হাসপাতালেও মবের হাত থেকে রক্ষা মেলেনি, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে প্রাণ গেল শামীমের 

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ওয়াহেদুজ্জামান শামীম ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন একজন ব্যক্তি। স্ত্রীর সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। সেই ঝগড়ার রেকর্ড ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক মাধ্যমে। 

এরপর স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো করেন। তারপর ঘটে এক ‘নারকীয়’ তাণ্ডব। 

প্রথমে বাড়ি ভাঙচুর করা হয় শামীমের। এরপর গণপিটুনি। ক্ষোভে, অপমানে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। নেওয়া হয় চিকিৎসকের কাছে।  

‘তৌহিদি জনতা’র নামে ‘উন্মত্ত মব’ থেকে রেহাই মেলেনি চিকিৎসাধীন শামীমের। সোশাল মিডিয়ায় আহ্বান জানিয়ে জড়ো করা হয় লোকজন। ঘিরে ফেলা হয় ডাক্তারের চেম্বার।

সেখান থেকে বের করে আরেক দফায় গণপিটুনি। শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। এবার হাসপাতালে হানা দেয় ‘তৌহিদি জনতা।’

চিকিৎসাধীন শামীমকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় হাসপাতাল থেকে। বাইরে বের করে এনে তৃতীয় দফায় দেওয়া হয় গণপিটুনি। মৃত ভেবে ফেলা রাখা হয়। 

তিন দফা গণপিটুনি সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ওয়াহেদুজ্জামান শামীম। 

মঙ্গলবার রাতে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন শামীমকে। 

মৃত্যুর পরও ভয় কাটেনি শামীমের পরিবারে। স্থানীয় যে প্রভাবশালীরা তাকে গণপিটুনি দিয়েছে, তারাই এখন দাফন করতেও বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা। 

তারা বলছেন, “ধর্ম অবমাননার নামে মব সৃষ্টি করে” হত্যা করা হয়েছে শামীমকে। পুলিশ বলছে, মবের তাণ্ডবে নিহত হয়েছেন শামীম। 

আর গণপিটুনির ঘটনার পেছনে থাকা যে স্থানীয় প্রভাবশালী, তার বক্তব্য, ‘‘ধর্ম অবমাননা’’ করায় ‘‘তৌহিদি জনতা’’ গণপিটুনি দিয়ে ‘‘পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিয়েছে’’ শামীমকে।

শামীমের সঙ্গে যা যা ঘটেছে  

নিহত ওয়াহেদুজ্জামান শামীমের বাড়ি সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া এলাকার বড় শান্তা গ্রামে। তার বাবার নাম শামছুর রহমান। 

ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে তুলে প্রথমে তার বাড়ি ভাঙচুর করা সোমবার সন্ধ্যায়। ওই সময় প্রথমবার গণপিটুনির শিকার হন তিনি। 

এরপর মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে দ্বিতীয় দফা এবং সেদিনই রাত ১০টার তৃতীয় দফায় গণপিটুনির শিকার হন শামীম। 

নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল বলেন, মানসিক রোগাক্রান্ত ভাই ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সাথে বচসায় জড়িয়ে গালিগালাজ করেন। সেই বচসার কথাবার্তা স্থানীয় একজন অডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।

আব্দুল জলিল বলেন, শামীমের ওই কথাবার্তায় ধর্ম নিয়ে ‘কটূক্তি’ আছে, এমন দাবি করেন দেবহাটার স্থানীয় বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনী। তিনি ফেইসবুকে লাইভে সোমবার সন্ধ্যায় ‘তৌহিদি জনতা’কে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান।

“এর কিছুক্ষণ পর কয়েকশ লোক শামীমের বাড়ি ভাঙচুর করে এবং তাকে ঘর থেকে মারতে মারতে সুবর্ণাবাদ বাজারের জামায়াত ইসলামীর অফিসের সামনে নিয়ে যায়,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

মারধরের শিকার হয়ে ‘‘মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায়’’ বাড়িতে ফিরেই শামীম বিষপান করেন বলে জানান তার বড় ভাই। 

রাতেই তাকে নেওয়া হয় কুলিয়া এলাকায় পল্লি চিকিৎসক ডা. সবুরের চেম্বারে। ওয়াশ করানোর পর শামীম কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন বলে জানান তার বড় ভাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্থানীয় জনতা সেই পল্লি চিকিৎসকের চেম্বার ঘেরাও করে ফেলে।

ঘটনাস্থল থেকে ফেইসবুকের ভিডিও করে ‘ডাক্তার’-এর চেম্বারে লোকজন জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান ফজলুল হক আমিনী। 

ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিওতে ফজলুলকে বলতে শোনা যায়, “এখানে ট্রিটমেন্ট হচ্ছে। আমরা ভেতরে গিয়ে দেখেছি। কুলিয়াসহ আশেপাশে যারা রয়েছেন, তারা সবাই এই সবুর সাহেবের চেম্বারে জড়ো হন। আপনারা সবাই সমবেত হন।” 

রাত সাড়ে আটটার দিকে সবুরের চেম্বারের সামনে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে একদল মানুষ জড়ো হন বলে জানান নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল। 

তিনি বলেন, সেখানে চিকিৎসাধীন থাকা শামীমকে বের করে দেওয়া হয় গণপিটুনি দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

কিন্তু রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে কয়েকশো লোক ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানার নিয়ে রওনা হয় পারুলিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে সখীপুর হাসপাতালে। 

সেখানে চিকিৎসাধীন শামীমকে হাসপাতালের বাইরে আনা হয়। সেখানে তাকে এলোপাতাড়ি গণপিটুনি দেওয়ার পর নিস্তেজ হয়ে পড়েন ওয়াহেদুজ্জামান শামীম। মৃত ভেবে তাকে হাসপাতালের বাইরে ফেলে যাওয়া হয় বলে জানান তার ভাই। 

পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে রাত সাড়ে ১২টার দিকে নিয়ে যায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেই মৃত ঘোষণা করা হয় শামীমকে। 

“মব সৃষ্টির মাধ্যমে আইন হাতে তুলে নিয়ে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। ভাইয়ের লাশ মাটি দিতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে,” বলেন নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল। 

কী বলছেন ফজলুল ও পুলিশ

পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ, শামীম মাদরাসা থেকে কামিল পাশ করে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। নিহত শামীম ছিলেন ‍দুই সন্তানের বাবা। 

শামীমের আরেক ভাই তাহসিভ রহমান সাগর জানান, পারিবারিক সমস্যার কারণে মানসিক রোগে ভুগছিলেন তার ভাই। 

“সে সুস্থ না, অসুস্থ মানুষ। মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ার কারণে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। কখনো ভালো, আবার কখনো খারাপ ও অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা বলতেন। ঔষধপত্র খাচ্ছিলেন। 

“সে যদি কিছু বলে থাকে, তাহলে তাকে আইনে বিচার করতো। একটা মানুষকে এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেললো? আমরা কিছুই করতে পারিনি। আমরা সামনে যেতে পারিনি। গেলে আমাদেরও মারপিট করতো,” আলাপ-কে বলেন তিনি। 

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচএম শাহীন আলাপ-কে বলেন, মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে স্থানীয় লোকজন এক ব্যক্তিকে আটকে রেখে মারধর করছেন, এমন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ ছিল, শামীম ধর্ম অবমাননা করেছেন।

“রাত ৮টা ৪০ মিনিটে দুই থেকে আড়াইশ লোক হাসপাতালে গিয়ে শামীমকে চিকিৎসা দিতে বাধা দেন। পুলিশ, আনসার সদস্য ও চিকিৎসকেরা বাধা দিলেও তারা শোনেননি। একপর্যায়ে পেছনের দরজা ভেঙে ওয়ার্ডে ঢুকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে,” তিনি বলেন

অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “বিক্ষুব্ধ শত শত মানুষ মব সৃষ্টি করেছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে এমন অভিযোগের কথা আমি বিক্ষুব্ধদের বলতে শুনেছি। কিন্তু সেটি কি অভিযোগ, আমি এখনো সুনির্দিষ্ট জানতে পারিনি,” বলেন (ওসি) এইচ এম শাহীন।  

ঘটনার বিষয়ে ফজলুল হক আমিনী বলেন, “আল্লাহ্, রাসুল ও আমাদের ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য দীর্ঘ ৬ মাস ধরে করে আসছিল ওয়াহেদুজ্জামান। প্রতিবেশী বা তার সঙ্গে কেউ কথা বললে ইসলাম বিদ্বেষী কথাবার্তা বলতো। আজ তৌহিদি জনতা গণপিটুনি দিয়ে তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিয়েছে।”

বুধবার দুপুরে শামীমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।