মাত্র সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা। পড়তো ঢাকার একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে। বয়সটা কেবলই হাসিমুখে চারপাশ মাতিয়ে রাখার। খাতার পাতায় রঙিন পেন্সিলে স্বপ্ন আঁকার।
তার সামনে হয়তো অপেক্ষা করছিল অপার সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ। বিকৃত মানসিকতার হিংস্র থাবায় মুহূর্তেই নিভে গেল সেই সম্ভাবনাময় জীবনপ্রদীপ।
ঘটনার দিন সকালে রামিসাদের উল্টো দিকের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল ভুলিয়ে ভালিয়ে ফ্ল্যাটে নিয়ে যান তাকে। পুলিশকে দেওয়া সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের ভাষ্যেই তা উঠে এসেছে।
ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা। স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য রামিসাকে খুঁজতে থাকে তার বাবা-মা। ঠিক তখন ওই ফ্ল্যাটের সামনে পড়ে থাকতে দেখা যায় রামিসার ছোট্ট জুতা।
আশা ও শঙ্কা নিয়ে যখন ফ্ল্যাটের দরজায় কড়া নাড়ছিলেন রামিসার মা, ঠিক তখনই রামিসার গলায় ধারালো ছুরি চালাচ্ছিলো সোহেল।
পুলিশের ভাষ্যমতে, খুনের আগে ধর্ষণ করা হয় সাত বছরের রামিসাকে। এতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ছোট্ট রামিসা।
নির্মমতার এখানেই শেষ নয়। লাশ গুম করতে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় রামিসার মাথা, হাত। ক্ষতবিক্ষত করা হয় তার ছোট্ট শরীরের অন্যান্য অংশ।
পুরো সময়ে একই রুমে উপস্থিত ছিলেন স্বপ্না। জানালার গ্রিল কেটে স্বামী সোহেল যেন নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পারে, সেজন্য ভেতর থেকে দরজা আটকে রাখেন তিনি। পালিয়ে যাওয়া নিশ্চিত হওয়ার পরই খোলেন দরজা।
নিরাপদ নয় কোনো শিশু
২০২৫ সালের ৫ই মার্চ বোনের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় আট বছরের আছিয়া। গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি।
ঘটনার পর সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবতা হলো, বছর পার হলেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় ৮ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার খবর আলোড়ন তুলেছিল। মেয়েটি চিৎকারের চেষ্টা করলে চাকু দিয়ে তার গলাকাটার চেষ্টা করেন বাবু শেখ নামে তার এক প্রতিবেশী। শিশুটি শেষ পর্যন্ত মারা যায়। কাটা গলা নিয়েই জঙ্গল থেকে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে এসেছিল শিশুটি।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, শিশুটিকে চকলেট আর বেড়ানোর কথা বলে জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিল প্রতিবেশী বাবু শেখ।
ইউনিসেফের তথ্য বলছে, পৃথিবীতে প্রতি আট জনের একজন নারী ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, শিশুকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত তাদের পরিচিতজন।
সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটস বলছে, বর্তমান সরকারের আমলে এখন পর্যন্ত অন্তত ১১৫ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬ জন শিশুকে। মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ৩০ জন শিশু ধর্ষণ হয়, ২ জনকে হত্যা করা হয়।
এইসব পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিলে শিশুরা যে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপরিসর, কোথাও নিরাপদ নয়, তাই নির্দেশ করে।
গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ রামিসার ঘটনাটিকে বৃহত্তর সামাজিক অসুস্থতার প্রতিফলন হিসাবে দেখছেন।
এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “রামিসার ঘটনা মাতম করার মতো। দীর্ঘস্থায়ীভাবে ঘুম ছুটে যাওয়ার মতো। এতে হত্যাকারীদের বিচার হবে হয়তো। কিন্তু এরকম ঘটনা থামবে কি? মনে হয় না।”
তিনি বলেন, এ রকম নিপীড়ক ও হত্যাকারীদের সম্মিলিত যোগফলই আজকের সমাজ।
তার মতে, এই ঘটনা আমাদের সর্বগ্রাসী দুবৃত্তায়িত এবং মনোজাগতিকভাবে বিকারগ্রস্ত সমাজেরই ভাইরাল হয়ে যাওয়া চেহারা। যাবতীয় বয়ান ও বুলিবাগিশতার আড়ালে এটাই প্রকৃত বাংলাদেশ। এটাই এখানকার যাবতীয় মানবসম্পদের মুখ ও মুখোশ।
আলতাফ পারভেজ বলেন, রামিসার বহু আগেই বাংলাদেশের মাথা ও শরীর ছিন্ন হয়ে আছে। তা নাহলে আরও আগেই বুঝতাম, আমাদের শরীরজুড়ে পচন আর মগজজুড়ে বিকৃতি।
“বয়স্করা কেউ আর বেঁচে নেই সেটা বলার জন্য। আমাদের শিশুরাই বলে যাচ্ছে এই চূড়ান্ত সত্য।”
এপস্টিন ফাইল ও রামিসার মৃত্যু
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার পেছনে যে বিকৃত মনস্তত্ত্ব কাজ করেছে, অপরাধবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের ভাষায় তাকে বলা হয় পেডোফিলিয়া। এটি এমন এক ধরনের 'প্যারাফিলিক ডিজঅর্ডার' বা মানসিক অবস্থা যেখানে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শিশু ও ‘প্রি-পিবিসেন্ট’ বা প্রাক-কিশোরদের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন। এই ধরনের অপরাধ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, সোহেল রামিসাকে হত্যা করার পর তার যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের ওপর এই ধরণের যৌন ও শারীরিক সহিংসতা প্রধান চালিকাশক্তি পেডোফিলিয়া।
আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন পেডোফিলিয়াকে একটি ‘প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শিশু ও প্রি-পিবিসেন্ট’দের প্রতি তীব্র যৌন ফ্যান্টাসিতে ভোগে।
ঘাতক সোহেল যেভাবে যেভাবে মাত্র সাত বছরের রামিসাকে তার স্ত্রীর সহায়তায় ফাঁদে ফেলে ঘরে নিয়ে যায়, তা পেডোফাইলদের সুনির্দিষ্ট ‘গ্রুমিং’ বা শিকার ধরার কৌশলের সাথে মিলে যায়।
'এপস্টিন ফাইল' ও প্রাতিষ্ঠানিক পেডোফিলিয়া নেটওয়ার্ক
শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন এবং পাচারের বিষয়টি যে কতোটা পরিকল্পিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ‘এপস্টিন ফাইল’।
আমেরিকান ধনকুবের জেফরি এপস্টিন একটি আন্তর্জাতিক শিশু পাচার ও যৌন নিপীড়ন চক্র চালাতেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘এপস্টিন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর অধীনে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস এ সংক্রান্ত প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথি, হাজার হাজার ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এক বিবৃতিতে জানান যে, এই ফাইলগুলোতে বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যক্তিদের মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের যৌন দাসত্ব, পাচার এবং শোষণের প্রমাণ আছে।
আদালতের নথি ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই তালিকায় আছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রু, বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, বিল গেটস, লেসলি ওয়েক্সনারের মত বিখ্যাত, ক্ষমতাবান ও ধনী ব্যক্তিদের নাম।
পেডোফিলিয়ার কারণ ও মনস্তত্ত্ব
মনস্তত্ত্ববিদ ও গবেষকরা পেডোফিলিয়ার পেছনে একক কোনো কারণ খুঁজে পাননি। তবে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উৎস থেকে এই ধরনের মানসিকতার কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে তারা।
ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারের গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সমবয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের সাথে সামাজিক বা রোমান্টিক সম্পর্ক তৈরিতে ব্যর্থ হয়।
তারা প্রাপ্তবয়স্কদের সমাজকে ভীতিজনক বা হুমকিস্বরূপ মনে করে। এর বিপরীতে, শিশুরা তাদের কাছে নিরাপদ ও কম হুমকি মনে হয়। তারা শিশুদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, যা তাদের ‘লো সেলফ স্টিম’কে সাময়িকভাবে চাঙ্গা করে।
অনেক অপরাধী নিজেদের এই ঘৃণ্য কাজকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এক ধরণের মিথ্যা যুক্তি তৈরি করে। এই ধরণের বিকৃত চিন্তা তাদের অপরাধবোধকে ধামাচাপা দেয়।
শোক থেকে শিক্ষা: অপরাধ নির্মূলের উপায়
পেডোফিলিয়াকে দ্রুত স্বতন্ত্র ক্যাটাগরি হিসেবে চিহ্নিত করার পরামর্শ দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফাহাম আব্দুস সালাম। বৃহস্পতিবার ফেইসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, এই অপরাধের শাস্তি হতে হবে দ্রুত। লাইভ টেলিকাস্ট করুন।
পেডোফিলিয়ার শাস্তির ক্ষেত্রে দুইটি এলিমেন্ট যুক্ত করারও পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, পিতামাতাকে শাস্তি প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। অর্থাৎ তারা যদি চায় অপরাধী শাস্তি প্রদান প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে।
তিনি লিখেছেন, “জনগণ যেন ইন্দ্রিয় দিয়ে বোঝে যে জাস্টিস হ্যাজ বিন সার্ভড - এই ব্যবস্থা করতে হবে। লাইভ টেলিকাস্ট হতে পারে।”
রামিসা হত্যাকাণ্ড বা এপস্টিন ফাইলের মতো ঘটনা আটকাতে কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ।
পেডোফিলিয়া একটি আজীবন মানসিক ব্যাধি হতে পারে। তাই যাদের মধ্যে শিশুদের প্রতি বিকৃত আকর্ষণ রয়েছে, তারা যেন অপরাধে লিপ্ত হওয়ার আগেই চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং নিতে পারেন, এমন সামাজিক ও চিকিৎসাগত পরিকাঠামো তৈরি করা দরকার।
যদি কেউ অপরাধ করে, তবে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যেন সমাজে অপরাধীদের মনে তীব্র ভীতি তৈরি হয়।
জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ ইনিশিয়েটিভের গাইডলাইন অনুযায়ী, যেকোনো আবাসিক এলাকা, স্কুল বা সংস্থায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড়দের সাথে শিশুদের যোগাযোগের ওপর কড়া নজর রাখতে হবে। মিরপুরের ঘটনায় প্রতিবেশীরা সচেতন থাকলে এবং দুই মাস আগে আসা নতুন ভাড়াটিয়াদের আচরণ লক্ষ্য করলে হয়তো বাঁচানো যেত রামিসাকে।
ওয়াশিংটন স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব চিলড্রেন, ইয়ুথ অ্যান্ড ফ্যামিলিজ বলছে, শিশুদের খুব ছোটবেলা থেকেই 'গুড টাচ' এবং 'ব্যাড টাচ' সম্পর্কে শেখাতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে, তাদের শরীরের ওপর অন্য কারও অধিকার নেই। কোনো চেনা বা অচেনা মানুষ যদি তাদের গোপন স্থানে হাত দিতে চায় বা জোর করে ঘরে নিয়ে যেতে চায়, তবে সাথে সাথে যেন তারা চিৎকার করে বা বাবা-মাকে জানায়।
সচেতন থাকতে হবে অভিভাবকদেরও। সন্তানের সাথে এমন একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে যেন সন্তান যেকোনো ভয় বা অস্বস্তির কথা নির্দ্বিধায় শেয়ার করতে পারে।
শিশুর আচরণের আকস্মিক পরিবর্তন দেখা গেলে অভিভাবকদের অবিলম্বে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেয় শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করা যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা ‘ন্যাশনাল সোস্যাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ক্রুয়েল্টি টু চিলড্রেন’।