স্মৃতিচারণ

মৃত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি ও একটি ঘামতে থাকা হাত

ওঠার সময় ক্যাপসুল লিফট দিয়ে দিব্যি উঠে গিয়েছিলাম তিনতলায়। নামতে গিয়েই যত কাণ্ড।

এসকেলেটরের সামনে একটু ভিড় ছিল। আমরা তিনজন। আমি, রাহাত আর ফাল্গুনী সুড়সুড় করে নিচে নেমে এলাম। নিচে এসে তাকিয়ে দেখি, সুপর্ণা ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে!

সুপর্ণা আর ফাল্গুনী সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে পড়তো। কলেজের কোচিংয়ে গিয়ে পরিচয়, সেখান থেকে বন্ধুত্ব। সুপর্ণাকে আমার কুসুম কুসুম ভালো লাগতো। কিন্তু ও আবার আমার বন্ধুর প্রতি দুর্বল ছিল। সে যাহোক, রাহাত ততক্ষণে ফাল্গুনীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেছে।

আমি আবার এসকেলেটরে চড়ে ওপরে উঠলাম। সুপর্ণাকে বললাম, ‘হাত ধরো। আরে, কিছুই হবে না।’

ও হাত ধরল। হাতটা ঘামছে। কিন্তু হাত ধরেও আমাদের আর এসকেলেটরে নামা হলো না। পা রাখতে গিয়েই ওর হোঁচট খাওয়ার দশা। শেষ পর্যন্ত বোধ হয় লিফটের লাইনে দাঁড়িয়েই নিচে নেমেছিলাম।

মানুষের মস্তিষ্ক খুব অদ্ভুত। সুপর্ণার সঙ্গে আমার আরও কত স্মৃতি। ল্যান্ডফোনে কথা বলেই কত সময় কাটিয়েছি। অথচ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি বন্ধ হওয়ার খবর শুনে প্রথমে এই দৃশ্যটাই মনে পড়লো। ওপরে সুপর্ণা দাঁড়িয়ে আছে, আমি নিচ থেকে তাকিয়ে আছি।

আচ্ছা, সেদিন হাত ধরে নামতে পারিনি বলেই কি পরে আর হাতে হাত রেখে চলা হলো না!

স্মৃতির চেইন রিঅ্যাকশন

আড়াই দশকেরও বেশি সময় পর ফেইসবুক আর সামাজিক মাধ্যম যখন কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির স্মৃতিতে ভরে উঠছে, তখন আমার মনে পড়ছে একটি ঘামতে থাকা হাতের কথা। প্রায় আটাশটা বছর। একটা মার্কেট এতগুলো বছর টিকে ছিল, আর আমি এতগুলো বছর একটা হাতের ওম বুকে নিয়ে বসে আছি, জানতামই না।

স্মৃতির সমস্যা হলো, এর একটা চেইন রিঅ্যাকশন আছে। কোনো ঘটনা বছরের পর বছর মনে পড়ে না। তারপর একটা নাম, একটা ছবি কিংবা একটা ভবন হঠাৎ সেই বন্ধ দরজা খুলে দেয়। একটার পেছনে আরেকটা ঘটনা বেরিয়ে আসতে থাকে।

সুপর্ণার কথা মনে পড়তেই যেমন মনে পড়লো রুবেলের কথা। 

নটর ডেম কলেজে পড়ার সময় রুবেলের সঙ্গে পরিচয়। কলেজজীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। একদিন ওর প্রিয় মানুষটির সঙ্গে দেখা করতে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিতে। মেয়েটি ভিকারুননিসায় পড়তো। বয়সে আমাদের বেশ ছোট, স্কুলপড়ুয়া। কী মিষ্টি চেহারা! নামটাও মনে আছে, ফিমা।

নামগুলো ইচ্ছা করেই লিখছি। এত বছর আগের নির্দোষ অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নাম বলতে সমস্যা কোথায়! রুবেল তো এখন অন্যলোকে। কর্ণফুলীর সেই আড্ডার বছর দেড়েকের মাথায় মোটরবাইক দুর্ঘটনায় ও চলে গেলো। ভবনটা বন্ধ হয়েছে, এ খবরে আমার যত না কষ্ট, তার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে এটা ভেবে যে, যে জায়গায় রুবেল তার ভালোবাসার মানুষটির সামনে দাঁড়িয়ে লাজুক হাসতো, সেই জায়গাটাও এবার আর রইলো না।

ভাবি, একটা মার্কেটের কথা মনে করতে বসে কোথায় কোথায় চলে যাচ্ছি! একবার এসকেলেটরের সামনে, আরেকবার এমন এক বন্ধুর কাছে, যার সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না।

একটা তারিখের খোঁজে

তবে স্মৃতি কি সব ঠিকঠাক রাখে? ঘটনাগুলো মনে আছে, কিন্তু সময়ের হিসাব? কোনটা আগে, কোনটা পরে? কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি ঠিক কবে চালু হয়েছিল? ইন্টারনেটে খুঁজতে শুরু করলাম। সব জায়গাতেই ১৯৯৮ সালের কথা আছে, ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে নির্মাণকাজ শুরু, ১৯৯৮ সালে শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে এসে দাঁড়ালো বিশ তলার ভবন। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনটি কোথাও নেই।

১৯৯৮!

মনে হলো, হ্যাঁ, ওই সময়ই তো হবে। পাশের হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে তখন বিকেলে মার্শাল আর্ট শিখতে যেতাম। কলেজের পেছনে বিরাট একটা পুকুর ছিল। একটা পরিত্যক্ত পাকা বাস্কেটবল কোর্টে চলতো আমাদের অনুশীলন। সেখান থেকে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি ত্রিশ সেকেন্ডের হাঁটা পথ।

উল্টো দিকে বন্ধু তানভীরদের বাড়ি আর ওদের পারিবারিক আবাসিক হোটেল। ‘জলখাবার’ নামে একটা দোকানও ছিল। সেগুলো আছে এখনও?

কর্ণফুলীর জায়গায় আগে বোধ হয় পুরোনো একটা দোতলা দালান ছিল। একদিন দেখলাম, জায়গাটা ঘিরে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। সেই হিসাবে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি তো আমার চোখের সামনেই তৈরি হলো! একটা একটা করে ইট উঠতে দেখেছি, আর কোনোদিন ভাবিনি, যে ভবনটাকে বড় হতে দেখছি, তাকে একদিন এভাবে বিদায় জানাতে হবে।

তারিখ খুঁজতে খুঁজতে একসময় পুরোনো পত্রিকা ঘাঁটতে শুরু করলাম। কেন যে একটা তারিখ এত জরুরি হয়ে উঠলো, নিজেও জানি না। হয়তো তারিখটা মিললে নিজের স্মৃতিগুলোকেও ঠিক জায়গায় বসানো যাবে।

উদ্বোধনের চার দিন আগের বিজ্ঞাপন: ‘আগামী ২৮শে নভেম্বর ’৯৮ শুভ উদ্বোধন’। সঙ্গে কাঁচের ক্যাপসুল লিফটসহ ভেতরের ছবি। (দৈনিক জনকণ্ঠ, ২৪ নভেম্বর ১৯৯৮)

পুরোনো জনকণ্ঠের ২৪এ নভেম্বর ১৯৯৮-এর পাতায় পেলাম বিজ্ঞাপনটা। বড় হরফে লেখা, ‘আগামী ২৮শে নভেম্বর ’৯৮ শুভ উদ্বোধন’। পাশে ফিতা কাটার কাঁচি ধরা একটা হাত। তার নিচে ‘কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, কাকরাইল’, আর ছোট হরফে দাবি, ‘সদ্য নির্মিত দেশের সর্বাধুনিক শপিং কমপ্লেক্স’। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত, ‘সম্পূর্ণ নতুন ও সুন্দর পরিবেশ’, আর শেষে সেই আমন্ত্রণ, ‘কেনাকাটার জন্য আপনি আমন্ত্রিত’। কোণে কর্ণফুলী ইঞ্জিনিয়ারিং কোং লিমিটেডের নাম, নিচে ছোট করে ‘সিন্স ১৯৫৪’। বাঁ পাশের ছবিতে ঝকঝকে করিডোর, গাছপালা আর মানুষের ভিড়ের মাঝখানে কাঁচের ক্যাপসুল লিফট। ২৭এ নভেম্বরের ইত্তেফাকে বিজ্ঞাপনটা প্রায় একই, শুধু কথাটা আরও কাছে এসেছে: ‘আগামীকাল শুভ উদ্বোধন’।

ঠিক এই সময়ের আরেকটা বিজ্ঞাপন আমাকে থামিয়ে দিলো। উপহারসামগ্রী আর গ্রিটিংস কার্ডের দোকান আর্চিস জানাচ্ছে, ২৫এ নভেম্বরেই তাদের দোকান খুলে গেছে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির নিচতলায়, ১৪ নাম্বার দোকানে। সেদিনই আরেকটি শাখা খুলছে হাতিরপুলে, ইস্টার্ন প্লাজার উল্টো দিকে। উদ্বোধনের তিন দিন আগেই দোকানে দোকানে সাজ শুরু হয়ে গেছে, আর ইস্টার্ন প্লাজা তখনই এমন এক মাইলফলক, যার নাম বলে ঠিকানা বোঝানো হয়!

গ্রিটিংস কার্ড! তখন একটা কার্ড বাছতেও কত সময় লাগতো। দোকানে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা কার্ড খুলে পড়া। কোন কথাটা বেশি বলে ফেলছে, কোনটা আবার কিছুই বলছে না, সেই হিসাব। আজ একটা ‘সেন্ড’ বোতামে সব কথা উড়ে যায়। তখন কথা বলতে গিয়েও হাত কাঁপতো।

আর ক্যাপসুল লিফট! উদ্বোধনের প্রায় দুই মাস পর, ১৯৯৯ সালের ১৯এ জানুয়ারি ঈদ। তার আগে ইত্তেফাকে কর্ণফুলী প্রায় পুরো পাতাজুড়ে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে। সেখানে সে নিজেই প্রশ্ন করেছে, ‘এখানে কেন আসবেন?’ আর নিজেই উত্তর দিয়েছে: সুবিশাল করিডোর, সিসিটিভি আর ভিডিও মনিটরে নিরাপত্তা, ক্যাপসুল লিফট, ফুডকোর্ট, শিশুদের জন্য চিলড্রেন প্লে এরিয়া, কৃত্রিম রক ফাউন্টেন, মাটির নিচে গাড়ি রাখার জায়গা। সাতাশ বছর পরে পড়ে হাসি পায়, আবার বুকও কেমন করে। সিসিটিভি তখন বিজ্ঞাপনের আকর্ষণ! আমি ওই লিফটেই চড়ে তিনতলায় উঠেছিলাম, আর ওই ‘সর্বাধুনিক’ ভবনেই এক সন্ধ্যায় একটা মেয়ের হাত ধরে এসকেলেটরে নামতে পারিনি।

তলায় তলায় সাজানো ছিল পুরো শহরের কেনাকাটা। ওই বিজ্ঞাপনেই ছিল: প্রথম তলায় আন্তর্জাতিক মানের গিফট সামগ্রী, কসমেটিকস, বিদেশি খেলনা, হস্তশিল্পের বিপুল সম্ভার, সঙ্গে একটা সেলুন আর একটা ব্যাংক। দ্বিতীয় তলায় দেশি-বিদেশি শাড়ি ও ভ্যারাইটি সামগ্রী। তৃতীয় তলায় অত্যাধুনিক তৈরি পোশাক ও জুতা। চতুর্থ তলায় ফুডকোর্ট, ছোটদের গেমস আর ‘শীঘ্রই উন্মোচিত হবে’ বলে জুয়েলারি। নিচে ছোট করে লেখা, ‘জিতে নিন আকর্ষণীয় সব পুরস্কার’। নিচে ক্রেতা, ওপরে খাওয়া আর খেলা। আজ বুঝি, এটা আসলে ছিল দেখা হওয়ার জন্যই বানানো একটা ভবন।

নব্বই দশকের ঢাকার আরও কত কিছু উঠে এলো পত্রিকার পাতা ঘাঁটতে গিয়ে। গুলশান এলাকার আবাসন কোম্পানির বিজ্ঞাপন, ইস্টার্ন হাউজিংয়ের, এমনকি শেলটেকের একটা হোটেল বা মার্কেটের বিজ্ঞাপনও কাছাকাছি পাতায়। যে শহরের ভেতরে আমরা বড় হচ্ছিলাম, পত্রিকার পাতায় তখন সেই শহরের আরেক রকম পরিচয় লেখা হচ্ছিল। শহর তখন নিজেকে বিক্রি করছিল, জমি আর ফ্ল্যাট আর দোকানের স্বপ্নে।

কর্ণফুলীর পেছনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস অবশ্য আরও পুরোনো। ১৯৫৪ সালে হেদায়েত হোসেন চৌধুরীর হাতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর নামে কর্ণফুলী গ্রুপের যাত্রা শুরু। পরে নৌপরিবহন, বাণিজ্য, মোটরযানসহ নানা খাতে ছড়ায় ব্যবসা। আশ্চর্য, ওই একই ১৯৫৪ সালেই আজিমপুরে মাথা তুলেছিল ঢাকার প্রথম পরিকল্পিত আধুনিক বিপণিবিতান, ঢাকা নিউ মার্কেট। এই শহর তখন থেকেই শিখছিল কেনাকাটার জন্য এক ছাদের নিচে জড়ো হতে।

হেদায়েত হোসেনের ছেলে সাবের হোসেন চৌধুরী ওই সময় মতিঝিল থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। একজন সংসদ সদস্যের নামের সঙ্গে জড়ানো মার্কেট, কাজেই আলোচনা তো থাকবেই। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটিও সেই আলোচনাতেই ছিল। তাই বন্ধ হওয়ার প্রথম খবরে আমার মনে হয়েছিল, পরিবারটি ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী ঘরানার বলে কোনো রাজনৈতিক কারণ আছে কি না। পরে দেখলাম নাহ, মার্কেটটি বন্ধ হয়েছে সম্পূর্ণ তার নিজের ব্যবসায়িক কারণেই।

কেন কর্ণফুলী

আমাদের কাছে অবশ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের চেয়ে জরুরি ছিল জায়গাটা।

মতিঝিল থেকে শুরু করে পল্টন হয়ে শান্তিনগর বা মৌচাক-সিদ্ধেশ্বরী, কেনাকাটার বিকল্পের অভাব ছিল না। মৌচাক ছিল, চাঁদনীচক ছিল, জোনাকি সুপার মার্কেট ছিল, বেইলি রোডের দোকানগুলো ছিল। বেইলি রোডও তখন জমজমাট। কর্ণফুলীতে দাম একটু বেশিই মনে হতো। কিন্তু সব সময় তো আর কেনাকাটা করতে যেতাম না।

কর্ণফুলীর বড় সুবিধা ছিল, বেইলি রোড থেকে হেঁটেই আসা যায়। আশপাশে কত স্কুল-কলেজ: আইডিয়াল, ভিকারুননিসা, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস, মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুল, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল, আরও কত। কোচিংয়ে, প্রাইভেট টিউশনে শিক্ষকের বাসায় পরিচয় হতো। তারপর একটু নিশ্চিন্তে দেখা করা, ভালো লাগার মানুষটির সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলা, এর জন্যও তো একটা জায়গা দরকার। বেইলি রোডের নাটকপাড়ার নিজস্ব আড্ডা ছিল, কিন্তু তারা কর্ণফুলী পর্যন্ত আসতেন না। কর্ণফুলী ছিল উঠতি বয়সীদের।

মৌচাকে কোচিংয়ের ভিড় ছিল, কিন্তু দুইদণ্ড বসে কথা বলার জায়গা ছিল না। মনে হতে পারে কর্ণফুলী অনেক দূর। অথচ হাঁটতে ইচ্ছা না করলে রিকশাভাড়া মাত্র চার-পাঁচ টাকা। তখন ওইটুকু দূরত্ব নিয়ে এত ভাবতে হতো না।

ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিজ্ঞাপন। ‘এখানে কেন আসবেন?’ প্রশ্নের উত্তরে ক্যাপসুল লিফট, সিসিটিভি, ফুডকোর্ট আর চিলড্রেন প্লে এরিয়ার তালিকা, সঙ্গে চার তলায় চার রকম পণ্যের বিবরণ। (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে ঈদের আগে)

আমরা ভাবতাম, জায়গাটা আমাদের। অথচ জায়গাটা আসলে আরও অনেকের ছিল। ঢাকার মেয়েরা তখন ভালো বিদেশি প্রসাধন, স্কিন কেয়ার কিংবা স্টোন বসানো গয়নার খোঁজে আসতো এই মার্কেটেই। ফেসবুক পেজ নেই, অনলাইন শপ নেই, তাই আসল জিনিসের ভরসা ছিল কর্ণফুলী। ডিজাইনার বুটিক ছিল, নামকরা লেডিস টেইলার্স ছিল, ছিল জরি-লেস-বোতামের দোকান। মধ্য ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ঘরের মায়েরা, বোনেরা, কত মেয়ের কত সাজের শুরু এখান থেকে। নিচতলায় আগোরা, ওপরে ফুডকোর্ট, ওই এক ছাদের নিচে ছিল পাড়ার রোজকার জীবন।

এসকেলেটরের শহর

আজকের ছেলেমেয়েদের কাছে এসকেলেটরে উঠতে ভয় পাওয়ার গল্প শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় চলন্ত সিঁড়ি নিজেই ছিল দেখার জিনিস।

আমার স্মৃতিতে এসকেলেটরের সঙ্গে প্রথম বিস্ময়টা জড়িয়ে আছে মগবাজারের সেঞ্চুরি আর্কেডে। ঢাকায় কোন মার্কেটে প্রথম চলন্ত সিঁড়ি বসেছিল, সেটা খুব জোর দিয়ে বলতে পারবো না। তবে আমার মনের ছবিতে সেঞ্চুরি আর্কেডই আগে আসে। আশির দশকের শেষে তৈরি সেই ভবনে তখন ছিল ফ্যাশনের শার্ট-প্যান্ট, জুতো, বিদেশি কসমেটিকস। কিন্তু মগবাজার মোড়ের যানজট, পার্কিংয়ের অভাব আর নব্বইয়ের দশকে বড় মলগুলোর প্রতিযোগিতায় ভবনটা মুখ থুবড়ে পড়লো। তারপর নিজেকে নতুন করে বানালো। এখন সেখানে চশমার দোকান আর চোখ-দাঁতের চিকিৎসকের চেম্বার, ঢাকার অন্যতম চশমা ও ডেন্টাল হাব। বেঁচে থাকার জন্য কখনও কখনও নিজের পুরো চেহারাটাই বদলাতে হয়।

তারপর ইস্টার্ন প্লাজা। হাতিরপুলের এই মার্কেটের প্রতিষ্ঠার বছর কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে ১৯৯০। শুনেছি, ঢাকার প্রথম পুরোপুরি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বহুতল মার্কেটের তকমা ওর। বিয়ের শাড়ি, লেহেঙ্গা, সোনার গয়নার খোঁজে উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো ছুটতো ওখানে। আজ সেই ইস্টার্ন প্লাজা মোবাইল ফোন আর গ্যাজেটের ব্যস্ত হাট। কোণে কোণে টিকে আছে কয়েকটা শাড়ি-গয়নার দোকান, যেন পুরোনো দিনের শেষ চিহ্ন। নব্বইয়ের দশকে আমাদের কাছে এসব মার্কেটের নামের সঙ্গেই একধরনের আধুনিকতার ধারণা জড়িয়ে ছিল।

শহর সরতে থাকলো

তারপর শহরটাই সরে সরে বেড়ে যেতে লাগলো।

আমরা যখন কর্ণফুলীর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে, ঢাকা তখন নিঃশব্দে বড় হচ্ছে। বিবিএসের শুমারির সমন্বিত হিসাবে ১৯৯১ সালে ঢাকা জেলার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬১ লাখ ৬০ হাজার, ২০০১ সালে প্রায় ৯১ লাখ ৫০ হাজার, ২০১১ সালে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ, আর ২০২২ সালে ১ কোটি ৫২ লাখের বেশি। তিন দশকে মানুষ বেড়েছে আড়াই গুণের মতো। আর শহর যখন ভরে যায়, তখন সে উপচে পড়ে। পাশের গাজীপুর জেলার জনসংখ্যা ১৯৯১ সালের প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২০২২ সালে পৌঁছেছে ৫৪ লাখের কাছাকাছি। ঢাকা আর শুধু ঢাকায় আটকে থাকেনি।

উদ্বোধনের আগের দিনের বিজ্ঞাপন: ‘আগামীকাল শুভ উদ্বোধন’। ফিতা কাটার কাঁচি, ‘সদ্য নির্মিত দেশের সর্বাধুনিক শপিং কমপ্লেক্স’ আর ‘কেনাকাটার জন্য আপনি আমন্ত্রিত’। (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭ নভেম্বর ১৯৯৮)

কেনাকাটার কেন্দ্রও তাই সরতে থাকলো। ২০০৪ সালের ৬ই অগাস্ট চালু হলো বসুন্ধরা সিটি, পান্থপথে, কারওয়ান বাজারের কাছে। কেনাকাটার সঙ্গে সিনেমা, খাওয়া আর সময় কাটানোর আয়োজনও এক জায়গায় পাওয়া গেলো। আমাদের মার্কেটে যাওয়ার অভ্যাসের পরিধি আরও বড় হলো। তখনও অবশ্য শহরের হৃৎপিণ্ডের কাছেই ছিল সেটা। তারপর ২০১৩ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর উদ্বোধন হলো কুড়িল-বসুন্ধরা অঞ্চলের যমুনা ফিউচার পার্কের, যাকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় শপিং মল বলা হয়। নির্মাণ শুরু হয়েছিল ২০০২ সালে। অর্থাৎ কর্ণফুলী যখন চার-পাঁচ বছরের তরুণ ভবন, তখনই শহরের ভবিষ্যত রওনা দিয়েছে আরও উত্তর-পূর্বের দিকে। 

নতুনের আলোয় পুরোনো মার্কেটগুলো ধীরে ধীরে ম্লান হতে লাগলো। কেউ রূপ বদলে টিকে গেলো, কেউ পারলো না।

কর্ণফুলী পারলো না।

এত হাহাকার কেন

কিন্তু বড় মার্কেট আসার সঙ্গে সঙ্গে ছোট মার্কেটের স্মৃতি ছোট হয়ে যায় না। আমার কাছে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির জায়গাটা অন্য কারণে থেকে গেছে। সেখানে কত টাকার কী কিনেছিলাম, বা ফুডকোর্টে কী খেয়েছিলাম মনে নেই। সুপর্ণার ঘামতে থাকা হাতটির কথা মনে আছে।

সামাজিক মাধ্যমে এত হাহাকারের কারণ বোধ হয় একটাই। নব্বইয়ের দশকের ঢাকার এই মার্কেটটিই সম্ভবত একমাত্র, যেটি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন তার মালিকেরা নিজেরাই। এর আগে ডিসিসি মার্কেট গেছে আগুনে পুড়ে। সেঞ্চুরি আর্কেড বা ইস্টার্ন প্লাজা বন্ধ হয়নি, নিজেদের চেহারা পাল্টে টিকে গেছে। এই প্রথম একটা মার্কেটের মালিকেরা বললেন, আর না। আগুন নেই, ভাঙচুর নেই, শুধু একদিন শাটার নামানো। এমন বিদায় মানুষ কীভাবে মেনে নেবে, বলুন!

শেষ দিনগুলো

এখন খবরের কাগজে পড়ছি, ১লা অক্টোবর থেকে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সংকটের পর দোকানমালিকেরা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সংকটটা একদিনে আসেনি। দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকীবিল্লাহ ওসমানীসহ ব্যবসায়ীদের কথায় যা উঠে এসেছে, তা এক এক করে পড়লে বুকটা ভারী হয়ে আসে। প্রথম ধাক্কা মগবাজার-মালিবাগ উড়ালসড়ক। বছরের পর বছর রাস্তাজুড়ে ধুলো আর যানজট, ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিলো। বড় বড় নামী ব্র্যান্ড তখনই শাখা সরিয়ে নিলো অন্য সচল মার্কেটে, উড়ালসড়ক শেষ হলো, কিন্তু তারা আর ফিরলো না। তারপর করোনার লকডাউন, শতাধিক দোকান এক ধাক্কায় শাটার নামিয়ে দিলো। সঙ্গে এলো ফেইসবুক আর ই-কমার্স, ঘরে বসেই কেনাকাটা, মার্কেটে আসার অভ্যাসটাই যেন ফুরিয়ে গেলো। শেষ দিকে অভিযোগ উঠলো, কিছু অসাধু কসমেটিকস ব্যবসায়ী নকল বিদেশি প্রসাধন আসল বলে চড়া দামে বেচছেন। যে মার্কেটের সবচেয়ে বড় পুঁজিই ছিল ‘আসল জিনিসের ভরসা’, সেই ভরসাতেই চিড় ধরলো।

সংখ্যাগুলো আরও নির্মম। ১৯৮টি দোকানের এই মার্কেটে শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল মাত্র ১৭ থেকে ২৫টির মতো। একসময় যেখানে পা ফেলার জায়গা থাকতো না, সেখানে শেষ দিনগুলোতে নাকি শুধু নিস্তব্ধতা। ওপরে যাওয়ার এসকেলেটর আছে, কিন্তু যাওয়ার মানুষ নেই। মাসের পর মাস পরিচালন ব্যয়ের বোঝা, বকেয়া বিদ্যুৎ বিল ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেলো। বাধ্য হয়ে দোকান মালিকেরা সিদ্ধান্ত নিলেন, আর না।

গ্রিটিংস কার্ডের দোকান আর্চিসের বিজ্ঞাপন। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির নিচতলার ১৪ নম্বর দোকান খুলেছে ২৫ নভেম্বর, একই দিনে হাতিরপুলে ইস্টার্ন প্লাজার উল্টো দিকে আরেকটি শাখাও। (দৈনিক ইত্তেফাক, নভেম্বর ১৯৯৮)

শুনছি, শপিং মল হিসেবে আর কর্ণফুলী ফিরবে না। দোকানের মালিকানা বিক্রি বা দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়ার কথা চলছে, ভবিষ্যতে সেখানে বড় হাসপাতাল, ব্যাংক বা কোনো করপোরেট কার্যালয় আসতে পারে। ওপরের তলাগুলোর আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট নাকি আগের মতোই থাকবে। মানে, ওপরে মানুষ ঘুমাবে, জেগে উঠবে, আর নিচে যেখানে একদিন কিশোর-কিশোরীর প্রথম দেখা হতো, সেখানে হয়তো একদিন করিডরে দাঁড়িয়ে কেউ রিপোর্টের অপেক্ষা করবে।

ওপরে সুপর্ণা

যাদের দোকান ছিল, তাদের কাছে এই বন্ধ হওয়ার হিসাব আলাদা। বিনিয়োগ, আয়, দেনা, কর্মীদের জীবিকা, কত কিছু। আর আমাদের মতো যারা সেখানে কিছুটা সময় ফেলে এসেছি, তাদের হিসাব করতে বসলে সুপর্ণা আসে, ফাল্গুনী আসে, রাহাত আসে। রুবেলও ফিরে আসে।

কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি বন্ধ হওয়ার খবর শুনে তাই শেষ পর্যন্ত উদ্বোধনের তারিখ খুঁজছিলাম। তারিখটা পেয়েছি, ২৮এ নভেম্বর, ১৯৯৮। তবে কি ১৯৯৯ সালের কোনও একদিন দৃশ্যটা তৈরি হয়েছিল- আমরা তিনজন নিচে নেমে এসেছি। সুপর্ণা ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি আবার ওকে নামিয়ে আনতে এসকেলটেরে উঠছি…।

তন্ময় ইমরান একজন সংবাদকর্মী ও লেখক।

[মতামত লেখকের নিজস্ব]