চাকরি বদলাতে টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিতে হবে অনাপত্তিপত্র বা এনওসি, এমন বিবৃতি জারির ২৪ ঘণ্টা না পেরুতেই তা প্রত্যাহার করেছে অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো)। প্রত্যাহারের কয়েক ঘণ্টা আগেও আলাপ-এর কাছে বিবৃতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন অ্যাটকোর সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম।
এর আগে ১৭ই মে অ্যাটকোর সভাপতি অঞ্জন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালামের সই করা জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী, অন্য কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে যোগদানের আগে কর্মরত বা সর্বশেষ কর্মস্থল থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। ছাড়পত্র ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়া ‘নিষিদ্ধ’ করার কথা জানিয়েছিল টেলিভিশন মালিকদের সংগঠনটি।
এমন সিদ্ধান্তে সাংবাদিক ও কয়েকটি সাংবাদিক সংগঠন এই বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।
প্রত্যাহারের কয়েক ঘণ্টা আগে অ্যাটকোর সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম নিজের প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে বিজ্ঞপ্তির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আলাপ-কে বলেন, “যেমন আমার প্রতিষ্ঠানের কথা বলি। লোকজন চাকরি ছেড়ে চলে গেছে অথচ তার সঙ্গে দেনা-পাওনা আছে। বাবা অসুস্থ বলে অ্যাডভান্স নিয়েছে ৫০ হাজার টাকা। সেটা শোধ না করে সে পরে অন্য চ্যানেলে চাকরি করছে। এরকম অনেক ঘটনা আছে।”
বকেয়া বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
আব্দুস সালাম জানান তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা অ্যাডভান্স দেওয়া আছে। এমন অনেকেই আছেন লোন শোধ না করেই চাকরি ছেড়ে চলে যায়। এ ধরনের কাজকে তিনি ‘এথিকাল’ মনে করেন না বলেও আলাপ-কে জানান। এজন্য এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) কিংবা ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেন।
যদিও সাংবাদিকদের লোন নেওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন মনে করেন সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন হয় না বলেই লোনের প্রসঙ্গ আসে।
তিনি আলাপ-কে বলেন, “যদি বেতন হতো তবে সংবাদকর্মীদের লোনের প্রয়োজন কেন হবে?”
সাংবাদিকরা সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত বলে মনে করেন ইকনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা। তার মতে টেলিভিশন সাংবাদিকদের জন্য এখনও কোনো আইনি কাঠামো তৈরি হয়নি। যা পত্রিকার জন্য আছে।
সেক্ষেত্রে এই ধরনের মানসিকতা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন মালা।
“আমাদের এক্সিস্টিং পরিস্থিতি যখন একটা আদর্শ সিচুয়েশনে থাকবে, তখন এগুলো (এনওসি) কার্যকর হতে পারে। এখানেতো কোনো কিছুর কাঠামোই নেই। লিগ্যাল কোনো স্ট্রাকচার নাই। সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র এনওসির বিষয়টা হলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ সাংবাদিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে, বেতন দেওয়া হবে না, যখন তখন চাকরি থেকে টার্মিনেট করে দেবে, আবার আরেকটা জায়গায় গিয়ে চাকরিও চাইতে পারবে না।”
বিজ্ঞপ্তির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে অ্যাটকো'র সাধারণ সম্পাদক সালাম বলেন তারা সাংবাদিকদের ট্রেনিং দেন।
“ট্রেনিংটা দেওয়া হয় বিনামূল্যে। ছয় মাস একটা রিপোর্টার ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করতে তো ইনভেস্টমেন্ট আছে। তাদের সাথে একটা চুক্তি থাকে যে দুই বছর মিনিমাম এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে হবে। অনেকে দেখা যায় ছয়মাসের মধ্যে বিনা নোটিসে অন্য জায়গায় চলে যায়। এসব কীভাবে সুরাহা করবেন?”
সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ গণমাধ্যমের মালিক ও সাংবাদিক উভয়পক্ষের অবস্থান নিয়ে আলাপ-কে বলেছেন, “মাসের পর মাস বেতন বকেয়া রাখা এটা কোন আইন অনুযায়ী করেন তারা? অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই বেতন বকেয়া হয়, একতরফাভাবে ছাটাই করা হয় দেনা পাওনা না বুঝিয়ে। এসবের চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়া উচিত।”
ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি)–এর চেয়ারম্যান ফাহিম আহমেদ আলাপ-কে বলেন, “একজন সাংবাদিককে ন্যূনতম বেতন দেওয়া হয় না। প্রভিডেন্ট ফান্ড কিংবা গ্র্যাচুয়েটি এরকম কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। একজন সাংবাদিক যদি নিয়ম অনুযায়ী চিঠি দিয়ে অন্য জায়গায় চাকরির জন্য যেতে চায়, তখন তার বেতনও দেওয়া হয় না, আটকে রাখে। তাহলে ওই সাংবাদিক নোটিস পিরিয়ড মেনে যাবে কীভাবে?”
ফাহিম আহমেদের মতে সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তারপর এই বিধি-নিষেধগুলো আনা যেতে পারে। তখন সবাই এসব অবশ্যই মেনে নেবেন।
তবে আব্দুস সালাম আলাপ-কে বলেন, "আমাদের এই বিবৃতি নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলছেন। মুখোমুখী দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে তা নয়। কথা হচ্ছে নিয়ম অনুযায়ী চাকরি ছেড়ে যাওয়া যাবে। অবশ্যই অন্য প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার এবং চাকরি করার অধিকার সবার আছে।"
মালিকদের জন্য আইন নেই
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার মতে সাংবাদিকদের জন্য সব নিয়ম করার কথা বলা হলেও কর্তৃপক্ষের জন্য কোনো নিয়ম নেই। এমনকি টেলিভিশন কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্য আদর্শ কোনো আইনি প্রক্রিয়া এখনও তৈরি হয়নি বলে জানান তিনি।
তবে সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ মনে করেন ওয়েজ বোর্ড ও কোম্পানির আইন অনুযায়ী একজন সাংবাদিক দুই মাসের নোটিস দিয়ে চাকরি ছাড়তে পারবেন। মালিকরাও যদি কাউকে বাদ দিতে চান, তাহলে তাকে নিয়ম অনুযায়ী সময় দেওয়া এবং বেনিফিটগুলো দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
এসব আইন মালিকরা মেনে চলেছেন কিনা, আগে এটা যাচাই করা উচিত বলে মনে করেন মোস্তফা ফিরোজ।
“এসব তদন্তে একটি কমিশন হওয়া জরুরি। গত ১৫ বছরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মালিকরা কী ধরনের আচরণ করেছেন সেসব বিষয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। এরপর এনওসির যৌক্তিকতা আছে কিনা সেসব যাচাই-বাছাই করা উচিত,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
মালাও মনে করেন যদি কোনো টেলিভিশন সাংবাদিক সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত হন তাহলে আইনি কাঠামোর অভাবে আদালতে যেতে পারেন না।
সাংবাদিকদের চাপে রাখার চেষ্টা
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন মনে করেন গণমাধ্যমের অধিকাংশ মালিকরা বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ আর তাই 'নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র' হিসেবে এ ধরনের নিয়ম তারা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
“দীর্ঘদিন গণমাধ্যম ছিল ফ্যাসিস্ট নিয়ন্ত্রিত। যে কারণে তারা কর্মীদের উপর নিপীড়নমূলক পদ্ধতি চালাচ্ছে। অধিকাংশ গণমাধ্যম এখনও আওয়ামী লীগের লোকজনের নিয়ন্ত্রণে। এই মালিকদের কথা তো এখন সাংবাদিকরা শুনছে না। এখন চাকরির ভয় দেখিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। মূল উদ্দেশ্য হলো এটা।”
এনওসি বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে ইআরএফ সভাপতি মালা মনে করেন এখানে সাংবাদিকদের চাপে রাখা ও জিম্মি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
কী ধরনের চাপে ফেলতে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে আলাপ-কে তিনি বলেন, “ওদেরকে (মালিকদের) খুশি না করে আপনি চাকরি ছাড়তে পারবেন না। ধরা যাক, আপনার বেতন হচ্ছে না ছয় মাস। তখন চাকরি ছাড়লেন কিন্তু বের হতে পারবেন না। কারণ চাকরি ছাড়তে গেলে তো এনওসি লাগবে। তার মানে জিম্মি করে ফেলার একটা টেনডেনসি আমি মনে করি।”
টেলিভিশন খাত আছে 'ঝুঁকির মধ্যে'
বেতন বকেয়া নিয়ে টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি খুব ঝুঁকির মধ্যে আছে, বলে জানান অ্যাটকো সাধারণ সম্পাদক সালাম।
“আমরা ডিজিটালাইজেশন এবং পে চ্যানেল করার জন্য ফাইট করছি। এই খাতকে সিকিউর করতে হলে পে চ্যানেল করতে হবে। বাসায় আপনি টিভি চ্যানেল দেখছেন। আপনি তো মাসে পে করেন। সেটার অংশ ইন্ডিয়ান চ্যানেলগুলো পায়। বাংলাদেশি চ্যানেলরা পায় না। এখন আমাদের ফাইটটা হচ্ছে পে চ্যানেল করতে হবে।”
তার মতে, বিজ্ঞাপন কমে গেছে। আর এইসব সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্যই একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা হচ্ছে, যেন চ্যানেলগুলো টিকে থাকতে পারে।
এনওসি নিয়ে আইন যা বলে
বাংলাদেশের শ্রম আইনে সাংবাদিকদের অনাপত্তিপত্র বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে করপোরেট আইন বিষয়ক আইনজীবী ব্যারিস্টার রিজওয়ানা নাজনীন আলাপ-কে বলেন, “বাংলাদেশ শ্রম আইনে সরাসরি এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) সম্পর্কে কিছু নেই।”
তিনি জানান, ধারা ৩১ অনুযায়ী, চাকরি শেষ হওয়ার পর কর্মচারীর ‘সার্ভিস সার্টিফিকেট’ পাওয়ার অধিকার আছে। যা নিয়োগকর্তার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। “যদি নিয়োগকর্তা এই সনদ দিতে অস্বীকার করেন। তাহলে কর্মী আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে পারেন।”
যদিও এ বিষয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব নীতি তৈরি করতে পারে।
এক্ষেত্রে যদি নতুন নিয়োগকর্তা যোগদানের শর্ত হিসেবে এনওসি বাধ্যতামূলক করেন, তাহলে কর্মী মামলাটি আদালতে চলমান থাকা অবস্থায় নতুন চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন না।
এ বিষয়টিকে ব্যারিস্টার নাজনীন সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদে নাগরিকের যে কোনো বৈধ পেশা বা কাজে প্রবেশের অধিকার সীমাবদ্ধ হয়ে যায় বলে জানান।
এছাড়াও শ্রম আইনে টেলিভিশন কর্মীদের নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই বলেন জানান ব্যারিস্টার নাজনীন।
টেলিভিশনে কাজ করা সংবাদকর্মীরা এই আইনের আওতাভুক্ত হবে কিনা, সেটা নির্ভর করবে তাদের দায়িত্বের উপর।
উদাহরণ দিয়ে ব্যারিস্টার নাজনীন বলেন, সাম্প্রতিক সংশোধনীতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে ‘ম্যানেজার’ এবং ‘সুপারভাইজার’ শ্রমিকের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। সেই অনুযায়ী, টেলিভিশন কর্মীদের তাদের ভূমিকার ভিত্তিতে অন্যান্য কর্মচারীর মতো বিবেচনা করা হবে।
সাধারণভাবে, শ্রম আইন অনুযায়ী একজন স্থায়ী কর্মী ৬০ দিনের নোটিস দিয়ে চাকরি ছাড়তে পারেন, আর নিয়োগকর্তা ১২০ দিনের নোটিস দিয়ে চাকরি ছাড়তে বলতে পারেন।