ভিয়েতনামের সায়গন থেকে শেষ মার্কিন যুদ্ধবিমানটি যখন ফিরেছিল, তখন ওয়াশিংটনে বসে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মার্কিনিদের বোঝাতে ব্যস্ত ছিলেন যে, এটি পরাজয় নয়, বরং ‘পিস উইথ অনার’ বা ‘সম্মানের সাথে বিদায়’।
ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো- সেই ‘সম্মানে সাথে বিদায়’ ছিল আসলে পরাজয় ঢাকার আবরণ, যা রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এটাই পরে পরিচিত হয় ‘ভিয়েতনামাইজেশন’ নামে।
আমেরিকার ‘লজ্জাজনক’ সেই পলায়নের পাঁচ দশক পরে এসে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবারও সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠছে।
ইরানের পরমাণু স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি দেওয়ার পরপরই হঠাৎ পাঁচদিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প দাবি করছেন, তেহরানের সাথে তার ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ইরান যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের হাতে নেই বলে আলোচনা উঠেছে।
আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট আলোচনার কথা বলওে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা কোনো আলোচনায় বসেনি।
সার্বিক পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা, ১৯৭৩-এর সায়গন আর ২০২৬-এর তেহরানের মধ্যে এক ‘অদ্ভুত ও ভীতিকর’ মিল দেখতে পাচ্ছেন।
প্রশ্ন উঠছে, ডনাল্ড ট্রাম্প কি তাহলে নিক্সনের সেই পুরোনো ‘ফেস সেভিং এক্সিট’ বা সম্মান বাঁচিয়ে পিছু হটার কৌশলই বেছে নিয়েছেন?
ভিয়েতনামাইজেশন: পরাজয় যখন ‘কূটনৈতিক বিজয়’
ভিয়েতনাম যুদ্ধের শেষলগ্নে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জার বুঝেছিলেন যে, সামরিকভাবে যুদ্ধে জয় অসম্ভব।
তখন তারা ভিন্ন কৌশল খোঁজেন। তাদের ধারণা ছিল, সরাসরি পরাজয় স্বীকার করলে মার্কিন আভিজাত্য ধুলোয় মিশে যাবে। এটা থেকে রক্ষা পেতেই চালু করেন ‘ভিয়েতনামাইজেশন’ নীতি।
‘ভিয়েতনামাইজেশন’ নীতির মূল কৌশল ছিল- মার্কিন সেনারা যুদ্ধের মাঠ থেকে সরে যাবে। আর যুদ্ধের দায়ভার তুলে দেওয়া হবে তাদের সহযোগী দক্ষিণ ভিয়েতনামি বাহিনীর ওপর।
গোপন কৌশলের চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হয় ১৯৭৩ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তির মাধ্যমে।
সেই চুক্তির মাধ্যমেই ভিয়েতনামে ‘নাকানিচুবানি’ খাওয়া মার্কিন বাহিনীর প্রস্থানকে কাগজে কলমে দেখানো হয় ‘সম্মানজনকভাবে’ বেরিয়ে আসা হিসেবে।
আমেরিকার দাবিকে পালাপোক্ত করতে ‘সাজানো’ সেই শান্তি চুক্তির জন্য বিতর্কিতভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল হেনরি কিসিঞ্জারকে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ‘নাজেহাল’ অবস্থায় পড়া ট্রাম্পও কি যুদ্ধ থেকে এখন সরে আসতে চাচ্ছেন? এই প্রশ্ন এখন সরাসরি তুলছেন সমর কৌশল বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্পের ‘পাঁচ দিনের জুয়া’
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এরমধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘোষণা দেন।
কিন্তু ওই আল্টিমেটামকে পাত্তা দেয়নি ইরান। উল্টো হুমকি দেয় তারা।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন মিত্রদের পানি শোধনাগারগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, ট্রাম্পের হঠাৎ এই যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বিশ্ব অর্থনীতি।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে বলে ব্লুমবার্গ এনার্জি রিপোর্টের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যদিও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তবে এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পকে একটি ‘অর্থনৈতিক শ্বাস নেওয়ার জায়গা’ দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তের পেছনে মিত্র রাষ্ট্রগুলোর প্রচণ্ড চাপ ছিল বলে মনে করেন ইউক্রেনের ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ সের্হি দানিলভ।
দানিলভের মতে, জ্বালানি অবকাঠামো এবং পানি শোধনাগারগুলোতে হামলার হুমকির পরে আমেরিকার যুদ্ধের মাশুল দিতে সরাসরি অস্বীকার করেছেন আরব দেশগুলোর শাসকরা।
আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নেতিবাচক রিপোর্ট এবং মিত্রদের এই পিছুটান ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে বলে মনে করেন তিনি।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: ইরানের ভেতরে বিভাজনের বীজ
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির এই কৌশলকে ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ মনে করছেন অনেকেই।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সাথে গোপন আলোচনা চলছে। তবে সেই দাবি অস্বীকার করেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এবং সামরিক বাহিনী।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিসের সিনিয়র ফেলো বেহনাম বেন তালেবলু মনে করেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত চাল।
“ট্রাম্প যখন আলোচনার কথা বলেন, তখন ইরানের সাধারণ জনগণের মনে আশার সৃষ্টি হয়। আর সামরিক বাহিনীর মনে তৈরি হয় সন্দেহ। এটি ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে একটি আস্থার সংকট তৈরি করার চেষ্টা।”
যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় ইরান এক কঠিন দোলাচলে পড়েছে বলে মনে করেন বেন তালেবলু।
তিনি বলেন, ইরান যদি আক্রমণাত্মক হয়, তবে বিশ্ববাসীকে ট্রাম্প বলতে পারবেন, “আমি শান্তির সুযোগ দিয়েছিলাম, কিন্তু ইরানই যুদ্ধ চায়।”
আর ইরান যদি চুপ থাকে, তবে ট্রাম্প একে নিজের ‘কূটনৈতিক বিজয়’ হিসেবে প্রচার করবেন বলেও মনে করে এই বিশ্লেষক।
ট্রাম্পের মধ্যবর্তী পরীক্ষা
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী নভেম্বরে। এর আগে মূল্যস্ফীতি ইস্যুতে ট্রাম্পকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।
এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে নিজেকে একজন ‘মাস্টার নেগোশিয়েটর’ হিসেবে প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প।
সম্পাদকীয় নিবন্ধে লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, “ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতি আসলে তার নিজের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। তিনি বুঝতে পারছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের একটি অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ আমেরিকার অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে। আর এটাই নির্বাচনে তার পরাজয় নিশ্চিত করবে।”
শান্তি নাকি ধ্বংসের পূর্বাভাস?
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির কৌশলকে ‘ট্যাকটিক্যাল ম্যানুভার’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষক বেহনাম বেন তালেবলু।
তার মতে, ইরানকে দমানোর চেয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পাওয়ার জন্য সময় নিচ্ছেন ট্রাম্প।
“এটি স্থায়ী শান্তি নয়, বরং বড় যুদ্ধের আগে শক্তি সঞ্চয়,” বলেন তালেবলু।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ইউক্রেনের সের্হি দানিলভ বলেন, ভিয়েতনামের সেই পুরোনো কৌশল অবলম্বন করে এখন সম্মান বাঁচানোর চেষ্টা করছেন ট্রাম্প।
‘ইরান এখানে বিজয়ী অবস্থানে আছে’ বলে মনে করেন এই ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ।
ভিয়েতনামাইজেশন কৌশল নেওয়ার পরও সায়গনের পতন ঠেকাতে পারেনি আমেরিকা।
তাই সংশয় দেখা দিয়েছে যে, ট্রাম্পের ‘ফেস সেভিং’ কৌশল কি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে পারবে?
এই সংশয়ের মূলে রয়েছে- ইরান ও আমেরিকার দ্বৈরথ। এটা বিশ্বকে এমন এক অর্থনৈতিক ও সামরিক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে, যা থেকে উত্তরণ সহজ নয় বলে মনে বিশ্লেষকদের ধারণা।
আগামী পাঁচ দিন বিশ্ববাসীর নজর থাকবে ওমান আর কাতারের দিকে। কারণ পর্দার আড়ালের আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এই দুই দেশের নাম সামনের সারিতে রয়েছে।
গোপন আলোচনার মাধ্যমে সত্যিকারের যুদ্ধবিরতির চুক্তি কি হবে, নাকি এটি কেবলই একটি ‘সম্মানজনক পলায়নের’ রাস্তা খুলে দেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে।