পশ্চিমবঙ্গের অভিনেত্রী অরুন্ধুতি মৈত্র, যিনি লাভলী মৈত্র নামেই বেশি পরিচিত। বাংলা সিরিয়ালে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়ে ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন।
এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিধানসভা নির্বাচনে এবারেও দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর দক্ষিণ আসন থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে লড়ছেন তিনি।
গত ছয়ই এপ্রিল ফেইসবুকে এক পোস্টে লাভলী মৈত্র লেখেন, “সোনারপুর দক্ষিণের মানুষ, চলুন আমাদের ভোট দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ি। সক্রিয় থাকুন, দায়িত্ব পালন করুন।”
পোস্টের নিচে আটটি হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করেন এই অভিনেত্রী ও রাজনীতিবিদ, যেখানে একটি ছিলো #বাংলাদেশভোট।
আর এই বিষয়টিই ইস্যু বানিয়ে ফেলে ভারতীয় গণমাধ্যম রিপাবলিক বাংলা। সর্বভারতীয় গণমাধ্যম রিপাবলিক মিডিয়া নেটওয়ার্কের বাংলা আউটলেট হলো রিপাবলিক বাংলা।
বিজেপির পক্ষে জনমত গঠনে এই রিপাবলিক মিডিয়া গোষ্ঠী ভূমিকা রাখে বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
লাভলী মৈত্রের পোস্ট নিয়ে একটি ফটো কার্ড বানিয়ে রিপাবলিক বাংলার ফেইসবুকে পোস্ট করা হয়। কার্ডে লাভলীর ছবি দিয়ে লেখা হয়, “পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ বানানোর প্রচেষ্টা তৃণমূলের?”
কার্ডে #বাংলাদেশভোট হ্যাশট্যাগকে লাল বৃত্ত এঁকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং ওই পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয় আরো আগ্রাসী মন্তব্য।
“পশ্চিমবঙ্গের ভোটকে ‘বাংলাদেশের ভোট’ বলে উল্লেখ। সমাজ মাধ্যমে পোস্টে লাভলির প্রচারে ‘বাংলাদেশ’ উল্লেখ। সোনারপুর দক্ষিণের তৃণমূল প্রার্থী লাভলি মৈত্রের সোশাল মিডিয়ার পোস্ট ঘিরে বিতর্ক। পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ বানানোর চেষ্টা তৃণমূলের?” লেখা হয় ওই ক্যাপশনে।
মুহূর্তেই এই ঘটনা ভাইরাল হয়ে ভোটের মাঠের ইস্যু হয়ে যায়। লাভলীকে নিয়ে ট্রল করে পোস্ট দিতে থাকেন তার বিরোধীরা।
পরে ওই পোস্ট লাভলী মৈত্রের ফেইসবুক পেইজে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সম্প্রতি আরেক ঘটনা ভাইরাল হয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে। ভোটের আগে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ার মধ্যে বাংলাদেশের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সেখানে।
ওই ভিডিওর শেয়ার দিয়ে দাবি করা হয়, তৃণমূল কংগ্রেসের ‘গুন্ডা সমর্থককে’ বেধড়ক পেটাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
৬ই এপ্রিল হিন্দি ভাষার এক ফেসবুক পোস্টে ওই ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা হয়, “নির্বাচনি পরিবেশে উত্তাপ বাড়ছে বাংলায়! পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছে। খবর অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ থাকা গুন্ডাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থান নিয়েছে।”
আসলে সেখানে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটি বাংলাদেশের বলে জানিয়েছে এএফপির ফ্যাক্ট চেক।
পশ্চিমবঙ্গে ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই বিতর্কের কেন্দ্রে আসছে সীমান্তঘেঁষা বাংলাদেশের নানা প্রসঙ্গ।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটে কেন আলোচনায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশ–ভারতের ‘বিশাল’ সীমান্তের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ শুধু বড় ভৌগোলিক সীমারেখা নিয়েই যে হাজির রয়েছে তা নয়।
ভাষা, সংস্কৃতি এবং অন্যান্য দিক থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রাজ্যটির সম্পর্ক আরো নিবিড়। এই সীমান্তে এমনও পরিবার আছে, যাদের সদস্যরা বসবাস করেন দুই দেশেই।
দুই দেশের অনেক কৃষক নিজের জমিতে পৌঁছাতে সীমান্ত পার হন প্রায় প্রতিদিনই। প্রচলিত বন্দরের বাইরেও অপ্রচলিত বাণিজ্য হয় সীমান্ত দিয়ে।
“উত্তর ২৪ পরগনা বা নদিয়ার মতো জেলাগুলোতে মানচিত্রের রেখাটি বাস্তবের চেয়ে অনেক সময় প্রশাসনিক বিভাজন হিসেবেই বেশি মনে হয়। ঠিক এই কারণেই, নির্বাচন এলেই এটি রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে,” লেখা হয়েছে ভারতের শীর্ষ মিডিয়া গ্রুপের একটি ফাইন্যানশিয়াল নিউজ আউটলেট ‘মানিকন্ট্রোল’-এর এক প্রতিবেদনে।
“বাসিন্দাদের জন্য যা বাস্তব জীবনযাত্রার অংশ, তা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য প্রচারণার গল্পে পরিণত হয়।”
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ভোটে কোন কোন উপায়ে বাংলাদেশকে ইস্যু করা হয় এবং এটা শুরু হলো ঠিক কবে থেকে?
আলাপ-কে এইসব প্রশ্ন ব্যাখ্যা করেছেন ভারতীয় সাংবাদিক ও লেখক প্রতীক; যিনি নাগরিক ডটনেট নামে একটি ডিজিটাল মিডিয়া প্লাটফর্ম পরিচালনা করছেন।
এর আগে টাইমস অব ইন্ডিয়া, ডেকান ক্রনিকল ও স্টেইটসম্যান পত্রিকায় কাজ করেছেন প্রতীক।
“আমাদের জীবনে পশ্চিমবঙ্গের ভোটে অন্তত ২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশকে কোনো ইস্যু হতে দেখিনি। ব্যাপারটা শুরু হয় ২০১১ সালে, যখন মমতা ব্যানার্জি মতুয়াদের কথা আলাদা করে বলতে শুরু করেন। সেবারই প্রথম দেখা যায়, বামফ্রন্ট নেতারাও মতুয়াদের বড়মার আশীর্বাদ চাইছেন।”
প্রতীক বলেন, “স্বভাবতই উত্তর ২৪ পরগনা বা নদিয়ার যে অঞ্চলে মূলত মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস, তার বাইরের লোকের মধ্যেও মতুয়া কারা, তারা কেন বাংলাদেশ থেকে চলে এসেছিল, সেইসব আলোচনা পৌঁছে যায় পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ার মাধ্যমে। সেই শুরু। তখন থেকেই বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের কথা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে যায়। বিজেপি সেটাকে ব্যবহার করতে থাকে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে।”
মতুয়া সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষ নমশূদ্র বা দলিত পটভূমির। ঐতিহাসিকভাবে তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত।
এই সম্প্রদায়ের অনেকের শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। ভারতের সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে মতুয়ারা। তাই তাদের নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক মেরূকরণের মাধ্যমে নিজেদের বিস্তার ঘটাচ্ছে বিজেপি। এই ধারায় জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে তৃণমূল কংগ্রেসও ঝুঁকছে ‘মুসলিম তোষণ’-এর রাজনীতিতে।
ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উপস্থিতি এক সময় ছিলো খুবই নগণ্য। কিন্তু ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙা এবং সেই রেশ ধরে পশ্চিমবঙ্গে দাঙ্গার পর ভোটের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে।
২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকাকালীন বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি বিধানসভা আসনের একটিতেও জিততে পারেনি বিজেপি।
এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর বামজোট দুর্বল হয়ে পড়ায় দ্রুত বাড়তে থাকে বিজেপির ভোট।
২০১৬ সালে তিনটি এবং ২০২১ সালে ৭৭টি আসন পেয়ে রাজ্য প্রধান বিরোধীদল হয় বিজেপি।
ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি করা ‘রাষ্ট্র সেবা দল’-এর সাবেক সভাপতি ড. সুরেশ খাইরনার সম্প্রতি এক নিবন্ধে লিখেছেন, “বর্তমান পরিস্থিতিকে বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সুযোগসন্ধানী জোট, আদর্শগত আপস এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশলের ফলাফল হিসেবে দেখতে হবে।”
“সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার লক্ষ্যে হতাশ বাম সমর্থকদের একাংশ বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। অনেক প্রাক্তন বামকর্মী বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে মমতাকে হারানোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।”
স্বাভাবিকভাবেই আসন্ন নির্বাচনে তীব্র মেরূকরণের লড়াইয়ে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে।
আর সেখানে সীমান্তের পেরিয়ে বাংলাদেশের ঘটনাবলি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে সীমানা রয়েছে ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটারের। এর মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া নেই ৫৬৯ কিলোমিটার সীমান্তে। আর এটাই এখন নির্বাচনি প্রচারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
সেই সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে উত্থাপন করা হচ্ছে ভোটের মাঠে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সীমান্তে বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন করা হবে।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে বলছে, সীমান্ত নিরাপত্তা মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব এবং বিজেপি ইস্যুটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে নতুন ভোটার তালিকা
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক’ মোড় দেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বিজেপি নেতার ভাষ্য উল্লেখ করা বলা হচ্ছে, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন রাজ্যের জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে এবং ভোটার তালিকায় প্রভাব ফেলছে।
নির্বাচন কমিশন-সংশ্লিষ্ট তথ্য উল্লেখ করে বিজেপি নেতারা দাবি করছেন, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সর্বশেষ বড়সড় ভোটার তালিকা হালনাগাদের পর থেকে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি।
এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বলা হচ্ছে, এইসব তথ্য অতিরঞ্জিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এরই মধ্যে ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআর নামে পশ্চিমবঙ্গে নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়ন করেছে সরকার।
এই তালিকার আগে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার ছিল প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৭৫ লাখ।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, যেসব মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের একটা বড় অংশই মুসলমান এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের হিন্দু বলে মনে করা হচ্ছে, যদিও এ সংক্রান্ত সম্পূর্ণ তথ্য এখনো বিশ্লেষণ করে উঠতে পারেননি গবেষকরা।
ভারতের মুসলিম জনসংখ্যা বসবাসকারীর দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য হলো পশ্চিমবঙ্গ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট ১৭ কোটি ২০ লাখ মুসলমানের প্রায় ১৪ শতাংশ বসবাস করে এই রাজ্যে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ বিজেপি নেতারা প্রায়ই তাদের বক্তব্যে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত করার হুমকি দেন।
তবে তৃণমূল কংগ্রেস থেকে দাবি করা হয়, এই শব্দটি আসলে মুসলমানদের বোঝাতেই ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে অনেক হিন্দু ভোটারের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর এই ইস্যু কাজে লাগায় বিজেপি।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের সংবাদমাধ্যমে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, মালদা ও আলিপুরদুয়ারের মতো পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলার পাশের বাংলাদেশি আসনগুলোতে জামায়াতের জয়কে যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তা এক ধরনের ‘ভয়ের ভূগোল’ তৈরি করছে, যা নির্বাচনি প্রচারণার জন্য সুবিধাজনক।
“সমস্যাটি সীমান্ত উদ্বেগের অযৌক্তিকতা নয়, বরং একটি জটিল নির্বাচনি ফলাফলকে একমাত্রিক নিরাপত্তা বর্ণনায় সীমাবদ্ধ করে ফেলা। যেখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা মুছে গিয়ে তার জায়গায় অস্তিত্বগত হুমকির ভাষা বসানো হচ্ছে।”
২০২৫ সালের শেষের দিকে ইকোনমিক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের একটি সীমান্ত চেকপয়েন্ট দিয়ে কিছু ‘অবৈধ অভিবাসী’ বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার ঘটনা ২০২৬ সালের নির্বাচনের কয়েক মাস আগেই একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।
এর ফলে অনুপ্রবেশ ও ভোটার তালিকা নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের বাংলাদেশিদের ইস্যু শুধু সাম্প্রতিক সময়ে নয়, এর আগেও ছিল। জ্যোতি বসু বামফ্রন্টের মূখ্যমন্ত্রী থাকার সময় বাংলাদেশ থেকে যারা পশ্চিমবঙ্গে চলে গেছেন তাদের স্বার্থের পক্ষে কথা বলতেন।
এর ফলে সেখানে ‘বাঙাল’ বলে পরিচিত পাওয়া বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ‘হিন্দু’ ধর্মাবলম্বীদের সমর্থন পেতেন জ্যোতি বসু।
তবে এই উপাদানে ‘ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক’ ইস্যু যোগ হয় আরো পরে।
কেন বাংলাদেশের বিষয়গুলো সেখানে ইস্যু হয়? রাজনীতি এবং ধর্মীয় রাজনীতিতে এটা কীভাবে ব্যবহার করা হয়?
এই প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিক প্রতীক আলাপ-কে বলেন, “পুরোপুরি ব্যাপারটা বুঝতে গেলে আরও খানিকটা পিছিয়ে যেতে হবে। মমতা ব্যানার্জি এই শতকের গোড়ার দিকে, লোকসভার সদস্য থাকার সময়ে আওয়াজ তুলেছিলেন যে, সিপিএম পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি ঢুকিয়ে তাদের ভুয়ো রেশন কার্ড করিয়ে দিয়ে ভোটে জেতে। বলা যায়, আজকের বিজেপি সেই প্রোপাগান্ডাকে মমতারই বিরুদ্ধে কাজে লাগাচ্ছে।”
“কিন্তু সংসদে মমতার সেই চেঁচামেচি তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারেনি। ২০১১ সালে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা, বিশেষত মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ সম্পর্কে, মমতার যে দরদের কথা আগে বললাম, সেসব কিন্তু মমতার সেই পুরনো বয়ানে ছিল না। তখন তিনি বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের একমাত্রিক বয়ানই রেখেছিলেন, যা বিজেপির এখনকার "মুসলমানরা ঢুকে বাংলার ডেমোগ্রাফি বদলে দিচ্ছে"-র সঙ্গে মিলে যায়।”
প্রতীক মনে করছেন, “বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের পর যেসব হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল, তা পশ্চিমবঙ্গের অনেক মানুষের মনে এক ধরনের আতঙ্কও তৈরি করেছিল। হিন্দুত্ববাদীরা সেটাকেও ব্যবহার করেছে মানুষকে ভয় দেখাতে।”
“যদিও বিহারের পর পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর করেও নির্বাচন কমিশন একজনও বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা খুঁজে পায়নি, তবু অমিত শাহরা নির্বাচনি প্রচারে বলে চলেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশিতে ভর্তি এবং তাঁরা ক্ষমতায় এলে এদের চিহ্নিত করে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে।”
বাংলাদেশের ইস্যু কি আসলেই ভোটের মাঠে কাজ করে?
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নির্বাচনি চক্রের নতুন মাত্রা হলো ভোটার তালিকা। নাগরিকদের ভোটার তালিকায় নাম না থাকার বিষয়টি এতটাই ‘স্পর্শকাতর’ যে, এটা এখন ভারতের ‘নিরাপত্তা ইস্যু’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজেপি ভোটার যাচাই প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশ থেকে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যু হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জামায়াতের ইসলামীর প্রার্থদের বিজয় এবং ’অনুপ্রেবেশ’কে কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
অন্যদিকে পুরো প্রক্রিয়ার ‘স্বচ্ছতা ও উদ্দেশ্য’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে একটি বিদেশি নির্বাচনকে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট তৈরি করা হচ্ছে-যা অস্বাভাবিক কঠোর শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দিতে পারে এবং সীমান্তবর্তী ভাষা ও ধর্ম ভাগ করে নেওয়া ভারতীয় নাগরিকদের প্রতিও সন্দেহ বাড়াতে পারে।”
“যখন রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা এবং ভোটার তালিকা নিয়েও তীব্র বিতর্ক চলছে, তখন এই সিকিউরিটাইজেশন প্রবণতাই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
বিজেপির পক্ষ থেকে নিরাপত্তার ইস্যুটি বারবারই বড় করে দেখানো হচ্ছে।
তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি বিষয়ের কারণে পশ্চিমবঙ্গে সীমান্ত রাজনীতি বারবার সামনে আসে বলে মানিকন্ট্রোলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই তিন কারণ হলো:
নিরাপত্তা: অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ
পরিচয়: কে এই রাজ্যের বাসিন্দা, কে ভোট দিতে পারবে, কে ‘স্থানীয়’ হিসেবে বিবেচিত
শাসনব্যবস্থা: দায়িত্ব কার-রাজ্য সরকারের, না কেন্দ্রের?
বাংলাদেশে ভোটের সময় ‘ভারত বিরোধিতা’ যেমন ইস্যু হয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও তেমনি ‘বাংলাদেশ’ প্রসঙ্গ আসে ঘুরেফিরেই।
সীমান্ত তখন শুধু দেশের বিভাজনরেখা নয়, নির্বাচনের সময় হয়ে ওঠে রাজনৈতিক যুক্তির কেন্দ্র, নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্ন।
বিজেপি এই সীমারেখাকে নির্ধারক নির্বাচনি ইস্যুতে পরিণত করতে চায়। তৃণমূল কংগ্রেস চেষ্টা করছে, আলোচনাকে অন্যদিকে ঘোরাতে।
বাংলাদেশের ইস্যু আসলেই কি পশ্চিমবঙ্গের ভোটের রাজনীতিতে কাছে আসে?
এই প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিক প্রতীক বলছেন, “সত্যি কথা বলতে, ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি চালাচ্ছে বিজেপি আর তৃণমূল কংগ্রেস। এটা যত বাড়ছে, তত বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। সেটা সোশাল মিডিয়ার দিকে তাকালেও টের পাওয়া যায়।”
“তা সত্ত্বেও ২০১৬, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বা ২০১৯, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল এমন কোনো ইঙ্গিত দেয়নি, যা থেকে মনে করা যায় যে সাধারণ ভোটাররা বাংলাদেশে কী ঘটছে বা ঘটতে পারে তা নিয়ে ভেবে ভোট দেন। কারণ, যদি বিজেপির কথা মতো ধরেও নেই যে, তৃণমূল কংগ্রেস জেতে কেবল মুসলমান ভোটের প্রায় সবটা পায় বলে, তাহলে সীমান্ত থেকে বহুদূরের হুগলী, বর্ধমান বা কলকাতার আসনগুলোতে তৃণমূলের জেতার কথা নয়। অথচ কলকাতায় এবং ওইসব জেলায় তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য।”
‘ধর্মীয়’ বা ‘বাংলাদেশি’ বিভাজন যদি পশ্চিমবঙ্গে কাজই করবে, তাহলে হিন্দুপ্রধান জেলাগুলোতে বিজেপির খারাপ ফল করার কথা না বলে মনে করেন সাংবাদিক প্রতীক।
তিনি বলেন, “২০১৯ সালের লোকসভায় যখন বিজেপি অপ্রত্যাশিত ভালো ফল করল পশ্চিমবঙ্গে, তখনো কিন্তু হিন্দুপ্রধান ওই জেলাগুলোতে বিজেপি সুবিধা করতে পারেনি। এমন নয় যে তৃণমূল কেবল মুর্শিদাবাদ, মালদা বা নদিয়ার মতো বিপুল মুসলমান জনসংখ্যার জেলার দৌলতেই জেতে। বরং মুর্শিদাবাদ, মালদায় তারা তুলনায় দুর্বল।”
“কংগ্রেসের সঙ্গে রীতিমতো টক্কর চলে, এবারের ভোটেও, অনেকেরই ধারণা যে, কংগ্রেস ওই জেলাগুলো থেকেই খাতা খুলে বিধানসভায় ফিরবে।”
এসআইআর না হলে এবারের নির্বাচনে ‘সম্ভবত’ বাংলাদেশ নিয়ে কোনো কথাবার্তাই হতো না বলে মনে করেন এই ভারতীয় সাংবাদিক।
“হয়েছে বলে বিজেপি এখনো ব্যাপারটা জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। সফল হচ্ছে কিনা, ফল বেরোলেই বোঝা যাবে।”
আরও যেসব ইস্যু আলোচনায়
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৭ই মে। এর আগেই ভোট গ্রহণের জন্য দুই পর্বে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে।
২৯৪ আসনের মধ্যে প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে ভোট হবে ২৩শে এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোট হবে ২৯শে এপ্রিল।
গত দুইবারের ভোটে আসন বাড়ানোর পর এবার প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে বিজেপি।
আর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ‘আত্মবিশ্বাসী’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেস আবার ফিরবে বলে আশাবাদী দলটির নেতাকর্মীরা।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ‘নিরাপত্তা হুমকি’কে রাজ্য ও রাষ্ট্রের ইস্যু বানানো হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ নিয়ে শোরগোল এবং বিতর্কিত ভোটার তালিকা বানিয়ে ’নিরাপত্তা’ ইস্যুকে একেবারে সামনের কাতারে আনার চেষ্টা চলছে।
যদিও ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে ভোটের মাঠে এই ইস্যু ‘খুব কমই’ কাজ করে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
দ্য ডিপ্লোম্যাটে লেখা হয়েছে, “সিকিউরিটাইজেশন মূলত ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো ও একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংককে একত্র করার কৌশল। সীমান্তসংলগ্ন ও সাম্প্রদায়িকভাবে সংবেদনশীল আসনগুলোতে বিজেপির মূল বার্তা হলো- তৃণমূল কংগ্রেস বাংলাকে নিরাপদ রাখতে পারে না। একমাত্র শক্তিশালী ‘ডাবল ইঞ্জিন’ (কেন্দ্র ও রাজ্যে একই সরকার) সরকারই তা করতে পারে।”
“বাংলাদেশের মানচিত্র এখানে (পশ্চিমবঙ্গে) কার্যকর প্রচারসামগ্রী। কারণ এটি একই সঙ্গে নিরপেক্ষ ও উদ্বেগজনক বলে মনে হয়।”
অভিবাসীর দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ হলো ভারতের অন্যতম ’ভুক্তভোগী’ রাজ্য। ভারত ভাগ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে দাঙ্গার সময় বাংলাদেশের ‘উল্লেখযোগ্যসংখ্যক’ হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভারতে চলে যায়। সেদেশ থেকে মুসলিমরাও বাংলাদেশে আসে।
ধর্মের ভিত্তিতে অভিবাসনের কারণে গুজরাটসহ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি উসকানি পেয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
কিন্তু, পশ্চিমবাংলায় তিন দশকেরও বেশি বামপন্থিদের ক্ষমতায় থাকা এবং জ্যোতি বসুর মতো নেতার কারণে রাজ্যটিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ‘মাথাচাড়া’ দিয়ে উঠতে পারেনি বলেও মনে করেন তারা।
দ্য ডিপ্লোম্যাটে লেখা হয়েছে, “পশ্চিমবঙ্গ বারবার দেখিয়েছে যে, প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক মেরূকরণের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে ভোটাররা কল্যাণমূলক সেবা ও স্থানীয় শাসনব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেয়।”
এ কারণেই ২০২৫ সালের জুনে নদিয়ার কালীগঞ্জে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস বড় ব্যবধানে আসন ধরে রাখে। আর ২০২১ সালের তুলনায় ভোটের হার কমে যায় বিজেপির।
“পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন সাধারণত একমাত্রিক ইস্যুতে নির্ধারিত হয় না। নিরাপত্তাকরণ একদল ভোটারকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে এলেও, একই সঙ্গে এটি পালটা প্রতিক্রিয়াও তৈরি করতে পারে। যেমন- বাংলা পরিচয়, বহুত্ববাদ, হয়রানির আশঙ্কা, অতিরিক্ত পুলিশি কঠোরতা, আমলাতন্ত্র এবং চাকরি, মূল্যস্ফীতি ও কল্যাণমূলক সুবিধার মতো দৈনন্দিন ইস্যুতে আলোচনা ফিরিয়ে আনা।”