মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানা কবর কিংবা চিতা। মৃত মানুষকে সব সমাজেই সম্মানের সাথে বিদায় দেওয়া হয়। এটাই সভ্যতার রীতি।
কিন্তু মৃত্যুর পরও যদি একটা মরদেহ কারও যৌন লালসার শিকার হয়, তাহলে মরদেহের নিরাপত্তা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আলাপ-এর অনুসন্ধানে এমন কিছু তথ্য উঠে এসেছে, যা অস্বস্তিকর, ভয়াবহ এবং বিকৃত মানসিকতার নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
বিষয়টার নাম নেক্রোফিলিয়া। বাংলায় বলা হয় মৃতকামিতা, মানে মৃতদেহের প্রতি যৌন আকর্ষণ। একজন নারীর মরদেহ মর্গে পড়ে আছে আর এক বা একাধিক লোক তার সাথে যৌনাচার করছে!
ব্যাপারটা ভাবতেই রাগে শরীর জ্বলে ওঠে, গা ঘিনঘিন করে। কিন্তু এটা সম্ভব, এবং বাংলাদেশেই ঘটছে। এমন অভিযোগ আগেও উঠেছে, গ্রেফতারও হয়েছে ।
পৃথিবীর এক কুখ্যাত অপরাধী
বাংলাদেশের ঘটনায় যাওয়ার আগে একজন কুখ্যাত অপরাধীর কথা জেনে নিই, যিনি নেক্রোফিলিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন।
তার নাম জেফরি ডাহমার, বিশ্ব তাকে চেনে ‘মিলওয়াকি ক্যানিবাল’ নামে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার। ১৯৭৮ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে তিনি ১৭ জন তরুণ ও কিশোরকে হত্যা করেন।
জেফরির অপরাধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলো একটি ছিলো তীব্র নেক্রোফিলিয়া। হত্যা করেই ক্ষান্ত হতেন না, মৃতদেহের সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হতেন আর লাশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে নিজের বাসাতেই রেখে দিতেন।
জেফরির নেক্রোফিলিয়া পেছনে ছিলো চরম একাকিত্ব, ছেড়ে যাওয়ার ভয় ও নিয়ন্ত্রণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি এমন সঙ্গী খুঁজতেন যে তাকে কখনো ছেড়ে যাবে না, তর্ক করবে না এবং পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। জীবিত কারো পক্ষে এভাবে নিজেকে সঁপে দেওয়া সম্ভব না। তাই তিনি হত্যা করতেন আর মৃতদেহের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ খাটাতেন।
পদ্ধতিটা ছিল এমন: প্রথমে ভুক্তভোগীদেরকে অচেতন করতেন, পানীয়ের সাথে উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিতেন, তারপর শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলতেন। তারপর দিনের পর দিন মৃতদেহের সাথে যৌনকর্ম করতেন। লাশ যাতে পচে না যায়, সেজন্য কখনো কখনো ফ্রিজে রেখে দিতেন।
শেষ পর্যন্ত পুলিশ জেফরিকে ধরে জেলে পাঠায়। ১৯৯৪ সালে কারাগারের ভেতরেই এক কৃষ্ণাঙ্গ কয়েদি তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে।
জেফরির মতো আরো বহু মানুষ আছে পৃথিবীতে। কেউ ধরা পড়লে কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর অন্য ঘটনার আড়ালে চাপা পড়ে।
ঢাকার এক মধ্যরাত
২০২৬ সালের জানুয়ারী মাস। ঢাকা উত্তর সিটির একটি বাসায় মধ্যরাতে পুলিশ এসে হাজির। তাদের কাছে খবর ছিলো, ওই বাসায় থাকা এক নারীর কোন খোঁজ মিলছে না। পুলিশের উপস্থিতিতে ভেঙ্গে ফেলা হলো ঘরের দরজা। ভেতরে পাওয়া গেল সেই নারীর মৃতদেহ।
তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিলো সেটি এই গল্পের বিষয় নয়। গল্প হলো লাশ মর্গে নেবার পর কী ঘটেছিলো।
সে রাতে পুলিশ মরদেহ উদ্ধারের পর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়ে দেয়। খুব জরুরী বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছাড়া রাতে মর্গে ময়নাতদন্ত হয় না। তাই ময়নাতদন্ত না করে মরদেহটি রেখে দেয়া হয় হিমঘরে।
এরপর নিয়ম অনুযায়ী ময়নাতদন্ত শেষে প্রতিবেদন এলো। তাতে বলা হলো, সেই নারীর মৃত্যু ছিলো স্বাভাবিক, মানে হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যা নয়। এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিলো।
কিন্তু একই সাথে মরদেহটি নিয়ে হাসপাতালটির ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকদের মধ্যে কিছু সন্দেহ দেখা দেয়। অনুসন্ধানের মূল পর্বের শুরু এখান থেকেই।
সন্দেহের কারণে মরদেহের ভিসেরাসহ প্রয়োজনীয় কিছু নমুনা পাঠানো হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, সিআইডি’র রাসায়নিক পরীক্ষাগারে। আর সেখানেই ধরা পড়ে, ওই নারীর মরদেহে শুক্রাণুর উপস্থিতি।
মৃতদেহে শুক্রাণু এলো কিভাবে? প্রশ্নটি হাসপাতালের ফরেনসিক চিকিৎসকদের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ মরদেহটি ছিল হাসপাতালের মর্গে। তাহলে মর্গে কী করে এই ঘটনা ঘটলো?
আর এটি একবারের ঘটনা নয়। এর কয়েকমাস আগেও এমন ঘটনা চিকিৎসকদের নজরে এসেছিলো।
একই মর্গে আরেকটি ঘটনা
২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকাতে এক নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তের জন্য তারও মরদেহ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে আনা হয়। যতদূর জানা যায়, সেদিন ময়নাতদন্ত শেষ হয়নি বলে লাশ মর্গেই রাখা ছিলো।
ময়নাতদন্তের সময় ফরেনসিক চিকিৎসকদের চোখে অস্বাভাবিক কিছু ধরা পরে। সিআইডি’র ল্যাব পরীক্ষায় ওই নারীর মরদেহে একাধিক পুরুষের শুক্রাণু মেলে। ওই প্রতিবেদনের কপি আলাপ-এর কাছে রয়েছে।
শুধু এই দুটো নয়, আরো তিনটি ঘটনার নথি বিশ্লেষণ করে, ফরেনসিক চিকিৎসক আর সংশ্লিষ্ট অন্যদের সঙ্গে কথা বলে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে এ ধরনের যৌনচারের কথা নিশ্চিত হওয়া গেছে।
একবার নিজেকে এসব মৃত নারীদের স্বজনদের জায়গায় ভাবুন। ক্ষোভ, রাগ আর কষ্টের সীমা থাকবে না, অথচ কিছু করার নেই। সরকারি হাসপাতালের মর্গে মৃত নারীর সাথে কেউ এমন কিছু করবে, এ আপনার কল্পনারও বাইরে।
ফরেনসিক চিকিৎসকদের চোখ কপালে
সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালগুলোরও একটি। এখানকার ঘটনাগুলো থেকে দেশের সব মর্গে মৃতদেহের সম্মান ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি সামনে আসে। এসব ঘটনা যখন প্রকাশিত হয় তখন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসকরাও বিব্রত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে অন্তত তিনজন চিকিৎসক আলাপ-এর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা জানান, গত এক বছরে ময়নতদন্তের সময় বেশ কয়জন নারীর মরদেহে তারা সন্দেহজনক বস্তুর উপস্থিতি পেয়েছেন। তাদের মতে, সবকিছু বিবেচনা করলে এটা বুঝতে বাকি থাকে না যে এই মর্গেই লাশের সঙ্গে যৌনাচার হয়েছে।
এমনকি নানা সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত, কাগজপত্র খোয়া যাওয়ার ঘটনাও তাদের নজরে এসেছে। তারা সংশ্লিষ্ট বিভাগ আর কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছেন। এ কারণে কেউ কেউ তাদের ওপর ক্ষিপ্তও হয়েছে ।
অভিযোগ রয়েছে, আগের মর্গ প্রধানের লোকজন ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ঘুরিয়ে দিতেও পরোক্ষভাবে চাপ দিয়েছে। একাধিক চিকিৎসক এটাও বলেছেন, ফরেনসিক বিভাগের দুজন মেডিক্যাল অফিসার মর্গের ওই সিন্ডিকেটকে সরাসরি ইন্ধন দিচ্ছিলেন।
কলেজ কর্তৃপক্ষ যা বলছে
মৃতকামিতার এসব ঘটনায় কলেজ প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। কারণ, একই ঘটনা আগেও ঘটেছে এখানে।
লাশকাটা ঘরে দিনে একাধিক মরদেহের পোস্টমর্টেম হয়। তবে মরদেহগুলো হাসপাতালে আসা মাত্রই পোস্টমর্টেম করা হয় না। মর্গে পৌঁছানোর পর একটা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রক্রিয়া যত দ্রুত শেষ হয়, পোস্টমর্টেমও তত দ্রুত হয়। দেরি হলে মরদেহ হিমঘরে রাখা হয়। পরিচয়হীন, বেওয়ারিশ বা নানা জটিলতার কারণে কিছু মরদেহ দিনের পর দিন হিমঘরে পড়ে থাকে। আর মৃতকামিতার এই অপরাধগুলো ঘটে মর্গের ভেতরেই।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. অধ্যাপক মো. আঈনুল ইসলাম খান আলাপ-কে বলেন, ফরেনসিক চিকিৎসকদের কাছ থেকে মরদেহের সঙ্গে অস্বাভাবিক যৌনাচারের তথ্য পাওয়া যাচ্ছিলো। এরপর তদন্ত শুরু করে একটি প্রতিনিধিদল।
প্রথমেই তদন্তকারীরা খোঁজ করেন সিসিটিভি ফুটেজের। কিন্তু সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি। ঘটনার সময়ের কোনো ফুটেজ নেই, কারণ কেননা অপরাধীরা আগেই ক্যামেরা নষ্ট করে ফেলেছিলো।
প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হলেও নেক্রোফিলিয়ার ঘটনাগুলো আরো সূক্ষ্মভাবে খতিয়ে করে দেখা হচ্ছে বলে জানান কলেজের অধ্যক্ষ। তিনি বলেন, এই গুরুতর অভিযোগে মর্গ সহকারী শান্তকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তার আগে মর্গ ইনচার্জ যতনকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মিরপুরে ডেন্টাল কলেজে ফিরিয়ে নিয়েছে। তার সময়েই মর্গ সহকারী হিসেবে নিয়োগ পান শান্ত। তদন্তে উঠে এসেছে যতন ও শান্ত দায়িত্বে থাকার সময়ই এসব ঘটনা ঘটেছে।
অধ্যক্ষ আইনুল নিজেই অভিযোগ করে বলেন, “এখানে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।”
ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের অন্তত পাঁচ জন চিকিৎসক অনেক দিন ধরেই কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করে আসছিলেন যে, এই মর্গ ঘিরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডা. নাশাত জাবীন আলাপ-কে বলেন, ময়নাতদন্তকারীদের অভিযোগগুলো তারা গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেন। একটি দুটি নয়, বেশ কয়েকটি নারী মরদেহের সঙ্গে মৃত্যু-পরবর্তী যৌনাচার বা নেক্রোফিলিয়ার ঘটনা স্পষ্ট হতে থাকে। তিনি বলেন, এসব ঘটনা কর্তৃপক্ষের আড়ালে করা হচ্ছিল।
অনুসন্ধানে যা পাওয়া গিয়েছে
মর্গের ভেতরে সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট করে ফেলায় ওই সময়ের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে বাইরের ক্যামেরা থেকে মর্গ সহকারী শান্তর কিছু স্থিরচিত্র পাওয়া গেছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ঘটনার আগে শান্ত মর্গে ঢুকেছেন এবং বের হয়েছেন। হাসপাতালের প্রাথমিক অনুসন্ধান দল এটি নিশ্চিত করেছে, আর তাই তাকে প্রধান সন্দেহভাজনের তালিকায় রেখেছে ।
ডা. নাশাত জানান, তাকে ও মর্গের প্রধানকে সরে যেতে হুমকি দেওয়া হয়েছে। পরে তারা শেরেবাংলা নগর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
শান্ত সাবেক মর্গ প্রধান যতন লালের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত হয়েছেন, ঘটনার ওই রাতে শান্তই মর্গে ছিলেন।
অনুসন্ধান দলের একজন আলাপ-কে বলেন, তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন যে ওই রাতে ওই সময়ে মর্গে নতুন কোনো মরদেহ রিসিভ করা হয়নি।
খোঁজখবর নিয়ে দলের সন্দেহ আরও দুজনের ওপর পড়ে। একজন তখনকার মর্গ প্রধান, আরেকজন লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ির এক চালক। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মর্গ ও ফরেনসিক বিভাগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলামত ও নথি খোয়া গেছে।
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান শুরু করার পরপরই শান্ত তা টের পেয়ে যান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগের মর্গ প্রধানকে সরিয়ে নতুন একজনকে ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ করে। কিন্তু শান্ত গং নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রধানকে হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করে, দায়িত্ব ছেড়ে দিতেও বলে।
যতন লাল ও শান্ত যা বলছেন
সোহরাওয়ার্দীর মর্গের সাবেক ইনচার্জ যতন লালের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নেক্রোফিলিয়া ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এরপর তাকে আবার ফিরিয়ে নেওয়া হয় মিরপুরে ঢাকা ডেন্টাল কলেজে।
আলাপ-এর কাছে যতন লাল দাবি করেন, তার দায়িত্বকালে মর্গে যা ঘটেছে বলা হচ্ছে, সেগুলো আসলে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। শান্তকে মর্গের সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো তার সময়েই ।
মূল সন্দেহভাজন শান্তকে পাওয়া যায় কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। তিনি দাবি করেন, যতন লাল ছুটিতে থাকায় তিনি ওই সময় দায়িত্বে ছিলেন। মর্গের বাইরের ছবি নিয়ে তার ব্যাখ্যা, লাশ আসলে তা গ্রহণ করতেই ভিতর বাইরে আসা-যাওয়া করেছিলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সেখানে রাতে “ভৈৗতিক কিছু থাকায়” এক জায়গায় থাকা সম্ভব হয় না। মরদেহের সঙ্গে যৌনাচারে জড়িত নন বলেও দাবি করেন শান্ত।
আগের ঘটনা: ২০১৯ সাল
এবার একটু পেছনে যাওয়া যাক। তাহলে যতন লাল সম্পর্কে আরো তথ্য জানা যাবে।
২০১৯ সালে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গের সহকারী ছিলেন মুন্না ভগত। একাধিক মৃত নারীর সঙ্গে যৌনাচারের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তদন্তে তার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। মুন্না ভগত হলেন যতন লালের ভাগ্নে আর তার নিয়োগও হয়েছিলো তার হাত ধরেই।
ওই ঘটনায় যতন লালের বিরুদ্ধেও অভিযোগ ওঠে। গ্রেফতার করা হয় তাকে।কারাভোগ করে এখন জামিনে রয়েছেন যতন লাল। কিন্তু ভাগ্নে মুন্না ভগত এখনো কারাগারে।
২০১৯ সালের ওই ঘটনাই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসা নেক্রোফিলিয়ার ঘটনা, যা নিয়ে তখন বেশ আলোড়ন হয়েছিল।
সিন্ডিকেট আতঙ্কে বর্তমান মর্গ ইনচার্জ
জানু লাল ওরফে জীবন এখন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গের প্রধান। আগেও তিনি একই কাজ করতেন। তিনিও মনে করেব এই হাসপাতালে মরদেহের সঙ্গে যৌনাচার করা হয়, এমন একটি চক্র থাকতে পারে।
জীবন জানান ওই সিন্ডিকেটের লোকজন ষড়যন্ত্র করে আগে তাকে এই হাসপাতাল থেকে সরিয়ে দিয়েছিলো। তার অভিযোগ এই ঘটনার নেপথ্যে ছিলো যতন লাল নিজেই। এর কারণ হিসাবে জীবন জানান, সেসময় নারীদের মরদেহ গ্রহণের পর এক রকম থাকতো,আর সকালে সেই দেহটি অন্যরকম লাগতো। প্রায়ই এমনটা হওয়ায় সন্দেহ হয় মর্গ ইনচার্জ যতন লালকে। তিনি আরো জানান, তার কথায় কান দিতেন না যতন লাল।
“আমাকে ফোন ছাড়াও রাস্তায় চলাচলের সময় অপরিচিত মানুষ এখান থেকে সরে যেতে হুমকি দিচ্ছেন,” আলাপ-কে বলেছেন যতন লাল।
অন্যান্য মর্গেও একই ঘটনা
সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২১ সালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গেও মৃত নারীর সঙ্গে যৌনাচারের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিলো। ২০২৫ সালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে এক তরুণীর মরদেহের সঙ্গেও যৌনাচারের অভিযোগে লাশ বাহক আবু সাঈদকে গ্রেফতার করেছিলো পুলিশ। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছিলো আবু সাঈদ।
সিআইডি'র মিডিয়া বিভাগের বিশেষ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসীমউদ্দিন খান জানিয়েছেন, সোহরাওয়ার্দীর মর্গের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তদন্তও চলমান রয়েছে। তিনি সম্প্রতি বদলি হয়েছেন। দায়িত্বে থাকার সময় এই বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।
তবে ঘটনার স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় খুব বেশি তথ্য দিতে চায়নি সিআইডি।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন ও আইনে কী আছে
মনরোগ বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. মো. আজিজুল ইসলাম আলাপ-কে বলেন, নেক্রোফিলিয়া একটি ভয়াবহ রোগ। যার চিকিৎসা বাংলাদেশে এখনো তেমন একটা নেই।
এসব রোগীর ক্ষেত্রে মানসিক চিকিৎসার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে নেক্রোফিলিয়া সংক্রান্ত সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট আইন বা শাস্তির বিধান নেই। সুনির্দিষ্ট আইনের অনুপস্থিতির কারণে বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এনিয়ে দেশের আইনবিদ ও মানবাধিকার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে দণ্ডবিধি সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছেন। নতুন আইন না করেও ধারা সংশোধনের মাধ্যমে নেক্রোফিলিয়ার অপরাধে সাজা দেওয়া যেতে পারে বলে মত দেন তিনি।
আর নেক্রোফিলিয়ার ঘটনা বাংলাদেশে কয়েকবার সামনে আসায় নারী মরদেহের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি মনে করেন, এমন ভয়ংকর ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা না করে অভিযুক্তদের আইনের কাঠামোর মধ্যে এনে বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন,নেক্রোফিলিয়ার অপরাধে সুস্পষ্ট আইন না থাকায় নারী মৃতদেহের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।
মৃত্যুর পর কেউ আর প্রতিবাদ করতে পারে না। তাই মরদেহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ, এবং আমাদের ।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গ ঘিরে যেসব অভিযোগ উঠছে, তাতে সেই নিরাপত্তা নিয়েই এখন তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। ২০১৯ সালের ঘটনা থেকে শুরু, সাম্প্রতিক অভিযোগ, বারবার একই ধরনের ঘটনা সামনে আসা, এগুলো শুধু কোনো একজনের বিকৃত আচরণের ব্যাপার না। এর সঙ্গে মর্গের ব্যবস্থাপনা, নজরদারি, জবাবদিহি, তদন্ত আর শাস্তির প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।
অভিযোগগুলোর সত্যি কি-না তা নির্ধারণ করবে আদালত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, মরদেহ নিরাপদ রাখার মতো একটি কার্যকর ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এই অপরাধের জন্য আইনি কাঠামো স্পষ্ট করা দরকার, আর অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।