ঢাকায় ‘ভয়ঙ্কর রূপ’ নিচ্ছে ছিনতাই 

রনজিনা পারভীনের মর্মান্তিক মৃত্যু আলোড়ন তুলেছে পুরো দেশে। বগুড়ার গাবতলী উপজেলা থেকে চোখের চিকিৎসা করাতে ঢাকায় আসেন। শনিবার ভোরে ঢাকার গাবতলী বাস কাউন্টার থেকে অটোরিকশায় রওনা দেন ফার্মগেট খামারবাড়ির ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে। পথেই সংসদ ভবন এলাকায় একটি মোটরবাইকে আসা ছিনতাইকারী তার হাতের ব্যাগ টান দেয়। তখনই ভারসাম্য হারিয়ে লুটিয়ে পড়েন রনজিনা পারভীন। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রনজিনা ছিলেন বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। 

রনজিনা হত্যা মামলায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল সন্দেহভাজন ‘প্যারা পনি’-কে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-২। সঙ্গে তার এক সহযোগী আর ছিনতাইয়ের সময় ব্যবহার করা মোটরবাইকও জব্দ করা হয়। 

আরও মৃত্যুর ঘটনা

এই বছরের ২৬এ জুলাই দুপুর। মোহাম্মদপুর থানা এলাকার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান। স্ত্রীকে নিয়ে রিকশায় করে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সি ফজলে রাব্বি সুমন। আচমকা তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়, প্রতিরোধও করেন তিনি। তখনই ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ছিনতাইকারী। সেই আঘাতেই মৃত্যু হয় রাব্বির।

২০২৪ সালের ২৭এ অগাস্ট ভোরে রাজধানীর দারুস সালামে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান জাররাফ আহমেদ। 

একই বছরের ৩রা সেপ্টেম্বর কদমতলীর মেরাজনগরে কাঁচামাল ব্যবসায়ী হাশেমকে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। ১৬ই সেপ্টেম্বর মিটফোর্ড এলাকায় দিনমজুর আলমগীর বেপারি ছিনতাকারীদের হাতে প্রাণ হারান। এছাড়া ২৪ ও ৩০এ সেপ্টেম্বর নিকুঞ্জ আর যাত্রাবাড়ির কুতুবখালি এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারা যান রাসেল শিকদার ও মুক্তাকিম আলিফ নামে আরো দুইজন।  

এমনকি কয়েকদিন আগে ২৯এ অগাস্ট কদমতলীতে এক ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে অপর ছিনতাইকারী নিহতের ঘটনাও ঘটেছে।

অনিরাপদ ঢাকায় বসবাস

চারশো বছরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আজকের ‘মেগা সিটি’ ঢাকা। জীবিকার টানে কোটি মানুষের নগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা। বহু সমস্যার নগরীতে আইনশৃঙ্খলার অবনতিও অন্যতম। 

তবে ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর থেকে নিয়ন্ত্রণহীন আইনশঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগে রাজধানীর অপরাধ ছিলো লাগাম ছাড়া। যার মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো সংবাদের শিরোনাম হয়েছে বারবার। যার ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত আছে। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী, আগারগাঁও, মতিঝিল, রমনা, যাত্রাবাড়ি, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা এলাকার  মানুষ এখনো অনিরাপদ। 

মাহিন নামের এক যুবক জানান, সম্প্রতি দিনের বেলায় বসিলা এলাকায় রিকশা দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরে। ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে তারা লুটে নেয় নগদ টাকা আর মোবাইল ফোন। 

তিনি আরও জানান, প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ এমন ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন মোহাম্মদপুর এলাকায়। 

তাজমহল রোডের একজন বাসিন্দা বলেন, আগের থেকে অবস্থার বেশ কিছুটা উন্নতি হলেও অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী চক্রের আতংক থেকে এখনো মুক্ত হতে পারেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর যতগুলো জায়গায় ছিনতাইয়ের ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে, তার বেশিরভাগ ঘটনায় দেখা গেছে একই ধরনের ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।  

আবার প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যেও উঠে আসে ভয়ঙ্কর সব তথ্য। ঢাকার গণপরিবহনে যাতায়াতকারীরাও বাদ যাচ্ছে না ছিনতাইকারীর কবল থেকে।

বনানীর কাকলী এলাকায় এরকম ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন খোদ দুইজন সংবাদকর্মী। বিভিন্ন সময় আর ভিন্ন ব্যক্তি তারা, তবে ঘটনার স্পট ছিলো ওই কাকলী। এরকম আরো একাধিক ব্যক্তিও ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন একই জায়গায়। 

তাদের সবার একটা মিল পাওয়া গেছে, তা হলো থানায় গেলে ফোন ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে, গ্রহণ করা হয়েছে সাধারণ ডায়েরি। যাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ফোন হারিয়ে গেছে।’ 

আবার নিউমার্কেট থেকে গাবতলী বা টঙ্গী থেকে আব্দুল্লাপুর ও যাত্রাবাড়ি রুটে লোকাল বাসে থাকা যাত্রীদের ফোন, মানিব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে হরহামেশা। যদিও এসব ঘটনায় সবাই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানান না। ছিনতাইয়ের সময় জখম করার ঘটনাও ঘটছে অনেক। 

সন্ধ্যা নামলেই অনেক এলাকায় ছিনতাই আতংক জেঁকে বসেছে সাধারণ মানুষের মনে। আর যেসব রাস্তায় সড়ক বাতি নেই, সেসব জায়াগায় ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীদের অনেক সময় ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেন, “আমাদের টিম পৌঁছাবার খবর আগে থেকে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। যার কারণে স্পটে গিয়ে হাতেনাতে ছিনতাইকারী ধরাটা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।” 

ছিনতাইকারী চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা

পুলিশের এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৯ সালে থেকে ২০২৪ সালের অগাস্ট পর্যন্ত ৪৭ হাজারের বেশি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৪৭৫ এবং ২০২৪ সালের অগাস্ট পর্যন্ত ৫ হাজার ৮৮৩টি ঘটনা মামলা হয়েছে। যার মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন এবং রেঞ্জ এলাকায় সবচেয়ে বেশি ১৫ হাজার ৪১৯টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। অনেক ছিনতাইয়ের অভিযোগ জমা না পড়া ঘটনাগুলো হিসাবের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, আগের তুলনায় ছিনতাইয়ের ঘটনা অনেকটা কমে এসেছে। তালিকা ধরে গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে এসে আবারো একই কাজে জড়াচ্ছে।

অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক আলাপ-কে বলেন, “ছিনতাই বাড়ার একটি বড় কারণ হলো বেকারত্বের সমস্যা। তার ওপর গ্রেপ্তার হওয়ার পর দেখা যায় অল্প সময়ের মধ্যেই তারা জামিনে মুক্ত হয়ে যায়। যার কারণে জামিনে বের হয়ে আবার তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।”