দেশে আমদানি করা গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ দ্রুত বাড়াতে ভাসমান টার্মিনালকেই (এফএসআরইউ) সুবিধাজনক ও নিরাপদ ভাবছে সরকার। তাই বিদ্যমান দুটির পাশাপাশি নতুন আরো তিনটি টার্মিনাল স্থাপন সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন সময় এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তাদের সেসব বক্তব্য অনুযায়ী নতুন একটি টার্মিনাল স্থাপনের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোমে প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ ক্ষমতার এই টার্মিনালটি স্থাপন করা হবে। এরপর পায়রা বন্দর এলাকায় আরো দুটি স্থাপনের চিন্তা-ভাবনার কথা শোনা যায়। তবে এ দুটির স্থান এখনো চূড়ান্ত নয়। এর পাশাপাশি সরকারের তরফ থেকে স্থলভিত্তিক একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কথাও বলা হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশের গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিও হয়তো অপরিহার্য হবে। সেক্ষেত্রে একের পর এক স্থাপন করা ভাসমান টার্মিনাল কতটা নিরাপত্তা দিতে পারবে সেটা একটু পর্যালোচনা করে দেখা দরকার।
বর্তমানে মহেশখালীতে সামিট গ্রুপ এবং এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত ভাসমান টার্মিনাল দুটির সম্মিলিত সরবরাহ ক্ষমতা দৈনিক সর্বোচ্চ এক হাজার ১০০ মিলিয়ন বা ১১০ কোটি ঘনফুট। কুতুবজোমে নতুন টার্মিনালটি স্থাপিত হলে মোট সরবরাহ ক্ষমতা দাঁড়াবে দৈনিক এক হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
সরকারের আকাঙ্ক্ষা সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে নতুন টার্মিনালটি স্থাপনের। সেটা হয়তো কার্যাদেশ দেওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে স্থাপন করা সম্ভব হলেও হতে পারে। কিন্তু ভাসমান টার্মিনাল থেকে সমুদ্র তলদেশের যে পাইপ লাইনের মাধ্যমে (সাব-সী পাইপ লাইন) এখন গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালিত হয় তার ক্ষমতায় তো ওই তিনটি টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে না! সুতরাং নতুন একটি সাব-সি পাইপ লাইনও স্থাপন করতে হবে। তেমন একটি উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে সেই পাইপলাইন স্থাপনের কাজ দুই বছরের মধ্যে শেষ করা বোধহয় সম্ভব হবে না। সে জন্য দরকার হবে বাড়তি সময় এবং অর্থ। আরো ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের প্রথম সমস্যাটি সেখানে।
এরচেয়ে আরো বড় সমস্যা এবং ঝুঁকি হলো বঙ্গোপসাগরের, বিশেষ করে মহেশখালী ও পায়রা এলাকার প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণতা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভাসমান টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া, টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া, মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দীর্ঘদিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকা, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এই সবই আমরা গত সাত-আট বছরে দেখেছি। এর ফলে দেশে জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা, শিল্প-কারখানায় জ্বালানি সরবরাহ কতটা দুর্বিসহ অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে এবং এখনো যাচ্ছে তার কোনোকিছুই আমাদের অজানা নয়। এ বিষয়ে সরকারের এবং বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষাও রয়েছে।
২০১৬ সালে বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা (পিএসএমপি) প্রণয়নের অংশ হিসেবে সরকার জাইকার মাধ্যমে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানি করা গ্যাস সরবরাহে কোনো ঝুঁকি আছে কিনা তা নিরূপন করাই ছিলো ওই সমীক্ষার উদ্দেশ্য। এ বিষয়ে ওই মহাপরিকল্পনার ৮.৫.৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসপ্রবণ বঙ্গোপসাগরে ভাসমান এলএনজি অবকাঠামো স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রাখা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিনিউয়েবল ল্যাবরেটরির (এনআরইএল) একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী অঞ্চলটি খোলা সমুদ্রের (ওপেন সি) অংশ। সেখানে বাতাসের তীব্রতা ও ঘন ঘন দিক পরিবর্তন, উঁচু তরঙ্গমালা, জলোচ্ছাস ও সামুদ্রিক ঝড় ভাসমান টার্মিনালের মতো অবকাঠামোকে নোঙ্গর করে রাখা এবং সেই টার্মিনালের সঙ্গে সমুদ্র তলদেশের পাইপ লাইনের সংযোগ অবিচ্ছিন্ন রাখা কঠিন করে তুলবে। এসব কারণে সেখানে এলএনজিবাহী জাহাজের নিয়মিত আসা-যাওয়া, টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং নিরাপদে গ্যাস সরবরাহ করা মাঝে মাঝেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ঝড় পরবর্তীকালে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রেও বিলম্ব ঘটতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আমাদের একেকটি ভাসমান টার্মিনাল প্রতিবছর ৪৫ থেকে ৬০ দিন করে বন্ধ রাখতে হয়। এই সময় গ্যাস সরবরাহও বন্ধ থাকে। আর তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের মতো বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধের সময়সীমা আরো বাড়ে। যেমন হয়েছিল ঘূর্ণিঝড় রোমেল এবং মোখার সময়। ২০২৪ সালের ২৭এ মে ঘূর্ণিঝড় রোমেলের কারণে সাগরে ভেসে আসা ভাঙা একটি পন্টুনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সামিটের টার্মিনালের ব্যালাস্ট ট্যাংক। ফলে টার্মিনালটি সিঙ্গাপুরে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মেরামত করে আনতে হয়। ২০২৩ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় মোখার সময়ও সামিট এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল দুটি থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়। তখনও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল।
আকস্মিক বড় যান্ত্রিক ত্রুটি বা দুর্ঘটনা ঘটলেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার মেয়াদ দীর্ঘ হতে পারে। যেমন হয়ে গেলো গত জুলাই-অগাস্ট মাসে, এক্সিলারেট এনার্জির টারমিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে। এছাড়া প্রতি ৫ বছর পর পর পূর্ণাঙ্গ ড্রাই-ডকিং এবং বড় ধরনের ওভারহলিংয়ের জন্য একেকটি টার্মিনালকে বিদেশে নিতে হয়। এসময় একটানা প্রায় ৭৫ দিন গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে।
সরকারি নথিপত্রের হিসাব অনুযায়ী ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিবছর মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলো গড়ে ২০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বা অফলাইনে নিতে হয়েছে। প্রতি বছর প্রতিটি টার্মিনালের ছোটখাটো ত্রুটি মেরামতের জন্য সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিন আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ বন্ধের প্রয়োজন হয়। ঝড়ের সময়গুলোতে সুরক্ষার জন্য টার্মিনালগুলোকে গভীর সমুদ্রে, ঝড়ের আওতার বাইরে সরিয়ে নিতে হয়। এর ফলে দুর্যোগভেদে বছরে গড়ে ১৫ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়। ভাসমান টার্মিনাল পাঁচটি করলেও এই সমস্যাগুলো একই রকম থাকবে।
পায়রা বন্দর এলাকায় আরো এক প্রকার নতুন দুর্যোগপ্রবণতা বিদ্যমান। পায়রা বন্দর নির্মাণের সময়ই ওই অঞ্চলের হাইড্রোলজিক্যাল সমীক্ষা পরিচালনাকারী ব্রিটিশ-ডাচ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছে, পায়রা বন্দরের সন্নিকটে রয়েছে ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগরে নেমে আসা বার্ষিক প্রায় দুই কোটি টন পলিমাটির বেশিভাগই ওই সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড দিয়ে চলে যায়। ফলে সেখানে পলির প্রবাহ অস্বাভাবিক রকম বেশি। তাই সেখানে বন্দর কিংবা যে কোনো অবকাঠামো করতে হলে তা সচল রাখার জন্য সারাবছর ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মতো বিপুল ড্রেজিং কাজ চালাতে হবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ২০২৬ সালের পর এলএনজির ব্যবহার বহুলাংশে বাড়বে। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাড়বে দুর্যোগের সংখ্যা এবং মাত্রাও।
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এই ক্রমবর্ধমান দুর্যোগজনিত নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে টার্মিনাল স্থানান্তর বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। এমনকি বিপুল অর্থের এ বিনিয়োগ হুমকিতেও পড়তে পারে। এ কারণে এই ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কক্সবাজার ও টেকনাফ এলাকায় সাড়ে সাত সেন্টিমিটার পর্যন্ত বেড়েছে। ঢেউ এবং ঢেউয়ের উচ্চতাও বেড়েছে। আরো বাড়বে। ফলে সমুদ্রবক্ষ এবং উপকূলীয় এলাকায় তৈরি করা অবকাঠামো আরো বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।
তাই তাড়াহুড়া করে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন জ্বালানি নিরাপত্তার কতটা সহায়ক হবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন। আর স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল করতে হলে সময় লাগবে ছয় থেকে আট বছর। ব্যয় হবে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার। সুতরাং এই ক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণ করা মোটেই সহজ নয়।