দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনি প্রচারণায় ডনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে বিশ্বজুড়ে 'চিরস্থায়ী যুদ্ধ' বন্ধ করবেন। কিন্তু ক্ষমতা নেওয়ার এক বছর পর এসে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য।
ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে, যেখানে প্রশ্ন উঠছে ট্রাম্প কি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন?
‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ কি এখন 'এসক্যালেশন ট্র্যাপ'
ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা ‘সর্বোচ্চ চাপ’ এবং ‘পিস থ্রু স্ট্রেংথ’ অর্থাৎ ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’।
এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে নতুন পরমাণু চুক্তিতে বাধ্য করা। একইসাথে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমানো।
এখনকার বাস্তবতা ভিন্ন। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্পের এই নীতি এখন একটি 'এসক্যালেশন ট্র্যাপ’ বা 'পাল্টা আঘাতের চক্রে' আটকে গেছে। ইরান এখন আর আগের মতো রক্ষণাত্মক নয়। বরং তারা চাপের মুখে তারা নত না হয়ে, পাল্টা আঘাতের মাত্রা বাড়ানোর বার্তা দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র ফেলো স্টিভেন কুকের মতে, ট্রাম্পের কৌশল ছিল ইরানকে দরকষাকষির টেবিলে আনা।
“কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি উভয় পক্ষকে এমন এক যুদ্ধের কিনারায় নিয়ে গেছে যা হয়তো কেউই চায়নি।”
ট্রাম্প কি নেতানিয়াহুর হাতের পুতুল?
ইরান ইস্যুতে ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কে বড় ফাটলের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা।
অন্যদিকে, ট্রাম্প তার 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি বড় যুদ্ধে জড়িয়ে মার্কিন অর্থ ও প্রাণহানি হোক তা চান না।
ইসরায়েলি পত্রিকা হায়ারেতজ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, গত কয়েক মাসে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইসরায়েল এমন কিছু হামলা চালিয়েছে, যার আগাম তথ্য ওয়াশিংটনকে দেওয়া হয়নি।
ট্রাম্প নিজেও দাবি করেছেন, ইরানের দক্ষিণ পারস গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে তিনি আগে থেকে কিছুই জানতেন না। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলেছেন, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথেই সমন্বয় করেই চালানো হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং লেখক বব উডওয়ার্ডের মতে ট্রাম্পের অনিচ্ছাসত্ত্বেও নেতানিয়াহু তাকে ইরানের বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলছেন।
প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি ইসরায়েলের হাতের পুতুলে পরিণত হচ্ছেন?
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক কুইন্সি ইনস্টিটিউট বলছে, ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখন নেতানিয়াহুর নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াইয়ের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। আর এই বিষয়টি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের উপরে তার নিজের নিয়ন্ত্রণকেই কমিয়ে দিচ্ছে।
তেলের বাজার কি জিম্মি?
বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয় যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে, তা ইরানের কব্জায়।
লন্ডনভিত্তিক এনার্জি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান সফলভাবে তেলের বাজারকে জিম্মি করতে পেরেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বলছে, এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দেড়শ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালি এমন একটি অর্থনৈতিক অস্ত্র, যা তেলের দাম বাড়িয়ে মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি ঘটাতে পারে। কমিয়ে দিতে পারে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা।
ইরান ঠিক এখানেই আঘাত হানার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন এনার্জি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষকরা।
মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের অগ্নিপরীক্ষা
এ বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। যা ট্রাম্পের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তেলের বাড়তি দাম এবং ইসরায়েল-ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়া নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মার্কিনিদের মধ্যে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং মুসলিম আমেরিকানদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সিএনএনের এক সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ আমেরিকান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে সরাসরি মার্কিন অংশগ্রহণের বিপক্ষে।
জরিপের তথ্যমতে, যদি তেলের দাম বাড়তে থাকে এবং যুদ্ধে মার্কিন সেনারা হতাহত হয়, তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে হতে পারে রিপাবলিকানদের।
যা ট্রাম্পকে 'লেইম ডাক প্রেসিডেন্টে’ পরিণত করবে অর্থাৎ মেয়াদের বাকি সময়টুকু ট্রাম্পকে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকতে হবে। ফলে ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে ট্রাম্পের ক্ষমতা।
মিত্রদের অবস্থান: দোলাচলে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত
এক সময় ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যুক্তরাষ্ট্রকে উসকানি দিত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু এখন বদলেছে সেই পরিস্থিতি।
হরমুজ প্রণালি রক্ষায় মিত্রদের সহযোগিতা চাইলেও ট্রাম্পের সেই আবেদনে উল্লেখযোগ্য সাড়া দেয়নি দেশগুলো। আমেরিকাকে লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে রাজি হলেও, সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে ইরানের মিসাইলের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকি নিতে নারাজ মিত্ররা।
ট্রাম্প বরাবরই নেটোর সমালোচনা করে আসছেন। এবারও ইরানের বিরুদ্ধে নেটোর সক্রিয় সহযোগিতা পাচ্ছেন না তিনি। ফ্রান্স ও জার্মানি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার পক্ষে, যুদ্ধের পক্ষে নয়।
ট্রাম্পের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আর সেটি হলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইউরোপ।
এদিকে এই যুদ্ধে নেটোর সদস্য দেশগুলো যদি এগিয়ে না আসে, তবে ইউরোপের নিরাপত্তা বলয় থেকে হাত গুটিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প।
এই টানাপোড়েন এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে নেটোর ভবিষ্যতকে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, নেটোর মধ্যে যে ঐক্য ছিল, ইরান সংকট তা ধুলিসাৎ করে দিচ্ছে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক ভিত্তির ভাঙন
ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল 'আমেরিকা ফার্স্ট'। যা তাকে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতিয়ে এনেছিলো। ট্রাম্পের এই নীতির সমর্থকরা মনে করেন, বিদেশের মাটিতে আমেরিকানদের রক্ত ও অর্থ ব্যয় করা বৃথা।
তবে ইরান পরিস্থিতি ট্রাম্পকে তার নীতি থেকে অনেকটাই সরিয়ে এনেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট টমাস ফ্রিডম্যানের বলেছেন, “যদি ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় কোন যুদ্ধ শুরু করেন, তবে তিনি তার নিজের ভোটারদের কাছে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে গণ্য হবেন।”
এই যুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং ডেমোক্রেটদের হাতে ‘বড় অস্ত্র’ তুলে দিচ্ছে বলে মনে করেন ফ্রিডম্যান।
আমেরিকার শেষের শুরু?
এই যুদ্ধে যদি আমেরিকা সরাসরি জিততে না পারে অথবা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘস্থায়ী কোন চোরাবালিতে আটকে যায়, তবে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় আমেরিকার আধিপত্য চিরতরে শেষ হয়ে যেতে পারে।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইরান যদি রাশিয়ার ড্রোন এবং চীনের অর্থনৈতিক সহায়তায় আমেরিকাকে রুখে দিতে পারে, তবে তা বিশ্বজুড়ে এই বার্তা দেবে যে, আমেরিকা আর 'একমাত্র পরাশক্তি' নয়। আর সেটি ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব পাকাপোক্ত করতে পারে চীন ও রাশিয়া।
ট্রাম্পের হাতে কি কোনো পরিকল্পনা আছে?
এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রশাসনের ভেতরে কাজ করা সূত্রগুলোর বরাতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’ লিখেছে, হোয়াইট হাউসের মধ্যে বর্তমানে দুটি পক্ষ রয়েছে। এক পক্ষ চায় সীমিত হামলা চালিয়ে ইরানকে ভয় দেখাতে। আর ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পক্ষে মত দ্বিতীয় পক্ষের।
নিজেকে একজন 'ডিল মেকার' হিসেবে অনেকবার প্রচার করেছেন ট্রাম্প। একইসাথে ইরানের পক্ষে আলোচনায় বসার মত কেউ জীবিত নেই বলে নিজেই দাবি করেছেন তিনি।
বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনি এবং রেভল্যুশনারি গার্ডসের সাথে কোনো আলোচনার পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত অসম্ভবই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেই পোস্টে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে পাঁচদিনের জন্য হামলা বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে দাবি করে ট্রাম্প বলেন, “গঠনমূলক ও গভীর ও বিস্তারিত আলোচনার এই ধরনের ওপর ভিত্তি করে যা পুরো সপ্তাহজুড়ে চলবে, আমি ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’কে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাঁচদিন হামলা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছি।"
আপাতদৃষ্টিতে ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বিহীন এই যুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তো বটেই, বিশ্ব অর্থনীতিকেও ঠেলে দিতে পারে ধ্বংসের মুখে।
রয়টার্স, আল জাজিরা, ফরেন অ্যাফেয়ার্স ও কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, ব্রকিং ইন্সটিটিউট অবলম্বনে