শুধু খবর নয়, বদলে যাচ্ছে খবর বলার ধরন

এক বছর আগে যখন আলাপ  যাত্রা শুরু করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে একটি প্রশ্ন ছিলো, আরও একটা মিডিয়া আউটলেটের দরকারটা আসলে কী?

দেশে এখন শতাধিক অনলাইন নিউজপেপার, কয়েক ডজন টেলিভিশন চ্যানেল আর দেড় হাজারের কাছাকাছি সংবাদপত্র ও তাদের অনলাইন ভার্সন।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে কখনোই ‘খবরের’ অভাব ছিলো না। অভাব ছিলো ভিন্নভাবে উপস্থাপনার, বুঝিয়ে বলার। একই ঘটনা নিয়ে অন্যরকম প্রশ্ন করার, কিছুটা বেশি সময় নিয়ে যেকোনো একটা ব্যাপার বোঝার। আর সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ‘ডিফারেন্ট সেগমেন্টের’ পাঠক-দর্শকের সাথে ‘ডিফারেন্টলি কমিউনিকেট’ করা।

মূলধারার মিডিয়া বছরের পর বছর ধরে যে কাজটা খুব ভালোভাবে করে আসছে তাকে অনেকটা এইভাবে বর্ণনা করা যায়, ‘সব জায়গার সব খবর, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে।’

রাজধানী ঢাকায় রিপোর্টার, বড় বার্তাকক্ষ, দেশজুড়ে ব্যুরো-প্রতিনিধি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার সাবস্ক্রিপশন; সারাক্ষণ আপডেট। আর এই পুরো সিস্টেমটাই বানানো ‘স্কেলের’ জন্য।

রাজনীতি, খেলা, অপরাধ-দুর্নীতি, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অর্থনীতি, সবকিছু একই জায়গায়, একই গতিতে এবং প্রায় একই ফরম্যাটে।

আর এই মডেলটার নিজস্ব একটা শক্তিও আছে। এটা একইসাথে বহু মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারার মতো একটা পরীক্ষিত ব্যবস্থা। প্রচলিত এই ব্যবস্থাই গড়ে দিয়েছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম কীভাবে চলবে তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি।

কিন্তু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রতিদিন যখন সবকিছু ‘কাভার’ করতে হয় তখন কোনো একটা বিষয় নিয়ে সময় দেওয়া বা তার গভীরে যাওয়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। তারমানে অবশ্যই এই না যে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলো কোনো বিষয়ের গভীরে যাচ্ছে না। 

তবে ‘লিগ্যাসি মিডিয়ার’ সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাটা হলো এই ধরনের বার্তাকক্ষ যে কাঠামোতে চলে তা এই অন্যরকম কাজের জন্য না। সেগুলো ‘ডে ইন ডে আউট’ ধরনের কাজের জন্য তৈরি।

চেনা কাঠামোর বাইরের মিডিয়ার উত্থান

গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে ছোট এবং তুলনামূলকভাবে স্বতন্ত্র চরিত্রের মিডিয়া আউটলেট গড়ে উঠেছে। আর এদের কেউই বড় কোনো নিউজ নেটওয়ার্ক হওয়ার চেষ্টা করছে না।  প্রতিদিনের সব খবর দেওয়ার প্রতিযোগিতাতেও নেই তারা। বরং প্রত্যেকে একটা নির্দিষ্ট জায়গা বা ফরম্যাট ধরে কাজ করছে।

যেমন, নেত্র নিউজ । প্রতিদিনের খবরের স্রোতে না থেকে ফোকাস করেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায়। তাদের কাজ এখন পর্যন্ত মূলত ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-খুনের মতো বিষয়গুলোর নথি ও প্রমাণ নিয়ে। একটা প্রতিবেদন নিয়ে মাসের পর মাস কাজ করা, যা আসলে প্রতিদিনের খবর নিয়ে কাজ করা ব্যস্ত বার্তাকক্ষে হয় না।

দ্য পোস্ট -এর দিকে যদি দেখি তাহলে বলা যায়, তারা গল্প বলার দিকে বেশি ঝুঁকেছে। ব্রেকিং নিউজের বদলে মানুষের গল্প, অভিজ্ঞতা আর বর্ণনার উপর তাদের জোর। বলা যায়, খবরটা কী ঘটেছে সেখানে না থেকে বরং সেই ঘটনাটা মানুষের জীবনে কীভাবে ধরা দিয়েছে সেই গল্পটা বলার চেষ্টা আছে সাক্ষাৎকারধর্মী ভিজ্যুয়াল কনটেন্টে।

একদমই সোশ্যাল মিডিয়া-ভিত্তিক আরেকটি নতুন আউটলেট ব্রডশিট । খবরের বদলে অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তিসহ নানা বিষয়ে দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখার ওপর ফোকাস করছে এই আউটলেটটি । যেমন, দেশি শিল্পের ভাগ্য নির্ধারণ করে কে, ওষুধনীতি কিংবা ঢাকা কেন বাসযোগ্যতার তালিকায় বারবার নিচের দিকে থাকে?

এগুলো এমন প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর সাধারণ ‘নিউজ সাইকেলে’ সবসময় পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।

ঢাকা পেপার্স একটি হাইব্রিড মডেলে কাজ করছে। সেকেন্ডারি সোর্স থেকে খবর কিংবা ইস্যু নেওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব বিশ্লেষণ ও মতামতের জন্য একটা ছোট আকারের বার্তাকক্ষও রয়েছে তাদের। বড় ধরনের কোন রিপোর্টারের নেটওয়ার্ক ছাড়াই ভিডিও মনোলগ ধরনের কনটেন্ট দিয়ে ‘রিচ’ আর ‘ডেপথ’-এর একটা ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা করছে এই আউটলেটটি।

আলাপ  নিজেও এই পরিবর্তনের অংশ। আমরা কথোপকথনকে সামনে রেখেছি —পডকাস্ট, দীর্ঘ আলাপচারিতা আর এক্সপ্লেইনার। কারণ আলাপ  মনে করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর শুধু একটা শিরোনাম থেকে আসে না। কখনো কখনো তা বের করতে হয় একটা দীর্ঘ কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। মানে আলাপ হতে হবে।

ছোট প্ল্যাটফর্ম, বড় বৈচিত্র্য

এখন যে প্রশ্নটা ওঠা স্বাভাবিক তা হলো, এই ছোট ছোট প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের মিডিয়া কি বিভাজিত হয়ে যাচ্ছে?

ব্যাপারটা বরং উল্টো।

একটি গণমাধ্যম যখন একই সাথে প্রতি মুহূর্তের খবর, অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ, মানুষের গল্প, মতামত আর দীর্ঘ কথোপকথন সবকিছু করে তখন সেটা শুধু যে ব্যয়বহুল তাই না, সবসময় মান ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। অভিযোগ আছে, বাংলাদেশে প্রথাগত গণমাধ্যমগুলোর খুব কমই এমন বড় কর্মযজ্ঞ সামলে মান ধরে রাখতে পারছে।

আসলে একটা বার্তাকক্ষ যত বড়ই হোক, তার পক্ষে প্রতিটি খবরে বা ফরম্যাটে একই সময়ে সমান মনোযোগ আর রিসোর্স বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। 

এই ছোট ছোট প্ল্যাটফর্মগুলো আসলে সেই জায়গাগুলোই পূরণ করছে।

নেত্র নিউজ যেটা করছে, ঢাকা পেপার্স সেটা করছে না। ব্রডশিট যে ধরনের বিশ্লেষণ করছে, দ্য পোস্টের গল্প বলার ধরন তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আবার দ্য ডিসেন্ট যা করছে, তা অন্যরা কেউ করে না।

আর এই আলাদাটা থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ পাঠক-দর্শকের কাছে বাংলাদেশকে দেখার দৃষ্টিকোণ এখন অনেকগুলো।

কোন মিডিয়া আউটলেট একটি বিষয় দেখছে ক্ষমতার দিক থেকে, কেউ জনস্বার্থের দিক থেকে। কেউ অর্থনীতি বা প্রযুক্তির প্রশ্ন তুলছে, কেউ মানুষের কথা বলছে।

আর আলাপ  দীর্ঘ কথোপকথনের ভেতর যে কোনো বিষয় বুঝতে চায়। অর্থাৎ আলাপ-এর দর্শনগত জায়গা হলো ‘ন্যারেশনের’ মাধ্যমে কোনো ঘটনাকে নিজে বোঝা এবং অন্যকে বুঝতে সাহায্য করা।

গণমাধ্যম এখন কেবল বার্তাকক্ষে তৈরি হয় না

বাংলাদেশের মিডিয়া বদলাচ্ছে শুধু এই নতুন আউটলেটগুলোর কারণে না। পালটে গিয়েছে পাঠক-শ্রোতা-দর্শকের আচরণও। আগে মানুষ সকালে পত্রিকা পড়তো, নির্দিষ্ট সময়ে টিভিতে খবর দেখতো অথবা কোনো নিউজ ওয়েবসাইটে যেতো। এখন খবর তাদের কাছে পৌঁছে যায় ফেইসবুক ফিডে-রিলসে, ইউটিউবের ভিডিও-শর্টসে,পডকাস্টে এমনকি মাঝে মাঝে কমেন্ট সেকশনের আলোচনার মধ্যেও।

আর তাই এখন শুধু ব্যাপারটা কে আগে খবর দিলো শুধুমাত্র সেখানে আটকে নেই। বরং এখন বিষয়টা এমন কারা সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে পারছে, কারা এমন একটা প্রশ্ন তুলেছে, যেটা অন্য কেউ তুলছে না অথবা কারা এমন একটা গল্প বলছে যেটা মানুষ শেষ পর্যন্ত দেখতে বা পড়তে চাইছে।

আর ঠিক এই কারণেই এখন বার্তাকক্ষের কাজের ধরনও বদলে যাচ্ছে। সাংবাদিক এখন শুধু লিখছেন না, তাকে স্ক্রিপ্ট লিখে ক্যামেরার সামনে যেতে হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য ছোট করে গল্পটা বলতে হচ্ছে আবার এক ঘণ্টার পডকাস্টেও বসতে হচ্ছে।

একই খবর, গল্প বা কনটেন্টের বিভিন্ন ভার্সন তৈরির হচ্ছে—ওয়েবসাইট, ইউটিউব, রিলস-শর্টস আবার ফেইসবুক-ইন্সটাগ্রামের নিউজ বা ইনফো কার্ড।

অ্যালগরিদম এখন নতুন বাস্তবতা। এখন শুধুমাত্র এডিটোরিয়াল মিটিংয়ের সিদ্ধান্তে লিড নিউজ বা নিউজ প্ল্যানিং হয় না। কোন স্টোরি কত দূর যাবে সেটা ঠিক করতে বিবেচনায় নিতে হয় ট্রেন্ড, ক্লিক, শেয়ার, ওয়াচ টাইম আর কমেন্টের মতো ব্যাপারগুলো। সম্পাদকীয় বিবেচনা আর অডিয়েন্স ডেটা দুইটাই মাথায় রাখতে হয়।

তবে ঝুঁকিও আছে। রিচ বাড়ানো প্রতিযোগিতায় সেনশেনাল হেডলাইন, দ্রুত রিয়্যাকশন আর ক্লিকবেইট কনটেন্ট সহজ পথ হলেও, মনে রাখা দরকার ভুল তথ্যও সেই একই গতিতে ছড়ায়। এর এটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি গণমাধ্যমের সামনে।

সেই কারণেই এই নতুন মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপে ‘ক্রেডিবিলিটি’ অর্থাৎ বিশ্বাসযোগ্যতা আগের যেকোনো সময়ের থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোন আউটলেট কত বড়, কত রিপোর্টার তাদের, কতগুলো প্ল্যাটফর্মে তারা খবর দেয় তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মানুষ কি তাদের বিশ্বাস করে?

এই বদলের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে মিডিয়া এখন আর শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক থাকছে না। রাজধানী থেকে পুরা দেশের খবর অথবা গল্প বলার পুরনো এই মডেলের সাথে এখন স্থানীয় সাংবাদিক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করা ছোট আউটলেটগুলোও জায়গা করে নিয়েছে।

এই ‘মাল্টিলেয়ার’ জায়গাটাই হয়তো সামনের দিনের বাংলাদেশ এমনকি বিশ্ব মিডিয়ার বাস্তবতা। বড় আকারের গণমাধ্যম, টেলিভিশন, পত্রিকা থাকবে। পাশাপাশি থাকবে ছোট ও বিশেষায়িত ‘ডিজিটাল-ফার্স্ট’ গণমাধ্যম।

কেউ খবর দেবে, কেউ প্রশ্ন করবে, কেউ অনুসন্ধান করবে, কেউ ব্যাখ্যা করবে অথবা গল্প বলবে। আবার কেউ শুধুই মানুষকে কথা বলার জায়গা করে দেবে।

তবে ক্ষমতাটা থাকবে পাঠক-শ্রোতা-দর্শকের হাতেই। তারাই ঠিক করবে তারা কারটা পড়বে, শুনবে অথবা দেখবে।

লেখক ডেপুটি এডিটর, আলাপ