লিমন-বৃষ্টি হত্যা ও ফ্লোরিডায় ম্যাস শুটিং: ওপেন এআই ও স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা

আমেরিকার একই রাজ্যে তিনটি হত্যাকাণ্ড, সবগুলোতেই উঠে এসেছে ওপেন এআই ও চ্যাটজিপিটির নাম।

এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে চ্যাটজিপিটির ডিজাইন ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ওপেন এআই ও কম্পানিটির সিইও স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সরকার।

ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমায়ারের ওই মামলায় অভিযোগের তালিকায় আছে - শিশুদের আসক্ত করার মতো ডিজাইন ব্যবহার, ম্যাস শুটারদের সাহায্য করা এবং চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করা। 

ওপেন এআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে ‘ইচ্ছাকৃত বেপরোয়া আচরণ’ এবং ‘মানবজীবনের প্রতি ঝুঁকি নিয়ে চরম উদাসীনতা’-র অভিযোগ আনা হয়েছে।    

এই অভিযোগে দু’টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষদিকে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির হত্যাকাণ্ড।

জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডায় পিএইচডি করছিলেন। তাদের দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। উচ্চশিক্ষা শেষ করে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি বিয়ের পিঁড়িতে বসার স্বপ্ন দেখছিলেন দু’জন।

১৬ই এপ্রিল কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নিখোঁজ হয়ে যান তারা। কয়েকদিনের ব্যবধানে লিমন ও বৃষ্টির দেহাবশেষ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন হন লিমনের রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহ।

আদালতের নথি অনুযায়ী, হত্যাকারী হিশাম আবুগারবিয়েহ তার অপরাধ পরিকল্পনা করার সময় চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “একজন মানুষকে ময়লার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হতে পারে?”

চ্যাটজিপিটি উত্তর দিয়েছিলো, “এটি বিপজ্জনক শোনাচ্ছে।”

অভিযোগে উঠে আসা আরেকটি ঘটনা হলো ম্যাস শুটিং। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ফিনিক্স ইকনার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গুলি করে ২ জনকে হত্যা ও ৬ জনকে আহত করেন। 

ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমায়ার বলেন, “এই নৃশংস অপরাধ ঘটানোর আগে শুটারকে উল্লেখযোগ্য উপদেশ দিয়েছে চ্যাটজিপিটি।”

বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চ্যাটজিপিটির মুখপাত্র মন্তব্য করেছেন, “চ্যাটজিপিটি কোনো বেআইনি কিংবা ক্ষতিকর কাজ করতে উৎসাহ দেয়নি।”

আরেকটি ঘটনাও আলোচনায় এসেছে, যা কানাডায় ঘটেছিলো ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের টাম্বলার রিজে ১৮ বছর বয়সী এক যুবক গুলি করে ৮ জনকে হত্যা এবং প্রায় ৩০ জনকে আহত করে। 

বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনায়ও হত্যাকারী চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছিলেন এবং বিভিন্ন উদ্বেগজনক প্রশ্ন করায় তার অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলো চ্যাটজিপিটি। 

এই ঘটনা নিয়ে স্যাম অল্টম্যান ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।

নিহতদের পরিবারের সদস্যরা একাধিক মামলা করেছিলেন ওপেন এআই এর বিরুদ্ধে।

তিনটি ঘটনার ক্ষেত্রেই চ্যাটজিপিটিকে ব্যবহারকারীরা উদ্বেগজনক প্রশ্ন করার পরও কেন কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়নি, সেই প্রশ্ন উঠে এসেছে। 

“স্যাম অল্টম্যান ও চ্যাটজিপিটি আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার চেয়ে এআই রেইসকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তারা জননিরাপত্তার ওপর মুনাফাকে গুরুত্ব দিয়েছে। ফ্লোরিডায় আমরা এটি সহ্য করবো না। আমরা তাদের জবাবদিহিতায় আনবো,” বলে মন্তব্য করেছেন  অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমায়ার।

একই মামলায় অন্যান্য অভিযোগও উঠে এসেছে ওপেন এআই এর বিরুদ্ধে। এর মধ্যে আছে, প্রতারনামূলক এবং অন্যায্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম, প্রডাক্ট লায়েবিলিটি আইন ভঙ্গ করা, প্রতারণামূলক ও মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন এবং জনপরিসরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি।

ওপেন এআই এর এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, “সন্তান হারানো একটি পরিবারের জন্য সবচেয়ে কষ্টকর ঘটনা, এবং এই ধরণের বেদনাকে সম্বোধন করার মতো কোনো শব্দ আমাদের জানা নেই।”

ওপেন এআই কর্তৃপক্ষকে সতর্ক না করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও, অপরাধীদের ব্যবহার অন্যদের জন্য জীবনের ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মানদণ্ড পূরণ করেনি বলেও মন্তব্য করেছে তারা।

ফ্লোরিডায়-দুই-বাংলাদেশির-মৃত্যু-নিয়ে-যা-জানা-যাচ্ছে.jpg

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মামলার আগে কম্পানিটির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা উঠে এসেছে। অভিযোগ করা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি আত্মহত্যার ইচ্ছা পোষণ করা ব্যক্তিদের জন্য ‘সুইসাইড কোচ’ হিসেবে কাজ করেছে। 

আত্মহত্যাকারীদের পরিবারের সদস্যরাও এসব ঘটনার জেড় ধরে ওপেন এয়াই এর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার কম্পানিগুলো ছাড়াও মামলা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া কম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও। 

২০২৬ সালের মার্চ মাসে ইচ্ছাকৃতভাবে আসক্তিমূলক ডিজাইন ব্যবহারের অভিযোগে গুগল ও মেটার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়, এবং এই মামলায় কম্পানিগুলো দোষী প্রমাণিত হয়।