ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডিআরডিও’র তৈরি বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি এখন দেশটির বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে হস্তান্তরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এতে যোগ্যতা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি অনুমোদন ও শর্ত পূরণ করে দেশেই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে হবে।
দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রযুক্তিগত যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় সনদ ও অন্যান্য সরকারি শর্ত পূরণ করতে পারলে বেসরকারি কোম্পানিগুলো ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অনুমোদনের জন্য প্রতিযোগিতা করতে পারবে।
এ নিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতোদিন ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব ছিলো সবচেয়ে বেশি।
বিশেষ করে ভারত ডায়নামিক্স ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলো। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু যন্ত্রাংশ সরবরাহ নয়, ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারবে।
ভারত সরকারের দাবি, উৎপাদন বাড়ানো, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমানোই এর মূল লক্ষ্য। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিরক্ষা সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করারও সুযোগ তৈরি হবে এতে।
বেঙ্গালুরুর তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের গবেষক আদিত্য রামানাথনের মতে, এই সিদ্ধান্তের আওতায় ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য, ট্যাংকবিধ্বংসী ও রাডারবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা আসতে পারে। এমনকি দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও এর আওতায় থাকতে পারে।
ভারতের এই পদক্ষেপের পিছনে দেশটির সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করাই বড় কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে রয়টার্সের প্রতিবেদনে। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা, সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং ইউক্রেনসহ বিভিন্ন সংঘাত থেকে পাওয়া শিক্ষা দেশটির অস্ত্রের মজুত বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে বলেও জানিয়েছেন রামানাথন। তাই বড় পরিসরে অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চীনকে মোকাবিলায় দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্রের মজুত প্রয়োজন বলে মনে করছে দেশটি।
এরই মধ্যে ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। ড্রোন, গোলাবারুদ, সামরিক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও মহাকাশ প্রযুক্তির পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনেও বিনিয়োগ করছে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো।
আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস, ২০২৪ সালে উত্তর প্রদেশে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন স্থাপনায় ৩০ বিলিয়ন রুপির বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা জানায়।
তবে বড় পরিমাণে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সহজ নয়। বিপুল অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন। তাই সরকারের বড় অর্ডার না পেলে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর জন্য এত বড় বিনিয়োগ থেকে লাভ করা কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের হাতে বর্তমানে অগ্নি ও পৃথ্বী সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ব্রহ্মোসের মতো শক্তিশালী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
এর মধ্যে ‘অগ্নি পাঁচ’ ৫ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মোসের পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার।
শুধু নিজেদের চাহিদা পূরণ নয়, আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারেও ভারতের উপস্থিতি বাড়ছে। ২০২২ সালে ফিলিপাইন ভারতের কাছ থেকে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের তিনটি ব্যাটারি কেনে। পরে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়াও এ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বিষয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে।
তবে দেশীয় উৎপাদন বাড়লেও সামরিক সরঞ্জাম আমদানিতে এখনও ভারতের বড় নির্ভরতা রয়েছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)-এর তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভারত ছিলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। এ সময়ে দেশটির অস্ত্র আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে।
তবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির মতো স্পর্শকাতর তথ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রযুক্তি ফাঁস বা সাইবার হামলার আশঙ্কাও রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য বেসরকারি অংশীদারদের বেশিরভাগই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করছে এবং গোপনীয় তথ্য ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
ভারতের নতুন নীতি শুধু ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেসরকারি খাতকে দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশে নিয়ে আসার একটি বড় পদক্ষেপ।
(রয়টার্স অবলম্বনে)