ছোট্ট একটি শিশু। এই বয়সে যার চুল বেঁধে স্কুলে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড় করার কথা, ক্লাস শেষে মায়ের কাছে ফিরে গল্প করার কথা, সেই রামিসা আক্তারের জীবন থেমে গেল ভয়াবহ এক নৃশংসতায়।
মঙ্গলবার সকালে ঢাকার পল্লবীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের একটি বাড়িতে ঘটনাটি ঘটে। যে বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা, সেই একই ভবনের পাশের ফ্ল্যাট থেকেই পরে উদ্ধার করা হয় তার খণ্ডিত মরদেহ।
এ ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রামিসা স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ত। বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। মা পারভীন আক্তার।
দুই মেয়ের মধ্যে রামিসা ছিল ছোট। বড় বোন রাইসা স্থানীয় একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। পরিবারটি প্রায় ১৭ বছর ধরে পল্লবীর বাসিন্দা।
কী হয়েছিল সেদিন
মঙ্গলবার সকালটাও ছিল অন্য দিনের মতোই। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোন রাইসার সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল রামিসার। কিন্তু স্কুলে যাওয়ার সময় হঠাৎ রামিসাকে পাওয়া যাচ্ছিল না।
মা পারভীন আক্তার মেয়েকে খুঁজতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর বাসার দরজার বাইরে রামিসার পায়ের এক পাটি জুতা দেখতে পান তিনি। সেই জুতাই যেন প্রথম সন্দেহের দরজা খুলে দেয়।
রামিসার স্বজনরা জানান, জুতা দেখে পাশের ফ্ল্যাটে সন্দেহ হয় রামিসার মায়ের। তিনি দরজায় নক করতে থাকেন। কিন্তু ভেতর থেকে দরজা খোলা হচ্ছিলো না। অনেক সময় ধরে ডাকাডাকি ও ধাক্কাধাক্কির পরও সাড়া না পেয়ে সন্দেহ আরও বাড়ে। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।
পুলিশ জানায়, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে যায়। দরজা খোলার পর পাশের ফ্ল্যাটে পাওয়া যায় সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে। তবে প্রধান সন্দেহভাজন সোহেল রানা তখন জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।
পরে ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, শিশুটিকে হত্যার পর তার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। বিচ্ছিন্ন মাথা পাওয়া যায় শৌচাগারে। শরীরের মূল অংশ পাওয়া যায় খাটের নিচ থেকে। ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামতও সংগ্রহ করে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট।
ঘটনার পর দুপুরের পর পল্লবীর ওই বাড়ির সামনে ভিড় জমে যায়। উৎসুক মানুষ, স্বজন, প্রতিবেশী। সবার চোখে ছিল আতঙ্ক আর অবিশ্বাস।
যে বাড়িতে কিছুক্ষণ আগেও একটি শিশুর স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, সেই বাড়িতেই তখন পুলিশের আলামত সংগ্রহ চলছে। রামিসাদের বাসায় স্বজনদের ভিড়। একটি কক্ষে বাক্রুদ্ধ হয়ে বসে ছিলেন তার মা-বাবা।
যা জানালো পুলিশ
রাত সোয়া ১০টার দিকে পল্লবী থানায় প্রেস ব্রিফিং করে পুলিশ। সেখানে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে খুঁজতে গিয়ে বাসার সামনে এক পাটি জুতা দেখতে পান। এরপর পাশের ফ্ল্যাটে সন্দেহ হলে দরজা ধাক্কাধাক্কি করেন। এক পর্যায়ে দরজা খুললে স্বপ্না আক্তারকে পাওয়া যায়, তবে সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।
নজরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার ও আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে আলামত সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, অপরাধ গোপন করতে এবং মরদেহ সরিয়ে ফেলতে শিশুটির দেহ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে রামিসার মা বিষয়টি টের পেয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। এরপর সোহেল রানা পালিয়ে যায়।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায়ই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বাড়ি নওগাঁর সিংড়ায়। সোহেলের বিরুদ্ধে নাটোর জেলায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আগের একটি মামলার তথ্যও পাওয়া গেছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, সোহেল রানার আচরণ এবং স্ত্রী স্বপ্নার প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, তার বিকৃত মানসিকতা ও বিকৃত যৌনরুচি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে তদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পরই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
গ্রেপ্তার স্বপ্না আক্তারের বক্তব্য নিয়েও কথা বলে পুলিশ। পুলিশের দাবি, স্বপ্না বলেছেন, তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন এবং ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানেন না।
তবে তদন্তে দেখা গেছে, রামিসার মা দরজায় ধাক্কা দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় দরজা না খোলা এবং সোহেল রানাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সহযোগিতা করেছেন বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।
রামিসার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ফরেনসিক প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত ও সিআইডির পরীক্ষার পর হত্যার কারণ, ধরন এবং সম্ভাব্য নির্যাতনের বিষয়ে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
“নিপীড়ক ও হত্যাকারীদের সম্মিলিত যোগফলই সমাজ”
রামিসার হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, সামাজিকভাবেও গভীর আলোড়ন তৈরি করেছে। শিশুর ওপর এমন নৃশংসতার ঘটনায় ক্ষোভ, ভয় ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করছেন অনেকে।
কেউ বিচার দাবি করছেন, কেউ প্রশ্ন তুলছেন সমাজের ভেতরে জমে থাকা বিকৃতি, সহিংসতা ও নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে। এমন প্রেক্ষাপটে গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ ঘটনাটিকে বৃহত্তর সামাজিক অসুস্থতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
গবেষক আলতাফ পারভেজ এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, রামিসার ঘটনা মাতম করার মতো। দীর্ঘস্থায়ীভাবে ঘুম ছুটে যাওয়ার মতো। এতে হত্যাকারীদের বিচার হবে হয়তো। কিন্তু এরকম ঘটনা থামবে কি? মনে হয় না।
তিনি বলেন, এরকম নিপীড়ক ও হত্যাকারীদের সম্মিলিত যোগফলই আজকের সমাজ।
তার মতে, এই ঘটনা আমাদের সর্বগ্রাসী দুবৃত্তায়িত এবং মনোজাগতিকভাবে বিকারগ্রস্ত সমাজেরই ভাইরাল হয়ে যাওয়া চেহারা। যাবতীয় বয়ান ও বুলিবাগিশতার আড়ালে এটাই প্রকৃত বাংলাদেশ। এটাই এখানকার যাবতীয় মানবসম্পদের মুখ ও মুখোশ।
তিনি বলেন, এ অবস্থায় কেউ কেউ পালিয়ে বাঁচবে। বাকিদের একদল সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার হয়েও দিব্যি সহী চেহারা নিয়ে ঘুরবে, শিকার খুঁজবে। দুর্ভাগা অন্যরা মুখ বুজে প্রতিদিন নিপীড়িত ও নির্যাতিত হয়ে বাঁচবে। বাঁচতে না পারলেও বাঁচার অভিনয় করবে।
আলতাফ পারভেজ বলেন, রামিসার বহু আগেই বাংলাদেশের মাথা ও শরীর ছিন্ন হয়ে আছে। তা নাহলে আরও আগেই বুঝতাম, আমাদের শরীরজুড়ে পচন আর মগজজুড়ে বিকৃতি।
“বয়স্করা কেউ আর বেঁচে নেই সেটা বলার জন্য। আমাদের শিশুরাই বলে যাচ্ছে এই চূড়ান্ত সত্য।”