পেট্রোডলারের পর পেট্রোইউয়ান, যা বললেন ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’-এর লেখক

সবাই দেখছে ইরানের ওপর বোমা পড়ছে। কেউ দেখছে না ইরান ডলারের সঙ্গে ঠিক কী করল। তারা ডলারের সঙ্গে যা করেছে, তা যুদ্ধক্ষেত্রে যা ঘটেছে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এই বিষয়টিই অধিকাংশ মানুষ খেয়াল করছে না। ১৯৭৪ সালে, হেনরি কিসিঞ্জার সৌদি আরবে গিয়ে একটি চুক্তি করেন। বিশ্বের সব জায়গায় সব তেল মার্কিন ডলারে লেনদেন হবে।

সোনা নয়। পাউন্ড নয়। মার্ক নয়। ডলার। এই চুক্তি আমেরিকাকে যা দিয়েছিল, তা কোনো সামরিক শক্তি দিয়ে কেনা যেত না।

পৃথিবীর প্রতিটি দেশের তেল কিনতে ডলার দরকার ছিল। পৃথিবীর প্রতিটি দেশকে রিজার্ভ হিসেবে ডলার রাখতে হতো।

পৃথিবীর প্রতিটি দেশকে স্বেচ্ছায় নয় বরং জ্বালানির কারণে আমেরিকার আর্থিক ব্যবস্থায় ঢুকতে বাধ্য হয়েছিল। এটাই পেট্রোডলার।

এটি ৫২ বছর ধরে আমেরিকাকে ইতিহাসের সবচেয়ে অর্থনৈতিক প্রভাবশালী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

এখন দেখুন, কী ঘটেছে। এখন মার্চ ২০২৬।

ইরান ঘোষণা করেছে, তারা তেলের বিনিময়ে ইউয়ান গ্রহণ করবে। ডলার নয়। ইউয়ান। চীনা মুদ্রা।

শুধু তাই নয়। ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, শুধুমাত্র যদি তেলের দাম ইউয়ানে লেনদেন হয়।

অন্তত দুটি জাহাজ ইতিমধ্যেই ইউয়ানে ট্রানজিট ফি পরিশোধ করেছে।

ডয়চে ব্যাংক সরাসরি বলেছে, এই সংঘাত “পেট্রোডলারের প্রাধান্য কমাতে সাহায্য করবে এবং পেট্রোইউয়ানের সূচনা হতে পারে।”

সাধারন মানুষের কাছে এটি একঘেঁয়ে মুদ্রার গল্প মনে হতে পারে। এটা তা নয়। আসলে এর মানে কী, সেটি ব্যাখ্যা করি।

যেহেতু তেল পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হওয়া পণ্য, তাই যেকোনো দেশকে জ্বালানি আমদানি করতে হলে প্রথমে যে মুদ্রায় লেনদেন হবে সেটি সংগ্রহ করতে হয়।

যখন তেলের দাম ডলারে নির্ধারিত, তখন পুরো পৃথিবীর ডলার দরকার। পুরো পৃথিবী রিজার্ভ হিসেবে রাখার জন্য মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কিনত।

রবার্ট টি. কিওসাকির ‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ বইটি ১৯৯৭ সালে প্রকাশের পর থেকে বিশ্বব্যাপী ৩২ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে এবং ৫১টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে।

ডলারের এই চাহিদা আমেরিকাকে দশকের পর দশক বেশি ঋণ নিতে, বেশি খরচ করতে এবং বেশি ডলার ছাপাতে দিয়েছে, কম খরচে।

যদি তেল বেচাকেনায় ইউয়ানে লেনদেন শুরু হয়, দেশগুলো ইউয়ান রাখা শুরু করবে। তারা মার্কিন ট্রেজারি কেনা বন্ধ করবে।

আমেরিকার ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাবে। ঘাটতি সামাল দেওয়া আরও ব্যয়বহুল হবে।

অতিরিক্ত সুবিধা, শেষ।

একদিনে নয়। কিন্তু ধীরে ধীরে। নীরবে। একটি ট্রেডিং ডেস্কে বসে।

আমার গরিব বাবা কখনো এটি বুঝতে পারেননি। তিনি সারাজীবন ডলার সঞ্চয় করেছেন।

তিনি সরকারকে বিশ্বাস করতেন। সংবাদ যা বলত, তা-ই তিনি বিশ্বাস করতেন।

আমার ধনী বাবা এটি পুরোপুরি বুঝতেন। তিনি বলতেন, “ডলারের শক্তি কখনো আমেরিকার শক্তির ওপর নির্ভর করেনি। এটি নির্ভর করত তেলের বেচাকেনা ডলারে হওয়ার ওপর। যেদিন এটি বদলাবে, সবকিছু বদলে যাবে।”

১৯৬৫ সালে আমি নিউ ইয়র্কে একটি সামরিক স্কুলে পড়তাম। আমাদের অর্থনীতির শিক্ষক আমাদের ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ পড়তে দিয়েছিলেন।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন? তিনি বলেছিলেন, “তোমার শত্রুকে জানতে হবে।”

আমি কখনো এটি ভুলিনি।

এই যুদ্ধে চীন একটি ক্ষেপণাস্ত্রও ছোড়েনি। তাদের দরকারও নেই। তারা ডেস্কে বসেই জিতছে।

চীন ইরানের প্রায় ৯০% তেল কেনে। ইরান চীনা জাহাজগুলোকে (হরমুজ) প্রণালি দিয়ে যেতে দেয়।

ইরান যাতায়াতের জন্য ইউয়ান দাবি করে। ডলারের বদলে প্রতিটি ইউয়ানের লেনদেন, আমেরিকার আর্থিক শক্তির ভিত্তি থেকে একেকটি ইট সরিয়ে নিচ্ছে।

ডলার আগামীকাল ধসে পড়বে না।

কিন্তু ধীরগতির ঝুঁকি নিয়ে আমার ধনী বাবা বলতেন, “সবচেয়ে বিপজ্জনক লোকসান হলো সেগুলো, যা এত ধীরে ঘটে যে বুঝতেই পারো না, যতক্ষণ না অনেক দেরি হয়ে গেছে।”

তোমার সঞ্চয়ী হিসাবে তুমি পাঁচ শতাংশ সুদ পাচ্ছো। মুদ্রাস্ফীতি চলছে তিন, চার, পাঁচ শতাংশ।

পেট্রোডলার, যে কাঠামো তোমার ডলার মজুত করে রাখার মতো মূল্যবান করে তুলেছিল, তা নীরবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে এমন এক জায়গায়, যেটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেই। হরমুজ প্রণালি।

সোনা স্রষ্টার অর্থ। কেউ এটি ছাপাতে পারে না। বিটকয়েন মানুষের টাকা। কেউ এটি ছাপাতে পারে না। ডলার সরকারের টাকা। তারা প্রতিদিন এটি ছাপে।

আরেকটি জিনিসটি যা ছাপানো পৃথিবীকে মেনে নিতে বাধ্য করেছিল, পেট্রোডলার, সেটিতে ফাটল ধরছে।