বিশ্বে শান্তি আনার ঘোষণা দিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবার প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় দ্বিগুন করতে চলেছেন।
আটটি যুদ্ধ বন্ধ করার দাবি নিয়ে নোবেল প্রত্যাশী এই প্রেসিডেন্ট যখন ইসারায়েলের সাথে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনায় প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধ আদৌ থামবে?
হোয়াইট হাউস ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বরাদ্দ চেয়েছে প্রতিরক্ষা খাতে। যেখানে অন্যান্য সরকারি কর্মসূচিতে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেট অফিস শুক্রবার বাজেট কাঠামোটি তৈরি করেছে।
প্রস্তাবিত বাজেট অনুয়ায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৪৪৫ বিলিয়ন ডলার বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে ধরে রাখার লক্ষ্যে এই অর্থ ব্যয় করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা শিল্প সম্প্রসারণ এবং “গোল্ডেন ডোম” নামে একটি মহাকাশভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে।
বাজেট প্রকাশের দুই দিন আগে এক ব্যক্তিগত বৈঠকে ট্রাম্প বলেন যে, “যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ডে-কেয়ার, মেডিকেইড এবং মেডিকেয়ার কর্মসূচিতে অর্থায়ন করা সম্ভব নয়, কারণ ‘আমরা যুদ্ধ করছি’ এবং আমাদের একটি বিষয়েই খেয়াল রাখতে হবে তা হলো সামরিক সুরক্ষা।”
ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প ফেডারেল ব্যয় কমানো এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই লক্ষ্যে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ককে সরকারি ব্যয় কমানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যা “ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি” নামে পরিচিত ছিল।
যদিও উদ্যোগটি সফল হয়নি বলে মনে করেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেডারেল ব্যয় প্রায় ৪ শতাংশ বা ৩০১ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
এমন অবস্থায় নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিরক্ষা ছাড়া অন্যান্য খাতে ব্যয় প্রায় ১০শতাংশ বা ৭৩ বিলিয়ন ডলার কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এই কাটছাঁটের পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, “অপ্রয়োজনীয়, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এবং অপচয়মূলক কর্মসূচি” কমানো হবে।
প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল এনডোমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির অর্থায়ন বন্ধ করা, আইআরএস ও পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার ব্যয় কমানো এবং নাসার বাজেট প্রায় ২৩ শতাংশ কমানো।
এছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষ ও গৃহহীনদের সহায়তার জন্য আবাসন কর্মসূচিতে কাটছাঁটের প্রস্তাব থাকলেও মেলানিয়া ট্রাম্পের ফস্টার ইয়ুথ টু ইন্ডিপেনডেন্স উদ্যোগের জন্য ৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার কমানো এবং স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের কয়েকটি সংস্থা বাতিল করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এসব সংস্থা বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত গবেষণায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করছে।
যা বলছে কংগ্রেস
প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত বাজেট পাস হয় কংগ্রেসের মাধ্যমে। কংগ্রেস চাইলে এটি প্রত্যাখ্যান করতে পারে এবং প্রায়ই তা হয়।
গত বছর ট্রাম্প প্রতিরক্ষাবহির্ভূত ব্যয়ে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হ্রাসের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু কংগ্রেস সেই ব্যয় প্রায় অপরিবর্তিত রেখেছিল।
প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবে রিপাবলিকানরা সমর্থন জানিয়েছে, বিশেষ করে হাউস ও সিনেটের ‘কমিটি অব আর্মড সার্ভিসেস’-এর সদস্যরা। তারা বলেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।
তবে ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেছে ডেমোক্র্যাটরা।
সিনেটর রজার উইকার এবং প্রতিনিধি মাইক রজার্স বলেছেন, “আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈশ্বিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।”
কলোরাডোর ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেসন ক্রো বলছেন, “আমেরিকান জনগণ বিদেশি যুদ্ধ চায় না, তারা দেশের ভেতরে স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য এবং জ্বালানি চায়।”
তিনি বলেন, “ট্রাম্প দাবি করছেন শিশু যত্ন বা স্বাস্থ্যসেবার জন্য অর্থ নেই, কিন্তু বিদেশে সামরিক কার্যক্রম বাড়ানোর জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে চাইছেন। দেশের নিরাপত্তার জন্য সেনাবাহিনী ব্যবহার করা প্রয়োজন হলেও শুধুমাত্র বেশি অর্থ খরচ করলেই শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি হয় না।”
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বার্ষিক বাজেট ঘাটতির মুখে আছে এবং জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
সামরিক ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব কী বার্তা দেয়
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাব কংগ্রেসে অনুমোদন হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধ্বি পেতে যাচ্ছে।
বিপরীতে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সেবা, পরিবেশসহ অন্যান্য খাতে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাজেট কাটছাঁটের পরিকল্পনাকে দ্বিমুখী নীতি হিসাবে দেখছেন অনেকে।
বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছিলেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প বলেন, “ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে, তাদের বিমান বাহিনী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, তাদের অনেক নেতা যারা সন্ত্রাসী ছিল, তারা মারা গেছে।”
তিনি আরও বলেন,“আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।”
ভাষণের ঠিক দুইদিন পর প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধ্বির পরিকল্পনা জানালো হোয়াইট হাউস।
দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন ও ফক্স অবলম্বনে