হাম নিয়ে রাজনীতির সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে এর দায় আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চাপানো যাচ্ছে না। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার কয়েকজন মানুষ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়ে যখন প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন- এর দায় প্রফেসর ইউনূস সরকারের, তখন ইউনূস সরকারের বেনিফিশিয়ারি বিএনপি ও জামায়াত এটা নিয়ে একরকম নিশ্চুপ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে যে ইউনূস সাহেব ‘ভাসুর’ বনে গেছেন - তারা ভাসুরের নাম মুখে আনবেন না। উল্টো আওয়ামী আমলের ‘জামায়াত শিবির রাজাকার বিএনপি’ বলে ট্যাগ দেওয়ার মতো হাম নিয়ে যারা কিছু বলার চেষ্টা করছেন তাদেরকে ‘হামলীগ’ বা ‘বিষোদগার বিশেষজ্ঞ’ বলে ট্যাগ দিচ্ছেন। ‘দিন যায় ট্যাগ থাকে’ - বাংলাদেশের জন্য এটা বড় বাস্তবতা।
যারা সিনেমার খোঁজ খবর রাখেন তাদের নিশ্চয়ই হিন্দি সিনেমা ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ এর কথা মনে আছে। ২০২৬ সলের মার্চ-এপ্রিল-মে’র হামের পরিস্থিতি নিয়ে অভিনেতা সাজু খাদেম ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ শিরোনামে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। ফলাফল তাকে নিয়ে ফেসবুকে ঝড় বয়ে গেলো। নাটকের ডায়ালগের মতো তাকে ‘ফারদা ফাই’ করে দেওয়া হলো। আমরা শিখলাম হাম নিয়ে ফান করা যাবে না।
ঢাকার ডেইলি স্টার সেন্টারে গত মে মাসের একদিন হাম নিয়ে একটা গোলটেবিল বৈঠক হলো। সেখানে গায়িকা ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক আনিস আলমগীর, মাসুদ কামাল, জ.ই. মামুন, ডা. আবদুন নুর তুষার, মনজুরুল আলম পান্নাসহ আরো কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। এই গোলটেবিল নিয়েও গোলমাল হলো, এই বৈঠকে কেন ‘হাম বিশেষজ্ঞ’ নেই? তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে গেলো। একজন এই বৈঠকে অংশ নেওয়া মানুষদের বললেন-‘বিষোদগার বিশেষজ্ঞ!’ কেউ কেউ বললেন এরা ‘হাম লীগ’। মাঝখান থেকে আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইলাম যে -‘ হামের ব্যাপারে তুই চুপ থাক সনম’!
তবে চুপ থাকা বা নীরবতারও একটা ভাষা আছে! স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন - ‘অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলি, তোমার ভাষা বোঝার আশা দিয়েছি জলাঞ্জলী!’
হামের ভাষা বোঝার আশায়ও জলাঞ্জলী দিতে হবে হয়তো। হাম সাধারণত শিশুরোগ হিসেবেই পরিচিত। ২০২৬ এ এসে কি হাম বাংলাদেশের এক ‘রাজনৈতিক রোগ’ হয়ে দাঁড়ালো?
রোগের কোনো পক্ষ-বিপক্ষ থাকে না। তবে রাজনৈতিক রোগের থাকে। আমি এই পক্ষ বিপক্ষের প্রতিপক্ষ! কারণ সরকারি হিসেবে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী শিশু মৃত্যু ছাড়িয়েছে পাঁচশ।
কাজী নজরুল ইসলাম বেঁচে থাকলে হয়তো লিখতেন - ‘কান্ডারী বলো মরিতেছে শিশু, সন্তান মোর মার”! এই মৃত্যু নিয়েও রাজনীতি আছে!
রাজনীতিটা চিরাচরিত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কথা টেনে একদল বলছেন - শেখ হাসিনার রাজত্বের শেষকালে যখন শিশু-কিশোর-ছাত্রদের হত্যা করা হচ্ছিল তখন অনেকে কান্নাকাটি করে রাস্তায় নেমেছিলেন। হামের কারণে যখন শিশুরা মারা যাচ্ছে তখন সেই ‘লালবদর’রা কোথায়? শিশুদের মৃত্যর ঘটনা তাদের কান্না আনছে না কেন? এর বিপরীতে বলা হচ্ছে- যারা হাম নিয়ে সমালোচনা করছেন তারা আসলে কেউ বিশেষজ্ঞ নন, তারা ‘হামলীগ’! টকশো বা গোলটেবিল বৈঠকে যারা হামলীগের মতো কথা বলছে তারা ‘বিষোদগার বিশেষজ্ঞ’।
এই বিষোদগার বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের সারমর্ম এমন- টিকা কেলেংকারি ও হামে শিশু মৃত্যুর দায় পুরোটা ইউনূস সরকারের। অবিলম্বে তাদের নিয়ে সঠিক তদন্ত করা ও বিচারের আওতায় আনা উচিত।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই (এক্সটেন্ডেড প্রোগ্রাম অন ইমিউনাইজেশান) এর সূচনা ১৯৭৪ সালে। বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা সফলতার জায়গা। বাংলাদেশ প্রচলিত অনেক পুরনো রোগ থেকে এই টিকা কার্যক্রমের জন্য মুক্ত হয়েছিল।
স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টির জন্য এমন আরেকটি প্রকল্প স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘এইচপিএনএসপি’ বা হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রেশন সেক্টর প্রোগ্রাম। অবকাঠামো তৈরি, জনবল বাড়ানো, ফ্রি মেডিক্যাল সার্ভিস, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা, পুষ্টি, টিকা ও জরুরি ওষুধ সংগ্রহ এমন বিবিধ কাজে আওয়ামী লীগ বাজেট দিয়েছিল ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। যার মধ্যে ৩ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরের তুলনায় বেশি ছিল। টিকা সংগ্রহে পরনির্ভরতা কমিয়ে আনতে চেয়েছিল তারা।
এরপর আওয়ামী লীগের পতন ও প্রফেসর ইউনূসের আগমন। এনজিও-চট্টগ্রাম নির্ভর ইউনূস সরকারের হাত ধরে এলেন তার ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সহকর্মী নুরজাহান বেগম। যিনি হলেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা। নুরজাহান বেগমও ইউনূস সাহেবের মতো- ‘সব দোষ আওয়ামী লীগের, তাই আওয়ামী ভূত তাড়াও’ মন্ত্রের অনুসারী হয়ে টিকা বা আহত জুলাই যোদ্ধাদের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবলেন না। নুরজাহান বেগম নিজ স্বাস্থ্যের জন্য বিদেশে গেলেন চিকিৎসা নিতে আর জুলাই যোদ্ধারা নেমে এলো রাস্তায়। নারী ও স্বাস্থ্য কমিশন, ক্রম চলমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এফডিসিআরও প্রোগ্রাম হোঁচট খেলো।
ইউনিসেফ পাঁচবার অনুরোধ বা সতর্কবার্তা পাঠানোর পরেও তিনি ব্যবস্থা নিলেন না। ফলাফল দেশে এইডস রোগীর সংখ্যা বাড়লো। হামের কারণে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৫০০ ছাড়ালো। আগে ব্লাড প্রেশার, কুষ্ঠ ও যক্ষার ওষুধ ফ্রি দেওয়া হতো। ইউনূস গং ও নূরজাহান বেগমরা দেশে প্রচলিত ওষুধ সাপ্লাই চেইন বাধাগ্রস্ত করে দিলেন। টিকা দেন এমন কর্মীদের বেতন বন্ধ থাকে, যারা পরিবহন করতেন তারাও বেতন পাননি। এরা সবাই রাস্তায় নেমেছিলেন আন্দোলনে শামিল হবার জন্য। কিন্তু বেগম সাহেব যে দুই সহকারি উপদেষ্টা নিয়োগ দিলেন, তারা টাকার বিনিময়ে এমন নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য করলেন যে বিএনপি সরকার আগামী পাঁচবছর ধরে এটা করলেও ‘ইউনূস-নুরজাহানীয়’ এই রেকর্ড ভাঙতে পারবে না। স্বাস্থ্য বিভাগে সব নিয়োগ বদলিতে দলগতভাবে লাভবান হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর অনুসারিরা।
এই হচ্ছে হাম বিষয়ক বাস্তবতা। রাজনৈতিক রোগের কারণে এত শিশুর মৃত্যুর পরও এটা থেকে গেলো এক রাজনৈতিক রেষারেষির মাঝে। কথায় আছে, দুই হাতি যখন লড়াই করে তখন দুর্বাঘাস পিষ্ঠ হয়। আমরা দুর্বাঘাসের মতো পিষ্ঠ হওয়ার নিয়তি নিয়ে জন্মেছি। হামে মৃত্য এখানে ‘দুর্বাঘাস নিয়তি’।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে তিনমাস হতে চললো। হামে শিশু মৃত্যুর মোকাবিলায় সরকারের সমালোচনা তেমন কেউ করেনি। কিন্তু ইউনূস সরকারের কোনো গাফিলতি থাকলে সেটা তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে দোষ কোথায়? নাকি যে প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেটাই বাস্তব? এই সরকার ও বিরোধী দল ইউনূস এর ‘বাজে রূপান্তরকালীন’ সরকারের বেনিফিশিয়ারি বিধায় তারা কি টিকা ও হামে শিশু মৃত্যু এবং আমেরিকার সাথে করা বাণিজ্য ও সামরিক চুক্তি নিয়ে চুপ করে আছে বা থাকবে?
যদি থাকে তাহলে যে প্রশ্নগুলো সামনে চলে এসেছে সেগুলো অনর্গল জমতে থাকবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা টেলিভিশন টকশোর উপচে পড়া বিতর্কে:
১. বিএনপি নেতারা কাব্য করে জনসভাগুলোতে বলতেন-‘আপনার দেখে থাকবেন কোনো কোনো কল-কারখানা বা বাড়িঘরের গায়ে লেখা থাকে এই সম্পত্তি ‘অমুক ব্যাংকের’ কাছে দায়বদ্ধ। ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগ সরকার ‘ভারতের কাছে দায়বদ্ধ’। ঠিক তেমনি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার কি কোনো কারণে ইউনূস সরকার ও আমেরিকার কাছে দায়বদ্ধ?
২. পতিত শেখ হাসিনা বলেছিলেন সেন্টমার্টিনের দিকে দৃষ্টি পড়েছে আমেরিকার। এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ তাদের সামরিক স্থাপনার জন্য ব্যবহার করতে না দিলে তারা আমাকেও সরিয়ে দিতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী এই চুক্তির পেছনে কি বিএনপি ও জামায়াতের পূর্ণ সমর্থন আছে? সেই কারণে কি টিকা ও হামজনিত কারণে ইউনূস সরকারের সমালোচনা ও বিচারের প্রসঙ্গে একরকম চুপ করে আছে বিএনপি ও জামায়াত?
৩. এই লেখার মোরাল অব দ্য স্টোরি কী?
উত্তর হলো সবকিছুতে ট্যাগ দিতে নেই। হামে যে শিশুরা মারা যাচ্ছে তারা আমজনতা টাইপ মানুষের সন্তান; এরাই ক্ষমতার পালাবদলের ‘নিয়ামক’ হয়ে দাঁড়ায়। শিশু রামিসার মৃত্যু নিয়ে যখন সারা বাংলাদেশ নিন্দা জানাচ্ছে, যখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী রামিসার পিতার সাথে কথা বলতে তাদের বাসায় গেছেন, তখন অনেকে আওয়ামী আমলের খুন ধর্ষণ বিচার এর কথা বলা শুরু করে দিয়েছেন। শুধুমাত্র ‘ধর্ষক লীগ’ বলা বাকি আছে।
হামের কারণে শিশুমৃত্যু কমে আসুক, শিশুদের জন্য সর্বদা উপযোগী থাকুক বাংলাদেশ।
লেখক: রম্যলেখক
[মতামত কলামে প্রকাশিত লেখার দায়-দায়িত্ব একান্তই লেখকের, সম্পাদক এর জন্য দায়ী নন]