হজ সামনে, কিন্তু সৌদি আরবের আকাশে এখন যুদ্ধের ছায়া। ইসলামের পবিত্রতম এই সমাবেশ শুরু হতে আর তিন মাসও বাকি নেই, এমন সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে, এবার সৌদি আরবকে শুধু লাখ লাখ মানুষের হজযাত্রা সামলালেই হবে না বরং একই সঙ্গে মক্কা, মদিনা এবং পুরো হজ করিডোরকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ফ্লাইট বিপর্যয় ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যেও নিরাপদ রাখতে হবে।
এই বছর হজ শুরু হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ২৪ মে, আর হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ার কথা ১৮ এপ্রিল থেকে। এরইমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ২৭ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
জেদ্দার কিং আবদুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্যক্রমে বিঘ্নও দেখা দিয়েছে, ১৪টি দেশের জন্য ভিসা প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি এসেছে এবং মক্কা-মদিনার সুরক্ষায় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এখন সক্রিয়।
ফলে প্রশ্ন এখন আর যুদ্ধ হজকে প্রভাবিত করবে কি না, সেটি নয়; বরং এই সংঘাত ২০২৬ সালের হজকে কতটা বদলে দেবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
আঠারো লাখ হজযাত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে আলাদাভাবে ভাবতে হচ্ছে সৌদি আরবকে কারণ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানছে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে।
হজ কবে
হজ কার্যক্রম শেষ হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ২৯ মে, যদিও সৌদি আরবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে তা একদিন এদিক ওদিক হতে পারে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ার কথা ১৮ এপ্রিল। অর্থাৎ নিরাপত্তা প্রস্তুতি চূড়ান্ত করতে সৌদি আরবের হাতে থাকবে প্রায় দশ সপ্তাহ।
এই বছরের হজযাত্রীর লক্ষ্যমাত্রা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবর্তন করেনি সৌদি আরব। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে মোট ১৬ লাখ ৭৩ হাজার ২৩০ জন হজ পালন করেন, যার মধ্যে ১৫ লাখের বেশি ছিলেন ১৭১টি দেশ থেকে আসা হাজি। তার আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ১৬৪। ২০২৪ সালের তীব্র গরমে ১,৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর পর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়।
হজের কোটা সাধারণত প্রতি এক হাজার মুসলিম নাগরিকের বিপরীতে একজন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ ইন্দোনেশিয়ার; দুই লাখ ২১ হাজার। এরপর পাকিস্তান এক লাখ ৭৯ হাজার ২১০ এবং ভারত এক লাখ ৭৫ হাজার ২৫।
সৌদি আরবের ‘ভিশন টোয়েন্টি থার্টি’ অনুযায়ী বছরে ৩০ লাখ হজযাত্রী ও তিন কোটি ওমরাহ যাত্রী গ্রহণের লক্ষ্য থাকলেও, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাত সেই পরিকল্পনাকে নতুন চ্যালেঞ্জে ফেলেছে।
এই বছর সেই সংখ্যা স্বাভাবিক থাকবে নাকি কমে যাবে, তা এখন মূলত নির্ভর করছে যুদ্ধের গতি, সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষার ওপর বিদেশি সরকারগুলোর আস্থা এবং জেদ্দায় পূর্ণমাত্রায় ফ্লাইট চালু করতে এয়ারলাইনসগুলার প্রস্তুতির ওপর।
যেভাবে বদলে গেল হজের নিরাপত্তার হিসাব
এই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর হজের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে শুধুমাত্র জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ ছিল হজ। তবে এবার তা যুদ্ধকালীন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। এর মধ্যে রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস, রাস তানুরায় আরামকোর তেল স্থাপনা এবং প্রিন্স সুলতান এয়ারবেইসের কাছে রেইডার স্থাপনাও রয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একাধিক দফায় আকাশপথে আসা হুমকি প্রতিহত করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত মক্কা ও মদিনা সরাসরি হামলার বাইরে রয়েছে। তবে বিষয়টি কাকতালীয় নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের হিসাব-নিকাশে মক্কা ও মদিনার অবস্থান আলাদা।
আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও উভয় পক্ষ একে অপরের পবিত্র ধর্মীয় স্থানগুলোকে লক্ষ্য করেনি।
এই অলিখিত নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল আছে। সহজ যুক্তি হলো, মুসলমানদের জন্য পবিত্র এই শহরগুলোর ওপর হামলা হলে প্রায় ১৮০ কোটি সুন্নি মুসলমান তেহরানের বিরুদ্ধে এক হয়ে যেতে পারে।
তবে অলিখিত নিয়ম কখনোই পুরোপুরি নিশ্চয়তা দেয় না, আর সৌদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীরা শুধু প্রতিপক্ষের সংযমের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারেন না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের আগে যেসব ঝুঁকি ছিল না, এখন সেগুলোর নতুন কয়েকটি মাত্রা তৈরি হয়েছে।
আকাশে ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ, যা নিচে পড়ে আগুন, ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের কারণ হতে পারে। লাখ লাখ হাজির উপস্থিতিতে মক্কা, মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
সৌদি আরব-ইরান বৈরিতা
ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে হজকে ঘিরে উত্তেজনা নতুন নয়।
মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব নিয়ে রিয়াদ ও তেহরানের দীর্ঘদিনের আদর্শিক প্রতিযোগিতাও একটি বড় কারণ।
হজ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় ১৯৮৭ সালের ৩১ জুলাই। সেদিন মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদের কাছে ইরানি হাজিরা বিক্ষোভ করেন। একটা সময় তা সহিংসতায় রূপ নেয় এবং চার শতাধিক মানুষ নিহত হন।
সৌদি আরবের তথ্য অনুযায়ী, আয়াতোল্লাহ খোমেনির নির্দেশে প্রায় এক লাখ ৫৫ হাজার ইরানি হাজি ‘ডিসঅ্যাভাওয়াল অব দ্য পলিথিয়িস্টস’ নামে একটি রাজনৈতিক সমাবেশের চেষ্টা করেন। সেখানে “ডেথ টু আমেরিকা” ও “ডেথ টু ইসরায়েল” স্লোগান দেওয়া হয়।
হজের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ – এই দাবি তুলে সৌদি আরব তাদের ওপর চড়াও হয়। সেই সংঘর্ষে ২৭৫ জন ইরানি হাজি, ৮৫ জন সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং অন্য দেশের ৪২ জন হাজিসহ মোট ৪০২ জন নিহত হন।
এই ঘটনার পর দুই দেশের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটে। ইরান সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিন বছর ইরানিদের হজে অংশ নেওয়া বন্ধ রাখে। ইরানের হাজি কোটা এক লাখ ৫০ হাজার থেকে কমিয়ে ৪৫ হাজারে নামিয়ে আনা হয়।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ঠিক হয় ১৯৯১ সালে। তবে এরপরও বিভিন্ন সময়ে হজকে ঘিরে উত্তেজনা দেখা গেছে।
এরপর ২০১৫ সালে মিনায় হজের সময় পদদলিত হয়ে দুই হাজার ৪০০ জন মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে ৪৬৪ জন ছিলেন ইরানি। এ ঘটনার জন্য ইরান সৌদি আরবের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে।
শিয়া ধর্মীয় নেতা নিমর আল-নিমরকে সৌদি আরব ২০১৬ সালে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সেসময় তেহরানে সৌদি দূতাবাসে হামলার হয়। এরপর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আবার ভেঙে পড়ে। সেই বছরও কোনো ইরানি নাগরিক অংশ নিতে পারেননি।
চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয় এবং ইরানিদের জন্য কোটা বৃদ্ধি ও সরাসরি ফ্লাইট চালুর মতো কিছু সমঝোতা হয়।
তবে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া নতুন যুদ্ধ সেই অগ্রগতি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, ইরান হজকে সংঘাত থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করবে, নাকি চলমান উত্তেজনা সেই সংযম ভেঙে দিতে পারে।
ইরানিরা কি হজে যেতে পারবে
সৌদি আরব ইতোমধ্যে ইরানসহ ১৪টি দেশের নাগরিকদের জন্য সাধারণ ভিজিট ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। তবে সরকারি হজ পারমিটধারীদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয় বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, রিয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানিদের হজ থেকে বাদ দেয়নি।
তবে বাস্তবে তাদের অংশগ্রহণের পথে নানা বড় বাধা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভিসা প্রক্রিয়া, আকাশপথ এবং যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এমনটা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বাধা তৈরি হয়েছে যাতায়াত ও নিরাপত্তা নিয়ে। যুদ্ধের কারণে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট নেই। ফলে ইরানি হাজিদের তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে যেতে হবে। কিন্তু বর্তমানে আঞ্চলিক আকাশসীমা বন্ধ থাকায় সেটাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
কী করবে সৌদি আরব
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব সম্ভবত আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করবে না, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির কারণে ইরানি হাজিদের অংশগ্রহণ কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এতে একদিকে সৌদি আরব সরাসরি ধর্মীয় অধিকারের বাধা দেওয়ার অভিযোগ এড়াতে পারবে, অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকিও কমানো যাবে।
সাধারণত ইরান থেকে ৮৬ হাজার ৫০০ জনকে হজের অনুমতি দেয় সৌদি আরব। ১৯৮৭ সালের ঘটনার পর তা ৪৫ হাজারে নেমে এসেছিল। ২০১৬ সালে তা ছিল শূন্য। ২০২৩ এর পর আবার ইরানিরা হজের অনুমতি পান।
সৌদি আরবের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম
নিজেদের সুরক্ষায় বিলিয়ন ডলার অবকাঠামো তৈরি করেছে সৌদি আরব। হজ মৌসুম সামনে রেখে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সক্রিয় করছে, যেন জেদ্দা থেকে মদিনা পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার এলাকায় হাজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট পিএসি-থ্রি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কাছে প্রায় নয় বিলিয়ন ডলারের ‘প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর’ বিক্রির অনুমোদন দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের বাইরে সবচেয়ে শক্তিশালী সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন সৌদি আরবের। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে সেই প্রমাণও দিয়েছে তারা।
হজের সময় পশ্চিম সৌদি আরবজুড়ে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের সম্ভাবনা রয়েছে। ইরান থেকে মক্কার দূরত্ব প্রায় ৯০০ কিলোমিটার হওয়ায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার জন্য কিছুটা সময় পাওয়া যায়।
বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে ড্রোন। ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে হামলার ঝুঁকি রয়েছে কারণ সেখান থেকে মক্কার দূরত্ব ৪০০ কিলোমিটারেরও কম।
হজ মৌসুমে বিশাল সংখ্যক যাত্রীদের সামাল দেওয়ার কথা মাথায় রেখেই জেদ্দায় কিং আবদুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৈরি করা হয়েছে।
হজ মৌসুমে আট সপ্তাহে জেদ্দায় অতিরিক্ত পাঁচ থেকে সাত হাজার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট আসে। প্রতিদিন ৮০ হাজার যাত্রী সামলাতে সক্ষম এই হজ টার্মিনাল।
এআই প্রযুক্তি
সৌদি আরব হজের নিরাপত্তা জোরদার করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার করছে, ফলে মক্কা ও মদিনা এখন বিশ্বের সবচেয়ে নিবিড়ভাবে নজরদারিতে থাকা জনসমাগমপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মিনাতে ২০১৫ সালের দুর্ঘটনার পর থেকেই স্মার্ট ক্যামেরা, সেন্সর নেটওয়ার্ক, প্রবেশপথ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং এআই–নির্ভর ‘ক্রাউড অ্যানালাইসিস’ প্রযুক্তি দ্রুত সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
এসব প্রযুক্তি ‘রিয়েল-টাইমে’ মানুষের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে, কোথাও অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হলে তা আগেই শনাক্ত করে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে দেয়।
মক্কার কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সেন্টার থেকে গ্র্যান্ড মসজিদের প্রবেশপথ ও আশপাশের এলাকা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
হাজিরা কতটা নিরাপদ
যুদ্ধ শুরুর পর মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস সাময়িকভাবে জেদ্দা ফ্লাইট বন্ধ করে, এয়ার ইন্ডিয়া কিছু সময় বন্ধ রেখে পরে সীমিত পরিসরে চালু করে, আর টার্কিশ এয়ারলাইনস, এমিরেটসসহ অনেক সংস্থা ইরানি আকাশসীমা এড়িয়ে বিকল্প রুট নিতে বাধ্য হয়।
এতে যাত্রাসময় বেড়েছে, জ্বালানি খরচও বাড়ছে। একই সময়ে যুদ্ধঝুঁকি বিমার খরচও বেড়ে গেছে, ফলে অনেক এয়ারলাইনসের জন্য সৌদি আরবে ফ্লাইট চালানো আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠেছে।
সমস্যা শুধু বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সীমাবদ্ধ নয়। ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, নাইজেরিয়ার মতো দেশ থেকে জাতীয় হজ কমিটির চার্টার ফ্লাইটগুলোও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে।
স্থলপথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। হারামাইন হাই-স্পিড রেল, যা ২০১৮ সালে চালু হয়েছে, হজের সময় প্রতিদিন প্রায় ৬০ হাজার যাত্রী বহন করে। কিন্তু উঁচু রেললাইন, স্টেশন ও বিদ্যুৎব্যবস্থাও সংঘাতের সময় ঝুঁকিপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব নতুন টার্মিনাল চালু করতে চায়। খুঁজছে বিকল্প রুটও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সবচেয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি সামরিক নয়, বরং লজিস্টিক ও পরিবেশগত।
মক্কায় ইরানের সরাসরি হামলার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম, কারণ এর রাজনৈতিক পরিণতি তেহরানের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো ফ্লাইট বিপর্যয় ও আকাশপথের অনিশ্চয়তা।
হজে অংশ নেওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন দেশ নিজেদের নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক ও বাস্তব ঝুঁকি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেবে। শেষ পর্যন্ত ১৫ লাখের বেশি সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক হাজির প্রত্যেকের জন্যই বিষয়টি হয়ে উঠবে ব্যক্তিগত এক কঠিন সিদ্ধান্ত।
হজ অর্থনীতি
হজ বাতিল করা সৌদি আরবের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করবে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় পর্যটন খাত থেকে বছরে ১,২০০ কোটি ডলার আয় হয়। এটি দেশটির তেল বাণিজ্যের বাইরের অর্থনীতির প্রায় ২০ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ৭ শতাংশ।
মক্কা ও মদিনার স্থানীয় অর্থনীতিও পুরোপুরি হজ ও ওমরাহকেন্দ্রিক। হোটেল, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা, খাবার, সেবা খাত সবকিছুই এই মৌসুমকে ঘিরে সাজানো। এর পাশাপাশি হজ অবকাঠামো উন্নয়নে সৌদি আরব প্রায় ৮৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
ফলে ২০২৬ সালের হজ বাতিল বা ব্যাপক আকারে সীমিত করা হলে সেটি শুধু আয় কমাবে না, বরং বিশাল বিনিয়োগকেও অকার্যকর করে দেবে।
সৌদি রাষ্ট্রের ধর্মীয় বৈধতার প্রশ্নও এখানে জড়িত। কারণ ‘কাস্টোডিয়ান অব দ্য টু হোলি মস্ক’ হিসেবে হজ আয়োজন নিশ্চিত করা সৌদি বাদশাহর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য।
যুদ্ধ কি হাজিদের নিরাপত্তা বাড়াবে?
স্বাভাবিকভাবে মনে হচ্ছে, যুদ্ধের কারণে ২০২৬ সালের হজ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তবে কিছু বিশ্লেষক উল্টো যুক্তিও দিচ্ছেন: যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি হয়তো হজকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় আরও নিরাপদ করে তুলতে পারে বলে ধারণা তাদের।
তাদের মতে, যুদ্ধের কারণে হাজির সংখ্যা কমে যেতে পারে, কারণ ফ্লাইট বিঘ্ন, বিমা ব্যয়, ভ্রমণ সতর্কতা ও ভিসা জটিলতা অনেক সম্ভাব্য হাজিকে নিরুৎসাহিত করবে। এই সংখ্যা কম হলে ঝুঁকিও কমে যেতে পারে।
একই সঙ্গে অনিবন্ধিত হাজিদের সংখ্যাও কমে আসতে পারে, কারণ যুদ্ধকালীন কঠোর নিরাপত্তা, অতিরিক্ত চেকপয়েন্ট এবং সীমিত ভিসা প্রক্রিয়া অবৈধভাবে হজে প্রবেশ করা কঠিন করে তুলবে। এতে চিকিৎসা, শীতলীকরণ সুবিধা ও জরুরি সহায়তা থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যাও কমতে পারে।
এ ছাড়া যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৌদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্কতায় থাকবে। সেনা, নজরদারি প্রযুক্তি, চিকিৎসা দল এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় থাকবে।
আর যদি ইরানি হাজিদের অংশগ্রহণও সীমিত হয়, তাহলে অতীতে রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে তৈরি হওয়া কিছু ঝুঁকিও কমতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব যুক্তি সত্ত্বেও ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার মতো ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কারণ মক্কা এবং মদিনায় একটিমাত্র বড় দুর্ঘটনাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
হজ বিঘ্নিত হলে কী হবে?
এবারের হজ যদি বড় ধরনের বিঘ্নের মুখে পড়ে, তাহলে এর প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক মানবিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
হজ কেবল সৌদি আরবের একটি জাতীয় আয়োজন নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সমাবেশ এবং ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। ফলে এতে বিঘ্ন ঘটলে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও কৌশলগত সব ক্ষেত্রেই তার অভিঘাত পড়বে।
যুদ্ধাবস্থায় হজ চালু রেখে যদি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে সেটি সৌদি আরবের জন্য হজ বাতিলের চেয়েও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। সবাই সৌদি আরবের কাছে জবাব চাইবে, কারণ ‘কাস্টোডিয়ান অব দ্য টু হোলি মস্ক’ হিসেবে নিরাপত্তার চূড়ান্ত দায়িত্ব তাদেরই।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এর প্রভাব অনেক। যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা সৌদি অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিশেষ করে হজ ও ওমরাহভিত্তিক পর্যটন খাত দীর্ঘমেয়াদে পিছিয়ে যেতে পারে।
সম্ভাব্য হাজিরা হজ স্থগিত করতে পারেন, বিদেশি সরকারগুলো ভ্রমণ সতর্কতা জারি করতে পারে, আর এতে বহু বছরের প্রবৃদ্ধির হিসাব ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।
তবে সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়বে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রশ্নে। বিশ্বের ১৮০ কোটির বেশি মুসলমানের কাছে হজ একটি পবিত্র ফরজ; এমন একটি ইবাদত যদি যুদ্ধের কারণে ব্যাহত হয়, তাহলে শুধু যুদ্ধরত পক্ষ নয়, সৌদি আরবের দিকেও ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও ধর্মীয় চাপ এত বেশি যে সৌদি আরব হজ বাতিল করবে না; বরং নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এটি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
কারণ হজের অর্থনীতি শুধু সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ নয়, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ বহু মুসলিম দেশের ট্রাভেল এজেন্সি, প্রশিক্ষণ, পোশাক, সরঞ্জাম ও আর্থিক সেবা খাতও এর সঙ্গে জড়িত।
এরপর প্রশ্ন উঠতে পারে, পবিত্র স্থানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে সৌদি আরব কতটা যোগ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি হলে তা দেশটির ডি-ফ্যাক্টো নেতা যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্ব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশেষ করে যদি এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত হজ ব্যবস্থাকেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
(সামা টিভি, মিডল ইস্ট আই, হাউস অব সাউদ অবলম্বনে)