ইয়েমেনে পুনরায় হুথি-সৌদি লড়াই বিশ্ব বাণিজ্যর জন্য সতর্কবাণী

ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ পুনরায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। ইরান-সমর্থিত আনসার আল্লাহ গোষ্ঠী, যারা ‘হুথি’ নামে বেশি পরিচিত, তড়িৎ অভিযান চালিয়ে লোহিত সাগর উপকূলীয় বেশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছে, যার মধ্যে সাগরে কয়েকটি দ্বীপও রয়েছে। দেশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারের সৈন্যরা হয় দলে দলে আত্মসমর্পণ করেছে, না হয় তাদের ভারী অস্ত্রশস্ত্র রেখে পালিয়ে গেছে।

উপকূলের কাছে শহর এবং দ্বীপ দখলের ফলে আরব উপদ্বীপের পশ্চিম উপকূল এবং পূর্ব আফ্রিকার মাঝে সরু বাব এল-মানদেব প্রণালির উপর হুথি বাহিনী আরও সহজে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। ছয় মাস আগে আরব উপদ্বীপের পূর্ব দিকে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে যাওয়ার পর বিশ্ব বাণিজ্যে প্রবল প্রভাব পড়েছিল। এখন বাব এল-মানদেব, যে নামের অর্থ ‘শোকের দরজা’, হয়ে উঠতে পারে নতুন ফ্ল্যাশ পয়েন্ট।

আনসার আল্লাহ বর্তমানে ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের সশস্ত্র বাহিনীর যোদ্ধা আসে মূলত স্থানীয় জাইদি শিয়া সম্প্রদায় থেকে। ইরান সামরিক এবং আর্থিক সাহায্য দিলেও, হুথিরা ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে পারদর্শী।

অন্যদিকে, বন্দর নগরী এডেনে অবস্থিত সরকার দেশের দক্ষিণ, উত্তর এবং পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রচুর ভাড়াটে সৈন্য রয়েছে এবং তারা সৌদি বিমান বাহিনীর উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।

সৌদি আরবের হামলা

পরিস্থিতি উদ্ধারের জন্য সৌদি বিমান বাহিনী হুথি বাহিনীর উপর ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে। স্থল পথেও সরকারি বাহিনী পাল্টা হামলা চালিয়ে কিছু এলাকা উদ্ধার করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে আনসার আল্লাহ বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ যেসব জনপদ দখল করেছে, সেগুলো পুনরুদ্ধারের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

একই সাথে হুথি বাহিনী সৌদি আরবের ভেতরে বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবার আনসার আল্লাহ সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমান ঘাঁটিগুলোর মধ্যে অন্যতম, কিং খালেদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে আঘাত করেছে। সৌদিদের কাছে অত্যাধুনিক আমেরিকান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং জঙ্গি বিমান থাকলেও, হুথিদের আক্রমণের সামনে তাদের বেশ অসহায় মনে হচ্ছে।

বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর বের হয়েছে যে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্র, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট-সদস্য দেশ পাকিস্তান ও তুরস্ক, এমনকি ইসরায়েলের কাছে সাহায্য চেয়েও কোন সাড়া পাননি। তবে এই সব খবরের সততা কোন দেশের মুখপাত্র নিশ্চিত করেননি।

আনাসার আল্লাহ বাহিনীর এই নতুন অভিযান এবং সরকারি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দ্রুত পতন শুধু আরব দেশগুলিতে নয়, সারা বিশ্বেই সতর্কতার ঘণ্টাধ্বনি বাজিয়ে দিয়েছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুধু একটা ‘গৃহ’ যুদ্ধ না। অনেকেই ধারনা করছেন এখানে ইরান এবং সৌদি আরবের মধ্যে একটি ‘প্রক্সি লড়াই’ হচ্ছে।

ইয়েমেন অনেকদিন ধরেই ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েনের একটি ক্ষেত্র ছিল। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের কারণে আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই দেশ এখন টানাপোড়েনের কেন্দ্রে চলে আসবে।

ঝুঁকিতে বিশ্ব বাণিজ্য

লোহিত সাগরঘেঁষা ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য, বিশেষ করে ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

লোহিত সাগর আর আরব সাগর সংযোগকারী প্রণালির এক পাশে ইয়েমেনের উপকূল, অন্য পাশে জিবুতি। মাত্র ১৬ মাইল প্রস্থ এই প্রণালি দিয়ে সমুদ্রপথে যাওয়া বিশ্ব তেল বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ, আর তরলীকৃত গ্যাসের (এলএনজি) আট শতাংশ পাঠানো হয়। বিশ্বের কন্টেইনারবাহী জাহাজের ৩০ শতাংশ এবং মোট বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ বাব এল-মানদেব প্রণালি ব্যবহার করে।

আরব সাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছাতে সব জাহাজকে লোহিত সাগর হয়ে, মিশরের সুয়েজ খাল দিয়ে যেতে হয়। বাব এল-মানদেব প্রণালি বন্ধ হলে চীন থেকে ইউরোপগামী জাহাজকে গোটা আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যেতে হবে, যা সময় এবং খরচ কয়েকগুন বাড়িয়ে দেবে। বিশ্ব বাণিজ্য এবং সরবরাহ লাইনে মারাত্মক অস্থিতিশীলতা নিয়ে আসবে। মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার সাথে ইউরোপের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল, সব দেশেই জ্বালানি সংকট প্রকট হয়ে উঠবে।

গত ২৮এ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল ইরানের উপর যৌথ হামলা চালিয়ে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে নতুন যুদ্ধ শুরু করার পর তেহরান দুটি কাজ করে যেটা তারা আগে কখনোই করেনি। অনেকে ভেবেছিলেন ইরান সেটা করতে পাড়বে না।

হরমুজ থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন

প্রথমেই, পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে অবস্থিত আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি এবং স্থাপনায় আঘাত হানে। বিশেষ করে বাহরাইনে আমেরিকান নৌঘাঁটি এবং কাতার, কুয়েত, জর্ডান ও সৌদি আরবে আমেরিকার বিমান ঘাঁটিগুলোতে।

দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং সেখান দিয়ে জাহাজ চলাচল ভয়ানকভাবে হ্রাস পায়। যুদ্ধের আগে, সমুদ্রপথে যাওয়া তেল এবং এলএনজির বিশ্ব বাণিজ্যের ২০ শতাংশ এই প্রণালি ব্যবহার করতো।

প্রণালি কার্যত বন্ধ হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল এবং গ্যাসের সংকট দেখা দেয়। এই সংকট  প্রশমন করার জন্য সৌদি আরব পারস্য উপসাগরের উপকূল থেকে লোহিত সাগরের উপকূল পর্যন্ত ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করে তেল রপ্তানি বৃদ্ধি করে।

কিছুদিন আগে ইরাক থেকে নিক্ষেপ করা কয়েকটি ড্রোন প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এই ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’-এর একটি স্টেশন ধ্বংস করে দেয়। একই সাথে হুথিরা ঘোষণা দিয়েছে তারা সৌদি আরবের উপর একটি অবরোধ আরোপ করছে। এর ফলে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের পথ ব্যবহার না থামলেও, সমুদ্রপথে সৌদি আরবের বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যহত হবে। 

বিশ্বজুড়ে অনেকেই উদ্বেগের সাথে দেখছেন, হরমুজ প্রণালি এবং বাব এল-মানদেব একযোগে বন্ধ হবে কি-না। পর্যবেক্ষকদের ধারনা, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পুরোদমে আবার শুরু হলে হুথি বাহিনী তেহরানের সাথে সংহতি প্রকাশ করার লক্ষ্যে বাব এল-মানদেব বন্ধ করে দিতে পারে। এই প্রণালির উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই হুথি বাহিনী তড়িৎ গতিতে এই অভিযান চালিয়েছে। অনেকের দৃষ্টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে।

তবে ২০২৬ সালের হুথি-সৌদি লড়াই ইয়েমেনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় এসেছে, যার শুরু ২২ বছর আগে এক হত্যাকাণ্ড দিয়ে।

হুথি বিদ্রোহের ইতিহাস

উত্তর এবং দক্ষিণ ইয়েমেন ১৯৯০ সালে একত্রিত হবার পর কয়েক বছরের মধ্যেই দেশটি সংঘাতের দিকে চলে যায়। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে প্রতিষ্ঠিত আনসার আল্লাহ গোষ্ঠী ইয়েমেনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হলেও, ২০০৪ সালে তাদের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুথিকে সরকারি বাহিনী হত্যা করে। আল-হুথির নামেই তার অনুসারীদের ‘হুথি’ বলা হয়, যদিও তাদের সংগঠনের নাম আনসার আল্লাহ।

ইরান এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর সাথে আনসার আল্লাহর ঘনিষ্ঠতা সরকারি মহলকে সন্দিহান করে তুলছিল। এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই হুথিরা প্রেসিডেন্ট আলি আব্দুল্লাহ সালেহ’র বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। আনসার আল্লাহ বাহিনী ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করার পর প্রেসিডেন্ট সালেহ সৌদি আরবে আশ্রয় নেন এবং রিয়াদের সাহায্য কামনা করেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর, মরক্কো, জর্ডানসহ অন্যান্য আরব দেশের সহায়তায় সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে আনসার আল্লাহ বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য সহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ সৌদি-নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে সহায়তা করে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বে এই অভিযানের একটি অংশ ছিল হুথিনিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর উপর কঠোর অবরোধ। এর ফলে ইয়েমেনে দুর্ভিক্ষ এবং কলেরার ব্যাপক প্রকোপ দেখা দেয়। যুদ্ধের চার বছর পরই বোঝা যায় আনসার আল্লাহ বাহিনীকে সম্মুখ সমরে পরাজিত করার শক্তি সম্মিলিত আরব বাহিনীর নেই। যুদ্ধ ২০২২ সালে মোটামুটি শেষ হলেও, ২০২৩ সাল থেকে আনসার আল্লাহ গাজায় হামাসের সাথে সংহতি প্রকাশ করার জন্য লোহিত সাগরে ইসরায়েলগামী জাহাজের উপর আক্রমণ শুরু করে।

এরই মধ্যে সৌদি আরব এবং আমিরাতের ঐক্য ভেঙ্গে পড়ে। সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি)-কে সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখে। অন্যদিকে আমিরাত সাদার্ন ট্রান্সিশনাল কাউঞ্চিল (এসটিসি)-র পক্ষে অবস্থান নেয়, যারা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছিল। তবে এই এসটিসি’র ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। 

যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের যুদ্ধের এক পর্যায়ে সৌদি আরব ইয়েমেনে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর পর আনসার আল্লাহ বাহিনী এক দিকে সৌদি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে। অন্যদিকে রিয়াদসমর্থিত বাহিনী হটিয়ে লোহিত সাগর উপকূল এবং বাব এল-মানদেব প্রণালিতে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। 

(লেখক একজন সাংবাদিক এবং পডকাস্টার)