গত কয়েকদিনে পত্রিকার পাতা, সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইন আর চায়ের দোকান, সবখানেই শিশু ধর্ষণের খবরে সয়লাব।
প্রতিবেশী, নিকটাত্মীয়, সহকর্মী, শিক্ষক, এমনকি পিতার বিরুদ্ধেও উঠছে যৌন হয়রানির অভিযোগ। কোথায় নিরাপদ শিশুরা?
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৪ মাসে ১০৯টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে আরও ৩৪ জনের সাথে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১১ জন শিশুকে। এমনকি ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়েও একজনকে হত্যা করা হয়। ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে ২ জন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্ষণের যে ঘটনাগুলো সামনে আসছে, সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে মনে করেন না লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ। একে তিনি বলছেন ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’।
তিনি বলছেন, পলিটিক্যাল ইকনমির লুণ্ঠনতন্ত্র, ধর্মীয় শিক্ষার সংকট এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সব মিলিয়ে সমাজে একটা ‘ম্যাসিভ সর্বগ্রাসী ডিসঅর্ডার’ তৈরি হয়েছে।
লেখক ও মানবাধিকারকর্মী নিশাত সুলতানা বলছেন, “শিশুদের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার হয়ে ওঠেনি সমাজে। যতোদিন একজন শিশু সবার শিশু না হয়ে উঠবে, মগজে মননে যতোদিন শিশুরা নিরাপদ না হবে, ততোদিন সমাজের এই ব্যাধি সারবে না।”
গত এক সপ্তাহেই ঢাকাসহ সারা দেশে বেশ কয়েকটি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সপ্তাহের শেষ দিকে প্রতিদিনই গণমাধ্যমে একাধিক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার খবর প্রকাশ হয়েছে।
কিছু ঘটনায় চোখ বোলানে যাক।
কন্যা ধর্ষণের অভিযোগে পিতা গ্রেপ্তার
সিলেটের জৈন্তাপুরে ১১ বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে তার পিতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২০এ মে, বুধবার জৈন্তাপুর মডেল থানায় ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা করেছে শিশুটির মা।
অভিযুক্তের নাম আকবর হোসেন। মামলা করার পর, ওইদিনই ঘিলাতৈল এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার এজাহারে বলছে, মায়ের অনুপস্থিতিতে গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শিশুটিকে ধর্ষণ করে তার বাবা। তারপর ১৯এ মে আবারও নিজ বাড়িতে মেয়েকে ধর্ষণ করে আকবর হোসেন।
শিশুটি তার মাকে ঘটনা জানালে স্বজনদের সাহায্য নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দেন।
ভুক্তভোগী শিশুটিকে চিকিৎসার জন্য ওসমানী হাসপাতালের ওয়ান স্টপ সেন্টারে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক।
ধর্ষণ-হত্যার দুই মাস পর আসামি গ্রেপ্তার
দেশের আরেক প্রান্তে চট্টগ্রামে ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার দুই মাস পর আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আসামি ১৯ বছর বয়সী ফয়সাল পেশায় দিনমজুর।
ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিলো চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে। গণমাধ্যমের খবর বলছে, গত মার্চে ওই শিশুকে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে ফয়সাল। পরে পালিয়ে যায়।
বুধবার রাতে নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে নেওয়া হলে আসামি ফয়সাল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গত ২৪এ মার্চ শিশুটি নিখোঁজ হয়। তার দুই দিন পর ২৬এ মার্চ শিশুটির বাড়ির পাশের তুলার গুদাম থেকে দুর্গন্ধ এলে খোঁজ নিতে যায় আশেপাশের লোকজন। সেখান থেকেই মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ফয়সাল শিশুটিকে নিয়ে তুলার গুদামে ঢোকে। কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার সময় শিশুটি তার সাথে ছিল না।
জবানবন্দিতে ফয়সাল জানিয়েছে ধর্ষণের পর ফয়সাল ও তার আরেক সহযোগী মিলে হত্যা করে ১১ বছর বয়সী শিশুটিকে। আরেক আসামিকে ধরার জন্য অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
২৬এ মার্চ মরদেহ পাওয়ার পর ফয়সালকে আসামি করে হাটহাজারী থানায় মামলা করেন ওই শিশুর মা। মা স্থানীয় একটি কারখানার শ্রমিক। বাবা প্রতিবন্ধী। অভিযুক্ত ফয়সাল তাদের সাথে একই কলোনীতে থাকতেন।
মাদ্রাসা ছাত্রের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
গত মঙ্গলবার, ১৯এ মে, ঢাকার বনশ্রীর এক মাদ্রাসা থেকে ১০ বছর বয়সী ছাত্রের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, সুরতহাল প্রতিবেদনে শিশুটির শরীরে অস্বাভাবিক যৌনাচার বা বলাৎকারের আলামত পাওয়া গেছে।
ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত শিহাব হোসেন। ১৯ বছর বয়সী শিহাব একই মাদ্রাসার ছাত্র।
বুধবার পাবনায় তার বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা জানায়, শিহাবের বিরুদ্ধে আগে আরও ৪ জন ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগ আছে। ১৯এ মে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ থানায় শিহাবের বিরুদ্ধে মামলা করে।
পরে শিশুটির মা রামপুরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং আত্মহত্যার প্ররোচনার ধারায় শিহাব হোসেনসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে আরেকটি মামলা করে।
রামিসা হত্যাকাণ্ড
মঙ্গলবার প্রতিবেশীর বিকৃত লালসার শিকার হয়ে মারা যায় ৮ বছর বয়সী রামিসা। ঢাকার পল্লবীতে নিজ বাসার পাশের ফ্ল্যাটেই ধর্ষণের পর খুন হয় শিশুটি।
অভিযুক্ত সোহেল রানা পালাতে সাহায্য করে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। সেই ফ্ল্যাট থেকে রামিসার খন্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
বাসা থেকেই স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জবানবন্দিতে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে সোহেল রানা।
চট্টগ্রামে ৪ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ
বৃহস্পতিবার, ২১এ মে চট্টগ্রামে ৪ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের খবর এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানায় দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা ওই ভবনটি ঘেরাও করে।
অভিযুক্ত মনিরকে আটক করে পুলিশ থানায় নিতে গেলে সাধারন মানুষ আসামিকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। শত শত এলাকাবাসী পুলিশকে ঘেরাও করে।
এক পর্যায়ে স্থানীয়রা পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে ও লাঠিচার্জ করে।
গাইবান্ধায় ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
গাইবান্ধার সদর উপজেলায় তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে।
লিচুর কথা বলে বাগানে নিয়ে ওই শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ঐ যুবক। বাগানের পাশেই শিশুটির দাদা কাজ করছিল। তার চিৎকার শুনে ছুটে আসে দাদা। ওই যুবককে ধরতে গেলে সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
পরে স্থানীয়রা ধরে তাকে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে গ্রাম পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়। পরে সদর থানা পুলিশ এসে একটি ফাঁকা কাগজে মুচলেকা নিয়ে অভিযুক্তকে ছেড়ে দেন।
গলদ কোথায়
মাদ্রাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশু নির্যাতন বা যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলোকে ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে মনে করেন আলতাফ পারভেজ। তিনি বলেন, “এগুলা ট্যাবু, এগুলা প্রকাশিত হোক এটা তারা চায় না। ধামাচাপা দিতে দিতে এগুলা একটা মহামারি আকার নিয়েছে।”
“ধর্ষণের চেষ্টাও একটা গুরুতর অপরাধ। আমাদের পুলিশ বাহিনীর প্রশিক্ষণ, অ্যাপ্রোচ এগুলোতে গুরুতর সমস্যা রয়ে গেছে। এটা সামগ্রিক বিচারহীনতার ব্যাপার।”
সমাজের চরম ভোগবাদী মানসিকতাকে এমন ঘটনা ঘটার প্রথম কারণ বলছেন এই সমাজ বিশ্লেষক।
তিনি বলেন, “এখানে নৈতিকতা রেগুলেশান এগুলোর কোনো বালাই নেই। ধরে নেওয়া হয়েছে যে, সবকিছুই ভোগের উপযোগী, মোরালিটি বলে কিছু নাই। …সবকিছুই আমি পেতে পারি, সবকিছুই লুটযোগ্য, সবকিছুই ভোগযোগ্য।”
লেখক ও মানবাধিকারকর্মী নিশাত সুলতানা বলছেন, “আইনের প্রয়োগ না হওয়া যেমন এসব ঘটনা বন্ধ না হওয়ার একটি কারণ, তার ওপর সমাজের সব শ্রেণির মগজেই আছে ব্যাধি।”
“আইন ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখার জিনিস নয়, এই ভাবনা রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোকে মনে রাখতে হবে”, যোগ করেন নিশাত সুলতানা।
ধর্মীয় শিক্ষার সংকটকে অন্যতম কারণ বলে মনেন করেন আলতাফ পারভেজ। বলছেন, “আমাদের সমাজে ধর্মীয় শিক্ষার আদলে নারীদের ‘সেকেন্ড ক্লাস, এমনকি ক্লাসলেস’ হিসাবে গণ্য করা হয়। তাকে যেকোনো ভাবে ব্যবহার করা যাবে, শুধু পুরুষের ভোগের জন্য তার জন্ম।”
তিনি মনে করেন এটাই সমাজের ‘রুলিং আইডিওলজি’। সবকিছু মিলে সমাজে একটা “কালেক্টিভ পারভার্সন” বিরাজ করছে।
পরিত্রাণের উপায় আছে?
ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ নির্মূলে সবার আগে আইনের কঠোর ও কঠিন প্রয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী নিশাত সুলতানা। তিনি বলেন, “এই ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও অনমনীয় নৈতিক অবস্থান খুব জরুরি। ধর্ষকের কোনো পরিচয়ই আইনের প্রয়োগে কোনো ফারাক তৈরি করবে না এমন নিশ্চয়তা দিতে হবে রাষ্ট্রকে।”
তবে শুধু আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করছেন না গবেষক আলতাফ পারভেজ। সমাজে যদি এত বড় আকারে ‘পারভার্সন’ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা ঠেকাতে পুলিশ বা আইন কতটা কার্যকরী হবে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তিনি।
তিনি বলছেন, “এমন কিছু ঘটলেই সরকারকে দোষারোপ করা হয়, এটা ঠিক যে সরকার তো মূল রেসপন্সিবল অবশ্যই, কিন্তু সমাজের যে শক্তি, সোশ্যাল ক্যাপিটাল যে নাই হয়ে গেছে, কেউ সেটা অ্যাড্রেস করছে না।”
এ ধরনের কোনো ঘটনাকে সবাই নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে চায় বলেও মনে করেন তিনি। বলেন, “তখন রাজনীতিবিদ, মিডিয়া, আইনজীবী সবাই পপুলিস্ট হয়ে যায়। এটা যে চরম একটা বেদনাদায়ক ঘটনা, তা না, সবাই ফায়দা নেওয়ার কথা ভাবতে থাকে। এটা সেন্ট্রাল পারভার্সনের আরেকটা এক্সটেনশান।”