জুলাই পদযাত্রার পর সোমবার রাত ৯টা ৪২ মিনিটে সাভারের তারাপুর ঈদগাহ মাঠ এলাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশ চলছিলো।
বক্তব্য দিচ্ছিলেন দলটির ঢাকা জেলা কমিটির আহ্বায়ক নাবিলা তাসনিদ। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে।
মঞ্চে সেসময় ছিলেন এনসিপি আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা নাহিদ ইসলাম, এনসিপি সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম।
প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার বাদী এনসিপি ঢাকা জেলা উত্তর শাখার সদস্য সচিব মো. সালামত উল্লাহ রনি এভাবেই আলাপ-কে ঘটনা বর্ণনা করেন।
রনির দাবি মঞ্চের খুব কাছেই বিস্ফোরণ হয়। এনসিপি নেতাকর্মী-সমর্থক এবং মঞ্চের সামনে থাকা লোকজন আতংকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। আহত হন পাঁচ জন।
আহতরা হলেন, এনসিপি কর্মী মো. শাহীন খান্দকার, মো. জসিম ও মো. শাহাদাত হোসেন এবং ডিবিসি নিউজের ক্যামেরাপারসন মো. মজনু ও এনপিবি নিউজের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মো. সাইফুল ইসলাম।
ঘটনার পর রাতেই সাভার মডেল থানায় মামলা করেন রনি। যাতে আজহারুল ইসলাম তামিম ও ইউনুস আলী নামে আরও দু’জনকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিস্ফোরণে আহত শাহীন খন্দকার বলেন, “বক্তব্য শুনছিলাম। হঠাৎ করেই বিকট আওয়াজ। কে যেন বোমা মারছে। বোমা মারার পরে ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায় এলাকা।
“কোনো রকমে বের হয়ে দেখি আমার পা রক্তাক্ত। আমাকে উদ্ধার করে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।”
ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী সাভার প্রেস ক্লাবের সভাপতি নাজমুল হুদা বলেন, “নাবিলা তাসনিদ যখন বক্তব্য রাখছিলেন ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে যায়। বিকট শব্দে কোনো কিছুর বিস্ফোরণ ঘটে।”
সমাবেশ শুরুর ঠিক আগে আগে এবং নাবিলা তাসনিদের বক্তব্যের সময় দু’দফায় অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ চলে যায় বলে জানান নাজমুল।
বিস্ফোরণের ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সাভার পুলিশের পরিদর্শক নূর মোহাম্মদ জানান, আনন্দপুর এলাকা থেকে মো. সজীব ও নুরুল ইসলাম নামে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
“তারা ছাত্রলীগ কর্মী। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হবে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. আসাদুল্লাহ রিপন জানান, হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন চারজন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর একজন চলে গেছেন। চিকিৎসা চলছে তিনজনের। তারা হলেন শাহীন, জসিম ও শাহাদাত।
তদন্ত কমিটি
ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন।
“সমাবেশে বিস্ফোরণের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর সার্কেল) জাহাঙ্গীর আলম, সার্কেল এসপি রাকিবুল ইসলাম ইশান ও সাভার মডেল থানার ইন্সপেক্টর নূর মোহাম্মদ।
সমাবেশ চলাকালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে এনসিপি নেতারা যে অভিযোগ করেছেন। সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন।
তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন
মঙ্গলবার সকালে তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে বিস্ফোরকের আলামত বলতে তেমন কিছুই সংগ্রহ করতে পারেননি তারা। ঘটনার পর সোমবার রাতে ও মঙ্গলবার সকালে বৃষ্টি হওয়ায় আলামত মিলছে না বলে জানান এক কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, আহতদের রক্তাক্ত পোশাক, স্যান্ডেল সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব পরীক্ষা করলেই বিস্ফোরকের ধরন জানা যাবে।
এর আগে সোমবার রাতে পুলিশ জানায়, বালু মেশানো একটি জর্দার কৌটা উদ্ধার হয়েছে।
‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হামলা’
বিস্ফোরণের ঘটনায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করেননি তিনি।
ঘটনার পর সাভার মডেল থানা চত্বরে সাংবাদিকদের বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঘটা মানেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা। আমরা মনে করছি, এটার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে।“
পুলিশকে যদি দলীয়করণ করা হয়, পুলিশ এই ধরনের ঘটনায় তাদের রক্ষা করতে পারবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কারণ পুলিশ রাজনৈতিক নির্দেশে তখন কাজটা করবে। এখন পুলিশ যদি আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারে, তাহলে বুঝবো নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে।”
সমাবেশের শুরুতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া বিষয়টি উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “কেন বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল? স্পষ্ট যে আজকে আমাদেরকে খুন করার পরিকল্পনায় এখানে বোমা বিস্ফোরণ করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।“
ঢাকায় এনসিপি’র প্রতিবাদ
সাভারে এনসিপির পদযাত্রায় বোমা হামলার প্রতিবাদে এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা সোমবার মধ্যরাতে মশাল মিছিল করে। রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে মশাল মিছিল শুরু হয়।
শাহবাগে মশাল মিছিল শেষে এনসিপি নেতৃবৃন্দ জুলাই স্মৃতি স্তম্ভের পাদদেশে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। বক্তব্য দেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৬ই জুলাই থেকে ‘গণভোট বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান ও সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে জুলাই পদযাত্রা ২০২৬’ নামে ৩৬ দিনের কর্মসূচির ঘোষণা করেছে এনসিপি।
গাজীপুরে কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ এলাকা থেকে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম।
নাহিদ ইসলামসহ কেন্দ্রীয় নেতারা গাজীপুরের কালীগঞ্জে অনুষ্ঠান শেষ করে রাত ৯টার দিকে সাভারে যান। তারা নেতাকর্মীদের নিয়ে পদযাত্রায় অংশ নেন।
নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে পৌঁছানোর মুহূর্তেই সেখানে বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর নাবিলা তাসনিদের বক্তব্যের সময় যখন বিস্ফোরণ ঘটে তখনও আরেক দফা বিদ্যুৎ চলে যায়।