জামিল-বৃষ্টি হত্যার পেছনে কী, হিশামকে ঘিরে মিলছে নানা ইঙ্গিত

ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় শুরুতে হিশাম আবুগারবিয়াহ ছিলেন জামিলের রুমমেট। কী হয়েছিল প্রশ্নের চেয়ে এখন বড় প্রশ্ন কেন তাদের হত্যা করা হয়েছে। আর পুরো ঘটনায় কেন্দ্রীয় চরিত্র এখন হিশাম। 

আদালতের নথি, পুলিশি তদন্ত, আগের পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ, ডিজিটাল অনুসন্ধান এবং নিখোঁজ হওয়ার আগের দিনগুলোর কেনাকাটা সব মিলিয়ে হিশামকে ঘিরে এক ধরনের ধারাবাহিক আচরণগত প্যাটার্ন খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা

তদন্তকারীরা এখনো বলেননি, ঠিক কী কারণে জামিল ও বৃষ্টিকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। আদালতের নথিতেও সরাসরি কোনো মোটিভের ব্যাখ্যা নেই। 

তবে প্রসিকিউটরদের উপস্থাপনায় যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো তাৎক্ষণিক সহিংসতা নয়। 

এর পেছনে আগে থেকে কোনো প্রস্তুতি, মানসিক অস্থিরতা, সহিংসতার প্রবণতা বা পরিকল্পিত আচরণের ইঙ্গিত ছিল কি না তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে

আলোচনায় অতীত আচরণ

হিশামকে নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, হিশাম মানসিকভাবে সুস্থ নন। 

সিএনএনের হাতে আসা একটি পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৯ই মে হিশাম তার ভাইয়ের সঙ্গে নিজের ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘অনিয়মিত’ আচরণ নিয়ে তর্কে জড়ান। একপর্যায়ে ভাই তাকে ভিডিও করা শুরু করলে তিনি তাকে ঘুষি মারেন বলে অভিযোগ। 

একই ঘটনায় মাকেও লাথি মারার কথা উল্লেখ আছে সেই রিপোর্টে। 

 

সে সময়ের জিজ্ঞাসাবাদে হিশাম এমন কিছু কথাও বলেছিলেন, যা তদন্তকারীদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। 

রিপোর্টে বলা হয়েছে, তিনি বলেছিলেন, “আমি আমার ভাইকে সৃষ্টি করেছি, আমিই তার ঈশ্বর” এবং “এখানে এটি আমার প্রথম জীবন।” 

তদন্তকারীরা বলছেন,  এই বক্তব্যগুলো এখন আবার সামনে আনা হচ্ছে, কারণ বর্তমান মামলার প্রেক্ষাপটে এগুলো তার আচরণগত প্যাটার্ন বোঝার একটি সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ওই ঘটনার পর তাকে সাধারণ হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং ফ্লোরিডার বেকার অ্যাক্টের আওতায় রাখা হয়। 

এই আইনে নিজের বা অন্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হলে কোনো ব্যক্তিকে অস্থায়ীভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা যায়।  

পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহার করা হলেও আদালত তার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। 

এই ব্যাকগ্রাউন্ড এখন নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির নিখোঁজ হওয়ার পর তদন্তে হিশামের আচরণ নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। 

প্রসিকিউটরদের দাবি, দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার আগের দিনগুলোতে তিনি চ্যাটজিপিটিকে এমন কিছু প্রশ্ন করেছিলেন, যাতে মরদেহ গোপন করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

একই সময় তিনি অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ, ময়লার ব্যাগ, লাইটার ফুয়েল, আগুন ধরানোর উপকরণ, কয়লা এবং একটি নকল দাড়ি অর্ডার করেছিলেন বলেও তদন্তে বলা হচ্ছে। 

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই তথ্যগুলোকে তদন্তকারীরা সম্ভাব্য প্রস্তুতি বা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন কি না, সেটি শেষ পর্যন্ত আদালতেই স্পষ্ট হবে; তবে অভিযোগের গুরুত্ব বাড়াতে এসব তথ্য ইতিমধ্যেই বড় ভূমিকা রাখছে।

তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে হিশামকে ঘিরে পরিবারের ভেতরের উদ্বেগও। 

হিশামকে গ্রেপ্তারের ছবি

আদালতে জমা দেওয়া এক আত্মীয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, কয়েক বছর আগেও তিনি পরিবারের সহায়ক ও দায়িত্বশীল বড় ছেলে ছিলেন। 

তবে পরে মারিজুয়ানা ব্যবহার শুরু করার পর তার আচরণ বদলে যায় বলে ওই আত্মীয় দাবি করেছেন। 

তদন্তকারীদের প্রতিবেদনে দেখা যায়, পরিবারের ভেতরেও হিশামের আচরণ নিয়ে অস্বস্তি জমছিল। তাকে মাদকাসক্তি নিরাময় চিকিৎসার আবেদনও করা হয়েছিল। 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকারী মনে করছেন যে হিশামের বিরুদ্ধে ওঠা বর্তমান অভিযোগ কোনো একক, বিচ্ছিন্ন বিস্ফোরণ কি না, নাকি আগে থেকেও সহিংসতা, অনিয়ন্ত্রিত আচরণ এবং পারিবারিক উদ্বেগের ইঙ্গিত ছিল। 

দ্বিতীয়ত, প্রসিকিউটররা যখন আদালতে তাকে জামিন না দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন, তখন তার অতীত আচরণ, আগের অভিযোগ, এবং পরিবারের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আবেদন তাদের যুক্তিকে শক্তিশালী করতে পারে। 

তদন্তকারীরা বলছেন,  অতীতের অভিযোগ, পরিবারের বক্তব্য, কিংবা আচরণগত অস্বাভাবিকতা একটা প্যাটার্ন তৈরি করে। তবে আদালতে শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করতে হবে, জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির ক্ষেত্রে আসলে কী ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল, এবং হিশামের ভূমিকা কী ছিল।

যেভাবে এগিয়েছে ঘটনা

১৬ এপ্রিল কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নিখোঁজ হন জামিল ও বৃষ্টি। জামিলকে সকালে তার অ্যাপার্টমেন্টে শেষবার দেখা যায়। বৃষ্টিকে সকাল ১০টার দিকে ইউএসএফ ক্যাম্পাসের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস ভবনে দেখা যায়। দুপুরের পর তিনি বাংলাদেশে থাকা বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেন, কিন্তু তারপর আর কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। একই সন্ধ্যায় জামিলের ফোনের লোকেশন ক্লিয়ারওয়াটার এলাকায় যায়। 

প্রসিকিউটরদের দাবি, মাত্র কিছু মিনিটের ব্যবধানে হিশামের সাদা হুন্দাই জেনেসিস গাড়িকেও একই এলাকায় দেখা যায়। 

রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার ফোন থেকে ময়লার ব্যাগ, লাইসল ওয়াইপস, ফেবরিজসহ কিছু জিনিসের অর্ডার দেওয়া হয়। পরে তাদের আরেক রুমমেট হিশামকে কার্ডবোর্ডের বাক্স টেনে ডাম্পস্টারের দিকে নিতে দেখেন।

১৭ এপ্রিল দুই শিক্ষার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ বলা হয়। তদন্ত আরও দ্রুতগতিতে এগোতে থাকে। 

একই দিন গভীর রাতে তার যাওয়া-আসার তথ্য মেলে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায়। সেই সেতুর কাছ থেকেই পরে জামিলের দেহাবশেষ উদ্ধার হয়। 

এই টাইমলাইনই ঘিরে তদন্ত এগোতে থাকে। নিখোঁজ হওয়ার পর তার গতিবিধি, এবং  পরে উদ্ধার হওয়া আলামতের মধ্যে সংযোগ খুঁজে পাচ্ছেন তদন্তকারীরা।

২৩ এপ্রিল তদন্তকারীরা যখন ডাম্পস্টার তল্লাশি করেন, তখন সেখানে পাওয়া যায় রক্তমাখা ফ্লোর ম্যাট, জামিলের ওয়ালেট, বৃষ্টির ফোন কভার, জামিলের চশমা এবং আরও কিছু পোশাক। 

একই সময়ে হিশামের গাড়ি পরীক্ষা করে তদন্তকারীরা বলেন, সেটি “সম্প্রতি পরিষ্কার করা হয়েছে” বলে মনে হয়েছে। 

২৬ এপ্রিল আরও একটি কালো ময়লার ব্যাগ পাওয়া যায় জলপথের ধারে। সেটিও গিঁট দেওয়া ছিল আগের ব্যাগের মতোই। ভেতরে পাওয়া দেহাবশেষ ছিল অনেকটাই পচনধরা। তদন্তকারীরা লক্ষ্য করেন, পরনের পোশাক বৃষ্টিকে সর্বশেষ যে পোশাকে দেখা গিয়েছিল, তার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। 

ওই দেহাবশেষে ছুরিকাঘাতের চিহ্নও ছিল। যদিও আনুষ্ঠানিক শনাক্তকরণ হয়নি।

আলামত যা বলছে

ডাম্পস্টার তল্লাশি করে তদন্তকারীরা যে জিনিসগুলো পান, সেগুলো মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। 

সেখানে ছিল রক্তমাখা ফ্লোর ম্যাট, জামিলের ওয়ালেট, চশমা এবং আরও কিছু পোশাক।  ছিল বৃষ্টির ফোন কভারও। 

একই সময়ে হিশামের গাড়ি পরীক্ষা করে তদন্তকারীরা বলেন, সেটি সম্প্রতি পরিষ্কার করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ, বাহু ও পায়ে কাটা দাগও দেখা যায়।

২৪ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছে একটি কালো ময়লার ব্যাগের ভেতর জামিল লিমনের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, তার মৃত্যু হয়েছে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতে। 

ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি খুন নিয়ে চলছে তদন্ত

২৬ এপ্রিল আরও একটি কালো ময়লার ব্যাগ পাওয়া যায়। সেটিও আগের ব্যাগের মতোই বাঁধা ছিল। ভেতরে পাওয়া দেহাবশেষ  ছিল পচনধরা।

তদন্তকারীরা বলেন, পরনের পোশাক বৃষ্টিকে সর্বশেষ যে পোশাকে দেখা গিয়েছিল, তার সঙ্গে মিল রয়েছে। আনুষ্ঠানিক শনাক্তকরণ তখনো হয়নি, কিন্তু এতে বৃষ্টিকে ঘিরে শঙ্কা আরও বেড়ে যায়।

কেন হত্যা?

এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো আদালতের কাছেই বাকি। তদন্তকারীরা কোনো ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত বিরোধ, আর্থিক টানাপোড়েন বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট মোটিভ প্রকাশ করেননি। 

তবে তারা যে দিকগুলো খতিয়ে দেখছেন, তাতে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার: হিশামের অতীত আচরণ নিয়ে পরিবারে উদ্বেগ ছিল; নিখোঁজ হওয়ার আগে সন্দেহজনক কেনাকাটা ও ডিজিটাল অনুসন্ধান হয়েছে বলে অভিযোগ; ঘটনার দিন ও পরদিন তার গতিবিধি, জবানবন্দি ও উদ্ধার হওয়া আলামতের মধ্যে অসংগতির বদলে সংযোগই বেশি মিলছে। অর্থাৎ, মোটিভ এখনো অজানা হলেও তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে পরিকল্পনাহীন আকস্মিক বিস্ফোরণ হিসেবে দেখছেন না।

(সিএনএন ও ওয়াশিংটন পোস্ট অবলম্বনে)