ফারুকীর মন্ত্রিত্ব শেষ হল, কিন্তু ‘শনিবার’ আর এল না, ‘বিকেল’ও হল না

মস্কোতে তখন বরফ গলার ঋতু— এপ্রিল যাই যাই করছে, ক্যালেন্ডারে বসন্ত, কিন্তু বাতাসে তীব্র কিরকিরে ঠান্ডা। রাস্তাঘাটে সাদা বরফের স্তূপ ধীরে ধীরে গলছে, গলে কালচে পানিতে পরিণত হচ্ছে। তবু শহরের শরীরে শীতের স্মৃতি রয়ে গেছে। ২০১৯ সালের কথা। এই রুশ শহরেই তখন আমার বসবাস। 

হঠাৎ শুনি, নবই আরাবতস্ক্যায়ায় মস্কো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার নয়া চলচ্চিত্র ‘শনিবার বিকেল’ নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। খবরটি আমার ভেতরে এক অদ্ভুত আলোড়ন তুলল।

আপনি যদি বাংলাদেশে থাকেন, তাহলে এই সিনেমাটি আপনি দেখেননি। সম্ভবত দেখার সুযোগ মিলবেও না কোনোদিন আপনার। অল্প কিছু বাংলা ভাষাভাষী যেসব মানুষ বিদেশের মাটিতে বসে এই সিনেমাটি দেখার সুযোগ পেয়েছেন, আমি তাদের একজন। এই সিনেমাটি বাংলাদেশে মুক্তি দেওয়া হয়নি কখনো। একসময় বলা হতো শেখ হাসিনার সরকারের অনীহার কারণে সিনেমাটি বাংলাদেশের দর্শকের জন্য মুক্তি দেওয়া যায়নি।

কিন্তু খোদ সিনেমাটির পরিচালক মন্ত্রী পদমর্যাদায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন যখন, তখনো এই সিনেমার মুক্তির কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি তার তরফ থেকে। অথচ আমরা ভেবেছিলাম, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী উপদেষ্টা হয়েছেন, এবার হয়ত বাংলাদেশের সিনেমা হলে আরেকবার ছবিটি দেখতে পাব।

কেন এই সিনেমা মুক্তি দেওয়া হল না? উপদেষ্টা হওয়ার পরও কেনইবা ফারুকী এই ছবি নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করলেন না? আমার ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা এবং এটির গল্পে তুলে ধরা বক্তব্য দেখে চলুন বোঝার চেষ্টা করি।

‘শনিবার বিকেল’ নির্মিত হয়েছে ২০১৬ সালের ১লা জুলাই ঢাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে চালানো ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। সেই হামলায় ২২ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বিদেশি নাগরিক। রাষ্ট্রের ভাষ্য ছিল—ছবিটি দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তাই চলচ্চিত্রটির সেন্সর সার্টিফিকেট আটকে দেওয়া হয়।

অবশ্য এর আগে মস্কোসহ বেশ কয়েকটি দেশের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি দেখানো হয়, প্রশংসিত হয়, পুরস্কারও জোটে ভাগ্যে। এরকম একটি ছবি কেন কেবল বাংলাদেশেই আটকে গেল? এই নিষেধাজ্ঞা কি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি রাষ্ট্রীয় ‘ইমেজ ম্যানেজমেন্ট’-এর অংশ? 

২০১৯ সালে এই ছবি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বুদ্ধিজীবী মহলে—সবখানেই আলোচনা, বিতর্ক, প্রতিবাদ। তাই আমার মধ্যে ছবিটি দেখার জন্য প্রবল এক ক্ষুধা তৈরি হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রবাসে বাংলাদেশি শিল্পীদের সঙ্গে দেখা করার আকুলতা। মনে হলো—এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।

শনিবার বিকেল-এ অভিনয় করেছেন ভারতের অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ও বাংলাদেশের নুসরাত ইমরোজ তিশা।

আমার রুশ শিক্ষক বারবারা’কে আমন্ত্রণ জানালাম। বারবারা বাংলা বা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না, কিন্তু বিশ্বরাজনীতি ও চলচ্চিত্র নিয়ে তার গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি আনন্দের সঙ্গে রাজি হলেন। আমরা অনলাইনে টিকিট কেটে নির্দিষ্ট দিনে ফেস্টিভ্যাল প্রাঙ্গণে পৌঁছে গেলাম। আন্তর্জাতিক উৎসবের সেই আবহ—বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রকার, সমালোচক, দর্শক—এক বহুভাষিক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। সেবার সেখানে আমার প্রিয় দক্ষিণ কোরীয় নির্মাতা কিম কি-ডুক’কে সামনাসামনি দেখার সৌভাগ্যও হয়েছিল। সেটি যেন এক অতিরিক্ত প্রাপ্তি।

কিছুক্ষণ পর ফারুকী এলেন, সঙ্গে তার স্ত্রী ও তারকা অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা এবং জাহিদ হাসান। হলের বাইরে সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বিনিময়, গপ্পোসপ্পো আর সেলফি তুলে আমরা সিনেমা দেখতে অডিটেরিয়ামে ঢুকলাম। আমার পাশে বারবারা। হল অন্ধকার হলো, পর্দায় ভেসে উঠল ইংরেজি টাইটেল ‘স্যাটারডে আফটারনুন’—যে ছবিটি আমার নিজের দেশে দেখার অধিকার ছিল না, সেটিই আমি দেখছি রাশিয়ার রাজধানীতে বসে।

কিন্তু সিনেমা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আমার মধ্যে অস্বস্তি জন্ম নিল। গোলাগুলির শব্দ, আতঙ্কিত মানুষের চিৎকার, নির্বিচারে হত্যার দৃশ্য—বারবারা হঠাৎ আঁতকে উঠলেন। তার মুখে বিস্ময়, আতঙ্ক, প্রশ্ন। আমার মনে হলো, তিনি হয়ত ভাবছেন—বাংলাদেশ কি তবে এমন এক দেশ? আমি নিজেও বিব্রত হয়ে পড়লাম। ফিসফিস করে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম—এটি একটি বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবি; এটি আমার দেশের সামগ্রিক চিত্র নয়।

এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই আমাকে এক দ্বৈত বোধে ফেলে দেয়। একদিকে আমি বিশ্বাস করি—সিনেমা একটি আন্তর্জাতিক ভাষা; সত্য ও শিল্পের কোনো ভূগোল নেই। অন্যদিকে, জাতীয়তাবোধের জায়গা থেকে মনে হয়েছিল—এমন একটি ট্রমাটিক ঘটনার পুনর্নির্মাণ, যা বিদেশি দর্শকের সামনে তুলে ধরা কি আমাদের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলে না? বিশেষত যখন দেশেই ছবিটি সেন্সর ছাড়পত্র পায়নি। 

শনিবার বিকেল-এর প্লট

শনিবার বিকেল-এ নুসরাত ইমরোজ তিশা।

চলচ্চিত্রটির নান্দনিক নির্মাণ নিয়ে আলোচনা জরুরি। ছবির মূল অংশটি প্রায় আনকাট এক শটে ধারণ করা। পুরো ঘটনাপ্রবাহ আবদ্ধ একটি অভিজাত রেস্তোরাঁয়। এই সীমিত স্পেস দর্শকের মধ্যে ক্লস্ট্রোফোবিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। আমরা যেন সেই রেস্তোরাঁর ভেতর বন্দি। ক্যামেরা ক্রমাগত ঘুরে বেড়ায়—কখনও জিম্মিদের মুখে, কখনও বন্দুকধারীদের চোখে। এই একটানা টেনশন দর্শক যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়।

রেস্তোরাঁয় একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী ইতোমধ্যে হামলা চালিয়েছে। জিম্মিদের দেশি ও বিদেশি—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। এক আরব বংশোদ্ভূত বৃদ্ধ টপ লিডার, আর নেতৃত্বে বাংলাদেশি পলাশ—চরিত্রে পশ্চিমবঙ্গের অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। বিদেশিদের একে একে আলাদা করা হয়। জাপানি, ফরাসি ও ইতালীয় নাগরিকদের অফস্ক্রিনে হত্যা করা হয়।

এক গর্ভবতী নারী অনাগত সন্তানের প্রাণভিক্ষা করলে, তাকে ইরাক-সিরিয়ায় শিশু হত্যার উদাহরণ টেনে বিদ্রুপ করা হয়, এবং শেষে পেটে গুলি করা হয়। এক বিদেশিকে তার বৃদ্ধা মাকে ফোন করতে বলা হয়—যাতে মা গুলির শব্দ শুনতে পান। এই নির্মমতার মধ্যেই স্পষ্ট হয়—সন্ত্রাসীরা নিজেদের যুক্তি দাঁড় করাতে চায় এক বিকৃত বৈশ্বিক প্রতিশোধবাদের ভেতর।

পরবর্তী ধাপে মুসলিম জিম্মিদেরও পরীক্ষা শুরু হয়। নামাজ জানা, সুরা বলতে পারা, পোশাকের ধরন—সবকিছু জীবন-মৃত্যুর মানদণ্ড হয়ে ওঠে। ফুকোর ‘বায়োপলিটিক্স’ ধারণা এখানে প্রাসঙ্গিক—রাষ্ট্র বা ক্ষমতাকাঠামো যখন শরীর, পরিচয় ও ধর্মকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানায়, তখন তা এক ধরনের ‘বায়োপলিটিক্যাল ফিল্টারিং’। এখানে জঙ্গিরাই সেই ক্ষুদ্র ক্ষমতাকাঠামো।

নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ছেঁড়া জিন্স পরা এবং সুরা বলতে না পারার কারণে নিহত হয়। নারীদের ‘বেশ্যা’ ও ‘অপবিত্র’ আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হয়। রাইসা—নুসরাত ইমরোজ তিশা অভিনীত চরিত্র—হিজাব পরিহিত থাকায় প্রথমে বেঁচে যান। কিন্তু তিনি সন্ত্রাসীদের যুক্তির বিরোধিতা করলে তাকেও হত্যা করা হয়। তার চরিত্রটি সন্ত্রাসীদের ছদ্ম-ধর্মীয় মতাদর্শের বিরুদ্ধে এক নৈতিক প্রতিবাদ।

অন্যদিকে শহীদুল—জাহিদ হাসান অভিনীত চরিত্র—একজন ধার্মিক, মানবিক ব্যবসায়ী। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, জীবনে কারও অমঙ্গল চান না। তিনি তার অল্পবয়সী ছেলেকে ও এক ভারতীয় সহকর্মীকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। যখন সন্ত্রাসীরা জানতে পারে—এখানে একজন ভারতীয় আছে—তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ভারতবিদ্বেষের উন্মত্ততায় তারা ভারতীয়টিকে খুঁজতে থাকে। বিশ্বাস করে—ভারতীয় হত্যা করলে জান্নাত লাভ নিশ্চিত।

শহীদুল জানেন কে ভারতীয়, তবু কাউকে চিহ্নিত করেন না। একে একে সবার দিকে তাকিয়ে বলেন—“না, সে নয়।” শেষ পর্যন্ত ভারতীয় ব্যক্তিটিও রক্ষা পায়। কিন্তু টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেখে সন্ত্রাসীরা বুঝতে পারে—শহীদুল মিথ্যা বলেছেন। তার এই মানবিক ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র জন্য তাকেই প্রাণ দিতে হয়।

এই দৃশ্যটি চলচ্চিত্রের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু। ফারুকী এখানে এক ‘মডারেট’ বা মানবিক মুসলিম চরিত্র নির্মাণ করেন—যিনি ধর্মীয় আচার মানেন, কিন্তু ঘৃণা নয়; বরং সহমর্মিতা বেছে নেন। এই নির্মাণ কি বাংলাদেশের মুসলিম পরিচয়ের এক বিকল্প বয়ান? সম্ভবত তাই। এখানেই ছবিটির রাজনৈতিক তাৎপর্য। 

মস্কোতে লেখক।

পরিচালকের রাজনীতি

এটি কেবল সন্ত্রাসবাদের গল্প নয়; এটি পরিচয়ের রাজনীতির বিরুদ্ধে এক প্রশ্ন। কে মুসলিম, কে অমুসলিম—এই বিভাজনের ভিত্তিতে জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত—কেমন সমাজ গড়ে তোলে?

ছবিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়, রাশিয়ান ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। অথচ বাংলাদেশি দর্শকের কাছে ছবিটির পরিচয় দাঁড়ায়—“সরকার নিষিদ্ধ করেছে”—এই পর্যন্ত। ছবির ভেতরের ন্যারেটিভ, চরিত্র, মানবিক প্রশ্ন—সবই অদেখা থেকে যায়।

সম্ভবত ‘শনিবার বিকেল’-এর মুক্তি-সংকট নিজেই এক মেটা-ন্যারেটিভ। ছবির ভেতরে জিম্মিদের বন্দিত্ব, আর ছবির বাইরে সেন্সরের বন্দিত্ব—দুটির মধ্যে এক প্রতীকী সাযুজ্য তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র যেন নিজেই এক ক্লস্ট্রোফোবিক স্পেস—যেখানে শিল্পের শ্বাসরোধ ঘটে।

সিনেমাটি বুঝবার মধ্য দিয়ে মুক্তি না মেলার রাজনীতি ও ফারুকীর রাজনীতি বুঝবার চেষ্টা করব। একজন শিল্পীর কাছে তার সৃষ্ট আর্ট ওয়ার্ক সন্তানতুল্য। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর শনিবার বিকেল যখন সেন্সর বোর্ড বাতিল করে দিল, ফারুকী ভাই সন্তান হত্যার বেদনায় ছটফট করলেন। সেই বেদনায় আমরা ও ব্যথিত হলাম।

সন্তানটিকে মুক্ত করবার জন্য আমার মতো অনেকেই আওয়াজ তুলেছিল, অনেক লেখালেখি হলো, অনেক প্রতিবাদও হলো। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে এই অভিযোগে নিষিদ্ধ করা হয় শনিবার বিকেল সিনেমা। 

২০২১ সালের জানুয়ারিতে জনাব ফারুকীর নেতৃত্বে একদল শিল্পী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নানাভাবে প্রতিবাদ জানায়। ২০২২ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং শিল্পীদের একটি দল চলচ্চিত্রটিকে কেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করে। 

২০২২ সালে, ডিরেক্টরস গিল্ড নামে টেলিভিশন নাটক পরিচালকদের একটি সংগঠন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় এবং চলচ্চিত্রটিকে সেন্সর ছাড়পত্র দিতে দাবি করে। সিনেমাটি মুক্তি পেলে যতটা হাইপ তুলত, তার চাইতে কম হাইপ তোলেনি ছবিটার মুক্তি না পাওয়া। 

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নানা ফর্মে নানা উপায়ে প্রতিবাদ জারি রাখলেন। বাক স্বাধীনতা, শিল্পের মুক্ত বিকাশ অপর দিকে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের প্রশ্ন বড় করে হাজির হল তখন। রাষ্ট্র যেন তখন নিজেই এক ক্লস্ট্রোফোবিক স্পেস। 

বাংলাদেশি দর্শকের কাছে এই ছবির ইমেজ এই যে – ফারুকীর সিনেমা সরকার ব্যান করে দিয়েছে, ব্যাস এটুকুই। এই ছবির ভিতরের গল্প আর ন্যারেটিভ বাংলাদেশি দর্শকের আর জানা হল না। এখন ফারুকী নিজেও বোধ করি খুশি যে – তার একটি সিনেমা তৎকালীন সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল এই ভেবে। কারণ ছবিটির যখন মুক্তির সুযোগ আসছিল তখন তিনি আর ছবিটা মুক্ত করলেন না। ছবিটার নিষিদ্ধ রাজনীতির এচিভমেন্ট নিয়েই বোধহয় তিনি সন্তুষ্ট। 

২০২৩ সালে অবশ্য চলচ্চিত্রটি নিয়ে শুনানি হয়েছিল। শুনানিতে চলচ্চিত্রটির মুক্তিতে আর বাধা নেই জানানো হয়, তা সত্ত্বে ও চলচ্চিত্রটি এখনো বাংলাদেশে মুক্তি পায়নি। 

শনিবার বিকেল-এ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।

এরপর মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা হলেন। ২০২৪, ২০২৫, ২০২৬ সাল সমস্তই তার অনুকূলে থাকা সত্ত্বেও তবে কেন তার সন্তানতুল্য সৃষ্টি 'শনিবার বিকেল'কে মুক্ত করলেন না? সবার সামনে হাজির করলেন না? 

এই প্রশ্নের উত্তর তবে কি লুকিয়ে আছে সিনেমার গল্পে? সিনেমাটি যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয় বুঝবেন ফারুকী শনিবার বিকেল সিনেমায় যে ন্যারেটিভ বা বয়ান করেছেন, যে বক্তব্য বা আদর্শ তিনি হাজির করেছেন তা ২৪ পরবর্তী সময়ের সাথে কম্প্রোমাইজ করেছেন। একজন শিল্পীর সৎ সাহস নিয়ে আমাদের মাঝে প্রশ্ন তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। 

এই চলচ্চিত্রটিতে সন্ত্রাসবাদের পেছনের উগ্রতা ও ধর্মান্ধতার দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। এই ছবির মূল উপজীব্য বন্দুকধারীদের সঙ্গে ভীত-সন্ত্রস্ত জিম্মিদের সংলাপ। আক্রমণকারীরা যে অযৌক্তিক যুক্তিতে নিজেদের কাজকে বৈধতা দিতে চায়, সেই বিকৃত চিন্তাপদ্ধতিতে ফারুকীর প্রশ্ন এবং বেঁচে থাকা মুসলিম জিম্মিদের গভীর মানবিকতায় ফারুকীর দর্শন। 

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলেছে। নির্মাতা নিজেও রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক কাঠামোর অংশ হয়েছেন। তবু ছবিটি মুক্তি পায়নি। তাহলে কি ছবির ন্যারেটিভ, বক্তব্য বা আদর্শ পরবর্তী সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে কোনো অস্বস্তিকর দ্বন্দ্ব তৈরি করে?

যখন সুযোগ এল, তখনও মুক্তি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত—তার পেছনের যুক্তি কী? এটি কি কৌশলগত নীরবতা, নাকি রাজনৈতিক সমঝোতা?

বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সিনেমা ভাষা আমার পছন্দের। ফারুকী বরাবরই সমকালীন সমাজের অন্তর্লীন দ্বন্দ্ব, নাগরিক মানসিকতা এবং রাষ্ট্র-ব্যক্তির টানাপড়েনকে চলচ্চিত্র ভাষায় অনুবাদ করেন।

তবু প্রশ্ন রয়ে যায়—আমরা কি সত্যের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত? শিল্প কি রাষ্ট্রের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল? উগ্রতার বিরুদ্ধে মানবিকতার ভাষা কতটা শক্তিশালী?

‘শনিবার বিকেল’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের শিল্প-স্বাধীনতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছবিটি মুক্তি পাক বা না পাক—তার ভেতরের প্রশ্নগুলো আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে বারবার ফিরে আসবে। কারণ শেষ পর্যন্ত, শিল্পের কাজই হলো অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলা। সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু চিরদিনের জন্য নীরব করা যায় না।