ঢাকার আলোচিত ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের পর যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি ঘুরে ফিরেছে, তা হলো মূল আসামিরা কোথায়? কয়েক মাসের সেই জল্পনার পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছেন মামলার মূল আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন।
তাদের পরিচয় যাচাই, আইনি কার্যক্রম ও দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতাও শুরু হয়েছে। চাওয়া হয়েছে কনস্যুলার অ্যাকসেস।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদী হত্যা মামলায় অভিযুক্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিককে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।
ভারতীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশনও বলেছে, ফয়সাল ও আলমগীর নামে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তারের বিষয়টি কলকাতা পুলিশ তাদের নিশ্চিত করেছে।
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালায় রাজ্য পুলিশের এসটিএফ। তাদের কাছে তথ্য ছিল, সুযোগ পেলেই এই দুজন আবার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে পারেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই গোপন ডেরায় অভিযান চালিয়ে শনিবার গভীর রাতে ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে ফয়সাল করিম মাসুদ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন, সহযোগী আলমগীর হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি শরিফ ওসমান বিন হাদীকে হত্যা করেন এবং পরে ভারতে পালিয়ে যান। তারা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। এরপর ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ এলাকায় আশ্রয় নেন। তাদের পরিকল্পনা ছিল সুযোগ পেলে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসার।
যেভাবে হামলার শিকার হন ওসমান হাদী
গত বছরের ১২ই ডিসেম্বর নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরদিন ঢাকার পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদী।
দুপুরের ব্যস্ত সময়ে রিকশায় থাকা অবস্থায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই ১৮ই ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
শরিফ ওসমান হাদী ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং এর আগে এলাকায় গণসংযোগও করছিলেন। তফসিল ঘোষণার পরদিনই তাকে গুলি করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর কী হচ্ছে
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের পর ফয়সাল ও আলমগীরের বিরুদ্ধে সেখানে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং স্থানীয় আদালতে হাজির করা হয়েছে। আদালত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। বর্তমানে তারা পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।
এ দিকে তাদের সঙ্গে কথা বলতে ও আইনি সহায়তা দিতে কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশন ভারত সরকারের কাছে ‘কনস্যুলার অ্যাকসেস’ চেয়েছে।
উপহাইকমিশনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শনিবার রাতে বনগাঁও সীমান্ত এলাকা থেকে অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে স্থানীয় আদালতে হাজির করলে রিমান্ড মঞ্জুর হয়।
কনস্যুলার অ্যাকসেস কী
কনস্যুলার অ্যাকসেস হলো বিদেশে আটক কোনো নাগরিকের জন্য তার নিজ দেশের দূতাবাসের আইনি সহায়তা পাওয়ার আন্তর্জাতিক অধিকার।
আইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য দেশে গ্রেপ্তার বা আটক হন, তাহলে সেই দেশের সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দেশের দূতাবাসকে বিষয়টি জানাবে।
এর মাধ্যমে দূতাবাসের কর্মকর্তারা আটক ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে পারেন, তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তা বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে পারেন।
ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, বিদেশি কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে এ বিষয়ে অবহিত করতে হয়।
যা বলছে সরকার
এ ঘটনায় পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেছেন, ওসমান হাদী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক চ্যানেলে কাজ শুরু হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “সরকার আশা করছে খুব দ্রুত অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে “
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও সাংবাদিকদের বলেন, “ভারতের কলকাতা পুলিশ দুইজন ব্যক্তিকে হাদী হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেছে এবং তাদের সম্ভবত ১৪ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।”
তিনি জানান, কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশন ইতিমধ্যেই ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং কনস্যুলার অ্যাকসেস চাওয়া হয়েছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, “কনস্যুলার অ্যাকসেস পাওয়া গেলে কর্মকর্তারা আটক ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করতে পারবেন এবং এরপর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।”
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্দি বিনিময় চুক্তি আছে। যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাই এই মামলার আসামি, তাহলে সেই চুক্তির আওতায় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারেও বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তবে কত দ্রুত তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা যাবে সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি। বলেন, “এটা অন্য দেশের আইন ও আদালতের বিষয়। আমরা কূটনৈতিকভাবে চেষ্টা করছি এবং আশা করি ভারত এ বিষয়ে সহযোগিতা করবে।”