নারীর অধিকার, স্বাধীনতা ও সমতার লড়াইয়ে গ্লোরিয়া স্টেইনেম ছিলেন এক অনমনীয় কণ্ঠ। বুধবার ৯২ বছর বয়সে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো সাংবাদিক, লেখক, সংগঠক ও অধিকারকর্মী হিসেবে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের এক বর্ণাঢ্য সংগ্রামী জীবন।
বৃহস্পতিবার তার প্রতিষ্ঠিত গ্লোরিয়া’স ফাউন্ডেশন ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছে, নিউইয়র্ক শহরে নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি।
লিঙ্গসমতা, নারীর নাগরিক ও প্রজনন অধিকার এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার নিরলস ভূমিকা তাকে যুক্তরাষ্ট্রের নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চরিত্রে পরিণত করেছিলো।
শৈশবেই জীবনের কঠিন বাস্তবতা
গ্লোরিয়া স্টেইনেমের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৫এ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের টোলেডো শহরে। দুই মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। তার বাবা ঘুরে ঘুরে পুরোনো সব জিনিসপত্র বিক্রি করতেন। এ কারণে ছোটবেলায় পরিবারকে প্রায়ই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হতো। ফলে সপ্তম শ্রেণির আগে তিনি নিয়মিতভাবে স্কুলে পড়ার সুযোগও পাননি।
মাত্র ১১ বছর বয়সে তার বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। এরপর মায়ের সঙ্গে থাকা শুরু করেন গ্লোরিয়া, পরবর্তীতে তার মা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দেখাশোনার দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়ে ছোট্ট গ্লোরিয়ার ওপর।
শৈশবের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে স্টেইনেমের চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে। পরিবার, বিয়ে, নারীর স্বাধীনতা এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে এই সময়ের অভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা ছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একজন নারী কীভাবে পারিবারিক পরিস্থিতি ও সামাজিক কাঠামোর কারণে নিজের পছন্দ ও স্বাধীনতা হারাতে পারেন।
সাংবাদিকতা থেকে আন্দোলনের পথে
স্মিথ কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন স্টেইনেম। তবে সাংবাদিকতা তার কাছে কেবল পেশা ছিল না; মানুষের জীবনের অদৃশ্য বাস্তবতাগুলো সামনে নিয়ে আসারও একটি পথ ছিল।
১৯৬৩ সালে একটি প্রতিবেদনের জন্য তিনি নিউইয়র্কের প্লেবয় ক্লাবে ‘ওয়েট্রেস ’ হিসেবে ১১ দিন কাজ করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয় যুগান্তকারী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘আ বানি’স টেল’।
দুই পর্বের এই প্রতিবেদনে প্লেবয় ক্লাবে নারী কর্মীদের কম বেতন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং যৌন হয়রানিমূলক আচরণের বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এই কাজের মধ্য দিয়ে স্টেইনেম বিশ্ববাসীকে জানান দেন, সাংবাদিকতা শুধুমাত্র ঘটনা জানানোর জন্য না, বরং সমাজের আড়ালে থাকা বৈষম্যকে সামনে নিয়ে আসার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও ।
১৯৬৮ সালে ‘নিউ ইয়র্ক’ ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন স্টেইনেম। সেখানে প্রকাশিত ‘আফটার ব্ল্যাক পাওয়ার, উইমেনস লিবারেশন’ প্রবন্ধ তাকে নারীবাদী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
যে ঘটনা স্টেইনেমের জীবনকে বদলে দিয়েছিলো
নারীবাদী আন্দোলনে স্টেইনেমের সক্রিয় ভূমিকা আরও গভীর হয় ১৯৬৯ সালে। নিউ ইয়র্কের একটি গির্জায় গর্ভপাত বিষয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় অংশ নেওয়ার পর তিনি নিজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার কথা নতুন করে উপলব্ধি করেন।
বাইশ বছর বয়সে তিনি লন্ডনে গর্ভপাত করিয়েছিলেন, যা তখন আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ। সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাকে নারীর প্রজনন অধিকার নিয়ে আরও সক্রিয় করে তোলে। এরপর নিজের শরীর ও জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
‘মিস’ ম্যাগাজিন ও নতুন ধরনের নারীবাদী সাংবাদিকতা
১৯৭১ সালে স্টেইনেম সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ‘মিস’ ম্যাগাজিন চালু করেন। সে সময় নারীদের উদ্দেশে প্রকাশিত অধিকাংশ সাময়িকীতে সৌন্দর্য, রান্নাবান্না কিংবা কীভাবে ভালো স্ত্রী হওয়া যায়, এসব বিষয়ই বেশি গুরুত্ব পেতো।
স্টেইনেম ও তার সহকর্মীরা সেই চেনা কাঠামো বদলে দিতে চাইলেন। মিস ম্যাগাজিনে উঠে আসতে থাকে গর্ভপাত, যৌনবৈষম্য, সমান মজুরি, পারিবারিক সহিংসতা এবং নারীর স্বাধীনতার মতো বিষয়।
ম্যাগাজিনটি তাদের একটি প্রাথমিক সংখ্যায় ৫২ জন নারীর নাম প্রকাশ করে, যারা গর্ভপাত করিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে স্টেইনেমও ছিলেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভপাত বৈধ করার দাবিকে সামনে আনা হয়।
১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক ‘রো বনাম ওয়েড’ মামলায় যুক্তরাষ্ট্রে নারীর গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার স্বীকৃতি পাওয়ার আগেই এই ধরনের প্রচারণা জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শুধু বক্তব্য নয়, গড়ে তুলেছিলেন সংগঠন
স্টেইনেম কেবল লেখালেখি ও বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সংগঠিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন।
১৯৭১ সালে সাবেক মার্কিন কংগ্রেস সদস্য বেলা আবজুগ ও শার্লি চিশলম এবং লেখক বেটি ফ্রিডানের সঙ্গে মিলে তিনি ‘ন্যাশনাল উইমেনস পলিটিক্যাল ককাস’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর লক্ষ্য ছিল রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো।
পরবর্তীতে ‘কোয়ালিশন অব লেবার ইউনিয়ন উইমেন’, ‘উইমেনস মিডিয়া সেন্টার’, ‘ভোটার্স ফর চয়েস’ এবং ‘মিস ফাউন্ডেশন ফর উইমেন’ ছাড়াও আরো বিভিন্ন সংগঠন গড়ায় যুক্ত হন স্টেইনেম।
এসবের মাধ্যমে তিনি নারীর অধিকারকে শুধু ব্যক্তিগত জীবনের প্রশ্ন হিসেবে নয়, রাজনীতি, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম ও সামাজিক কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত করেন।
সব নারীর জন্য নারীবাদ
স্টেইনেমের নারীবাদী চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অন্তর্ভুক্তি।
তিনি মনে করতেন, নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে হলে জাতি, বর্ণ ও সামাজিক অবস্থানের ভিন্নতা বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে, কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের কাছ থেকে নারীবাদ শেখার কথা বলেছেন। তার মতে, বৈষম্যের অভিজ্ঞতা মানুষকে অন্যের বৈষম্যও বুঝতে শেখায়।
তার কাছে নারীবাদ ছিল কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর আন্দোলন নয়; বরং সব নারীর সমান অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন।
বিয়ে নিয়েও ছিলো নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি
বিয়ে ও পারিবারিক কাঠামো নিয়েও স্টেইনেম ছিলেন সরব। তার মতে, ঘরের বাইরে নারীর সমতা নিশ্চিত করতে হলে ঘরের ভেতরেও পুরুষ ও নারীর দায়িত্ব সমান হতে হবে।
নিজের কোনো সন্তান ছিল না। ছেষট্টি বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যবসায়ী ও পরিবেশকর্মী ডেভিড বেইলকে বিয়ে করেন স্টেইনেম। তার স্বামী ডেভিডের সন্তানদের একজন হলিউড অভিনেতা ক্রিশ্চিয়ান বেইল।
বিয়ের পর স্টেইনেম বলেছিলেন, নারীবাদ মানে বিয়ে না করা নয়; বরং জীবনের প্রতিটি সময়ে নিজের জন্য যা সঠিক, তা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা।
২০০৩ সালে মস্তিষ্কের ক্যানসারে মারা যান ডেভিড।
লেখালেখি ও পর্দায়ও ছিলো তার সমান উপস্থিতি
স্টেইনেম শুধু আন্দোলনের মাঠেই ছিলেন না, লেখালেখির মাধ্যমেও নিজের চিন্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। ১৯৮৬ সালে তিনি ‘মেরিলিন: নরমা জিন’ নামে মেরিলিন মনরোর জীবন নিয়ে বই লেখেন। ব্যক্তিগত বিকাশ ও আত্মমর্যাদা নিয়ে লেখেন ‘রেভলিউশন ফ্রম উইদিন: এ বুক অব সেলফ-এস্টিম’। এর পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে তার বিভিন্ন প্রবন্ধের সংকলন।
শিশু নির্যাতন নিয়ে ১৯৯৩ সালে এইচবিওর একটি এমি পুরস্কারজয়ী প্রামাণ্যচিত্রের ভাবনা ও ধারাবর্ণনায়ও তিনি যুক্ত ছিলেন। ‘বেটার অফ ডেড’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন। নারীর ওপর সহিংসতা নিয়ে ‘উইম্যান’ নামে একটি প্রামাণ্যধর্মী টেলিভিশন অনুষ্ঠানও উপস্থাপনা করেন।
তার জীবন ও কাজ পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র, নাটক ও প্রামাণ্যচিত্রেও উঠে আসে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত তার আত্মজীবনী ‘মাই লাইফ অন দ্য রোড’ তার দীর্ঘ কর্মজীবন ও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। এই বই অবলম্বনে ২০২০ সালে নির্মিত হয় ‘দ্য গ্লোরিয়াস’ চলচ্চিত্র। এর আগে ২০১৮ সালে তার জীবন নিয়ে মঞ্চনাটক ‘গ্লোরিয়া: এ লাইফ’ এবং ২০১১ সালে এইচবিওর প্রামাণ্যচিত্র ‘গ্লোরিয়া: ইন হার ওন ওয়ার্ডস’ নির্মিত হয়।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম পান স্টেইনেম।
ততদিনে তার পরিচিতি কেবল একজন নারীবাদী নেত্রী হিসেবে নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী।
কাজের পথে কখনো বয়স বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি গ্লোরিয়া স্টেইনমের জন্য। আশি বছর বয়স পার করার পরও তিনি লেখালেখি, বক্তব্য এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড সমান তালে চালিয়ে যান।
নিজের বর্ণনা দিতে গিয়ে একবার বলেছিলেন, ‘সামাজিক পরিবর্তনের একজন উদ্যোক্তা’। এই পরিচয়টিই যেন তার পুরো জীবনকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে।
তিনি শুধু পরিবর্তনের দাবি তোলেননি; সেই পরিবর্তনের জন্য সংগঠন তৈরি করেছেন, লিখেছেন, মানুষের কথা শুনেছেন এবং নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাকেও আন্দোলনের অংশ করেছেন।
(রয়টার্স অবলম্বনে)