আবার কেন আলোচনায় ককরোচ জনতা পার্টি

দিল্লি আবার উত্তাল। রাজপথে, সামাজিক মাধ্যমে, রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও ফিরে এসেছে যুব-তরুণদের রাজনৈতিক প্রতিবাদ, বিক্ষোভ। এই বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। যে নাম শুনলে সাধারণত ঝাঁটা কিংবা কীটনাশকের কথা মনে পড়ে, সেই নামই এখন ভারতের ক্ষমতার অলিন্দে অস্বস্তির কারণ। একসময় অবজ্ঞা আর অপমানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত ‘তেলাপোকা’ শব্দটিকেই হাতিয়ার করে তরুণেরা যেন বলতে চাইছে, যাদের তুচ্ছ ভেবে পদদলিত করতে চান, তারাই একদিন আপনার সাজানো রাজনৈতিক ঘরের প্রতিটি কোণে প্রশ্নের ঝড় তুলতে পারে। 

ককরোচ জনতা পার্টি নিছক কোনো রসিকতার নাম, নাকি বেকারত্ব, হতাশা, প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থা ও ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভের নতুন ভাষা—সেই প্রশ্নেই আবার সরগরম ভারতের রাজনীতি। মহাক্ষমতাধর ভারতীয় জনতা পার্টি, বিজেপিকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। এই দলের বিক্ষোভকে ঘিরে চরম অস্বস্তিতে আছে ক্ষমতাসীনরা। তেলাপোকা তাড়ানোর ওষুধ হয়তো বাজারে মেলে, কিন্তু মানুষের ক্ষোভ তাড়ানোর কোনো স্প্রে এখনো আবিষ্কৃত হয়নি!

ভারতের রাজনীতিতে তেলাপোকা নিয়ে এত হইচই হবে, তা বোধ হয় দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক কৌশলবিদেরাও ভাবেননি। যে প্রাণীটিকে দেখলে মানুষ ঝাঁটা খোঁজে, কীটনাশকের বোতল বের করে কিংবা প্রতিবেশীকে ডেকে বলে, “দেখো তো, কোথা থেকে এলো!”— সেই তেলাপোকাই একসময় ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসে হাজির হয়েছে। 

তারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই ক্ষমতার ভাষাকে বিদ্রূপের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এ বছর মে মাসে সামাজিক মাধ্যমে জন্ম নেওয়া এই ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ পরের মাসেই অর্থাৎ জুলাইতে শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে রাজপথেও দৃশ্যমান হয়। এবার অক্টোবরে আলোচনায় উঠে এসেছে ভারতের নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক। ককরোচ জনতা পার্টি ও সহযোগী আন্দোলনকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের বিপরীতে নির্বাচন কমিশন বলছে, সংশোধন প্রক্রিয়া আইনসম্মত এবং এর লক্ষ্য অযোগ্য ও দ্বৈত ভোটার শনাক্ত করা। ফলে ককরোচ জনতা পার্টির নতুন তৎপরতা কেবল একটি ইন্টারনেট-ব্যঙ্গের পুনরাবৃত্তি নয়; এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিবর্তনটা লক্ষ করুন। মে মাসে প্রশ্ন ছিল, বেকার তরুণেরা কি সমাজের চোখে তেলাপোকা? অক্টোবরের প্রশ্ন, ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ পড়লে তিনি কি গণতন্ত্রের চোখে নাগরিকই থাকেন? প্রথম প্রশ্নটি ছিল মর্যাদার; দ্বিতীয়টি নাগরিক অধিকারের। প্রথমটিতে অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দ্বিতীয়টিতে ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ। তেলাপোকা তাই এখন আর শুধু একটি অস্বস্তিকর উপমা নয়; ভারতীয় রাজনীতির অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরার একটি প্রতীক।

ককরোচ জনতা পার্টির শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রচলিত রাজনীতির ভাষা ও আচরণের প্রতি তরুণদের অনাস্থা। এই উদ্যোগকে কেবল সামাজিক মাধ্যমের সাময়িক উন্মাদনা বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না; এর পেছনে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর প্রতি অসন্তোষ এবং তরুণদের সমস্যার সমাধানে তাদের ব্যর্থতার অনুভূতি রয়েছে। অর্থাৎ, ককরোচ জনতা পার্টির উত্থান শুধু শাসক দলের জন্য অস্বস্তির কারণ নয়; বিরোধীদের জন্যও এটি একধরনের আয়না। আয়নায় মুখ দেখে কেউ চুল আঁচড়ায়, কেউ আয়নাটাই ভেঙে ফেলে। ভারতের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো কোন পথ বেছে নেবে, সেটাই দেখার বিষয়। তরুণদের কাছে চাকরি চাইলে চাকরির বদলে বক্তৃতা, পরীক্ষায় স্বচ্ছতা চাইলে তদন্তের বদলে আশ্বাস, আর ভবিষ্যৎ চাইলে অতীতের গৌরবগাথা পরিবেশন করা হলে রাজনীতির বাজারে একসময় নতুন পণ্যের চাহিদা তৈরি হবেই। ককরোচ জনতা পার্টি সেই বাজারে ঢুকেছে একেবারে অপ্রচলিত মোড়কে। তার প্যাকেটের গায়ে লেখা নেই ‘উন্নয়নের অমৃত’, ‘বিশ্বগুরুর নিশ্চয়তা’ কিংবা ‘বিকল্প রাজনীতির বিপ্লব’। বরং নামেই রয়েছে এমন এক আত্মপরিহাস, যা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্র্যান্ডগুলোর চকচকে বিজ্ঞাপনকে বিব্রত করতে পারে।

ককরোচ জনতা পার্টির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও কম নয়। মে মাসে দলটির সামাজিক মাধ্যমের কিছু কার্যক্রম ব্লক করা হয়েছিল; তখন জাতীয় নিরাপত্তা ও বিদেশি প্রভাবের আশঙ্কা নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ সামনে আসে। পরে আন্দোলনটি পরীক্ষায় অনিয়ম, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে রাজপথে প্রতিবাদ সংগঠিত করে। জুলাইয়ে শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থার সংকট ঘিরে আন্দোলনের পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এই উদ্যোগকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। এখানে ক্ষমতার জন্য একটি মৌলিক শিক্ষা আছে। একটি আন্দোলনের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করা যায়, তার নেতৃত্বের সমালোচনা করা যায়, তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু কেবল তার নাম অরুচিকর, ভাষা ব্যঙ্গাত্মক কিংবা অনুসারীরা অসম্ভব রকমের বিদ্রূপপ্রবণ—এই যুক্তিতে তাকে অবজ্ঞা করলে মূল সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যায়।

তেলাপোকা মারার জন্য বাজারে নানা ওষুধ আছে। কিন্তু রাজনৈতিক অসন্তোষের জন্য তেমন কোনো স্প্রে আবিষ্কৃত হয়নি। সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করে সাময়িক নীরবতা তৈরি করা সম্ভব, কিন্তু চাকরির সংকট, পরীক্ষার অনিয়ম কিংবা নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তাতে দূর হয় না। বরং কখনো কখনো দমনমূলক প্রতিক্রিয়াই একটি প্রান্তিক কণ্ঠকে আরও পরিচিত করে তোলে। যোগাযোগবিজ্ঞানে এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় স্ট্রিজেনড ইফেক্ট—কোনো বিষয়কে চাপা দিতে গিয়ে সেটিকে আরও বেশি মানুষের নজরে নিয়ে আসা। ককরোচ জনতা পার্টির প্রাথমিক উত্থান নিয়ে এমন ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে। এ কথা অবশ্যই বলা দরকার, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব উদ্বেগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়; সমালোচনা আর ষড়যন্ত্রও এক নয়। গণতন্ত্রের শক্তি শুধু তার বিরোধীদের সহ্য করার মধ্যে নয়, বরং অভিযোগের জবাব যুক্তি, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মাধ্যমে দেওয়ার মধ্যেও নিহিত।

এই নতুন দিনের তেলাপোকারা কি সত্যিই বিপ্লব ঘটাতে পারবে? এ প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। ভারতের রাজনীতিতে এমন দৃষ্টান্ত নতুন নয়—আন্দোলনের উত্থান হয়েছে, জনসমর্থনের ঢেউ উঠেছে, তারপর কেউ সাংগঠনিক দুর্বলতায় থেমেছে, কেউ ক্ষমতার রাজনীতিতে গিয়ে পুরোনো ব্যবস্থারই অনুকরণ করেছে। ককরোচ জনতা পার্টির সামনে সেই পুরোনো ফাঁদও রয়েছে। যারা প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকে বিদ্রূপ করে জনপ্রিয়তা অর্জন করে, তাদের নিজেদের আচরণেও একসময় সেই প্রতিষ্ঠানের রোগ বাসা বাঁধতে পারে। তেলাপোকা যদি একদিন নিজেই ক্ষমতার রান্নাঘরের মালিক হয়ে যায়, তখন সে আর আগের মতো বিপ্লবী থাকবে কি না, সেটিও দেখার বিষয়। তেলাপোকা অন্ধকারে বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আলোয় দাঁড়াতে হয়। আন্দোলনকে শুধু প্রতিবাদের ভাষা নয়, সমাধানের ভাষাও শিখতে হবে। চাকরি কীভাবে তৈরি হবে, শিক্ষা ও নিয়োগব্যবস্থায় স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সামাজিক বৈষম্য কীভাবে কমবে, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা কীভাবে রক্ষা পাবে—এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর দিতে না পারলে ককরোচ জনতা পার্টিও একসময় আরেকটি ভাইরাল স্মৃতিতে পরিণত হতে পারে।

ককরোচ জনতা পার্টি আলোচনায় এসেছে কারণ তার নামটা আজব, এটি আংশিক সত্য। কিন্তু আরও বড় সত্য হলো, তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ক্ষোভ এখন নতুন নতুন রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বেকারত্ব থেকে পরীক্ষাব্যবস্থা, সেখান থেকে শিক্ষার জবাবদিহি, এবং এখন ভোটার তালিকা ও নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা—আলোচনার ক্ষেত্র বদলেছে, কিন্তু মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে: সাধারণ নাগরিকের উদ্বেগ কি ক্ষমতাবানদের কাছে পৌঁছাচ্ছে? ভারতের সংবাদমাধ্যমে এই আন্দোলন নিয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষা যখন মানুষের হতাশা প্রকাশে যথেষ্ট বলে মনে হয় না, তখন মানুষ নতুন প্রতীক, নতুন কৌতুক এবং নতুন প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে নেয়। ককরোচ রাজনীতি সেই প্রবণতারই একটি উদাহরণ।

বাংলাদেশের পাঠকের জন্যও এই ঘটনায় একটি পরিচিত শিক্ষা রয়েছে। যে সমাজে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, কর্মসংস্থান নিয়ে হতাশা কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন জমতে থাকে, সেখানে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপকে নিছক হাস্যরস বলে উড়িয়ে দেওয়া বিপজ্জনক। কখনো কখনো একটি কৌতুক এমন কথা বলে দেয়, যা দীর্ঘ বক্তৃতা পারে না; একটি মিম এমন অসন্তোষ প্রকাশ করে, যা প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষা আড়াল করে রাখে। তাই ককরোচ জনতা পার্টিকে নিয়ে হাসুন, তার রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলুন, তার কর্মসূচির পরীক্ষা নিন। কিন্তু তার উত্থানের পেছনে থাকা প্রশ্নগুলোকে উপেক্ষা করবেন না। কারণ তেলাপোকাকে মেরে ফেলা গেলেও ঘরের স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, নোংরা নালা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ঠিক না করলে নতুন তেলাপোকা আবার আসবেই।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও তাই। ক্ষোভের প্রতীককে সরিয়ে দিলেই ক্ষোভের কারণ দূর হয় না। আর যে ক্ষমতা নিজের সমালোচনাকে তেলাপোকার মতো তুচ্ছ মনে করে, তার একদিন বুঝতে অসুবিধা হতে পারে—সমস্যাটি তেলাপোকা নয়, সমস্যাটি সেই ঘর, যেখানে তেলাপোকা জন্মানোর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ সম্ভবত এটাই: যে প্রাণীকে মানুষ দেখতে চায় না, সেই প্রাণীই এখন ক্ষমতাকে তার নিজের ঘরের দিকে তাকাতে বাধ্য করছে।

 

লেখক: কলামিস্ট, রম্য লেখক ও উন্নয়নকর্মী

[মতামত লেখকের নিজস্ব]