রামিসা হত্যার বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে মিরপুর ও পল্লবী এলাকা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ চলেছে রাতভর। শুক্রবার বিকেলেও ‘এলাকাবাসী’র ব্যানারে শত শত মানুষ মিরপুর গোল চত্বরে অবস্থান নেন।
বেলা সোয়া দুইটা থেকে শিশুটির বাসার কাছে মানববন্ধনের আয়োজন করে বি–১১ সমাজকল্যাণ যুব সংগঠন ও শিশুটি যে স্কুলে পড়াশোনা করত সেই স্কুলের শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে জুমার নামাজের পর একটি বিক্ষোভ মিছিল মিরপুর থেকে বেরিয়ে শিশুটির বাসার সামনে গিয়ে শেষ হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভাকারীদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
এর আগে বৃহস্পতিবারও রাতভর থমথমে ছিল মিরপুর-পল্লবী এলাকা। সকাল থেকে পল্লবী থানা, রামিসার বাসার আশপাশ এবং স্কুল এলাকায় দফায় দফায় বিক্ষোভ করেন সহপাঠী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী।
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কালশী রোডে। হাজার হাজার মানুষ সড়ক অবরোধ করে। তাদরে সবার একটাই দাবি, রামিসা হত্যাকাণ্ডের বিচার।
তাদের হাতে তখন ব্যানার, দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে স্লোগানে যেন কাঁপছিল চারপাশ। মানুসের চাপে দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, পুরো এলাকায় তৈরি হয় উত্তেজনা।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই রাতে রামিসার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পল্লবীর বাসায় যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গাড়ি থেকে নামার পর থেকেই বিক্ষোভকারীরা তাকে ঘিরে তীর্যক মন্তব্য করতে থাকেন। ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন।
এর মধ্যেই রামিসার বাসায় যান প্রধানমন্ত্রীসহ ও অন্যান্য মন্ত্রীরা। তার পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি রামিসার বড় বোনের পড়াশোনাসহ ভবিষ্যৎ দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেন এবং দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয় সরকার।
যে শ্রেণিকক্ষে রামিসার বসার কথা ছিল, সেখানে এখন পড়ে আছে শুধু একটি খালি বেঞ্চ। সেই বেঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন বাবা। কান্নায় ভেঙে পড়ে সহপাঠীরাও। সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় বৃহস্পতিবার দিনভর শোক, ক্ষোভ আর প্রতিবাদে উত্তাল ছিল পল্লবীসহ সারা দেশ।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রামিসার স্কুল, পল্লবী থানা এবং কালশী সড়ক ঘিরে বিক্ষোভে নামেন সহপাঠী, এলাকাবাসী ও সাধারণ মানুষ। সন্ধ্যায় কালশী রোড অবরোধ করে দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান বিক্ষুব্ধ জনতা।
রাতে রামিসার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পল্লবীর বাসায় যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; বড় বোন রাইসার পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেয় সরকার।
ঢাকার পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে সারাদেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ, সবখানেই একই দাবি।
মূল অভিযুক্ত সোহেল রানার দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার দিনভর বিক্ষোভ করেছেন রামিসার সহপাঠী, এলাকাবাসী ও সাধারণ মানুষ।
রামিসা ছিল মিরপুরের পপুলার মডেল স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। বৃহস্পতিবার সকালে মেয়ের স্মৃতিবিজড়িত শ্রেণিকক্ষে যান তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা। সেখানে রামিসার বসার খালি বেঞ্চটি দেখে তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি।
ক্লাসরুমে থাকা রামিসার সহপাঠীদের জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকেন এই শোকাহত বাবা। বাবার বুকফাটা কান্না দেখে ক্লাসের ছোট ছোট শিশুরাও কান্নায় ভেঙে পড়ে। পুরো শ্রেণিকক্ষে তৈরি হয় হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
অশ্রুসজল চোখে রামিসার সহপাঠীরা বলে, “আমরা রামিসাকে কোনোদিন ভুলব না। আমরা ওর খুনিদের ফাঁসি চাই।”
কালশী অবরোধ, দ্রুত ফাঁসির দাবি
পৈশাচিক এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই পল্লবীতে বিক্ষোভ শুরু হয়। রামিসার সহপাঠী ও এলাকাবাসী প্রথমে তার বাসার সামনে জড়ো হন। পরে তারা পল্লবী থানার সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ভাষ্য, এমন নৃশংস অপরাধের বিচার বিলম্বিত হলে সমাজে আরও ভয়াবহ বার্তা যাবে।
সকালে পল্লবী থানার সামনে বিক্ষোভ করেন রামিসার সহপাঠী ও এলাকাবাসী। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা থানার ভেতরেও ঢুকে পড়েন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়।
সন্ধ্যায় বিক্ষোভ আরও বড় আকার নেয়। শত শত মানুষ কালশী রোডে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রামিসা হত্যার বিচার দাবিতে শুধু রাজধানী নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দিনভর ক্ষোভ প্রকাশ করেন বহু মানুষ।
পরিবারের পাশে প্রধানমন্ত্রী
রাতে রামিসার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পল্লবীর বাসায় যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি রামিসার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন শোকে কাতর বাবা-মা।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, এ সময় রামিসার বাবা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, “আমরা এখানে নোংরা পরিবেশে আছি বলে আমার মেয়েকে হারিয়েছি। আমরা একটা ভালো পরিবেশে থেকে আমার বড় মেয়েটাকে নিয়ে বাস করতে চাই।”
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ঠিক আছে। আপনাদের একটা ভালো পরিবেশে থাকার বিষয়টি আমি দেখব।”
‘ও আমার সঙ্গে নামাজ পড়তে পছন্দ করত’
রামিসার বাবার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কথোপকথনে উঠে আসে এক শোকাহত পিতার বুকফাটা আর্তনাদ।
আবদুল হান্নান মোল্লা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, “স্যার, আপনি আমার এই ১০ হাজার টাকার ছোট ফ্ল্যাটে পা রাখবেন, এটা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। আমার ৫৫ বছর বয়স হয়েছে, অনেক মানুষ দেখেছি। কিন্তু আপনার মতো মানুষ, যে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে নিয়ম মেনে চলে, তাকে চেনা সহজ। এটা আমার সৌভাগ্য যে আপনি এসেছেন।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি এখানে এসেছি আপনাদের পাশে দাঁড়াতে। আপনার কষ্টের কথা আমি বুঝতে পারছি। আপনিও একজন মেয়ের বাবা, আমিও একজন মেয়ের বাবা। সন্তানের এই অকাল প্রয়াণের কষ্ট কতটা গভীর, তা আমি অনুভব করতে পারি।”
কাঁদতে কাঁদতে রামিসার বাবা বলেন, “ও আমার সঙ্গে নামাজ পড়তে খুব পছন্দ করত স্যার। আমি দুই ওয়াক্ত নামাজ ওর সঙ্গে বাসায় পড়তাম। আমি ওকে বলেছিলাম, এখন থেকে আর ভ্যানে স্কুলে পাঠাব না, রিকশায় নিয়ে যাব আর নিয়ে আসব। ১০ বছর বয়স থেকে অবহেলা পেতে পেতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি স্যার। আল্লাহ আমার ভাগ্যে কী লিখেছিলেন জানি না।”
প্রধানমন্ত্রী তাকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনাদের এখন শক্ত থাকতে হবে। আল্লাহ যা করেছেন তাতে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে এই অন্যায়ের সঙ্গে যে জড়িত, তার বিচারের ব্যবস্থা আমরা সবার আগে করতে চাই। ইনশাআল্লাহ, খুব শিগগিরই বিচার হবে।”
রামিসার বাবা বলেন, “স্যার, আমি চাই শুধু একটা সুষ্ঠু বিচার হোক।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদালতের বিষয় নিয়ে বেশি কিছু বলা যায় না, তবে দ্রুত চার্জশিট হবে এবং বিচারও হবে। তিনি রামিসার বাবা-মাকে বড় মেয়ে রাইসার দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকার অনুরোধ জানান।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, রামিসার বড় বোন রাইসা আক্তারের লেখাপড়াসহ ভবিষ্যৎ দায়িত্বভার প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন। পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
দ্রুত চার্জশিটের আশা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রামিসার বাসায় গিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও। তিনি পরিবারকে আশ্বস্ত করে বলেন, দ্রুত এই মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে এবং বিচার দ্রুত শেষ করতে সরকার সচেষ্ট থাকবে।
রামিসার বাসা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রবিবার আদালতে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
তিনি জানান, চার্জশিট দেওয়ার আগে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। এ জন্য আদালতের অনুমতি নিয়ে সিআইডি ল্যাবে প্রক্রিয়া চলছে। রোববার দুপুরের মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষা শেষ হলে ওইদিনই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হতে পারে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে বিচারকার্য নিষ্পন্ন হয়, সে চেষ্টা করব। যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, সেজন্য আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা থাকবে।”
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনায় আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পরিবারের প্রধান চাওয়া সুষ্ঠু ন্যায়বিচার, দ্রুততম সময়ের মধ্যে। একই সঙ্গে রামিসার বড় বোন যেন নিরাপদে থাকতে পারে, পড়াশোনা করতে পারে এবং উন্নত জীবন পায়, সে বিষয়ে পরিবার সহায়তা চেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সে ব্যবস্থা করবেন।
গত মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে সাত বছর বয়সী রামিসার মাথা আলাদা করা ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন প্রতিবেশী ভাড়াটিয়া সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পল্লবীসহ সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রামিসার সহপাঠীদের কান্না, বাবার আর্তনাদ, কালশীর অবরোধ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের প্রতিবাদ। সব মিলিয়ে একটাই দাবি সামনে এসেছে: দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি।
এখন সবার চোখ তদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা, চার্জশিট এবং আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার দিকে। রামিসার পরিবার শুধু একটি কথাই বলছে। তারা ন্যায়বিচার চায়।
‘আসামিপক্ষে থাকবে না কোনো আইনজীবী’
শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী মামলা পরিচালনা করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা আইনজীবী সমিতি।
শুক্রবার সকালে নিজের ফেইসবুক পোস্টে এ তথ্য জানান অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম।
তিনি লেখেন, ‘ঢাকা বারের কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা বারের কোনো আইনজীবী রামিসা হত্যা মামলার আসামির পক্ষে মামলা পরিচালনা করবেন না।’