ভারতে ভোটার তালিকা বিতর্ক: শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে ট্রেন বাতিল

ভারতে প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তালিকা যাচাইয়ের উদ্যোগ ঘিরে দেশজুড়ে চলছে বিক্ষোভ। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে সুবিধা পেতে পারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপি।

ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে বিরোধী দলগুলো। একই দাবি তুলেছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। শনিবার রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে বড় বিক্ষোভের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থাও জোরদার করছে দিল্লি পুলিশ। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসাবে ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। 

এদিকে, মহারাষ্ট্রে বিক্ষোভে যোগ দিতে ইচ্ছুক কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, পুলিশ তাদের চলাচলের ওপর রাখছে কঠোর নজরদারি। এমনকি কয়েকজনকে আটক করে বিক্ষোভে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও উঠেছে অভিযোগ। তবে রাজ্যে কাউকে আটক করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশের মহাপরিচালকের কার্যালয়।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন বলছে, জুনে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগেভাগেই প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ। ওই বিক্ষোভের জেরে সরকারি পরীক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ধারণা, জুনের বিক্ষোভ মোকাবিলায় দুটি গুরুতর ঘাটতি ছিলো। ১০ই অক্টোবরের বিক্ষোভ সামনে রেখে তারা এবার একটি ‘ত্রুটিমুক্ত পরিকল্পনা’ তৈরি করেছেন বলে জানিয়েছেন। 

নিরাপত্তা পরিকল্পনার শুরুতেই রয়েছে ৩৭ দফার একটি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

এছাড়াও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিক্ষোভের অনুমতিসহ আয়োজকদের করা সব ধরনের অনুমতির আবেদন নাকচ করা হচ্ছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেরিতে আবেদন করার কারণ দেখিয়ে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি পুলিশ।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ সামনে রেখে দিল্লির ৫৭টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার নির্দেশে উদ্বেগ জানিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। নাগরিকদের যাতায়াতে যাতে ভোগান্তি না হয়, তা নিশ্চিত করতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে বলেছে আদালত।

সুপ্রিম কোর্ট বলেন, “মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমরা মূলত উদ্বিগ্ন। এ নিয়ে আমাদের গুরুতর আপত্তি রয়েছে।”

৫৭ টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ (ছবি: সংগৃহীত)

আদালত আরও বলেন, “নাগরিকদের অসুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিন।”

শনিবার যন্তর মন্তরে প্রস্তাবিত বিক্ষোভ সামনে রেখে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) ৫৭টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল। শুক্রবার রাত ৯টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এসব গেট বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়।

বন্ধ রাখার তালিকায় রয়েছে রাজীব চক, নয়াদিল্লি, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক ও কাশ্মীরি গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন।

এর আগে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিধিনিষেধ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কপিল সিবাল, অভিষেক মনু সিংভি ও গোপাল শঙ্করনারায়ণন আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। 

শুক্রবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, বিক্ষোভ করা একটি মৌলিক অধিকার। তবে বিক্ষোভকারীদের অবশ্যই আইন মেনে এই অধিকার প্রয়োগ করতে হবে। 

আইনজীবীরা ট্রেন চলাচল বাতিল এবং মেট্রো পরিষেবা বন্ধের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাদের যুক্তি, নিরাপত্তার নামে নেওয়া এসব পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করতে পারে।

কেন এ বিক্ষোভ 

মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচন কমিশনের তথ্য তুলে ধরে জানিয়েছিল, ভোটার তালিকা যাচাইয়ের সময় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বাদ পড়াদের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অন্য এলাকায় চলে গেছেন। আরও ৩ কোটি মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, বাদ পড়াদের মধ্যে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তাদের দাবি, এতে বিজেপি বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।

বিরোধী দলগুলোর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কারণে কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের ফল প্রভাবিত হয়েছে। এসব নির্বাচনে বিজেপি জয় পেয়েছে। এ কারণে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে যোগ দিয়েছে বিরোধী দলগুলো

তবে বিজেপি বলছে, মোদির জনপ্রিয়তা ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তাদের নির্বাচনী সাফল্যের অন্যতম কারণ।

মোদীর ১২ বছরের শাসনামলে বড় রাজনৈতিক বিতর্কগুলোর একটি হয়ে উঠেছে এই ভোটার তালিকা যাচাই। আগামী বছরের শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভারতের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই উপপ্রধান অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।

নির্বাচন কমিশন বলেছে, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। কোনো রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছে কমিশন।

অন্যদিকে, বিজেপির অভিযোগ, বিরোধী গোষ্ঠীগুলো বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশের গণতন্ত্রকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

২০২৭ সালে ভারতের অন্তত সাতটি রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা। এর মধ্যে রয়েছে বিজেপি-শাসিত উত্তর প্রদেশ। এটি ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য। জাতীয় রাজনীতিতেও রাজ্যটির নির্বাচনী ফলকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভোটার তালিকা যাচাই শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে ১৩ শতাংশ নাম বাদ পড়ে।

ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। এরপর তিনি আবার ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারেন। এই প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকেই অভিযোগ করেছেন।

১০০ কোটি ভোটারের তালিকা যাচাই নিয়ে বিতর্ক

গত বছর ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারের নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা যাচাই শুরু হয়। রাজ্যটি বিজেপির জোট সরকারের অধীনে রয়েছে। পরে ভারতের অধিকাংশ রাজ্যেই এই কার্যক্রম চালানো হয়।

ভারতের রাজপথ উত্তাল (ছবি: সংগৃহীত)

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়মিত প্রক্রিয়া। তবে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বিপুলসংখ্যক ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম খুঁজে পাননি। ফলে তাঁরা ভোটও দিতে পারেননি। গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে বিজেপি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য তুলে ধরে বিজেপি জানিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৩ কোটি নামের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ ভোটার মারা গেছেন, ৬ কোটি ৩০ লাখ অন্য এলাকায় চলে গেছেন, ১ কোটি নাম একাধিকবার ছিল এবং ৩ কোটি ভোটারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমার পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় বিজেপি সুবিধা পাচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি—দুই পক্ষই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের দুই উপপ্রধান ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

নির্বাচন কমিশন বলেছে, তাদের সব সিদ্ধান্ত আইন মেনেই নেওয়া হয়েছে।

ভোটার তালিকা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিরোধী নেতারা এবং ককরোচ জনতা পার্টি দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু করে। গত জুলাইয়ে কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল সংগঠনটি।

যাদের নাম বাদ পড়েছে, তারা কী করবেন?

নির্বাচন কমিশনের দাবি, কোনো ভোটারের মৃত্যু হলে, একই নাম একাধিকবার থাকলে, অন্য এলাকায় চলে গেলে অথবা তাকে খুঁজে না পাওয়া গেলে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়। নাম বাদ দেওয়ার কারণ কর্মকর্তাদের বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করতে হয়।

খসড়া ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করতে পারেন। আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে আপিলের সুযোগও রয়েছে।

চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটাররাও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন। ভবিষ্যতের নির্বাচনে ভোট দিতে হলে তাদের আপিলে সফল হতে হবে অথবা নতুন করে ভোটার নিবন্ধনের আবেদন করতে হবে।

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, যথাযথ কারণ ছাড়াই নাম বাদ দেওয়া এবং আপিলের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের লাখ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারেননি। ভবিষ্যতের নির্বাচনেও এই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য

রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে নির্বাচন কমিশন। গত বছর এক সংবাদ সম্মেলনে জ্ঞানেশ কুমার বিরোধীদের অভিযোগ শপথ করে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ভারতের নির্বাচন কমিশন

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়। এ বছরের শুরুতে বিরোধী আইনপ্রণেতারা তাকে অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে সংসদে সেই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়।

২০২৩ সালে মোদী সরকারের পাস করা একটি আইন অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের সময় নির্বাচন কমিশনের প্রধানের করা কাজের ক্ষেত্রে দায়মুক্তির বিধান রয়েছে।

সাম্প্রতিক সমালোচনার মুখে ভোটার তালিকা যাচাইয়ের নিয়মেও পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন জানিয়েছে, কর্মকর্তারা এখন ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করবেন। কয়েকটি রাজ্যে চূড়ান্ত যাচাইয়ের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও রয়টার্সের অবলম্বনে