃষক সেচের জন্য তেল (ডিজেল) না পেয়ে গত রবিবার গিয়েছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ে। কারণ তেলের সমস্যা সমাধানে কয়েক দিন ধরে কৃষকদের চিরকুট (স্লিপ) দিচ্ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। তাতেও পাম্প থেকে তেল দেওয়া হচ্ছিল না। কিন্তু কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েও কোনো সমাধানের আশা না দেখে, তাঁদের মধ্যে জাতীয় পুরস্কার পাওয়া কৃষক ময়েজ উদ্দিন সরাসরি ফোন করেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে। মন্ত্রী ফোনে কৃষি কর্মকর্তাকে সমস্যা সমাধানের নির্দেশনা দেন। কৃষি কর্মকর্তা সে অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ে চেষ্টাও করেন। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই কৃষকেরা তেল পেযেছেন বলে নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি।
৩. বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র (যুগ্মসচিব) মনির হোসেন চৌধুরী মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, দেশে এখন জ্বালানি তেলের মোট মজুত রয়েছে প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ ২৯ হাজার টন ডিজেল। এছাড়া অকটেন ৭ হাজার ৯৪০ টন, পেট্রোল ১১ হাজার ৪৩১ টন এবং জেট ফুয়েল ৪৪ হাজার ৬০৯ টন।
পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পর, গত ৩ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলায় অভিযান চালিয়ে মজুতদারদের কবল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে মোট ২ লাখ ৯৬ হাজার ৩০৫ লিটার জ্বালানি তেল। এর মধ্যে ২ লাখ ৭ হাজার ৩৬৫ লিটার (প্রায় ২৩০ টন) হচ্ছে ডিজেল। এছাড়া, অকটেন ২৮ হাজার ৯৩৮ লিটার এবং পেট্রোল ৬০ হাজার ২ লিটার। উদ্ধার করা তেলের মধ্যে একদিনেই উদ্ধার করা হয়েছে ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার!
৪. যে চিত্রটিকে শুরুতে সমস্যার বাহ্যিক বা অগভীর দিক বলেছিলাম সে বিষয়টি আগে স্পষ্ট করা দরকার। পেট্রোল পাম্পগুলোতে আমরা যে দীর্ঘ সারি দেখে আসছি তাঁদের চাহিদা মূলত: পেট্রোল এবং অকটেন। ইতিমধ্যে আমরা সবাই জেনে গেছি যে পেট্রোলের বার্ষিক চাহিদার পুরোটাই আমাদের দেশে উৎ)পাদিত হয়। এর কাঁচামাল হচ্ছে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট। অবশ্য এর সঙ্গে আমাদের একমাত্র পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে আমদানি করা অপিরিশোধিত তেল পরিশোধন করেও কিছুটা পেট্রোল পাওয়া যায়। তবে তার পরিমান সামান্য। তাহলে একমাত্র অবৈধ মজুতদারি ছাড়া পেট্রোলের সংকট হওয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই।
অকটেনও আমাদের বার্ষিক চাহিদার অর্ধেকের বেশি দেশেই উৎপদিত হয়। এরও কাঁচামালও কনডেনসেট। বাকি অর্ধেকের ঘাটতি মেটাতে যেটুকু অকটেন দরকার তার চেয়ে বেশি আমদানির নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে একবিন্দু পরিমান আমদানি না হলেও অন্যান্য উৎস থেকে এই অকটেন পাওয়া যাবে এবং চাহিদা অনুযায়ী এর সরবরাহ আছে।
জেট ফুয়েলকে আমরা এই আলোচনার বাইরে রাখছি। কারণ এটি সাধারণ মানুষের নৈমিত্তিক প্রয়োজনের কোনো বস্তু নয়। তবে বলে রাখা ভালো, এই পন্যটির ঘাটতি আছে। আমদানিও চলমান আছে।
৫. মূল সমস্যা ডিজেল। সরকারি হসাব অনুযায়ী, ৩১এ মার্চ দেশে ডিজেলের মজুত ছিল প্রায় এক লাখ ১০ হাজার টন। কিন্তু এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। এই ঘাটতি পূরণ করাই এখন সরকারের বড় মাথাব্যাথা। কারণ এর সঙ্গে দেশের খাদ্য উৎপাদন জড়িত। সেই জন্য সরকার চেষ্টা করছে বহুমুখী উৎস থেকে ডিজেল সংগ্রহের। সরকারের এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেব এপ্রিলের ১০/১২ তারিখ নাগাদ ৯৫ হাজার টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে মজুত আছে ২৬ হাজার টন অপরিশোধিত তেল। সেখান থেকেও প্রায় ১২ হাজার টন ডিজেল পাওয়া যাবে। ভারত থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আসছে, মার্চ মাসে যার পরিমান ১৬ হাজার টন। এপ্রিলেও আসবে। চীন, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকেও এপ্রিলে প্রায় দেড় লাখ টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে মোট ৬০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে দুটি জাহাজ শিগগিরই আসার কথা। ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানি করার বিষয়ে ইতিমধ্যে দুই দেশের সরকারের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
এছাড়া নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপরিশোধিত বা পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ যাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসতে পারে সে বিষয়ে অনুমতি ও নিরাপত্তার জন্য ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলমান আছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য শিথিল করায় আগামী দুই মাসে রাশিয়া থেকে ৬ লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারের এই বহুমুখী উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় সুফল পাওয়ার আশা করা যেতেই পারে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে, সংকটের কারণ নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে কৃষকের তালিকা আছে। তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজেল সরবরাহ করার কথা বলা হয়েছে। আসল কথা এটিই। এটি একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বিষয়। সেই বিষয়টির প্রতি সরকারের বিশেষ মনযোগ দেওয়া দরকার। একইসঙ্গে অব্যাহত রাখতে হবে মজুতদারি বিরোধী অভিযানও।
তারপরও দরকার বিশেষ সতর্কতা। কারণ বিপিসি সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানি ব্যাহত হতে পারে। কারণ মধ্যপ্রচ্যের বাইরের যেসব দেশ থেকে আমদানির চেষ্টার কথা উপরে বলা হয়েছে তাদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে পরিশোধনের পর রপ্তানি করে থাকে। তাই তাদের কাছ থেকে সময়মতো ডিজেল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা যে কোনো সময়ই দেখা দিতে পারে।
অরুণ কর্মকার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক