ঢাকার মিরপুরের শাহ আলী মাজারে হামলার ঘটনা শুধু একটি ধর্মীয় স্থানে হামলার খবর নয়। এটি নতুন করে সামনে এনেছে বাংলাদেশে মাজার, সুফি চর্চা, লোকজ ইসলাম ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের জায়গা কতটা নিরাপদ, সেই পুরোনো প্রশ্ন।
বৃহস্পতিবার রাতে যেখানে ভক্তরা জিয়ারত, দোয়া ও আধ্যাত্মিক সমাগমের জন্য যান, সেখানে লাঠিসোঁটা হাতে একদল মানুষের প্রবেশ এবং হামলার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি করেছে।
ঘটনার পর মামলা ও গ্রেপ্তারও হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে গেছে যে, এ ধরনের হামলা কি কেবল ধর্মীয় মতভেদের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে আরও গভীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক হিসাব আছে?
২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে মাজারে হামলার যে তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে, তা শাহ আলী মাজারের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ কমিয়ে দেয়।
কারণ একের পর এক মাজারে হামলা, হুমকি, মামলা ও জিডির ঘটনা একটি বড় প্রবণতার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কী হয়েছিল শাহ আলী মাজারে
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শাহ আলী মাজারে ওরশ চলাকালে লাঠিসোঁটা হাতে একদল ব্যক্তি ভেতরে ঢুকে জিয়ারতকারী ও ভক্তদের ওপর হামলা চালায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও মাজারে আসা লোকজনকে পেটানোর দৃশ্য দেখা গেছে।
মাজার জিয়ারতকারী ও স্থানীয়দের কেউ কেউ হামলাকারীদের জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করেছেন।
তবে জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ঘটনার পর শাহ আলী থানায় মামলা হয়েছে। সেখানে ৯ জনের নাম উল্লেখ করা, যারা জামায়াতে ইসলামী ও এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে জড়িক। আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামির তালিকায় রাখা হয়েছে।
এরইমধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মাজারে ধারাবাহিক হামলার অংশ শাহ আলী?
শাহ আলী মাজারের ঘটনা বুঝতে হলে সাম্প্রতিক কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকাতে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং ৫ই অগাস্টের পর মাজারকেন্দ্রিক হামলার যে ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে, তারই একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ৬৮টি মাজারে হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
একই সময়ে মাজারকেন্দ্রিক হুমকির ঘটনায় ৪০টি জিডি ও ২৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টিতে চার্জশিট, ছয়টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং ১২টি মামলা এখনো তদন্তাধীন।
শাহ আলী মাজারের হামলা নিয়ে আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে-এটি কি কেবল ধর্মীয় বিরোধ, নাকি এর পেছনে সম্পদ ও আধিপত্যের লড়াইও আছে?
ধর্মীয় দ্বন্দ্ব
কেন মাজার বারবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে? এই প্রশ্নের একটি উত্তর খোঁজা যায় ধর্মীয় ব্যাখ্যার দ্বন্দ্বে।
বাংলাদেশে মাজার, পীর-আউলিয়া, ওরশ ও সুফি ধারার চর্চা বহু পুরোনো। তবে একই সঙ্গে এই ধারাকে ‘অশুদ্ধ’ বা ‘বাতিল’ মনে করা এক ধরনের কঠোর ধর্মীয় ব্যাখ্যাও সমাজে সক্রিয়।
দুই ধারার টানাপড়েন থেকেই মাজারবিরোধী মনোভাবের কট্টর একটি অংশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সিনিয়র সাংবাদিক শরীফ খৈয়াম আহমেদ ইওনের মতে, মাজারে হামলার ঘটনাকে শুধু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র ধরা যাবে না।
তার ভাষ্যে, এর শিকড় আরও গভীরে। ইসলামের ভেতরে সুফি, লোকজ ও পীরকেন্দ্রিক ধারার সঙ্গে এক ধরনের কঠোর ব্যাখ্যাভিত্তিক ধারার পুরোনো দ্বন্দ্ব।
“বাংলায় ইসলামের বিস্তারে সুফি ধারার বড় ভূমিকা থাকলেও পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় ও বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতায় ভিন্ন ধরনের ধর্মীয় ব্যাখ্যা শক্তিশালী হয়েছে।”
আর এর প্রভাব সমাজে মাজারবিরোধী মনোভাব তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা
মাজার ঘিরে সংঘাতের ব্যাখ্যা শুধু ধর্মীয় মতভেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অনেক বড় মাজারের সঙ্গে যুক্ত থাকে ওয়াক্ফ সম্পত্তি, দোকানপাট, বাজার, দান-অনুদান, কমিটি ও স্থানীয় প্রভাবের প্রশ্ন।
ফলে মাজার একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক জায়গা, অন্যদিকে তা হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রও।
গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, শাহ আলী মাজারের মোট জমির পরিমাণ ৩২ দশমিক ১৪ একর বা ৯৭ দশমিক ৪০ বিঘা। এর মধ্যে ৭৫ বিঘা ওয়াক্ফ সম্পত্তি।
মাজারের বড় অংশের সম্পত্তি, দোকান, বাজার ও বরাদ্দ ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দখল ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব রয়েছে।
ইওন বলেন, মাজার একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জায়গা। তাই মাজার ঘিরে সংঘাতের পেছনে শুধু ধর্মীয় মতভেদ নয়- স্থানীয় ক্ষমতা, কমিটি, ওয়াক্ফ সম্পত্তি, দোকানপাট, বরাদ্দ ও প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নও জড়িত থাকতে পারে।
এই সাংবাদিকের মতে, শাহ আলী মাজারে নতুন কমিটি গঠনের আলোচনার প্রেক্ষাপটে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
তিনি এটিকে ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’ বা রাজনৈতিক অর্থনীতির দ্বন্দ্বের অংশ হিসেবে দেখছেন।
“সম্প্রতি সেখানে একজন বিএনপি নেতা হামলা চালিয়েছিলেন। সেটি বেশি আলোচনায় আসেনি, কারণ সেদিন সেখানে বেশি মানুষ ছিলো না,” বলেন তিনি।
ইওন বলেন, সবশেষ হামলা হয়েছে বৃহস্পতিবার রাতে, যেদিন সেখানে প্রচুর মানুষ থাকায় ঘটনার গুরুত্বও বেড়েছে।
মাজারের রাজনীতি
ধর্মীয় বিরোধ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যখন স্থানীয় রাজনীতি যুক্ত হয়, তখন সংঘাত আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ, মাজারের নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু ধর্মীয় প্রভাব নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা স্থানীয় ভোট, সামাজিক নেতৃত্ব, কমিটি গঠন এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তাই বিশ্লেষকদের মতে, মাজারে হামলার পেছনে রাজনৈতিক ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
জবান পত্রিকার সম্পাদক রেজাউল করিম রনিও ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করেন।
তার ভাষ্যে, যারা ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক শক্তি তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, তাদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সমাজে মাজারপন্থী ও মূলধারার ইসলামি ধারার মধ্যে মতভেদ, তর্ক-বিতর্ক বা বাহাসের ঐতিহ্য আছে।
তবে সেই মতভেদ হামলা, অপমান বা শারীরিক লাঞ্ছনায় রূপ নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রনির মতে, সমস্যাটি আরও জটিল করছে কিছু বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক পক্ষের দ্বৈত অবস্থান। একদিকে তারা ধর্মভিত্তিক বিভাজনের রাজনীতিকে শক্তিশালী করে, অন্যদিকে হামলার পর নিন্দাও জানায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষারও মনে করেন, মাজারে হামলার ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টার অংশ হিসেবেও দেখা দরকার।
তার মতে, যারা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দিতে আগ্রহী নয় এমন কিছু পক্ষ দেশে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা জিইয়ে রাখতে চায়।
তিনি বলেন, এ ধরনের হামলার মাধ্যমে একসঙ্গে কয়েকটি উদ্দেশ্য পূরণের চেষ্টা হয়। একদিকে ধর্মীয় অস্থিরতা তৈরি করা যায়, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ানো যায়।
একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, অরাজকতার পরিবেশ তৈরি করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোও সম্ভব হয় বলেও মনে করেন তিনি।
বিচারহীনতার প্রভাব?
ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সব ব্যাখ্যার পরও একটি প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত আইনের জায়গায় এসে থামে যে হামলার বিচার হচ্ছে কি না।
কারণ প্রতিটি হামলার পর যদি শুধু গ্রেফতার হয়, কিন্তু প্রকৃত পরিকল্পনাকারী বা পেছনের স্বার্থগোষ্ঠী চিহ্নিত না হয়, তাহলে একই ঘটনা আবারও ঘটার ঝুঁকি থাকে।
বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন, মাজারে হামলার ধারাবাহিকতা থামাতে হলে তদন্ত, বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
শাহ আলী মাজারে হামলার মামলায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে; যদিও দলটির পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়েছে।
রেজাউল করিম রনির ভাষ্যে, এই দ্বিচারিতা পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে রাখছে।
তিনি সরকারের প্রতি শুধু গ্রেফতারে সীমাবদ্ধ না থেকে সঠিক তদন্ত, বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
তার মতে, বিচার নিশ্চিত না হলে এ ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি থামানো কঠিন হবে।
বিচারের ওপর জোর দিয়েছেন আব্দুন নূর তুষারও। তিনি বলেন, বিষয়টি এখন তদন্তসাপেক্ষ। তদন্তে যদি সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। আর যদি প্রমাণ না থাকে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমেই পরিষ্কার হতে হবে।
তবে তার মতে, ঘটনাস্থলে অনেক মানুষ অংশ নিয়ে থাকলে হামলাকারীদের শনাক্ত করা অসম্ভব হওয়ার কথা নয়।
এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানান, মাজার হামলার আরেকটি বড় দিক হলো, এগুলো তুলনামূলকভাবে সহজ লক্ষ্যবস্তু। কারণ মাজারে ভক্তরা সাধারণত লাঠিসোঁটা বা অস্ত্র নিয়ে যান না।
ফলে সেখানে হামলা হলে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের সম্ভাবনাও কম থাকে। এই কারণেই হামলাকারীরা মাজারকে সহজ জায়গা হিসেবে বেছে নিতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের হামলা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার বোধ আরও বাড়িয়ে দেয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশে যদি মানুষ নিরাপদ বোধ না করে, তাহলে ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের ওপরই মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে। তাই গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হলে আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
শাহ আলী মাজারে হামলার পর তাই প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়েছে যে, মাজার অনুসারীদের মুখ বন্ধ করতে চাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। এখানে ধর্মীয় মতাদর্শের বিরোধ আছে, মাজারকেন্দ্রিক সম্পদ ও প্রভাবের লড়াই আছে, স্থানীয় রাজনীতির হিসাব আছে, আবার অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টাও থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য বলছে, মাজারের অনুসারীরা সাধারণত সংঘাতের পক্ষ নয়; তারা আধ্যাত্মিক চর্চা, জিয়ারত ও ভক্তির জায়গায় থাকেন। সেই নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ পরিসরকে লক্ষ্যবস্তু করা তাই শুধু একটি গোষ্ঠীর ওপর হামলা নয়, বরং সমাজের বহুত্ববাদী চরিত্র, ধর্মীয় সহাবস্থান এবং নাগরিক নিরাপত্তার ওপরও আঘাত।