যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্দুক হামলার ঘটনা ‘স্কুল শ্যুটিংয়ের’ পেছনের মনস্তত্ব নিয়ে প্রশ্নটি আবার সামনে এনেছে। বিচ্ছিন্নতা, অপমানবোধ, ক্ষোভ কিংবা প্রতিশোধের আকাঙ্খা, কোনটা একজন কিশোরকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়?
বৃহস্পতিবার, ১৫ই অক্টোবরের হামলায় তিন শিশু ও এক শিক্ষক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও দুজন। হামলাকারীর বয়স ১৬ বছর । পরে এক প্রত্যক্ষদর্শীর গুলিতে ওই কিশোরও নিহত হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। সিএনএন জানিয়েছে, এটি এবছরের যুক্তরাষ্ট্রের ৫২তম ‘স্কুল শ্যুটিং’-এর ঘটনা।
হামলাকারী কিশোর সঙ্গে স্কুলটির কোনো সম্পর্ক ছিলো কি না, তা এখনো জানা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যালয়ে বন্দুক হামলা
বিদ্যালয়গুলোতে দলগত বন্দুক হামলা, অভ্যন্তরীণ সহিংসতা, খেলাধুলা ও স্কুলের অন্যান্য কোনো অনুষ্ঠানে গুলি চালানোর ঘটনা, আত্মহত্যা, মারামারির জেরে, এমনকি দূর্ঘটনাবশত গুলি ছোড়া, এসব বিশ্লেষণ করে কে-১২ স্কুল শুটিং ডেটাবেইস। এই ডেটাবেসে স্কুল প্রাঙ্গনে সংঘটিত গান ভায়োলেন্সের ঘটনা যুক্ত করা হয়।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গান ভায়োলেন্সের ঘটনার সংখ্যা এখন পর্যন্ত ১৪৮টি। গত বছর এই সংখ্যা ছিলো ২৩৫টি।
১৯৬৬ থেকে এখন পর্যন্ত এই ৬০ বছরে দেশটির স্কুলগুলোতে ৩ হাজার ৩৩৯টি গান ভায়োলেন্সের ঘটনা নথিভুক্তি করেছে কে-১২ স্কুল শ্যুটিং ডেটাবেস। এমন সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ২০২৩ সালে, ৩৫২টি।
অন্যদিকে গান ভায়োলেন্স আর্কাইভ, এডুকেশন উইক এবং এভরিটাউন ফর গান সেফটির তথ্য বিশ্লেষণ করেছে সিএনএন। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ৫২টি বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে অন্তত একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এসব ঘটনায় কমপক্ষে ৩২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন আরও ৫০ জন।
সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, করোনাভাইরাস মহামারির প্রথম বছরে স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে গুলির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিলো। তবে এরপরের বছরগুলোতে এ ধরনের ঘটনা আবার বেড়েছে।
সংবাদমাধ্যমটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে অন্তত ৮৪টি বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে, যা ২০০৮ সালের পর সর্বোচ্চ।
তবে প্রাণহানির দিক থেকে অন্যতম ভয়াবহ বছর ছিলো ২০২২। ওই বছর স্কুলে গুলির ঘটনায় ৪৮ জন নিহত হন। যার মধ্যে ২১ জন প্রাণ হারান সেবছর ২৪এ মে।
২০২২ সালের ২৪এ মে উভালডে শহরের রব এলিমেন্টারি স্কুলে ঢুকে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় ১৮ বছর বয়সী সালভাদর রামোস। সেদিন ১৯জন শিক্ষার্থী ও ২ জন শিক্ষক প্রাণ হারিয়েছিলেন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ১৭ জন। নিহত শিক্ষার্থীদের সবাই ছিলো চতুর্থ শ্রেণির। বয়স ছিলো ৯ থেকে ১১ এর মধ্যে।
টেক্সাসের ইতিহাসে স্কুলে গুলি চালানোর সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনা এটি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দ্বিতীয়। দেশটির ইতিহাসে স্কুল শ্যুটিং-এর সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটে ২০১২ সালে।
২০১২ সাল: স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে ২৬টি মৃত্যু
ক্রিসমাসের আর ১৩ দিন বাকি। যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও অনেক দেশে এই দিনটার অপেক্ষায় থাকে শিশুরা। স্যান্টা নিয়ে আসবে উপহার। পুরো ডিসেম্বর মাসটাই কাটে আনন্দ উত্তেজনায়।
কিন্তু কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের নিউটাউনের স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ২০১২ সালের ডিসেম্বর কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।
ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ স্কুলটির ২০ জন শিক্ষার্থী ও ৬ জন শিক্ষক ও কর্মীকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে সেই বিদ্যালয়েরই একজন সাবেক শিক্ষার্থী, অ্যাডাম ল্যানজা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০ বছর বয়সী অ্যাডাম সেদিন সবার আগে তার মাকে হত্যা করে। এরপর বাড়ি থেকে তিনটি এআর-ফিফটিন অ্যাসল্ট রাইফেল নিয়ে গুলি চালিয়ে জোর করে স্কুলের ভেতরে ঢুকে সে।
স্কুলে ঢুকে অ্যাডাম কিন্ডারগার্টেন ও প্রথম শ্রেণির দুটি শ্রেণিকক্ষের ২০ জন শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা করে। নিহত শিশুদের কারোও বয়সই ৬ থেকে ৭ এর বেশি হবে না। সেদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্কুলের মাইকে ঘোষণা চলার সময় পুরো স্কুলজুড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়।
স্কুলের ভেতর থেকে জরুরি নম্বরে ফোন আসতে শুরু করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশের ভাষ্যমতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এগিয়ে আসতে থাকলে হামলাকারী একটি পিস্তল দিয়ে গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন।
অ্যাডাম ল্যানজা, সালভাদর রামোস ও সিলভার রেইল এলিমেন্টারি স্কুলের হামলাকারীর মতো যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল শ্যুটিং-এর ঘটনাগুলোতে অধিকাংশ হামলাকারীর বয়সই ২০ বা তার নিচে।
কারা এই স্কুল শ্যুটাররা?
বৈশ্বিক ডেটা প্ল্যাটফর্ম, স্ট্যাটিস্টা’র গবেষণা বিভাগের তথ্য বলছে, ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে গুলি চালানো সক্রিয় বন্দুকধারীদের বেশিরভাগের বয়স ছিলো ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সক্রিয় বন্দুকধারীদের মধ্যে ২৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
ইউএস গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস বা গাও-এর রিপোর্ট বলছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিরোধ বা ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বন্দুক হামলাো চালানো হয়েছিলো। শিক্ষার্থী ও স্কুলকর্মীদের মধ্যে বিরোধ কিংবা অপরাধী চক্রগুলোর সংঘাত থেকেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে, সেন্টার ফর ভায়োলেন্স প্রিভেনশন ও দ্য ভায়োলেন্স প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, ম্যাস স্কুল শুটিং-এর ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই হামলাকারীদের সাথে ঐ প্রতিষ্ঠানের কোনো না কোনো একটা সম্পর্ক থাকে। হামলাকারীদের একটা বড় অংশই সেই স্কুলের বর্তমান বা সাবেক শিক্ষার্থী।
এফবিআই ও ইউএস সিক্রেট সার্ভিসের গবেষণাতেও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের কে-১২ স্কুল হামলার বেশিরভাগ ঘটনায় হামলাকারী ওই স্কুলেরই শিক্ষার্থী ছিলেন। সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি অংশও পরে নিজেদের পুরোনো স্কুলে ফিরে হামলা চালিয়েছে। যেমনটা দেখা যায় স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে হামলার ঘটনায়। টেক্সাসের রব এলিমেন্টারি স্কুলে হামলাকারী, সালভাদর রামোসও সেই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন।
গাও-এর তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের অনেকেই আছেন যারা ঐ স্কুলের শিক্ষার্থী নন। তারা ছিলেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, শিক্ষক বা কর্মী, কিংবা অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তি। প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ ঘটনায় হামলাকারীর সাথে স্কুলের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনাবশত গুলি চালানো, আত্মহত্যা এবং পরিকল্পিত হামলার ঘটনায় বর্তমান বা সাবেক শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বেশি ছিল। এধরনের হামলা স্কুলের ভেতরেই বেশি ঘটে। অন্যদিকে, বিরোধ বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে হামলার ঘটনাগুলো স্কুলের বাইরে ঘটতে দেখা যায়, যেখানে বেশিরভাগ হামলাকারীই সেই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন না।
গাও এর বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, শহরাঞ্চলের যেসব স্কুলগুলোতে দরিদ্র ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, সেসব স্কুলেই বন্দুক হামলার ঘটনা বেশি ঘটেছে। এসব হামলার বেশিরভাগই বিরোধ বা ব্যক্তিগর ক্ষোভ থেকে করা হয়েছিলো।
অন্যদিকে, গ্রামীণ এলাকায় তুলনামূলক সচ্ছল আর যেসব স্কুলে সংখ্যালঘু শিক্ষার্থী কম, সেখানে আত্মহত্যা ও পরিকল্পিত হামলার ঘটনা বেশি ঘটে। এধরনের হামলায় প্রাণহানির ঘটনাও ছিলো বেশি।
ইউএস সিক্রেট সার্ভিসের ন্যাশনাল থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট সেন্টারের তথ্য বলছে, পরিকল্পিত স্কুল হামলার ক্ষেত্রে হামলাকারীদের নিজেদের স্কুল বেঁছে নেওয়ার একটি বড় কারণ হলো নিজেদের স্কুলে পড়াশোনা করার কারণে তারা ওই প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, ভবনের কাঠামো, ক্লাসের সময়সূচি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবে জানে।
একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ক্ষোভ, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্নতা বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতির মতো বিষয়ও হামলার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
হামলাকারীদের মনে কী চলে?
যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলে গুলি চালানোর ঘটনা নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই হামলাকারীদের মনস্তাত্বিক অবস্থার কথা সামনে আসে। যেই কারণগুলো প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে সেগুলো হলো বুলিং, মানসিক অসুস্থতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন, এত বড় সহিংসতার পেছনে কোনো একটি কারণ বা বৈশিষ্ট্যকে প্রধান হিসেবে দেখা যায় না।
২০১৩ সালে ‘অ্যাগ্রেশান অ্যান্ড ভায়োলেন্ট বিহেভিয়ার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘প্যারানয়েড থিঙ্কিং ইন ম্যাস শ্যুটারস’ গবেষণায় কয়েকজন হামলাকারীর ডায়েরি ও অনলাইন লেখা বিশ্লেষণ করা হয়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এসব লেখায় বারবার উঠে এসেছে প্রত্যাখ্যাত, অবহেলিত কিংবা অসম্মানিত হওয়ার অনুভূতি। কিছু হামলাকারী নিজেদের এমন একটি গোষ্ঠীর বাইরের মানুষ হিসেবে দেখতেন, যাদের তারা জনপ্রিয়, সফল এবং অন্যায্যভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত বলে মনে করতেন। তাদের ধারণায়, এই গোষ্ঠী তাদের প্রতি অন্যায় করেছে আর সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়াই যেন সহিংসতার যৌক্তিকতা।
এই ব্যাখ্যার সঙ্গে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হ্যারল্ড আই শোয়ার্টজের ২০২৩ সালের একটি বিশ্লেষণের মিল পাওয়া যায়। ‘দ্য মাইন্ড অব দ্য ম্যাস স্কুল শ্যুটার’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, অনেক হামলাকারী এমন স্কুলেই ফিরে যায়, যেখানে তারা আগে পড়েছে। শোয়ার্টজ বলছে, কেউ কেউ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এমন হামলা চালায়। আবার কারও কারও হামলার কারণ ছিলো, স্কুলজীবনে যারা তাদের উপেক্ষা করেছিলো, তাদের উপর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা। হামলাকারীদের মধ্যে এমন অনেককেও দেখা যায়, যারা নিজেদের গুরুত্বহীন বা অদৃশ্য মনে করতেন।
কিন্তু অন্যদের প্রতি ক্ষোভ থাকলেই একজন মানুষ হত্যাকাণ্ড ঘটাবেন, এমন নয়। শোয়ার্টজের ধারণা, কিছু হামলাকারীর ক্ষেত্রে অন্যদের সঙ্গে সামাজিক সংযোগ ও সহমর্মিতার ঘাটতি, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং বিচ্ছিন্নতা একসঙ্গে কাজ করতে পারে। ফলে যাদের তারা নিজেদের দুর্দশার জন্য দায়ী মনে করে, তাদের স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে দেখার বদলে শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে।
এই গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসের নথিভুক্ত ২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের ৪১টি স্কুলে গুলির ঘটনার বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে দেখা যায়, অধিকাংশ হামলাকারীর মধ্যে মানসিক, আচরণগত বা বিকাশগত সমস্যার লক্ষণ পাওয়া গেলেও মাত্র সাতজনের মধ্যে সাইকোসিসের লক্ষণ ছিলো। অর্থাৎ, মানসিক অসুস্থতা ও সহিংসতার সম্পর্ককে সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
অন্যদিকে, লিহাই ইউনিভার্সিটির কলেজ অব এড্যুকেশান-এ ২০১৩ সালে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তরুণ হামলাকারীদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষক পিটার ল্যাংম্যান তিন ধরনের হামলাকারীর কথা বলেছেন। ট্রমার অভিজ্ঞতায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা ব্যক্তি, অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও অনুশোচনার ঘাটতি থাকা ব্যক্তি এবং সাইকোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তি। তার মতে, এসব ব্যক্তির পারিবারিক পরিবেশ, মানসিক অবস্থা ও সহিংসতার পেছনের কারণ এক নয়।
ল্যাংম্যান আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে হামলা হঠাৎ করে ঘটে না। বরং প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক সমস্যা, স্কুলে সংঘাত, মাদক বা অ্যালকোহলের ব্যবহার কিংবা অন্য কোনো সংকটের সঙ্গে আগে থেকে জমে থাকা ক্ষোভ যুক্ত হতে পারে। কখনো হামলাকারী বন্ধুদের সঙ্গে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলে; কেউ সেই পরিকল্পনায় উৎসাহ দেয়, কেউ আবার বিষয়টিকে নিছক ঠাট্টা ভেবে এড়িয়ে যায়।
সহিংস চলচ্চিত্র, ভিডিও গেম কিংবা আগের হামলাকারীদের প্রতি মুগ্ধতার প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে। ল্যাংম্যানের মতে, কিছু ঝুঁকিতে থাকা তরুণ এসবের মধ্যে সহিংসতার অনুপ্রেরণা খুঁজে পেতে পারে। কিন্তু লাখ লাখ মানুষ সহিংস গেম খেলে বা চলচ্চিত্র দেখে, সবাই হামলার মানসিকতা পোষণ করে না।
বুলিংয়ের শিকার হওয়া, একা থাকা কিংবা মানসিক সমস্যায় ভোগা, এগুলোর কোনোটিই কাউকে ভবিষ্যৎ হামলাকারী হিসেবে চিহ্নিত করার যথেষ্ট ভিত্তি নয়। ২০১৩ সালের ‘প্যারানয়েড থিংকিং ইন ম্যাস শ্যুটারস’ গবেষণাতেও লেখকেরা বলেছেন, অল্প কয়েকজন হামলাকারীর ডায়েরি ও অনলাইন লেখা থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে সবার মানসিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
শোয়ার্টজও প্রায় একই কথাই বলেন। তার মতে, সম্ভাব্য হামলাকারীর বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত প্রোফাইল সাহায্য করলেও, এসব বৈশিষ্ট্য বলে দেয় না, কে সত্যিই হামলা চালাবে আর কে চালাবে না।
তাই প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, একজন তরুণ কেন ক্ষুব্ধ বা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই ক্ষোভ কখন অন্যদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পরিকল্পনায় রূপ নিচ্ছে, এবং তার আগে কেউ কি সেই সংকেতগুলো শনাক্ত করতে পারছেন কি না।
ল্যাংম্যানের মতে, কোনো স্কুলে হামলার সময় কীভাবে দরজা বন্ধ করে নিরাপদ থাকতে হবে, শুধু তা শেখানো যথেষ্ট নয়। আগে থেকে সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো শিক্ষার্থীর মধ্যে সন্দেহজনক আচরণ দেখা দিলে, আগে থেকেই তা গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। কিন্তু এজন্য, সেই শিক্ষার্থীকে অপরাধীর ধরে নেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে শোয়ার্টজ তার বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য, হামলাকারীর মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা প্রয়োজন, কিন্তু সেই চেষ্টায় অস্ত্রের ভূমিকা আড়াল করা যাবে না।