আপনিও হয়ত এই কথাটি শুনেছেন, “চীনকে ঘুমাতে দাও। কারণ, সে যখন জেগে উঠবে, তখন পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেবে।”
২০০ বছর ধরে এই উক্তিটি চলে আসছে নেপোলিয়ান বোনাপার্টের নামে। ফরাসি সম্রাট ও ইতিহাসের অন্যতম সেরা সামরিক কমান্ডার এই কথা আদৌ বলেছিলেন কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে চীনের সম্ভাব্য উত্থান বুঝতে এই উক্তিটি প্রাসঙ্গিক।
১৮০৪ সাল থেকে দেড় দশক ফ্রান্স শাসন করেছিলেন নেপোলিয়ান। তখনও চীনের ছিলো বিশাল জনসংখ্যার বহর, হাজার হাজার বছরের সমৃদ্ধ সভ্যতা আর শক্ত অর্থনৈতিক ভিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব ছিলো না।
সেই সময় ইউরোপে চলছিল শিল্পবিপ্লব। নতুন নতুন উপনিবেশ বিস্তার আর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল ইউরোপ। চীন তখন আফিমের ঘোরে বিভোর।
অনেকের ধারণা, নেপোলিয়ান চীনকে ‘ঘুমন্ত ড্রাগন’ বলতে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, চীন যদি আফিমের নেশা ছেড়ে আধুনিক হয়, নিজেদের সংগঠিত করে এবং জনশক্তি ও সম্পদকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে বদলে যেতে পারে বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য।
২০০ বছর পরে এসে নেপোলিয়ানের সেই কথাই সত্য হতে যাচ্ছে। ঘুম ভেঙেছে চীনের। নিশ্বাস ফেলছে পরাক্রমশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাড়ের ওপর। সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে এবং দুনিয়াজুড়ে আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্যকে হটিয়ে ড্রাগনরা হতে চাইছে বিশ্বের নিয়ন্ত্রক।
হাল দুনিয়ার সব প্রান্ত, সব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এবং সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় সমান্তরালভাবে কাজ করছে ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের সমীকরণ।
অনিবার্যভাবেই প্রশ্ন উঠছে, চীন কি আধিপত্য বিস্তারকারী বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে দেবে? পৃথিবী কি আটকে গেছে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের মধ্যে?
ওয়াশিংটন ও বেইজিং কি স্থিতিশীল সহাবস্থানের পথ খুঁজে নেবে? নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে এবং চীনই হতে যাচ্ছে নতুন বিশ্ব পরাশক্তি?
দুই হাজার বছরের অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন
যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত একটি আর্থিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো ম্যাককিনসি গ্লোবাল ইনস্টিটিউট। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী এই প্রতিষ্ঠান অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, উদীয়মান প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক ট্রেন্ডগুলো নিয়ে গবেষণা করে, যা সহায়তা করে বিশ্বনেতা এবং করপোরেট প্রধানদের নীতি নির্ধারণে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্রের গতিপথ নিয়ে ম্যাককিনসির রয়েছে গভীর একটি গবেষণা। সেটাকে বলা হচ্ছে ‘ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক সেন্টার অব গ্রাভিটি’ বা বৈশ্বিক অর্থনীতির ভরকেন্দ্র। গত দুই হাজার বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র কোথায় কোথায় ছিলো, সেটাই তুলে ধরা হয়েছে ওই গবেষণায়।
তারা দেখাচ্ছেন, দুই হাজার বছর আগেও বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র ছিলো মিডল কিংডম বা চীনে। ১৮২০ সাল পর্যন্ত চীন ও ভারত সম্মিলিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতো বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ।
কেবল মাঝের ২০০ বছর ওই ভরকেন্দ্র সরে গিয়েছিলো ইউরোপ ও আমেরিকায়।
ম্যাককিনসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পর অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্রটি আবারও ফিরেছে এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে, বিশেষ করে চীনের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি এসেছে।
২০২৬ সালে ‘দ্য নেক্সট চায়না ইজ স্টিল চায়না’ গবেষণায় ম্যাককিনসি উল্লেখ করেছে, বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে যত দ্বন্দ্বই থাকুক না কেন, উৎপাদন ও ভোক্তাবাজারের গভীরতার দিক থেকে চীনকে প্রতিস্থাপন করা অন্য কোনো দেশের পক্ষে অসম্ভব। ২০৪০ সালের মধ্যে এককভাবে এশিয়া অঞ্চলের অবদান বৈশ্বিক জিডিপির ৫০ শতাংশে পৌঁছাবে, যার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে থাকবে বেইজিং।
এবার একজন নারী ধনকুবেরের গল্প বলবো। তিনি কত সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করতেন, তা শুনলে আপনার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।
গত ১২ই জুন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসাবে ইতিহাস তৈরি করেন ইলন মাস্ক, যিনি টেসলা ও স্টার লিংকের মালিক। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি তিনি।
ট্রিলিয়নিয়ার মানে এক হাজার বিলিয়ন ডলারের মালিক। বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটু বেশি। এই তুলনায় ইলন মাস্কের সম্পদের বাজারমূল্য বাংলাদেশের জিডিপির দ্বিগুণ।
চীনের যে নারীর কথা বলতে যাচ্ছি, ১৪০০ বছর আগে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন ইলন মাস্কের চেয়েও ১৬ গুণ বেশি সম্পদ।
সেই নারীর নাম উ জেতিয়ান। চীনের ইতিহাসের একমাত্র নারী শাসক। অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও আকর্ষণীয় এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন জেতিয়ান।
তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল রাজকীয় উপ-পত্নী হিসেবে। পরে তিনি সম্রাট গাওজং-কে বিয়ে করেন। স্থান পান সম্রাটের হেরেমে। উ জেতিয়ান ছিলেন উচ্চাকাঙ্খী বিদুষী নারী। কৌশল খাটিয়ে হেরেম থেকে বিতাড়িত করেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাজ্ঞীকে। সম্রাটের আরেক প্রিয় উপপত্নীকেও হত্যা করেন তিনি।
সম্রাট গাওজং বেঁচে থাকতেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে থাকেন উ জেতিয়ান। পর্দার আড়াল থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন চীনকে। এরপর মারা যান সম্রাট। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন জেতিয়ান এবং ৬৯০ থেকে ৭০৫ সাল পর্যন্ত ১৫ বছর চীনের সম্রাট ছিলেন এই নারী।
চীনের বিপুল সম্পদের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন উ জেতিয়ান। চীন তখন দুনিয়ার প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি, বৈশ্বিক জিডিপির ২৩ শতাংশই ছিল চীনের অধিকারে। উ জেতিয়ান নিয়ন্ত্রণ করতেন ১৬ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ। এ কারণেই তাকে ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী নারী বিবেচনা করা হয় তাকে।
চীনের আরেকজন শাসক ছিলেন, যার নাম সম্রাট শেনজং। এগারো শতকের এই সম্রাট কত সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করতেন জানেন? এটাও অবাক হওয়ার মতো তথ্য।
বর্তমান ইউরোপের সব দেশ এক করলে তাদের অর্থনীতির আকার যতবড় হবে, তার থেকেও বেশি সম্পদের নিয়ন্ত্রক ছিলেন শেনজং, যার পরিমাণ ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
তবে তিনি ছিলেন না কোনো বিলাসী শাসক। ছিলেন অর্থনীতি-মনস্ক দূরদর্শী এক সম্রাট। বিশ্বের প্রথম কাগজের মুদ্রার ব্যাপক প্রচলন, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থা চালু, লোহা ও ইস্পাতের উৎপাদন শুরু, নগরায়ণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চীনে ব্যাপকভাবে শুরু হয় শেনজং-এর আমলেই।
চীনের আরেক ব্যবসায়ী হলেন শেন ওয়ানসান। ১৪ শতকে সমুদ্রপথে বাণিজ্য করতেন বিদেশে। ঐতিহাসিক তথ্য ও অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান বাজারমূল্যে তার সম্পদের পরিমাণ ছিলো ৪০০ থেকে ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
বহু শতাব্দী আগে থেকেই চীন কতটা ধনী ছিলো, তা বোঝার জন্যই চীনের দুজন সম্রাট এবং এক ব্যবসায়ীর কথা বললাম এতক্ষণ। প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ ধনী ও অর্থনৈতিক পরাশক্তি ছিলো চীন। এর পেছনের কারণগুলো হলো- হাজার বছর ধরে সিল্ক তৈরির গোপন সূত্র ধরে রাখা , বিশ্ব বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা, নিখুঁত নকশার চিনামাটির বাসন আর চায়ের একচেটিয়া রপ্তানি বাজার।
ঐতিহাসিক সিল্ক রুট, বিশাল জনসংখ্যা, সুসংগঠিত অভ্যন্তরীণ বাজার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আর মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র প্রাচীনকাল থেকেই সমৃদ্ধ করেছিলো চীনকে।
দেশটির অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী ছিলো সেই বর্ণনা পাওয়া যায় ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যানগাস ম্যাডিসনের লেখায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়নের পরিমাপ এবং অর্থনৈতিক ইতিহাসের একজন বিশেষজ্ঞ মনে করা হয় ম্যাডিসনকে।
তার বিখ্যাত দৃুটি বই হলো, ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইকনোমি: অ্যা মিলেনিয়াল পারসপেকটিভ’ এবং ‘চাইনিজ ইকনোমিক পারফরম্যান্স ইন দ্য লং রান’।
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের মাধ্যমে অ্যানগাস ম্যাডিসন দেখিয়েছেন, গত দুই হাজার বছরের ইতিহাসে, মানে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতির পরাশক্তি ছিলো চীন। ১৮৫০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে নিজেদের অর্থনৈতিক প্রভাব ও শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পেরেছিলো তারা।
লজ্জার শতবর্ষ: আফিমের নেশা ও চীনের অবক্ষয়
দুই হাজার বছর ধরে বিশ্ব জিডিপির ২৫ থেকে ৩৩ শতাংশ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতো চীন। ১৮২০ সালে চীনের জিডিপি ছিলো সমসাময়িক ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি যুক্তরাজ্যের ৬ গুণ এবং সদ্য স্বাধীন হওয়া আমেরিকার ২০ গুণ।
কিন্তু ১৮৫০ সালের পর সেই শ্রেষ্ঠত্ব হারাতে শুরু করে চীন। ১৮৯০ সালের মধ্যে চীনের অর্থনীতি একেবারে ভেঙে পড়ে।
১৮৫০ থেকে ১৯৪৯ সাল ছিল চীনের ইতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায়। এই ৯৯ বছরকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘লজ্জার শতবর্ষ’ হিসেবে। এক সময়ের ধনী চীন লজ্জার শতবর্ষে পরিণত হয়েছিলো চরম দরিদ্র একটি দেশে।
যে দেশ এক সময় বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ জিডিপির নিয়ন্ত্রক ছিলো, সেই দেশের জিডিপি ১৯৫০ সালে নেমে আসে এক অঙ্কের ঘরে। তখন বিশ্ব জিডিপিতে চীনের অবদান ছিলো মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ।
কিন্তু কেন এই পতন? ধনী চীন হঠাৎ কীভাবে গরীব হয়ে গেলে? কারণ খুঁজতে গিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা দায়ী করেন অনেকগুলো ঘটনাকে।
অন্যতম একটি কারণ ছিল পাশ্চাত্যের শিল্প বিপ্লব। ১৮ শতকের শেষভাগে ইউরোপে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে শুরু শিল্প বিপ্লবের। মেকানাইজেশন বা যন্ত্র উদ্ভাবনের ফলে আমূল বদলে যায় বিশ্ব। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে উৎপাদন ক্ষমতা ও সম্পদ জ্যামিতিক হারে বাড়াতে থাকে পশ্চিমা দেশগুলো। তাদের ঐশ্বর্য ও প্রতিপত্তি বাড়ে। বাড়তে থাকে রাজনৈতিক প্রভাব। একের পর এক উপনিবেশ স্থাপন করতে থাকে ইউরোপের দেশগুলো।
কিন্তু চীন তখন আটকে ছিলো ঘোর অমানিশার ভেতর। প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন পদ্ধতিই ছিল তাদের ভরসা। আধুনিক প্রযুক্তির ধাক্কায় পিছিয়ে পড়তে শুরু করে প্রতিযোগিতা থেকে।
এর ওপর চীনে তখন চলছিলো ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ। ১৮৫০ সালে শুরু হওয়া তাইপিং বিদ্রোহ ছিলো মানব ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। কিং রাজবংশের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহে ২ থেকে ৩ কোটি মানুষ নিহত হয় বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।
বক্সার বিদ্রোহ, নিয়ান ও মুসলিম বিদ্রোহসহ নানা অভ্যন্তরীণ বিবাদ দমন করতে গিয়ে চীন সরকারের কোশাগার প্রায় শূন্য হয়ে যায়।
লজ্জার শতবর্ষে চীনের পতনের আরও একটি কারণ ছিলো, কিং রাজবংশের চরম দুর্নীতি ও অযোগ্যতা। ২৬৮ বছর চীন শাসন করতে গিয়ে কিং রাজবংশের সম্রাট ও আমলারা চরম হয়ে পড়েছিলেন দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিলাসপ্রিয়। এমনকি তারা পশ্চিমাদের উদ্ভাবিত উন্নত প্রযুক্তি, রেলপথ এবং আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র গ্রহণ করতেও অনীহা দেখান।
চীন আবদ্ধ হতে থাকে চরম রক্ষণশীলতার মোড়কে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নিত্যনতুন উদ্ভাবন ও আবিষ্কার থেকে যোজন যোজন দুরে দুরে সরে যায় চীন।
এই সময় আরেকটি ঘটনা ঘটে। চীনে জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটে দেখা দেয় চরম দুর্ভিক্ষ। ১৮ থেকে ১৯ শতকের মধ্যে দেশটির জনসংখ্যা ১৪ কোটি থেকে একলাফে বেড়ে হয় ৪৪ কোটি। সেই তুলনায় চাষযোগ্য জমি বা শিল্পায়ন কোনোটাই বাড়েনি। এর ফলে বিরাট খাদ্য সংকটের মুখে পড়ে চীন।
তবে অর্থনৈতিক পরাশক্তি থেকে চীনের গরীব হয়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল আফিম যুদ্ধ। মানসভ্যতার ইতিহাসের বিরল এই যুদ্ধকে বিবেচনা করা হয় অন্যতম নিকৃষ্ট, অনৈতিক এবং কুখ্যাত অধ্যায় হিসাবে।
ইতিহাসের প্রায় সব যুদ্ধই হয়েছে ভূখণ্ড, ক্ষমতা বা আদর্শের জন্য। কিন্তু আফিম যুদ্ধই সম্ভবত একমাত্র যুদ্ধ, যা একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়েছিল আরেকটি স্বাধীন দেশের ওপর। লক্ষ্য ছিল মাদক বা নেশাদ্রব্য রপ্তানির অধিকার আদায়।
দুই দফায় হয়েছিল আফিম যুদ্ধ। প্রথমবার ১৮৩৯ সাল থেকে তিন বছর, প্রতিপক্ষ ব্রিটিশরা। দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ হয় ১৮৫৬ সাল থেকে ৪ বছর। এবার ব্রিটিশদের সঙ্গে যোগ দেয় ফরাসিরাও।
আফিম যুদ্ধের কারণ ছিল অসম বাণিজ্য। শিল্প বিল্পবে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রৈণির উদ্ভব হয় ১৮ শতকের শেষভাগে। চীনের চায়ের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয় ব্রিটেনে। রেশম, চিনামাটির বাসনসহ আরও নানা পণ্য বিপুল পরিমাণে আমদানি শুরু করে ব্রিটিশরা।
চীন তখনো বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র। রপ্তানি করলেও ইউরোপের কোনো পণ্য কিনতে আগ্রহী ছিলো না চীনারা। ব্রিটিশদের কাছ থেকে পণ্যের মূল্য হিসাবে চীনারা নিতো খাঁটি রৌপ্য মুদ্রা বা রুপা।
এর ফলে ব্রিটেনের বিপুল পরিমাণ রুপা চলে যাচ্ছিলো চীনে এবং এতে দেখা দেয় তীব্র বাণিজ্য ঘাটতি। ঘাটতি কমাতেই চীনে আফিম পাচার ও বিক্রি শুরু করে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা।
বাংলাসহ ভারতের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে ওয়ারেন হেস্টিংসের নাম। প্রথম গভর্নর-জেনারেল ছিলেন তিনি। ১৭৭২ থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর ভারতের শাসনভার পরিচালনা করেন তিনি।
তার আমলেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রূপান্তরিত হয় ভারতের মূল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরাশক্তিতে।
ওয়ারেন হেস্টিংস গভর্নর জেনারেল হওয়ার পরপরই ১৭৭৩ সাল থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আফিম পাচার বা চোরাচালান শুরু করে চীনে। এক দশকের মধ্যে অবৈধ এই কারবার ব্যবসায়িক নীতি হিসাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে। আফিম চাষে বাধ্য করা হতো উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের কৃষকদের। সেই আফিম পাচার হতে থাকে চীনে।
ব্রিটিশদের পরিকল্পিত মাদক ব্যবসার কারণে, সাধারণ জনগণ থেকে রাজকীয় সেনাবাহিনী পর্যন্ত আফিমের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন চীনের প্রায় চার কোটি মানুষ। দিনে গড়ে প্রায় ৪ থেকে ১২ টন আফিম চীনে পাচার করত ব্রিটিশরা। দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পর এটা আরও বেড়ে যায়। আর আফিমের মূল্য পরিশোধ করতে চীন থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করে রৌপ্য মুদ্রা বা রুপা। যে রূপা পণ্য রপ্তানি করে ব্রিটেন থেকে নিয়ে যেত চীনারা।
আফিমের নেশায় বিভোর হয়ে যায় চীন। ব্যাপক হারে আফিম পাচারের ফলে দেশটির সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সৃষ্টি হয় এক নজিরবিহীন ও প্রলয়ঙ্কারী বিশৃঙ্খলা।
১৮৩০ থেকে ১৮৪০- এক দশকের মধ্যে সোয়া কোটি মানুষ মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে আফিমের নেশায়। উচ্চবিত্ত, বুদ্ধিজীবী এবং সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষক, কুলি ও সৈন্যরা পর্যন্ত বুঁদ হয়ে পড়ে মরণনেশায়।
নেশার টাকা জোগাড় করতে দেউলিয়া হয়ে যায় লাখ লাখ পরিবার। আফিমের খরচের জন্য ঘরবাড়ি, জমিজমা, এমনকি নিজেদের সন্তান ও স্ত্রীদেরও দাস হিসেবে বিক্রি করতে শুরু করে তারা। আফিম সেবনের জন্য চীনে গড়ে ওঠে হাজার হাজার 'আফিম ডেন' বা আখড়া। সেই আখড়ায় দিনরাত নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকত কর্মক্ষম তরুণ ও যুবসমাজ।
চীনের উৎপাদন ব্যবস্থা ও কৃষি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অবশেষে ভেঙে পড়ে। উত্থান ঘটে দুর্নীতি ও মাফিয়াতন্ত্রের। স্থানীয় চীনা কর্মকর্তা, নৌবাহিনীর পাহারাদার এবং জলদস্যুদের ঘুষ দিয়ে পাচার কাজ করত ব্রিটিশরা।
আফিমের ছোবলে দুর্বল হয়ে পড়ে চীনের রাজকীয় সেনাবাহিনীও। হাজার হাজার সৈন্য ও সেনাপতি আসক্ত হয়ে হারিয়ে ফেলে শারীরিক ও মানসিক যুদ্ধক্ষমতা। পরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চীনের চরম পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণই ছিলো এই পঙ্গুত্ব।
একইসঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে প্রায় দেউলিয়া হয়ে যায় চীন। রুপা দিয়ে আফিম কেনা শুরু করায় রাজকোষ থেকে টন টন রুপা পাচার হয়ে যায় ব্রিটেনে। সংকটে পাগলা ঘোড়ার গতিতে বাড়তে থাকে মুদ্রাস্ফীতি। জিনিসপত্রের দাম হয়ে যায় আকাশচুম্বী।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সাধারণ কৃষকদের ওপর দ্বিগুণহারে চাপানো হয় করের বোঝা। পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে জন্ম নেয় চরম অসন্তোষের।
ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রিটিশদের এই মাদক বাণিজ্যই সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেয় অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী এক সাম্রাজ্যকে।
অবশেষে কঠোর অবস্থানে যায় চীন। ১৮৩৯ সালে আফিম নিষিদ্ধ করে কিং রাজবংশ। এই সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে।
লিন জেক্সু নামের এক চৌকস যুবক ছিলেন চীনের কিং সাম্রাজ্যের অত্যন্ত সৎ, দেশপ্রেমিক, দূরদর্শী এবং দক্ষ রাজকীয় কর্মকর্তা। ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে আছেন আফিম বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আপসহীন যোদ্ধা হিসাবে।
আফিমের নেশায় পুরো চীন যখন ধ্বংসের মুখে, তখন তিনি মাদকের বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। ১৮৩৮ সালে লিনকে ‘সাম্রাজ্যের কমিশনার’ হিসাবে পাঠানো হয় ক্যান্টন বন্দরে। তখন ক্যান্টন ছিলে চীনের একমাত্র বন্দর, যেখান দিয়ে বিদেশিরা বাণিজ্য করত। সেই ক্যান্টন এখন গুয়াংজু বন্দর নামে পরিচিত, যা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম বন্দরগুলোর একটি।
ক্যান্টনের দায়িত্ব নিয়েই ব্রিটিশ ও বিদেশি বণিকদের লিন স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, তাদের কাছে থাকা সমস্ত আফিম জমা দিতে হবে সরকারের কাছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর কখনো চীনে আফিম পাঠানো হবে না বলে দিতে হবে মুচলেকা।
কিন্তু ওইসব শর্তে রাজি হয়নি ব্রিটিশরা। এতে তাদের বাণিজ্য কুঠিগুলো অবরুদ্ধ করেন লি জেক্সু। বাধ্য হয়ে লিনের কাছে প্রায় ২০,০০০ বাক্স বা ৩২ হাজার মনেরও বেশি আফিম হস্তান্তর করে ব্রিটিশরা। সৈকতে বিশাল বিশাল গর্ত খুঁড়ে চুন, লবণ এবং পানি মিশিয়ে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ আফিম সম্পূর্ণ গলিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয় সমুদ্রে। সেই ঘটনা এখনো আলোচিত হয়ে আছে মাদকের ইতিহাসে অন্যতম বড় প্রতিরোধ হিসাবে।
কিন্তু এতে চরম অপমানিত বোধ করে ব্রিটিশরা। কোটি কোটি টাকার আফিম ধ্বংস এবং বাণিজ্যে বাধা পাওয়ায় ক্ষিপ্ত হঠে ওঠে ব্রিটিশ সরকার। প্রতিশোধ নিতে চীনের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয় যুদ্ধ, যেটাই প্রথম আফিম যুদ্ধ নামে পরিচিত।
চীনে পাঠানো হয় ব্রিটিশদের বিশ্বসেরা রাজকীয় নৌবাহিনী। আধুনিক বাষ্পচালিত লোহার যুদ্ধজাহাজ। দূরপাল্লার কামান দিয়ে সজ্জিত ছি সেই জাহাজগুলো। এর বিপরীতে চীনের রাজকীয় সেনাবাহিনী ও যুদ্ধজাহাজগুলো ছিলো মধ্যযুগীয় ঘরানার। আধুনিক প্রযুক্তির কোনো ছোঁয়াই ছিলো না সেসবে।
ব্রিটিশ নৌবাহিনী পৌঁছে যায় একেবারে চীনের উপকূলে। প্রধান প্রধান বন্দর এবং নদীপথ অবরুদ্ধ করে ফেলে। আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় কিং রাজবংশ। আর এই সময়ই সই করা হয় চীনের ইতিহাসের কালো চুক্তি, যা পরিচিত নানজিং চুক্তি নামে।
ইতিহাসে চীনের পিছিয়ে পড়ার শুরু এখান থেকেই। যুদ্ধে হেরে ১৮৪২ সালের ২৯এ অগাস্ট চীন ও ব্রিটেনের মধ্যে সই হয় অসম ওই চুক্তি। ৫ হাজার বছরের চৈনিক সভ্যতার ইতিহাসে আগে কখনোই এতটা গোলামির চুক্তি করতে হয়নি তাদের।
কতটা গোলামির চুক্তি ছিল, তা বোঝা যায় পূর্ব এশিয়ার অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী মহানগরী হংকংকে দিয়ে। চীনের দক্ষিণ উপকূলে পার্ল নদীর মোহনায় এর অবস্থান। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাকৃতিকভাবে গভীর সমুদ্র বন্দরের জন্য সমৃদ্ধ দ্বীপ হংকং। বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হিসাবেও পরিচিত।
আফিম যুদ্ধে হেরে নানজিং চুক্তির মাধ্যমে হংকংকে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল চীন। হংকং দখল করে সেটিকে একটি মুক্ত বাণিজ্য বন্দর ঘোষণা করে ব্রিটিশরা। লিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ১৯৯৭ সালের পহেলা জুলাই জাঁকজমকপূর্ণ এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হংকং-এর সার্বভৌমত্ব পুনরায় চীনের কাছে হস্তান্তর করে যুক্তরাজ্য। তবে হংকংয়ের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে "এক দেশ, দুই নীতি" ফর্মুলা চালু করে চীন, যা কার্যকর থাকার কথা ২০৪৭ সাল পর্যন্ত।
আফিম যুদ্ধে হেরে নানজিং চুক্তির মাধ্যমে ৫টি প্রধান বন্দর ব্রিটিশদের বাণিজ্য ও বসবাসের জন্য খুলে দিতে বাধ্য করা হয় চীন। ক্যান্টন, সাংহাই, আময়, ফুঝু ও নিংবো। সঙ্গে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং ধ্বংস করা আফিমের মূল্য বাবদ চীনকে গুনতে হয় বিশাল জরিমানা। এর পরিমাণ তখনকার সময়ে ছিলো ২১ মিলিয়ন রৌপ্য মুদ্রা।
মূলত দু্ইটি আফিম যুদ্ধের ফলে চীনের অর্থনীতি একেবারে ধসে পড়ে। বিদেশি বাণিজ্যের জন্য অনেকগুলো বন্দর খুলে দেওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে প্রভাব বেড়ে যায় বিদেশি শক্তির। দুর্বল হয়ে পড়ে চীনের সার্বভৌমত্ব। আরও কিছু ঘটনা ঘটে, যা চীনকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- সাংহাই ও ম্যাকাওয়ের মতো প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলো চলে যায় বিদেশিদের হাতে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর আগ্রাসন বাড়তে থাকে। ১৮৯৪ সালে চীনে হামলা করে জাপান। যুদ্ধে হেরে জাপানের সঙ্গে ‘শিমোনোসেকি’ নামে একটি চুক্তি করে চীন। এটাও ছিল চীনের জন্য আরেকটি অসম চুক্তি। একইসঙ্গে বৈষম্যমূলক ও অপমানজনক। এর ফলে চীনের করদ রাজ্য হিসেবে থাকা কোরিয়া হয়ে যায় স্বাধীন। তাইওয়ানকে হস্তান্তর করা হয় জাপানের কাছে।
আধুনিক চীনের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ১৯১২ সালে। কিং সাম্রাজ্যের পতন হয়। চীন থেকে উচ্ছেদ হয়ে যায় হাজার হাজার বছর ধরে চলা সম্রাটতন্ত্র।
কিন্তু এরফলে বিশৃঙ্খলা বেড়ে যায় বহুগুণে। চীনে থাকে না কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার। পুরো দেশে আবির্ভাব ঘটে নানা গোষ্ঠীর। ছোট ছোট স্থানীয় সামরিক নেতাদের অধীনে চলে যায় চীন। তারা পরস্পরের সঙ্গে লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘাতে। শুরু হয় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ। এর মধ্যে উত্থান হয় জাতীয়তাবাদীদের। তাদের নেতা চিয়াং কাই-শেক।
একইসয়ে আসে আরেক ব্যক্তিত্ব। যিনি শুধু নিজ দেশে নয়, চীনের এমন ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, যা নাড়িয়ে দিয়েছে পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাকে। তিনি হলেন মাও সেতুং। তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে চীনের কমিউনিস্টরা।
জাতীয়বাদী, কমিউনিস্ট ও অন্যান্য গোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধে একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় চীনের অর্থনীতি। এর মধ্যেই দামামা বেজে ওঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। গৃহযুদ্ধ বিধ্ধস্ত চীনকে আক্রমণ করে বসে জাপান। প্রধান শহরগুলো দখল করে নেয় এবং ব্যাপক গণহত্যা চালায়।
ধ্বংসস্তূপ থেকে চীনের উত্থান এবং ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রক
সবকিছুরই শেষ আছে। চীনেও সমাপ্তি ঘটে অরাজকতার। জেগে ওঠে ঘুমন্ত ড্রাগন। ১৯৪৯ সালে মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে সফল বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী চীন।
দীর্ঘ পতন থেকে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। অস্থিতিশীল ও দরিদ্র কৃষিপ্রধান চীনকে একটি পরাশক্তি ও আধুনিক শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরের বুনিয়াদ গড়ে দেন মাও সেতুং। তবে তার অর্থনৈতিক মডেল ও রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জন্য ডেকে এনেছিলো চরম বিপর্যয়ও।
কিন্তু মাও সেতুং যে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কাঠামো ও প্রাথমিক শিল্প ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, সেটাকেই কাজে লাগিয়ে আবির্ভাব ঘটেছে আজকের পরাক্রমশালী চীনের।
মাওয়ের পরে চীনের নেতৃত্বে আসে দেং জিয়াওপিং। বর্তমানের উন্নত, অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও আধুনিক চীনের স্থপতি বা জনক। বর্তমানের বিশ্ব কাঁপানো চীনের উন্নত প্রযুক্তি ও উন্মুক্ত অর্থনীতির যে রূপ, তার রূপকার হলেন দেং জিয়াওপিং।
১৯৭৮ সালে চীনের প্রধান নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপরই অবিশ্বাস্য গতিতে আধুনিকীকরণের পথে যাত্রা শুরু হয় চীনের। কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের কঠোরতা শিথিল করেন দেং। একের পর এক সংস্কারের মাধ্যমে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় অর্থনীতি।
চীনের বাজার বিদেশি বিনিয়োগের জন্য খুলে দেওয়া, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ব্যক্তিগত ব্যবসার অনুমতি দিয়ে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে বের করে আনেন দেং জিয়াওপিং। তার সেই অর্থনৈতিক বিপ্লবের ফলেই চীন আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাশক্তি এবং প্রধানতম অর্থনীতির দেশে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।
মাত্র ৮০ বছর আগেও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ও নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকা চীনের ওপর বর্তমান বিশ্ব চীনের ওপর কতটা নির্ভরশীল, কয়েকটি তথ্য দিলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।
আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ সালে চীনের নমিনাল জিডিপির আকার ২০ দশমিক ৮৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ এখন চীনের।
পণ্য উৎপাদন, বৈশ্বিক ঋণ, খনিজ সম্পদ এবং প্রযুক্তি— সব ক্ষেত্রেই চীন এখন বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা নিউক্লিয়াস। চীনকে বলা হচ্ছে বিশ্বের কারখানা বা ম্যানুফ্যাকচারিং সুপারপাওয়ার। বিশ্বজুড়ে যত পণ্য উৎপাদিত হয়, তার প্রায় ৩০ শতাংশ একাই উৎপাদন করে চীন। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও জার্মানির সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতার তুলনায়ও এটা বেশি।
বিশ্বের প্রতিটি বড় বড় ম্যানুফ্যাকচারিং দেশ শিল্প উৎপাদনের জন্য অন্তত দুই শতাংশ ইনপুট বা কাঁচামাল সরাসরি আমদানি করে চীন থেকে। চীন উৎপাদন বন্ধ করলে আইফোন থেকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ—ভেঙে পড়বে সবকিছুর বৈশ্বিক সাপ্লাইচেইন।
চীনের ওপর বিশ্বের নির্ভরশীলতা আরও বহুগুণ বাড়িয়েছে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি। বর্তমানে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের মূল হাতিয়ার হলো ইলেকট্রিক ভেহিকল বা ইভি, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং সোলার প্যানেল।
এই তিনটি খাতের বৈশ্বিক বাজারের সিংহভাগই চীনের দখলে। সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রাংশ ও আধুনিক টেলিকমিউনিকেশনের মতো বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও জটিল শিল্পগুলোর প্রায় ২৫ শতাংশ তৈরি হচ্ছে চীনে।
চীনে এমন বেশ কয়েকটি কোম্পানি গড়ে উঠেছে, যারা নিজস্ব খাতে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে পুরো বিশ্বজুড়ে। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রবল প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও, এই কোম্পানিগুলো উৎপাদন সক্ষমতা, কম খরচ এবং প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় নিজেদের বিশ্ব বাজারে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে যে, তাদের বিকল্প খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
একটি চীনা কোম্পানি হলো সিএটিএল। উৎপাদন করে বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি ব্যাটারি। ২০২৬ সালের জুলাই মাসের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ব্যবহার করা মোট ইভি ব্যাটারির ৪০ শতাংশ একাই সরবরাহ করে সিএটিএল।
টেসলা, বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ থেকে শুরু করে দুনিয়ার সব বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যাটারির জন্য সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল সিএটিএলের ওপর। পুরো খাতের সাপ্লাই চেইন ও প্রযুক্তিতে চীনা এই কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ এখনই ভাঙা অন্য কোনো দেশের পক্ষে অসম্ভব বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞরা।
ইভি ব্যাটারি তৈরিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীনের আরেক কোম্পানি বিওয়াইডি। বিশ্বব্যাপী ১৪ শতাংশের সরবরাহ তাদের। বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে মার্কিন জায়ান্ট টেসলাকেও পেছনে ফেলে বিওয়াইডি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। অপ্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার মূল কারণ হলো- গাড়ির ব্যাটারি, চিপস এবং বডি- সব নিজেরাই তৈরি করে বিওয়াইডি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো- এমনকি বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ব্যাটারি কোম্পানির ৭টিই এখন চীনের।
বাণিজ্যিক ও বেসামরিক ড্রোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হলো ডিজেআই। বিশ্বের বেসামরিক ড্রোনের বাজারের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ একাই নিয়ন্ত্রণ করে তারা।
আরেকটি স্টার্ট-আপ হলো ডিপসিক। ২০২৫ সালের শুরুতে আত্মপ্রকাশ করার এক বছরে পার হতেই চীনা এআই স্টার্ট-আপটি ২০২৬ সালের মাঝামাঝি এসে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনএআই বা গুগলের জেমিনাইয়ের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত ডিপসিক। গত জুন মাসে তাদের ভ্যালুয়েশন ছাড়িয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলার এবং পশ্চিমা টেক জায়ান্টদের একচেটিয়া বাজারকে একেই চ্যালেঞ্জ করে হয়ে উঠছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
এছাড়া প্রযুক্তি, ই-কমার্স, সোশ্যাল মিডিয়া, নির্মাণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, সামরিক পণ্য-এমন কোনো খাত নেই, যেখানে নেই চীনা কোম্পানির আধিপত্য।
আপনারা নিশ্চয়ই সিল্ক রোডের নাম শুনেছেন। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে চীন থেকে শুরু হয়ে এই প্রাচীন বাণিজ্য পথটি সংযুক্ত করেছিল এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপকে। এই পথেই রোমান সাম্রাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে চীন থেকে রপ্তানি হতো প্রচুর পরিমাণে দামি রেশম বা সিল্ক, মশলা ও চিনা মাটির বাসন।
শুধু পণ্য রপ্তানিই না। সিল্ক রুট ধরেই বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিল বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্ম, কাগজ তৈরির প্রযুক্তি, এমনকি বারুদও। সিল্ক রোড ছিল প্রাচীন বিশ্বের সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মেলবন্ধন।
চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং ২০১৩ সালে ঘোষণা করেন, প্রাচীন সিল্ক রোডের আদলে বিশ্বকে যুক্ত করতে ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড মহাপরিকল্পনার। এটাই এখন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই।
মূলত স্থলপথ দিয়ে চীন থেকে মধ্য এশিয়া এবং রাশিয়া হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত রেলপথ, হাইওয়ে, তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন এবং জ্বালানি গ্রিডের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক হলো বিআরআই।
প্রাচীন সিল্ক রোডের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চীনের নেওয়া বিআরআই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও উচ্চাভিলাষী অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্প।
আলোচিত বিআরআইয়ের অধীনে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে অবকাঠামো নির্মাণে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন করেছে চীন। বাংলাদেশের 'পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রজেক্ট' ও 'কর্ণফুলি টানেল'-এর মতো মেগা প্রকল্পগুলোও বিআরআইয়ের সঙ্গে যুক্ত।
চীনের অর্থনৈতিক উন্নতি যত হচ্ছে, ততই তাদের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে বিভিন্ন দেশ। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতা রাষ্ট্র।
আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতোই শত শত কোটি ডলারের জরুরি ঋণ দিচ্ছে দেশটি। শুধু দরিদ্র দেশগুলোকেই না, যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড বা সরকারি ঋণে চীনের বর্তমান বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয়শ বিলিয়ন ডলার।
তবে দেশে দেশে চীনের অর্থায়ন ও ঋণ দেওয়া নিয়ে আলোচনাও কম না। অনেকেই এটাকে বলছেন ‘ঋণফাঁদ’ বা ‘ডেথ-ট্র্যাপ ডিপ্লোম্যাসি’। অভিযোগ করা হয় যে, চীন ইচ্ছাকৃতভাবে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বড় মেগা প্রকল্পের জন্য এমন শর্তে বিশাল পরিমাণ ঋণ দেয়, যা শোধ করার সামর্থ্য ওই দেশগুলোর থাকে না। পরবর্তীতে দেশগুলো ঋণ খেলাপি হলে চীন সেই ঋণের বিনিময়ে ওই দেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
চীনের ঋণ ফাঁদের সবচেয়ে আলোচিত 'পোস্টার চাইল্ড' হলো শ্রীলঙ্কা। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে এই বাণিজ্যিক কেন্দ্র হলো হাম্বানটোটা বন্দর। এটি নির্মাণের জন্য চীন থেকে নেওয়া হয়েছিল ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সেই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় শ্রীলঙ্কা। এরপর যা হয়েছিল, তা এখন চীনা উন্নয়ন মডেলের অন্যতম সমালোর বিষয়। ২০১৭ সালে হাম্বানটোটা বন্দর এবং চারপাশের ১৫,০০০ একর জমি ৯৯ বছরের জন্য চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির কাছে লিজ দিতে বাধ্য হয় শ্রীলঙ্কা।
মিয়ানমার থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বন্দরসহ নানা স্থাপনা তৈরি সমুদ্রপথেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে চীন। এটাকে বলা হচ্ছে ‘মুক্তার মালা’।
জিবুতি হলো পূর্ব আফ্রিকার ছোট একটি দেশ। গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র প্রণালি বাব আল-মান্দেবের প্রবেশমুখেই দেশটির অবস্থান। তাই ভৌগোলিক কৌশলগত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশটি।
চীনের কাছে দেনার দায়ে ডুবতে বসেছে জিবুতি। তাদের মোট বৈদেশিক ঋণের ৪৫ থেকে ৭৭ শতাংশই চীনের কাছ থেকে নেওয়া। চীনা ঋণের কিস্তি শোধ করতে চরম হিমশিম খাচ্ছে জিবুতি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চীন সেখানে তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে।
সাম্প্রতিককালে চীনের ঋণফাঁদের অন্যতম বড় শিকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস। ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় লাওস তাদের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ একটি চীনা কোম্পানির হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের অধীনে চীনের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ নেওয়া চিন থেকে। ঋণের এই বিশাল বোঝার কারণে, পাকিস্তান তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে এবং প্রতি বছর নতুন চিনা ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধ করছে।
বিআরআই ছাড়াও আরও কয়েকটি জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। এর একটি হলো শীর্ষ অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন জি-7 জোট এবং মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য রুখে দিতে এই জোটকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে চীন।
আরেকটি হলো সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা-এসসিও। পশ্চিমাদের সামরিক জোট নেটোর এশীয় সংস্করণ বা বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে এসসিওকে।
গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ বা জিএসআই। প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের এই নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ থেকে মুক্ত রাখতে একটি স্বাধীন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করছে চীন।
গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ বা জিডিআই। এটি হলো শি চিন পিংয়ের প্রস্তাবিত একটি বৈশ্বিক উন্নয়নমূলক মহাপরিকল্পনা। বিআরআইয়ের পর বিশ্বমঞ্চে চিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের দ্বিতীয় বৃহত্তম মঞ্চ হচ্ছে জিডিআই।
একদিকে বিশ্বের পণ্য উৎপাদনের নিউক্লিয়াস, বিরাট ভোক্তা শ্রেণির বাজার। আরেকদিকে পুরো পৃথিবীজুড়ে অর্থ বিনিয়োগ করে প্রভাব সৃষ্টি করছে চীন। পাশাপাশি রণ প্রস্তুতিও সেরে নিচ্ছে ব্যাপকভাবে। সামরিক খাতে আমেরিকার একক আধিপত্যকে এখন সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে চীন। সংখ্যার বিচারে বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী এখন চীনের।
চীনের বিমানবাহী রণতরিও পশ্চিমাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, বর্তমানে তিনটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনা করলেও ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা পৌঁছাবে নয়টিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সবচেয়ে দ্রুততম নৌ-সম্প্রসারণের ঘটনা এটি।
কোনো কোনো প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, চীনের ডালিয়ানে নির্মাণাধীন রয়েছে প্রথম পারমাণবিক সুপারক্যারিয়ার 'টাইপ ০০৪'। এটি হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্যারিয়ার ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড-এর সমকক্ষ।
হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তিতেও আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দিয়েছে চীন। সম্প্রতি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে দূরপাল্লার মিসাইলের সফল পরীক্ষা করেছে দেশটি। মার্কিন ডিফেন্স সিস্টেম ফাঁকি দিয়ে যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে বেইজিং আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হচ্ছে।
২০৩০ সালের মধ্যে পারমাণবিক বোমার সংখ্যা ১,০০০-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে দ্রুত কাজ করছে চীন। পাশাপাশি, ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন আধুনিক প্রযুক্তির যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে তারা। আমেরিকার বৈশ্বিক সামরিক ঘাঁটি বেশি থাকলেও, তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগরের মতো নিজেদের আঞ্চলিক সীমানায় চীন এখন মার্কিন শক্তিকে রুখে দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
চীনের যুদ্ধবিমান প্রযুক্তির আধুনিকীকরণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থা অবিশ্বাস্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রুশ প্রযুক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলো চীন। কিন্তু এখন বিশ্বকে চমকে দিয়ে নিজেই হয়ে উঠছে রপ্তানিকারক।
চীনের কাছে রয়েছে জে-২০ 'মাইটি ড্রাগন' এবং জে-৩৫ স্টিলথ ফাইটার। যা আমেরিকার গর্ব এফ-৩৫ ও এফ-২২-কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। এছাড়া জে-১৬ এবং জে-১০সি-এর মতো সাড়ে চার প্রজন্মের বিমানগুলোও চীনের আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির উৎকর্ষতার নিদর্শন বহন করছে।
চীনের এগিয়ে চলার একটি বড় কারণ হলো যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া। বিগত ৭৫ বছরের বৈশ্বিক রাজনীতিতে দেখঅ গেছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। গণপ্রজাতন্ত্রী চীন গঠনের পর, নিজেকে বড় কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ থেকে দূরে রাখতে পেরেছে বেইজিং। অথচ একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে ফেলেছে।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির 'কস্টস অব ওয়ার' প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, নাইন ইলেভেনের পর শুধু ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়া যুদ্ধে আমেরিকার ব্যয় হয়েছে রেকর্ড ৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি।
এই বিপুল অর্থ যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ায় মার্কিন অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো আজ ভঙ্গুর, জাতীয় ঋণ ঠেকেছে রেকর্ড ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে। ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান চিনের। ১৯৭৯ সালের পর চীন জড়িত হয়নি পূর্ণাঙ্গ কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধে। যুদ্ধের পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অপচয় না করে, বেইজিং সেই অর্থ ব্যয় করেছে অভ্যন্তরীণ আধুনিকীকরণ এবং বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারের অর্থনৈতিক মেগা প্রজেক্টে।
বৈশ্বিক পুলিশ সেজে আমেরিকা যখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সম্পদ ও সামরিক শক্তি ক্ষয় করছে, চীন তখন অত্যন্ত নীরবে বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তির মূল চাবিকাঠি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে।
স্বাভাবিকভাবেই আজকের দুনিয়ায় চীনের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমানো বা ‘ডিকাপলিং’ করা কার্যত অসম্ভব। সকালের টুথব্রাশ থেকে শুরু করে রাতের ঘরের সোলার প্যানেল কিংবা দেশের মেগা প্রজেক্টের অর্থায়ন—পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণ কোনো না কোনোভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল।
তাহলে চীনকে অগ্রাহ্য করবে কীভাবে? নাকি চীনই হয়ে উঠবে ভবিষ্যৎ বিশ্বের নিয়ন্ত্রক? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন গবেষক ইভান মেদেইরোস। চীন বিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সাবেক বিশেষ সহকারীও ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের যে লড়াই চলছে তা ইভান মেদেইরোস ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
দ্য শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সে ‘চীন কি ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করবে’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, চীনের সাথে মতবিরোধপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ক, এশিয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতা, ইউরোপে চলমান যুদ্ধ এবং বিশ্বজুড়ে মিত্র ও অংশীদারদের ক্রমশ দূরে সরে যাওয়ার পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে। আর ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের সাথে ধীরে ধীরে বেইজিং এমন এক অবস্থান তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে তারা এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুবিধা নিতে পারে। জ্বালানি সংকট বেশিরভাগ দেশের তুলনায় ভালোভাবে মোকাবিলা করছে বেইজিং এবং দ্রুত তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছে।
এই গবেষক বলছেন, ভূরাজনীতির টেকটোনিক প্লেটগুলো দ্রুতগতিতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন এক অনিশ্চয়তা, বিভ্রান্তি এবং অস্থিরতার উৎস। শি চিন পিং চীনকে একটি বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করতে চান। চীন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সামরিক পরাশক্তি হতে চায়, যাতে অন্যরা তাকে সমীহ করে চলে।
তবে চীনের অর্থনীতি এখন বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দেশটির সামগ্রিক জনসংখ্যা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সংকুচিত হচ্ছে। কর্মক্ষম জনসংখ্যার চেয়ে দ্রুত গতিতে বেড়ে যাচ্ছে প্রবীণ জনসংখ্যা। চীনের জিডিপির প্রায় ৩০০ শতাংশ ঋণ এবং অনেক স্থানীয় সরকার দেউলিয়া হয়ে গেছে। চীনা ব্যাংকগুলোও খেলাপি ঋণে জর্জরিত।
ইভান মেদেইরোস মনে করছেন, বেইজিং বিশ্বাস করে যে, ট্রাম্প কেবল তাদের ঐতিহ্যগত মিত্র ও অংশীদারদেরই দূরে ঠেলে দিচ্ছেন না। বরং গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশগুলোকেও দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন, যেখানে রয়েছে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ এবং বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ। ট্রাম্পের এই নীতিগুলোকে কাজে লাগিয়ে বেইজিং নিজেকে বিশ্বায়ন এবং বহুপাক্ষিকতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে।
তবে সামগ্রিক বিশ্ব পরিস্থিতিতে এখন কেউই কোনো এক পক্ষকে বেছে নিতে চায় না। মানে ওয়াশিংটন বা বেইজিং—কোনো একটি একক শক্তির দ্বারা শাসিত হতে রাজি নয়। মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতার ফলে সুযোগ এসেছে উন্নত ও উন্নয়নশীল দুই ধরনের দেশের সামনেই। তাদের সামনে রয়েছে–উভয় পক্ষ থেকেই সুবিধা নেওয়া, বাজার ও বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া, বিশ্বজনীন কল্যাণমূলক কাজের অংশ হওয়া, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া, আন্তর্জাতিক নিয়ম তৈরিতে অংশ নেওয়া এবং সবকিছুর জন্য সঠিক মূল্য নিয়ে দরকষাকষি করার বিষয়।
ঘুম ভেঙে চীন যখন পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, তখন তার কাছে থেকে কে কত সুবিধা নিতে পারে সেই সমীকরণ এখন হচ্ছে প্রবল।