অবশেষে বাঙালির জ্ঞানার্জনের পথে এক বিশাল প্রাচীর খাড়া হয়ে গেল। এতকাল আমরা জানতাম, ‘জ্ঞানের জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যাও’। কিন্তু মশা মারার জ্ঞান অর্জনের জন্য যখন আমাদের একদল অক্লান্ত, কর্মঠ সরকারি কর্মকর্তা ব্যাগ-পত্র গুছিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা যাওয়ার টিকিট কাটার স্বপ্ন দেখছিলেন, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক ঐতিহাসিক ‘অ্যারোসল’ স্প্রে করে সেই স্বপ্নে জল ঢেলে দিলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—মশা মারা শিখতে ফ্লোরিডা যাওয়ার কোনো দরকার নেই, সন্ধ্যার পর দেশের যেকোনো একটা ডোবার পাশে দুই-তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেই মশক নিধনের হরেক রকম ‘উদ্ভাবনী’ পদ্ধতি মাথায় চলে আসবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যে দেশপ্রেমিক আমলাদের মনে যে কী পরিমাণ রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তা কোনো সাধারণ নাগরিক বুঝবে না। আমলারা তো নিজেদের আনন্দের জন্য যাচ্ছিলেন না! তারা যাচ্ছিলেন দেশের সাড়ে সতেরো কোটি মানুষকে এডিস আর অ্যানোফিলিসের কামড় থেকে বাঁচাতে। ফ্লোরিডার মিয়ামি সৈকতে বসে মশার মনস্তত্ত্ব না বুঝলে কি ঢাকার গুলশান-বনানী বা চট্টগ্রামের চকবাজারের মশা মারা সম্ভব? একেবারেই না।
যারা ভাবছেন মশা মারার জন্য বিদেশ যাওয়া একপ্রকার বিলাসিতা, তাদের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত দুর্বল। আমাদের দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের অতীতে বিভিন্ন ‘মহৎ’ এবং ‘জটিল’ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য বিদেশ সফরের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। আসুন, সেসব সোনালী অতীত থেকে একটু ঘুরে আসি:
পুকুর খনন ও দিঘি উন্নয়ন শিক্ষা
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। আমাদের দেশের অতি সাধারণ এক চিলতে পুকুর কীভাবে খুঁড়তে হয়, তা শেখার জন্য সরকারের একদল কর্মকর্তা ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়েছিলেন। কারণ তারা মনে করেছিলেন, বাংলার হাজার বছরের চেনা কাদা-মাটি খুঁড়তে গেলে ইউরোপীয় প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকলে সেই পুকুরে মাছ ঠিকমতো সাঁতার কাটতে পারবে না।
খিচুড়ি রান্না ও স্কুল ফিডিং প্রজেক্ট
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য কীভাবে পুষ্টিকর খিচুড়ি রান্না করতে হয়, ডাল-চালের অনুপাত কেমন হওয়া উচিত, তা শিখতে কিছু কর্মকর্তা বিদেশ সফরে যেতে চেয়েছিলেন। দেশের মায়েরা যে খিচুড়ি রাঁধেন, তাতে নাকি ‘উন্নত বিশ্বের’ ভিটামিন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক হৈচৈ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অবশ্য এই বিদেশযাত্রা বাতিল হয়েছিল।
লিফট কেনা ও লিফটের বোতাম টেপা
বহুতল ভবনের জন্য লিফট কিনতে গিয়েও কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর করতে হয়েছে। লিফটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কোন বোতাম চাপলে উপরে যায় আর কোনটা চাপলে নিচে নামে—এই অতি উচ্চমার্গীয় কারিগরি বিদ্যা অর্জনের জন্য বিদেশ না গেলে কি আর উন্নয়ন টেকসই হতো?
রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ শিক্ষা
ড্রেন কীভাবে বানাতে হয়, ড্রেনের ভেতর দিয়ে পানি কোন দিকে প্রবাহিত হবে, তা দেখতে নেদারল্যান্ডস বা লন্ডনের ড্রেন পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন আমাদের কর্মকর্তারা। অথচ মিরপুরের রাস্তায় একটু বৃষ্টি হলেই যে ভেনিস নগরী তৈরি হয়, সেই প্রাকৃতিক বিদ্যাকে তারা সবসময় অবজ্ঞা করেছেন।
এই যদি হয় আমাদের অতীত ঐতিহ্য, তবে মশার মতো এক আন্তর্জাতিক, কুখ্যাত এবং ডানাওয়ালা শত্রুকে দমন করার কৌশল শিখতে ফ্লোরিডা যাওয়াটা কি অপরাধ? ফ্লোরিডার মশারা কীভাবে মানুষকে কামড়ায়, তাদের কামড়ানোর কোণ কত ডিগ্রি, তারা কামড়ানোর আগে গুনগুন গান গায় নাকি র্যাপ মিউজিক বাজায়—এসব না জানলে মশক নিধন কীভাবে সম্ভব?
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যে প্রতিনিধিদলটি ফ্লোরিডা যাওয়ার সারসংক্ষেপ পাঠিয়েছিলেন, তারা অত্যন্ত দূরদর্শী। তারা জানতেন, ফ্লোরিডায় আছে ডিজনিল্যান্ড, আছে সুন্দর সুন্দর সমুদ্রসৈকত আর ডলফিন শো। এখন সমালোচকেরা বলতে পারেন, মশা মারার সাথে ডলফিন শোর কী সম্পর্ক? আরে ভাই, মশা মারতে মারতে যখন মাথা গরম হয়ে যাবে, তখন মনকে একটু বিনোদন না দিলে কি মশা মারার সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়?
তাছাড়া, ফ্লোরিডার মশারা অত্যন্ত আধুনিক। তারা সম্ভবত সুট-টাই পরে ঘোরে। আর আমাদের দেশের ডোবার মশারা? তারা একেবারেই অশিক্ষিত, কোনো শিষ্টাচার নেই। প্রধানমন্ত্রীর কথামতো যদি আমাদের কর্মকর্তারা সন্ধ্যার পর কোনো ডোবার পাশে গিয়ে দাঁড়ান, তবে কী ঘটবে?
আসুন কল্পনা করি ধপধপে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি বা স্যুট পরা একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা মশার ‘মনস্তত্ত্ব’ বুঝতে মিরপুর বা নাসিরাবাদের একটা কুচকুচে কালো পানির ডোবার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে তার একটা নোটপ্যাড ও কলম। দুই মিনিট যেতেই এক ঝাঁক মশা এসে তার কানের কাছে গান গাওয়া শুরু করল এবং ঝাঁকে ঝাঁকে কামড়াতে লাগল। কর্মকর্তা তখন নোটপ্যাডে লিখবেন—
পদ্ধতি ১: মশা তাড়াতে হলে নিজের গালে নিজে জোরে থাপ্পড় মারতে হবে। একে বলে হাতে-কলমে শিক্ষা। উচিত শিক্ষাও বলা যায়!
কিছু সমালোচক বলছেন, ‘শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যেতে পারে না, আর কর্মকর্তারা মশা মারার জন্য বিদেশ যান!’ কী অদ্ভুত তুলনা! শিক্ষার্থীরা বিদেশ যায় নিজের ক্যারিয়ার গড়তে, আর কর্মকর্তারা বিদেশ যান দেশের মশা মারার ‘কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ’ কারিগরি জ্ঞান অর্জন করতে।
কর্মকর্তাদের জীবনটা একটু ভেবে দেখুন। সারাদিন ফাইলে সই করা, মিটিং করা, আর দেশের উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা করতে করতে তাদের জীবন একেবারে কয়লা হয়ে গেছে। তাদের জীবনে কোনো আনন্দ নেই, বিনোদন নেই। এই কাজের ভিড়ে বিদেশযাত্রা হলো তাদের জন্য ‘জ্ঞান, দক্ষতা ও বিনোদনের এক অপূর্ব সমাহার’। এখন যদি মশা মারার অজুহাতে তাদের একটু ফ্লোরিডা গিয়ে সাগরের হাওয়া খাওয়ার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়, তবে সেটা কি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়? এটা তো তাদের জীবনকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার শামিল!
বিনোদনের অভাবে যদি কোনো কর্মকর্তা বিষণ্ণতায় ভোগেন, তবে তিনি ফাইলের ওপর লাল কালির সঠিক আঁচড়টি কীভাবে দেবেন? মশা মারার চেয়ে মশা মারার উছিলায় কর্মকর্তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখাটা কি বেশি জরুরি নয়?
প্রধানমন্ত্রীর এই ‘ডোবা তত্ত্ব’ অবশ্য বেশ সাশ্রয়ী। এতে সরকারের বা বিদেশি দাতা সংস্থার এক টাকাও খরচ হবে না। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে এই পদ্ধতির একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যেতে পারে।
ভবিষ্যতে মশক নিধন দপ্তরের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য নিচের পরীক্ষাগুলো বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে:
পদের নাম: সহকারী মশক কর্মকর্তা
প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা: ঢাকার যেকোনো কচুরিপানাযুক্ত ডোবার পাশে টানা ২ ঘণ্টা হাফ-প্যান্ট পরে দাঁড়িয়ে থাকার অভিজ্ঞতা।
পদের নাম: উপ-পরিচালক (মশক)
প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা: ড্রেনের মশার কামড় খেয়ে চুলকানি নাানি উপায়ে সহ্য করার ৩ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা।
পদের নাম: মহাপরিচালক (মশক উইং)
প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা: মশার গুনগুন গান শুনে মশার জাত (এডিস, কিউলেক্স নাকি অ্যানোফিলিস) নিখুঁতভাবে চেনার অলৌকিক ক্ষমতা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস কোম্পানি হয়তো ফ্রিতেই এই সফরের টাকা দিচ্ছিল। কিন্তু টাকা যারই হোক, ফ্লোরিডার সৈকতে বসে মশার কামড় খাওয়ার চেয়ে আমাদের নিজেদের দেশের ডোবার মশার কামড়ের মধ্যে একটা ‘দেশাত্মবোধ’ আছে। দেশের মশা দেশের মানুষের রক্ত খাবে, দেশের কর্মকর্তারা সেই মশার কামড় খেয়ে দেশেই বসে উদ্ভাবন করবেন—এটাই তো প্রকৃত স্বনির্ভরতা!
তাই আসুন, ফ্লোরিডার টিকিট বাতিল করি। মশারির ভেতর থেকে বের হয়ে, হাতে একটা করে ওডোমস বা মশার কয়েল নিয়ে আমরা সবাই সন্ধ্যার পর নিকটস্থ ডোবার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি। জ্ঞান তো আর কেবল চীন দেশে বা ফ্লোরিডায় নেই, জ্ঞান লুকিয়ে আছে আমাদের পাড়ার ড্রেনে আর মজে যাওয়া পুকুরে!
লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট