বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে।
সংবিধানের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। পদত্যাগের পর ক্ষমতায় থাকার সময়ের ‘দায়িত্ব পালন’ নিয়েও উঠেছে একাধিক অভিযোগ।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর ইসলামী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও জালিয়াতিসহ একের পর এক অভিযোগ ও তদন্তের তথ্য সামনে আসায় দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে কিনা- তা নিয়ে এখন দুই মেরুতে ভাগ হয়েছে আইনের ধারাভাষ্যকার ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।
অসুস্থতাকে কারণ দেখিয়ে গত ২৪এ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালের ২৪এ এপ্রিল ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি।
আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২০২৮ সালের এপ্রিলে।
কিন্তু চব্বিশের অগাস্টের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন মহল থেকে মো. সাহাবুদ্দিনকে সরানোর দাবি ওঠে।
ওই সময় দায়িত্বে থাকাবস্থাতেই মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের নির্দেশ দেন।
উচ্চ আদালতের নির্দেশে ইসলামী ব্যাংক পিএলসির দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গোয়েন্দা ইউনিট। ওই তদন্ত প্রতিবেদনেও মো. সাহাবুদ্দিনের নাম আসে।
সবশেষ গত ২৯এ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিনের নামে আরও একটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে। তবে শুধু একটি অভিযোগেই তার পরিচয় সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর এসব অভিযোগ ওঠার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- দায়িত্ব পালনের সময় একজন রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কি অভিযোগ তোলা যায়?
মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে যত মামলা ও অভিযোগ
ব্যাংক কোম্পানিজ আইন অনুসরণ না করে ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতে এস আলম (সাইফুল আলম) সংশ্লিষ্ট ২৪ কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার ধারণের বৈধতা নিয়ে গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকটির পক্ষে তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ মনিরুল মওলা হাইকোর্ট রিট করেন।
এস আলম সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত ২৪ শেয়ারহোল্ডার কোম্পানি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ব্যাংকটিতে শেয়ারের পরিমাণ ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ বলে রিটে উল্লেখ করা হয়।
পরে হাইকোর্ট এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বাংলাদেশ ফাইন্যানসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) নির্দেশ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক) তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত।
বিএফআইইউ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকের ৮০ হাজার কোটি টাকার শেয়ার কেলেঙ্কারিতে সরাসরি জড়িত ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও তার কোম্পানি জেএমসি বিল্ডার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে জেএমসি বিল্ডার্সের মনোনীত পরিচালক হন মো. সাহাবুদ্দিন। পরে ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ২০২৩ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে বহাল ছিলেন এবং এই সময়কালের মধ্যে ইসলামী ব্যাংক থেকে ২৪টি কোম্পানি মিলে ৮০ হাজার কোটি টাকা লোন নেয়। ২৪টি কোম্পানির একটি হলো মো. সাহাবুদ্দিনের জেএমসি বিল্ডার্স। ওই টাকা এখনও ইসলামী ব্যাংককে পরিশোধ করা হয়নি।
গত বছরের ৪ঠা সেপ্টেম্বর ঢাকা সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনসহ ২০ জনকে আসামি করে মামলা করেন ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সিনিয়র কর্মকর্তা মো. আবদুচ ছামাদ। দুর্নীতি, প্রতারণা ও অবৈধ প্রভাব খাটানোর অভিযোগে দায়ের হওয়া ওই মামলায় মো. সাহাবুদ্দিনের পরিচয় ইসলামি ব্যাংকের পরিচালক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের এই মামলা ছাড়াও আরো অভিযোগ জমা পড়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে। এর মধ্যে একটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে।
গত ২৬এ জুলাই বাংলাদেশ আজাদি পার্টি ও রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম নামের দুটি সংগঠন পৃথকভাবে দুটি অভিযোগ করে।
আজাদি পার্টির আহ্বায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. হাসিনুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ৫ই অগাস্ট পর্যন্ত এতো লোককে হত্যা করা হয়েছে, গুম করা হয়েছে; কোনো দিন প্রতিবাদ করেননি সাবেক রাষ্ট্রপতি।
সবশেষ গত ২৯এ জুলাই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও এস আলমসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ‘সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড’ নামের একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানের ঋণসীমা জালিয়াতির মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। পরে ওই ঋণের অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়।
মো. সাহাবুদ্দিন কি বিচারের মুখোমুখি হবেন
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময়েই মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা ও অভিযোগের তদন্ত এবং বিচার হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সংবিধানে কী বলা হয়েছে?
গত ২৬এ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এনসিপি ও অন্যরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছে। সেটা করতে পারে। কিন্তু আমরা আমলে নেওয়ার মতো কোনো বক্তব্য সেখানে দেখি না।
“রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে স্বৈরাচারের শেষ দিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা এবং বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের সময়ে তিনি বিধিবিধান ও সংবিধান অনুসারে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। ফৌজদারি অপরাধ বা অন্য বিষয়ে আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না,” বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক গণমাধ্যমকে বলেন, দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে এ ধরনের মামলা গ্রহণ সংবিধান ও আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তার ভাষায়, আদালত কীভাবে এমন মামলা আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিলেন, সেটি বড় প্রশ্ন।
ড. শাহদীন মালিক সংবিধানের ৫১(২) অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, রাষ্ট্রপতির কার্যভার চলাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের বা চালু রাখা যায় না। একইসঙ্গে তার গ্রেপ্তার বা কারাবাসের জন্যও কোনো আদালত থেকে পরোয়ানা জারি করা যায় না।
তিনি বলেন, কে এ ধরনের মামলা করলেন, কোন আইনজীবী তা পরিচালনা করলেন এবং কোন বিচারক এটি গ্রহণ করলেন-এসব বিষয়ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তবে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের পর তার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু।
তিনি আলাপ-কে বলেন, “রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন জোরপূর্বক বা ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় বা অর্থ হাতিয়ে নেওয়াসহ অন্যান্য অভিযোগ আসলেও মামলা করা যাবে না। কারণ, সংবিধানে তাকে ওই সময়ের জন্য দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।”
“কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর ওই সময়ের অভিযোগে মামলা করতে আইনি বাধা নেই,” বলেন এই আইনজীবী।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, পদে থাকার সময় রাষ্ট্রপতি আইনের মুখোমুখি হবেন না। কিন্তু তার আগে-পরে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে সেগুলোর জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
গত ২৮এ জুলাই সচিবালয়ে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে কি না, এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি হন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
জবাবে তিনি বলেন, “দায়মুক্তির ব্যাপারটি নিয়ে একটু বিভ্রান্তি আছে। বাংলাদেশের একজন মানুষ (রাষ্ট্রপতি) তার পদে থাকার সময়ে কোনো আইনের মুখোমুখি হবেন না। তিনি যখন পদে নেই। সেটা আগে-পরে যদি কোনো রকম মিসকন্ডাক্ট, সেটি এই রাষ্ট্রপতির (সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন) কথা বলছি না, যেকোনো রাষ্ট্রপতি...সেগুলোর জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।”