‘প্রথম রোবট বিদ্রোহ’

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে বিদ্রোহের গল্পের কমতি নেই। মানুষ থেকে দেবতা, রাজা থেকে প্রজা, শ্রমিক থেকে শাসক- যুগে যুগে সবাই জড়িয়েছে কোনো না কোনো বিদ্রোহে। 

ইতিহাসের পাতায় এমন বিদ্রোহের গল্প ছড়িয়ে আছে অগণিত।

কখনো কৃষক লাঙল ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছে অস্ত্র। কখনো শ্রমিক কারখানা ছেড়ে রাস্তায় নেমেছে। কখনো স্বাধীনতার দাবিতে জনতার ঢল নেমেছে রাজপথে। শিল্পবিপ্লবের সময় ব্রিটেনের শ্রমিকরা তো যন্ত্রের বিরুদ্ধেই নেমেছিলো রাস্তায়। তাদের আশঙ্কা ছিলো, মেশিন তাদের কাজ কেড়ে নেবে।

কিন্তু দুই শতাব্দী পর সেই দৃশ্যের যেন উল্টো ছবি দেখা গেলো পোল্যান্ডে।

এবার যন্ত্র ভাঙতে মানুষ রাস্তায় নামেনি। মানুষই রোবটকে রাস্তায় নামিয়েছে মানুষের চাকরি বাঁচানোর দাবিতে।

শুনতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো লাগছে। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে ইউরোপের দেশ পোল্যান্ডে।

সেখানে রোবটের হাতে ছিলো প্ল্যাকার্ড আর স্লোগান হচ্ছিলো “কর্মসংস্থান রক্ষা করো”, “নিয়ম করার সময় এখনই” এবং “অপেক্ষা নয়, নিয়ন্ত্রণ করো”। 

যেভাবে রাজপথে নামলো যন্ত্র

সময়টা সোমবার। পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ। ওয়ারশর ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সামনে হঠাৎ দেখা গেলো অদ্ভুত এক দৃশ্য।

কেউ দুই পায়ে হাঁটছে। কেউ কুকুরের মতো চার পায়ে। কারও হাতে পতাকা। কেউ মিছিল করছে। আর চারপাশে বাজছে স্লোগান। 

আর এই মিছিলের সামনে থাকা এমন প্রায় ৩০ জন ‘বিক্ষোভকারী’ মানুষ নয়, রোবট।

তাদের দাবি- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং রোবোটিক প্রযুক্তির বিকাশকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কারণ প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতে মানুষের কাজের জায়গা দখল করতে পারে।

মূলত প্রযুক্তির এই আশঙ্কা বোঝাতেই রাস্তায় নামানো হয়েছে রোবটকে।

বিক্ষোভের আয়োজক ‘ডেমোক্রেটিজম’ নামের একটি সামাজিক সংগঠন। এটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবোটিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আনছে, তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার একটি প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে মানুষের কাজের জায়গায় প্রযুক্তির প্রভাব, কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা এবং ভবিষ্যতের শ্রমবাজার কীভাবে বদলে যেতে পারে, এসব বিষয় সামনে আনাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

তবে এই বিক্ষোভের সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় শুধু রোবটের উপস্থিতি নয়। একটি রোবট সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছে।

‘আমরা তো ইতিমধ্যেই বাস্তব’

বিক্ষোভ চলাকালীন সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হয় এই রোবট। শুধু তাই নয় সেসকল প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছে ‘অ্যাজিবট এ৩’ নামে একটি এআই-চালিত হিউম্যানয়েড রোবট। 

রোবটটি জানায়, এআই এবং রোবোটিক প্রযুক্তি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো কল্পনা না। সে বলে, “আমরা তো ইতিমধ্যেই বাস্তব।” 

কথাটা শুনতে যতটা স্বাভাবিক, দৃশ্যটি ছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি অস্বাভাবিক।

কারণ, যে প্রযুক্তিকে ঘিরে মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কা, সেই প্রযুক্তিই দাঁড়িয়ে আছে মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষার দাবিতে!

অবশ্য রোবটটির বক্তব্য আগে থেকে নির্ধারিত ছিলো। স্লোগানও বাজছিলো লাউডস্পিকারে।

তবে প্রশ্ন উঠছে যে, আগে থেকেই ঠিক করা স্লোগান যন্ত্রের মুখে শোনা গেলে সেটিকে কি সত্যিই ‘বিক্ষোভ’ বলা যায়?

আয়োজকেরা অবশ্য বলছেন, রোবটের সক্ষমতাই দেখিয়ে দিচ্ছে কেন বিষয়টি নিয়ে এখনই আলোচনা প্রয়োজন।

এই বিক্ষোভের আয়োজক গ্রজেগর্জ কুলিশের বলেন, মানুষের চাকরি শুধু হিউম্যানয়েড রোবটের কারণে নয়, এআইয়ের কারণেও হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে চিন্তাশক্তিনির্ভর কাজে। 

“এখনই যদি আমরা ব্যবস্থা না নিই, খুব শিগগিরই আমাদের সমস্যা তৈরি হতে পারে,” বলেন তিনি।

তার দাবি, শ্রমিকদের সুরক্ষায় এমন নিয়ম ও বিধিমালা প্রয়োজন, যা প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের কর্মসংস্থানকেও সুরক্ষা দেবে।

রোবটদের সঙ্গে কথা বলতে এলেন মন্ত্রী

ঘটনাটি এতটাই ব্যতিক্রমী ছিলো যে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সরকারের নজরেও আসে।

বিক্ষোভস্থলে হাজির হন পোল্যান্ডের ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিশতোফ গাওকোভস্কি। সেখানে তিনি আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলেন।

রোবট ও এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন মন্ত্রী। তার আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রণহীন এআই হিউম্যানয়েড রোবটে ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে তা বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। আর রোবোটিক প্রযুক্তি যত এগোবে, এসব যন্ত্র তত বেশি উন্নত হবে।

রোবট নির্মাতারাই চাকরি নিয়ে শঙ্কিত

পোল্যান্ডের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ওপোলস্কা৩৬০’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে ব্যবহৃত রোবটগুলো তৈরি করেছে ‘ডেল্টা রোবটস’। প্রতিষ্ঠানটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হিউম্যানয়েড ও চার পায়ের রোবট তৈরি করছে।

আর বিক্ষোভের আয়োজক কুলিশ নিজেও একটি রোবোটিকস প্রতিষ্ঠানের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা। পাশাপাশি তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী।

অর্থাৎ, যে প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানুষের কাজের জায়গা বদলে দিতে পারে, সেই প্রযুক্তি তৈরির সঙ্গেই সরাসরি যুক্ত একজন মানুষ এখন সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন। আবার একই সময়ে তিনি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত, যার কাজই হলো মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।

আয়োজক কুলিশ অবশ্য প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নন। তার বক্তব্য, রোবোটিকস বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থামানো তাদের লক্ষ্য নয়।

বরং তারা চান, প্রযুক্তি এগিয়ে যাক। কিন্তু সেই অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তার কথাটিও যেন সমানভাবে ভাবা হয়।

এ কারণেই তাদের ‘ডেমোক্রেটিজম’ উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

পোল্যান্ডও এরই মধ্যে এআই নিয়ন্ত্রণে নিয়মকানুন তৈরির কাজ শুরু করেছে। জুলাইয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি একটি আইনে স্বাক্ষর করেন, যার ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইন পোল্যান্ডেও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে এআই কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, আর এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম মানা হচ্ছে কি না সেটা দেখার জন্য পোল্যান্ডে একটি সরকারি সংস্থা তৈরি করা হয়েছে। 

সরকার নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নতুন এআই প্রযুক্তি পরীক্ষার সুযোগ দিতে ‘রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স’ চালুর পরিকল্পনাও করছে। ‘রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স’ হলো নতুন কোনো প্রযুক্তি বা এআই ব্যবস্থা বড় পরিসরে চালু করার আগে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সমস্যা আগে থেকেই চিহ্নিত করা যাবে।

প্রযুক্তিকে থামানো সম্ভবত আর সম্ভব নয়। কিন্তু এর গতি, সীমা এবং মানুষের ওপর এর প্রভাব নিয়ন্ত্রন করার সুযোগ এখনো আছে।

ওয়ারশর রাজপথে সোমবার যে দৃশ্য দেখা গেল, সেটি হয়তো ভবিষ্যতের একটি ছোট্ট ঝলক।

একসময় মানুষ যন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। আজ মানুষ যন্ত্রকে দিয়েই যন্ত্রের সম্ভাব্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে সতর্ক করছে। আর কে জানে হয়তো ভবিষ্যতের ইতিহাসের পাতায় এই দৃশ্যটির নাম সত্যিই লেখা থাকবে –‘রোবটের প্রথম বিদ্রোহ।’