সাত বছরের সুমাইয়া আক্তার আর তিন বছরের মুফাসিনা আক্তারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়েই দেশ ছেড়েছিলেন মো. রনি মিয়া। ভেবেছিলেন, কয়েক বছর কষ্ট করলে মেয়েদের জীবনটা অন্তত বদলে যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। রনি ফিরেছেন, তবে জীবিত নয়—একটি কফিনে।
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার দিঘীরপাড় পালপাড়ার বাসিন্দা রনির প্রবাসজীবন শুরু থেকেই ছিল দুর্ঘটনায় ভরা।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্রমিক ভিসায় সৌদি আরবে যান তিনি। ফুড ডেলিভারির কাজ শুরু করার মাত্র দুই মাসের মাথায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দেশে ফিরতে হয়।
সুস্থ হওয়ার পর আবারও ভাগ্য বদলের আশায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে সৌদি আরবে যান। এবার সবকিছু যেন ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু চলতি বছরের ২১এ এপ্রিল রিয়াদে আরেকটি সড়ক দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান ৩০ বছর বয়সী এই তরুণ।
এগারো দিন পর, ১লা মে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় তার মরদেহ।
রনির স্ত্রী দিলরুবা আক্তার আলাপ-কে বলেন, দুই দফায় সৌদি আরব যেতে তাদের ১০ লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। প্রায় পুরো টাকাই ছিল ধার করা।
"এখন আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা, এই ঋণ শোধ হবে কীভাবে," বলেন তিনি।
তার বিশ্বাস, পরিবারের ভবিষ্যত, ধার-দেনা আর অর্থনৈতিক চাপের দুশ্চিন্তাই হয়তো রনিকে সবসময় তাড়া করত।
"আমার মনে হয়, এসব চিন্তার কারণেই হয়তো তিনি অমনোযোগী হয়ে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন," বলেন দিলরুবা।
রনির গল্প আলাদা কোনো ঘটনা নয়। প্রতিদিনই এমন অনেক প্রবাসী কর্মী দেশে ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে।
প্রতিদিন ফিরছে গড়ে ১৪টি মরদেহ
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর; এই তিনটি পথেই দেশে ফিরছে প্রবাসী কর্মীদের মরদেহ।
প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম আলাপ-কে জানান, শুধু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ আসে।
চট্টগ্রামের বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, সেখানে প্রতি মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি মরদেহ আসে। একই ধরনের চিত্র সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও।
ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে ফিরেছে ৫ হাজার ৩৮ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় ৪২০ জন, আর প্রতিদিন প্রায় ১৪ জন।
এর আগে ২০২৪ সালে দেশে ফিরেছিল ৪ হাজার ৮১৩ জন এবং ২০২৩ সালে ৪ হাজার ৫৫২ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ।
বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মরদেহ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে, বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উল্লেখ থাকে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা অন্যান্য দুর্ঘটনা।
বিমানবন্দরের নথি যা বলছে
বিদেশ থেকে মরদেহ দেশে এলে তার সঙ্গে পাঠানো নথিপত্র সংরক্ষণ করে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক। সেই নথির ভিত্তিতেই মৃত্যুর কারণ লিপিবদ্ধ করা হয়।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ৩০৭ জন মৃত প্রবাসী কর্মীর নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের মধ্যে ১৭৬ জন, অর্থাৎ ৫৬ শতাংশ, মারা গেছেন স্ট্রোকে। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন তরুণ বা মধ্যবয়সী।
আরও ৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে স্বাভাবিকভাবে অথবা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে।
কর্মক্ষেত্র বা অন্যান্য দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৫৭ জন। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন। আত্মহত্যা করেছেন তিনজন এবং খুন হয়েছেন দুজন।
তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের কর্মকর্তারা জানান, গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রায় একই প্রবণতা দেখা যায়।
মাত্র ৩৭ বছর বয়সেই থেমে যাচ্ছে জীবন
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু) ২০২৫ সালে মৃত প্রবাসী কর্মীদের নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ করে।
২০১৭ থেকে ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মারা যাওয়া ৫৫৪ জন বাংলাদেশি কর্মীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের গড় বয়স মাত্র ৩৭ বছর।
গবেষণায় প্রশ্ন তোলা হয়, বিদেশে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও কেন এত অল্প বয়সে মারা যাচ্ছেন কর্মীরা?
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদেশ থেকে পাঠানো মৃত্যুসনদের ওপর নির্ভর করেই মরদেহ গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশে এসে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ময়নাতদন্ত করা হয় না।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুসনদে স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা লেখা থাকলেও মরদেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
ফলে মৃত প্রবাসী কর্মীদের প্রায় ৪৮ শতাংশ পরিবারের সদস্য মৃত্যুসনদে উল্লেখ করা কারণ বিশ্বাস করেন না। এ কারণেই দেশে আসার পর মরদেহের ময়নাতদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণায়।
রামরুর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মারা যাওয়া প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে ৩১ শতাংশের মৃত্যু ছিল অস্বাভাবিক। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ দুর্ঘটনায় এবং ১৫ শতাংশ আত্মহত্যা করেন। ২৮ শতাংশের মৃত্যু স্বাভাবিকভাবে হয়েছে। বাকিরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
কেন এত কম বয়সে মৃত্যু
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং ব্র্যাক ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরীফুল হাসানের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে।
তিনি আলাপ-কে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেককেই দিনে ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। দীর্ঘ সময়ের কঠোর শারীরিক শ্রম তাদের শরীর দ্রুত দুর্বল করে ফেলে।
এর সঙ্গে যোগ হয় ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা, অস্বাস্থ্যকর আবাসন, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়া।
ভাষাগত সমস্যা এবং আর্থিক সংকটও সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটি বড় চাপ আসে ঋণ থেকে।
শরীফুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যেতে অনেক ক্ষেত্রেই ১০ লাখ টাকা বা তারও বেশি খরচ হয়। এই টাকা জোগাড় করতে অধিকাংশ শ্রমিককেই ঋণ করতে হয়। বিদেশে পৌঁছানোর পর সেই ঋণ শোধের চাপ তাদের সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়।
"কখন ঋণ শোধ হবে, পরিবারকে টাকা পাঠাতে পারব কি না, এই মানসিক চাপও তাদের স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে," বলেন তিনি।
তার মতে, অতিরিক্ত পরিশ্রম, মানসিক চাপ, চরম আবহাওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ, সব মিলিয়েই অনেক প্রবাসী কর্মী অল্প বয়সে ব্রেইন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো প্রাণঘাতী সমস্যায় আক্রান্ত হন।
শুধু সংখ্যা নয়, প্রতিটি কফিনের পেছনে একটি পরিবার
প্রতিদিন দেশে ফিরছে গড়ে ১৪ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ। পরিসংখ্যান হিসেবে সংখ্যাটি হয়তো একটি তথ্য মাত্র। কিন্তু প্রতিটি কফিনের সঙ্গে দেশে ফেরে একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন, শোধ না হওয়া ঋণ, অনিশ্চিত হয়ে পড়া একটি পরিবার এবং এমন কিছু শিশু, যারা কোনো দিন তাদের বাবাকে দেখতে পাবে না।
রনি মিয়ার দুই মেয়ের মতো এমন অসংখ্য শিশুর কাছে বিদেশ মানে আর শুধু স্বপ্নের দেশ নয়, কখনো কখনো সেটি হয়ে ওঠে এমন এক পথ, যার শেষ গন্তব্য একটি কফিন।