মতামত

হাম: ভাইরাস দায়ী নাকি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাও ব্যর্থ?

বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নয়। এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি, নজরদারি এবং সমন্বয় সক্ষমতার একটি কঠিন পরীক্ষাও। যখন হামের বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাকসিন প্রায় ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান, তখন সেই রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু ঘটনা মেনে নেয়া উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে শুধু ভাইরাসকে দায়ী না করে আমাদের পুরো প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেই দায়ী করা উচিত।

সবাই জানে হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জন ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। একারণেই হাম নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সাধারণ সংক্রামক রোগের তুলনায় অনেক বেশি জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনতে হয়। এই সংখ্যাটা কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ, অর্থাৎ এই বড় জনগোষ্ঠীকে দুই ডোজ টিকার কভারেজে থাকা প্রয়োজন, যাতে হার্ড ইমিউনিটি বজায় থাকে।

হামের প্রাদুর্ভাব হুট করে শুরু হয় না। বহু বছর আগে তার বীজ বপণ হয়। যখন কোনো দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কভারেজ ধীরে ধীরে কমতে থাকে, যখন কিছু শিশু প্রথম ডোজ নেয় কিন্তু দ্বিতীয় ডোজ পায় না, আবার যখন কিছু অঞ্চল স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থেকে যায়, তখন সেখানে একটি ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়। এই টিকাবঞ্চিত বা অসম্পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুরা সময়ের সাথে একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। ভাইরাস একবার ওই জনগোষ্ঠীতে প্রবেশ করলে, তার বিস্তার রোধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।     

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সম্ভবত এমনটাই ঘটেছে। গত কয়েক বছরে হাম-রুবেলা টিকার দ্বিতীয় ডোজ (এমআর-২) কভারেজ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছিল। তার আগে কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। অনেক পরিবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যায়নি, অনেক এলাকায় সেবাদান কমে গিয়েছিল, আবার অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি। এসব শিশু পরে জাতীয় পর্যায়ে একটি বড় ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি করেছে। 

বর্তমান প্রাদুর্ভাবে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদেরও আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণত নবজাতক শিশু মায়ের শরীর থেকে কিছু সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি পায়, যা কয়েক মাস পর্যন্ত তাকে রক্ষা করে। কিন্তু যখন সমাজে ভাইরাসের সংক্রমণ অত্যন্ত বেড়ে যায় অথবা মাতৃ অ্যান্টিবডির মাত্রা পর্যাপ্ত থাকে না, তখন এই স্বাভাবিক সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে টিকা নেয়ার বয়স হওয়ার আগেই শিশুরা ঝুঁকির মুখে পড়ে যায়। 

এই পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি মৌলিক কিন্তু খুব সহজ প্রশ্ন উত্থাপন করে - যদি টিকাদান কভারেজ ধীরে ধীরে কমছিল, যদি ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হচ্ছিল, যদি বিভিন্ন অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী জমা হচ্ছিল- তাহলে কি আমরা যথাসময়ে সেই সতর্ক সংকেতগুলো ধরতে পেরেছিলাম?

জনস্বাস্থ্যে একটি বহুল ব্যবহৃত নীতি আছে- ‘রোগের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হয় হাসপাতালে, তবে প্রতিরোধ করা সম্ভব কার্যকর নজরদারির মাধ্যমেই’। এজন্য বাংলাদেশের বর্তমান হাম সংকট কেবল একটি ভাইরাসের গল্প নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা- যে দেশে ডেঙ্গু, নিপাহ, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং ভবিষ্যতের অজানা সংক্রামক রোগের ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে শক্তিশালী নজরদারি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা ছাড়া শুধু নিয়মিত প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নাও হতে পারে। আমার দৃষ্টিতে আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে হামের ভয়াবহতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। 

এবার আসি আরেকটি ব্যর্থতার আলোচনায়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে আমরা কি দ্রুত ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি? ইনফেকশিয়াস ডিজিজ প্রতিরোধে একটি বহুল ব্যবহৃত কথা আছে-“যে সংকটকে আপনি সঠিকভাবে বুঝতেই পারবেন না, সেটিকে আপনি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণও পারবেন না”। হামের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সেই বাস্তবতাই আবার মনে করিয়ে দিয়েছে। 

কোনো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রিয়েল-টাইম তথ্য। কতজন আক্রান্ত হচ্ছে, কোন জেলায় রোগী দ্রুত বাড়ছে, কোন বয়সের শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, আক্রান্তদের মধ্যে কতজন টিকা পেয়েছে, কোথায় মৃত্যুহার বেশি- এসব তথ্য প্রতিদিন বিশ্লেষণ করা না গেলে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রায় অসম্ভব।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও রোগ নজরদারি ব্যবস্থা অনেকাংশে দুর্বল। হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, বেসরকারি হাসপাতাল, গবেষণাগার এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য প্রায়ই আলাদা আলাদা জায়গায় থাকে। ফলে জাতীয় পর্যায়ে পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র অনেক সময় পাওয়া যায় না। 

একটি জাতীয় এপিডেমিক কমান্ড সেন্টার এই সমস্যার সমাধান করতে পারতো। দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, হাসপাতাল এবং ল্যাবরেটরি থেকে তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে জমা হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বোঝা সম্ভব হতো কোথায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এবং কোথায় জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

যদি দেখা যায় কোনো নির্দিষ্ট জেলায় গত এক সপ্তাহে হামের রোগী দ্বিগুণ হয়েছে এবং আক্রান্তদের অধিকাংশই এমআর-২ টিকা পায়নি, তাহলে কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার সঙ্গে সঙ্গে সেই এলাকাকে “হাই রিস্ক জোন” হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। এরপর অতিরিক্ত ভ্যাকসিন, স্বাস্থ্যকর্মী, ভিটামিন-এ সরবরাহ এবং বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি দ্রুত সেখানে পাঠানো সম্ভব হবে। 

কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বের অনেক দেশ দেখেছে যে, দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ জীবন বাঁচাতে পারে। তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিদিন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফলস্বরূপ, তারা অনেক ক্ষেত্রেই প্রাদুর্ভাবের বিস্তার সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই নীতি গ্রহণ করতে পারতো।

হামের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর প্রতিদিন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর সংক্রমণ ক্ষমতার কারণে কয়েক দিনের বিলম্বও হাজার হাজার নতুন সংক্রমণের কারণ হতে পারে। তাই একটি জাতীয় এপিডেমিক কমান্ড সেন্টার স্থাপন করে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল দেশব্যাপী ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত করা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করা। অন্য কথায়, হাম প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূল পরিকল্পনা হাসপাতালে নয়- বরং শুরু করা উচিত ছিল তথ্য বিশ্লেষণ কক্ষে বা সিচুয়েশন রুমে। আর সেই সিচুয়েশন রুমের নামই হতে পারে বাংলাদেশের জাতীয় এপিডেমিক কমান্ড সেন্টার। দুর্ভাগ্যবশত আমরা এরকম কোনো পদক্ষেপ দেখিনি। আমার দৃষ্টিতে আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এটি আরেকটি ব্যর্থতা।  

কোনো মহামারি বা বড় আকারের প্রাদুর্ভাব শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব। হাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। এটি শুধু একটি ভাইরাসজনিত রোগ নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে টিকাদান কর্মসূচি, ইমিউনোলজি, ভাইরোলজি, শিশুচিকিৎসা, পুষ্টি ডেটা বিশ্লেষণ, ঝুঁকি ডেটা বিশ্লেষণের মতো একাধিক শাখা। এখানেই একটি জাতীয় এপিডেমিক কমান্ড সেন্টার পারে- বৈজ্ঞানিক সমন্বয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করতে।

বাংলাদেশের সৌভাগ্য হলো, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অসংখ্য বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কর্মরত আছেন। তারা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, জনস্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থায় কাজ করছেন। অনেকেই সংক্রামক রোগ, ভ্যাকসিন, রোগ নজরদারি, বায়োইনফরমেটিক্স, প্যান্ডেমিক মডেলিং এবং স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করছেন। কিন্তু জাতীয় সংকটের সময় এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে ব্যবহার করার জন্য কোনো স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। 

একটি জাতীয় এপিডেমিক কমান্ড সেন্টারের অধীনে জাতীয় ও বৈশ্বিক বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ নেটওয়ার্ক গঠন করা গেলে দেশের ভেতরের এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের দ্রুত একত্রিত করা সম্ভব হতো। কোনো এলাকায় হামের সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পেলে এপিডেমিয়োলজিস্টরা সংক্রমণের গতিপথ বিশ্লেষণ করতে পারতেন, ডেটা বিজ্ঞানীরা ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করতে পারতেন, ইমিউনোলজিস্টরা ইমিউনিটি গ্যাপ মূল্যায়ন করতে পারতেন এবং ভ্যাকসিন বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে কার্যকর টিকাদান কৌশল প্রস্তাব করতে পারতেন। এর ফলে সিদ্ধান্ত শুধু অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নয়, বরং প্রমাণভিত্তিক জনস্বাস্থ্য নীতির ভিত্তিতে নেয়া সম্ভব হতো। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এই সমন্বয়ের জন্য বিপুল অর্থ বা অবকাঠামো প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত ভার্চুয়াল বৈঠক, ডেটা শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম এবং একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় টিমের মাধ্যমেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা সম্ভব।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় আমরা দেখেছি, যেসব দেশ দ্রুত বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছে এবং গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে, তারা তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছে। বিপরীতে, যেখানে বিজ্ঞান ও নীতিনির্ধারণের মধ্যে দূরত্ব ছিল, সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ও বিভ্রান্তি বেশি দেখা গেছে। 

একবিংশ শতাব্দীর সংকট মোকাবিলা করতে হলে শুধু স্বাস্থ্য প্রশাসন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন একটি স্থায়ী বৈজ্ঞানিক মস্তিষ্ক, যা সংকটের সময় জাতীয় নেতৃত্বকে সর্বোত্তম তথ্য ও পরামর্শ দিতে পারে। সুতরাং, এই চলমান হাম পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং গবেষণালব্ধ তথ্যকে একত্রিত করে দ্রুত, বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত ছিল। তবে এ ধরনের কোনো উদ্যেগ চোখে পড়েনি। আমার দৃষ্টিতে এটি আরেকটি ব্যর্থতা।  

লেখক: ভ্যাকসিন বিজ্ঞানী, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফেকশিয়াস ডিজিজ অ্যান্ড ভ্যাকসিনোলজি, তাইওয়ান।

[মতামত কলামে প্রকাশিত লেখার দায়-দায়িত্ব একান্তই লেখকের, সম্পাদক এর জন্য দায়ী নন]