রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে হামলার ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের সহ সভাপতি ও রাকসুর সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদকের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা গড়ায় সংঘাতে। সেই সংঘাতের মধ্যে হামলার শিকার হন কয়েকটি গণমাধ্যমের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি।
এ ঘটনার সূত্র ধরেই সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছিলেন। এছাড়াও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলায় কারও নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করার প্রতিবাদে প্রশাসন ভবনের সামনে সোমবার রাতে অবস্থান নেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলামসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রায় ৪৫ মিনিট অবরুদ্ধ করে রাখেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বাংলা ট্রিবিউনের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি আতিকুর রহমান আলাপ-কে বলেন, “রাত দুইটা পর্যন্ত উপাচার্যের সঙ্গে কনফারেন্স রুমে বৈঠক হয়। সেখানে ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।”
এছাড়াও আতিক জানান জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্টকে অপসারণ করা হয়।
কোন অভিযোগে অপসারণ করা হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে আতিক বলেন, তিনি সিসি ফুটেজ আমাদের দেননি।
“আগেরদিন দুপুর পর্যন্ত সিসি ফুটেজ আছে। এমনকি সাইকেল চুরি হয়েছে, সেটার ফুটেজও আছে। কিন্তু দুপুরের পর থেকে রাতে যখন মারামারি হয় তখন থেকে কোনো ফুটেজ নেই।”
আতিকুর রহমান জানান এসব কারণেই তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (প্রশাসন) ড. মো. আবদুল আলিম সিসি ফুটেজ না পাওয়ার ঘটনাকে অস্বীকার করে আলাপ-কে বলেন, “এটা একদম ভুল তথ্য। এটা সঠিক না। ওখানে ইন্টেরিয়রের কাজ চলছে এজন্য ক্যামেরা অফ করা। ওনাকে ব্লেম দেওয়ার বিষয় সম্পূর্ণ ভুল, এটা ঠিক না।”
তাহলে কেন প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করা হলো এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “সেটা তো অন্য বিষয় কিন্তু যেটা বলা হচ্ছে সেটা একেবারেই ভুল। এমনকি ছাত্রও বলছে সিসি ক্যামেরা তো আগে থেকেই বন্ধ।”
প্রত্যাহারের বিষয়ে ছাত্রদের অন্যান্য দাবি ছিলো উল্লেখ করে ড. মো. আবদুল আলিম জানান, তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন।
প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করার বিষয়ে ছাত্রদলের হামলায় আহত সমকালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজু আলাপ-কে বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজ সরানোর কারণেই আমরা দাবি জানিয়েছিলাম প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করতে হবে। এখন প্রশাসন দায় এড়ানোর জন্যই এ ধরনের কথা বলছে।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক এস এম কামরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয় শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় সিন্ডিকেট সদস্য এবং প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মো. রেজাউল করিম-২কে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্য হচ্ছেন প্রফেসর মো. আরিফুল ইসলাম (দর্শন বিভাগ), প্রফেসর এম আসাদুল হক (ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ), প্রফেসর মো. আনিছুর রহমান (প্রাণিবিদ্যা বিভাগ) ও কাজী মামুন হায়দার (গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ)।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস প্রতিনিধিদের সঙ্গে কী ঘটেছিল
রবিবার রাতে ছাত্রদলের হামলায় আহত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল। তিনি রাতে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হলে ফিরতে চাইলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ফিরতে নিষেধ করেন।
নূর আহসান রাতে এক বন্ধুর বাসায় অবস্থান নিয়ে সকালে প্রক্টরকে জানিয়ে আবার হলে ফেরেন বলে জানান আলাপ-কে।
জিয়া হলে থাকেন উল্লেখ করে মৃদুল বলেন, “আমার হলের সামনেই আমাকে মারা হয়েছে।”
ঘটনা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে মৃদুল আলাপ-কে বলেন, “রাকসুর সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম বর্তমান সরকারকে সমালোচনা করে পোস্ট দিয়েছিল। ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ওই পোস্টেই গালাগালি করে কাউন্টার দিয়েছেন। এখান থেকে দ্বন্দ্বের শুরু।”
মৃদুল স্টেশন বাজারে রাতের খাবার শেষ হওয়ার পর ফোনে খবর পান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি আরিফ উজ্জামান কোরবানের ওপর হামলা হয়েছে। একইসঙ্গে সমকালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজুর ওপরও হামলা হয়েছে।
দ্রুত ঘটনাস্থলে এলে হলের গেট বন্ধ অবস্থায় দেখতে পান মৃদুল। ভেতরে সাংবাদিক, সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। বাইরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছিল।
“আমি আহসান হাবীবকে জিজ্ঞেস করেছি, ভাই আপনার কত বড় সাহস আপনি সাংবাদিকদের গায়ে হাত দিয়েছেন?”
মৃদুল অভিযোগ করেন তার প্রশ্নেরও পরই প্রথমে তার গলা চেপে ধরা হয় এবং ধাক্কা দেওয়া হয়। এরপর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান তার ওপর হামলা করেন। এসময় আগামীর সময় পত্রিকার প্রতিনিধি জাহিদ এগিয়ে এলে তার ওপরও এলোপাতাড়ি হামলা হয়।
এদিকে মৃদুলের অভিযোগকে অস্বীকার করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবীব আলাপ-কে বলেন, “শিবিরের হয়ে তারাই আমাদের ওপর হামলা করেছে। তাদের গলায় সাংবাদিক কার্ড কি ছিলো?”
“সাংবাদিকরা হামলা না করলে তাদের সঙ্গে আমাদের শত্রুতা করে লাভটা কী?”
আহসান হাবীব অভিযোগ করে বলেন, তারা যখন জিয়া হলের গেটে অবস্থান করছিলেন তখন ডেইলি স্টারের সাংবাদিক নূর আহসান মৃদুল তার কলার চেপে ধরে।
“সাংবাদিক কেন শিবিরের হয়ে আমাদের মারতে আসবে? আমরা আত্মরক্ষার্থে প্রতিহত করেছি।”
এ বিষয়ে ডেইলি স্টারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুলের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “আমি তো তখন পরিস্থিতিটাই ঠিক মতো বুঝতে পারছিলাম না। আমি সেখানে পৌঁছে তার কাছে জানতে চেয়েছি। জানার আগেই তো আমার ওপর হামলা করা হলো।”
হামলার শিকার আরেকজন হলেন দৈনিক সমকালের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজু।
ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি আলাপ-কে জানান, নয়টার কাছাকাছি সময়ে জিয়া হলের বাইরে যখন ছাত্রদল অবস্থান নেয় তখন তিনি সহ আরও কয়েকজন সাংবাদিক ভিডিও করার চেষ্টা করেন। তখনই তাদের ওপর হামলা করা হয়।
মৃদুলের প্রসঙ্গে রাজু বলেন, ডেইলি স্টারের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি পরে এসে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা হামলা শুরু করে।
তবে রাজু এ ধরনের হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভিন্ন তথ্য দেন। তিনি জানান, চাঁদাবাজের দায়ে সাংবাদিকদের নিউজের কারণেই ছাত্রদলের অনেককেই ২০২৪ সালে ডিসেম্বরে একবার বহিষ্কার করা হয়েছিল। আবার ২০২৫ সালেও অনেকে বহিষ্কার হন। পরে নতুন কমিটি ঘোষণা হলে বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করে এদের অনেককে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
“ছাত্রদলের এই কয়েকজন প্রায়ই সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করেছেন, চাঁদাবাজিও করেছেন। সাংবাদিকরা একাধিকবার এসব নিয়ে রিপোর্ট করেছেন। এ জায়গা থেকেই সাংবাদিকদের ওপর তাদের একটা ক্ষোভ ছিলো।”
সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের জয়েন্ট সেক্রেটারি মো. হাসিবুল হাসান আলাপ-কে বলেন, “কিছু সাংবাদিক আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে তেড়ে আসছিল। এ কারণেই ছাত্রদলের সঙ্গে হাতাহাতি হয়। ছাত্রদল বুঝেশুনে কোনো সাংবাদিকের গায়ে হাত দেয়নি।”
উস্কানির সূত্রপাত যেখান থেকে শুরু
অভিযোগ উঠেছে রাকসুর সহ-সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করে ফেসবুকে পোস্ট করেন।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবীব আলাপ-কে জানান, তিনি সালাউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে একটি ফেসবুক পোস্ট দেন।
“আম্মারের অর্থ কেলেঙ্কারি, চাঁদাবাজি বিভিন্ন ইস্যুতে তাকে শিবির থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সম্প্রতি এটা তো প্রকাশ হয়েছে। শিবিরের লোকেরাই প্রকাশ করেছে। আম্মারকে নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট করেছি।”
আহসান হাবীব দাবি করেন ওই পোস্টেই তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন রাকিবুল ইসলাম।
মন্তব্যের কোনো জবাব না দিয়ে আহসান হাবীব ইনবক্সে রাকিবুলকে বলেন, “আমি আহসান হাবীব একা, ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির-বাম সবাই মিলে আসলেও আমার সাথে পারবি না। আমি রাগে দুঃখে বলেছি। কারণ আমার মা-বোনকে নিয়ে গালি দিয়েছে।”
তিনি আরও জানান পরদিন আমি দেখি উস্কানি দিয়ে পোস্ট দিয়ে রাকিবুল বলছে, সে পরিবহন মার্কেটে ১০টা থেকে ৫টা পর্যন্ত থাকবে।
“আমার সাহস থাকলে যেন আসি। এবার বলেন উস্কানি দিয়েছে কে? তারপর আমি গেছি। যেতে একটু দেরি হয়েছে। তাকে পাইনি।”
আহসান হাবীব দাবি করেন তারা কোনো সহিংসতায় তখনও জড়াননি। কিন্তু আবার আরেকটি পোস্ট দেখে তারা উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং জিয়া হলে যান।
“এমন সময় আরিফুল ইসলাম নামে একজন আছেন জিয়া হলের জিএস। সে ৫ই অগাস্টের আগে করতো ছাত্রলীগ, পরে শিবির হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সে অতীতেও মির্জা ফখরুল, তারেক রহমান, ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছে। সে আবার পোস্ট করেছে। আমি বগুড়ার ছেলে আমার ইগোতে হার্ট করেছে। আমি তখন নেতাকর্মী নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গেছি তার হলে। গিয়ে দেখি ও নেই, পালিয়ে গেছে।”
ওই সময় বাক-বিতণ্ডায় জড়ানোর পরই কয়েকজন সাংবাদিক শিবিরের পক্ষ নিয়ে তাদের ওপর হামলা করলে তারা আত্মরক্ষা করেন বলে জানান আহসান হাবীব।
অনেক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে অস্ত্র হাতে নিয়ে হামলার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে আহসান হাবীব বলেন, “হ্যাঁ ছিল। লাঠি ছিল। মরণাস্ত্রো তো ছিল না। আত্মরক্ষার্থে লাঠি সবাই রাখে।”
এদিকে ফেসবুকে যার সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে ছাত্রদল সংঘাতে জড়িয়েছে তার নাম রাকিবুল ইসলাম। তিনি রাকসুর সহ সাংস্কৃতিক সম্পাদক। তিনি আলাপ-কে জানান, শিবির প্যানেলে রাকসুর নির্বাচনে তিনি সহ সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। তবে তিনি শিবিরের কোনো পদে নেই।
ঘটনার বিষয়ে রাকিবুল আলাপ-কে জানান, রাকসুর সম্পাদককে নিয়ে আহসান হাবীব নানান অশ্লীল পোস্ট দিচ্ছিলেন।
রাকিবুল দাবি করেন এসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে আহসান হাবীব তাকে গালাগাল করেন। নানাভাবে হুমকি দিলে নিরাপত্তাহীনতা থেকেই আহসান হাবীবকে ঘোষণা দিয়েই পরিবহন মার্কেটে আসতে বলেন রাকিবুল।
“যেহেতু আমাকে মারবে। সেই নিরাপত্তাহীন জায়গা থেকেই আমি ভেবেছিলাম মারবে যখন সবার সামনে মারুক। এজন্যই ওই জায়গায় সময় দিয়ে গিয়েছি।”
রাকিবুল বলেন, আহসান হাবীব যখন পরিবহন মার্কেটে আসেন, তখন সেখানে অনেক সাংবাদিকরাও আসেন। তারা আগে থেকেই বিভিন্ন কারণে সাংবাদিকদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলো।
“জিয়া হলের ছাত্র সংসদের জিএস ফেসবুকে প্রায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করার কারণে আমাকে না পেয়ে তাকে মারতে যায়। সেখানে গিয়ে সাংবাদিক যাদের হাতেই মোবাইল ছিল তাদেরই হামলা করেছে।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান জানান এ ঘটনায় মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন (এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মামলা হয়নি)।
“আহত শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসা এবং পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছি। নতুন করে আবার যেন কিছু না ঘটে সেসব বিষয়েও আমরা সচেতন আছি”, আলাপ-কে বলেন তিনি।
ঘটনার সময় প্রক্টোরিয়াল বডির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অধ্যাপক মাহবুবর রহমান আলাপ-কে বলেন, আমরা যখন প্রায় মিটমাট করে ফেলছি তখন হঠাৎ করে জিয়া হলের এক শিক্ষার্থী এক পোস্ট দেয়। সেটাকে কেন্দ্র করে আবার ছাত্রদলের ছেলেরা উত্তেজিত হয়ে জিয়া হলের দিকে আসে।
“তখন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে হলের গেট বন্ধ করে দিলে আমি ভেতরে আটকা পড়ে যাই। ভেতরে থাকায় আমার পক্ষে নিবৃত করা সম্ভব হয়নি। মুখে বলে কত আর বাধা দেওয়া যায়।”
দায়িত্ব পালনে কেন হামলার শিকার হন সাংবাদিকরা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অগাস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ৮২ জন সাংবাদিক হেনস্তার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের হামলা, নিপীড়ন বা হেনস্তার শিকার হয়েছেন ১৭ জন সাংবাদিক। সংবাদ প্রকাশের জেরে মামলা হয়েছে ৩০টি এবং সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়েছে ১৪টি মামলা।
অতীতের পরিসংখ্যানও বলছে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা বাংলাদেশে ঘটে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে ৭৮ জন, ২০২৪ সালে ৫৪ জন, ২০২৫ সালে ১১৮ জন সাংবাদিক হামলা বা হেনস্তার শিকার হয়েছেন।
এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি কারণের কথা তুলে ধরেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর। তিনি মনে করেন এ ধরনের ঘটনা ঘটে কারণ সাংবাদিকরা যেন ঘটনার ছবি, ভিডিও বা প্রমাণ সংগ্রহ করতে না পারেন।
আর এজন্য তিনি মনে করেন সাংবাদিকদেরও এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা থাকাও প্রয়োজন।
“সাংবাদিক পরিচয় আপনাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। সংঘাতের জায়গায় সন্ত্রাসী বা হামলাকারীরা সাংবাদিককে আলাদা করে ছাড় দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই”, আলাপ-কে বলেন তিনি।
অন্যদিকে মানবাধিকার কর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরও মনে করেন যারা বল প্রয়োগ করেন, তারা মনে করেন এ ঘটনা পৌঁছে দেবেন সংবাদকর্মীরা। সে জায়গায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বা ভয় দেখিয়ে একটা বার্তা দেওয়া যে আমাদের নিয়ে যেন সমালোচনা না হয়।
তবে ফয়জুল কবির আইনি প্রতিকারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখতে চান। এদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতিও এ ধরনের ঘটনাকে উৎসাহিত করছে।
“এ পর্যন্ত যারাই আক্রান্ত হয়েছে আমরা দেখতে পাইনি এ ধরনের ঘটনায় কাউকে আটক করা কিংবা কোনো বিচার হয়েছে। এমনকি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হত্যার শিকার হয়েছেন। এমন ঘটনার ক্ষেত্রেও আমরা ন্যায়বিচার দেখতে পাইনি।”
তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা প্রসঙ্গে আনিস আলমগীর বলেন, ঘটনাটিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দেখা উচিত নয়। ছাত্রদলের কেউ জড়িত থাকলে তার দায় ব্যক্তির, পুরো সংগঠনের নয়। আবার সাংবাদিকদের কারও আচরণ নিয়ে অভিযোগ থাকলেও সেটি সাংবাদিকের ওপর হামলার বৈধতা তৈরি করে না।