অনলাইন বিদ্বেষের বলি মালয়েশিয়ার রোহিঙ্গা শিশুরা, বন্ধ হচ্ছে একের পর স্কুল

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্বেষমূলকক প্রচারণা আর অপপ্রচারের জেরে মালয়েশিয়ায় একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের স্কুল।

স্থানীয়দের হুমকি, হয়রানি এবং কর্তৃপক্ষের অভিযানের মুখে বাধ্য হয়ে অন্তত নয়টি রোহিঙ্গা শরণার্থী বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে রোহিঙ্গা শিশুরা, যাদের অনেকেই ভয়ে ঘর থেকেই বের হতে পারছে না। দেশটিতে থাকা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর নজরদারি ও আইনি কড়াকড়িও বেড়েছে।

এই অনলাইন বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন ১২ বছর বয়সি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থী শিশু নূর। গত জুন মাসে স্কুলে যাওয়ার পথে দুজন ব্যক্তি তাকে আটকে মারধরের হুমকি দেয়।

নূরকে উদ্দেশ করে তারা বলে, "তুমি কেন স্কুলে যেতে চাও? তুমি কি আমাদের দেশ দখল করতে চাও?" সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় নূরের পরিবার তার পুরো নাম প্রকাশ করতেও রাজি হয়নি।

এই ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে নূর স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। নূর জানায়, সে যদি স্কুলে যেতে না পারে, তবে সে কিছুই শিখতে পারবে না এবং ভবিষ্যতেও তার পক্ষে কিছু হওয়া সম্ভব নয়।

মানবাধিকারকর্মী এবং শিক্ষাবিদরা বলছেন, নূরের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। অসংখ্য রোহিঙ্গা শিশু প্রতিনিয়ত এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় বেড়ে ওঠা রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী শরিফাহ শাকিরা জানান, শিশুরা এতোটাই আতঙ্কিত যে তারা এখন ঘর থেকে বের হতেই ভয় পাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, একটি শিশুকে দুয়েকদিনের জন্য হয়রানি করার মানে হলো তার মনে একটি চিরস্থায়ী মানসিক আঘাত বা ট্রমা তৈরি করা।

স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে এই শিশুদের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। শরিফাহ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, শিক্ষার সুযোগ না থাকলে রোহিঙ্গা মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার বেড়ে যাবে এবং রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তি করা শিশুর সংখ্যাও বাড়বে।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই বিদ্বেষের সূত্রপাত হয় গত মে মাসে। মেটা এবং টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে একটি রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর পশুবলির আচার নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ব্যাপক অপপ্রচার শুরু হয়।

পরিস্থিতি এতোটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, মালয়েশিয়া থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার দাবিতে অনলাইনে খোলা একটি পিটিশনে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সই করে। পরে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপে জুন মাসে পিটিশনটি সরিয়ে নেওয়া হয়।

মেটার মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম থ্রেডসে ‘লেম্পাং রোহিঙ্গা’ বা ‘রোহিঙ্গাদের চড় মারো’ শিরোনামে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে সহিংসতার উস্কানি দেওয়া শুরু হয়।

কিছু ইনফ্লুয়েন্সার রোহিঙ্গাদের ভিডিও করে তাদের অবস্থান কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেওয়ার জন্য অনুসারীদের উসকানি দিতে শুরু করে। শরিফাহ শাকিরার মতে, বর্তমান এই পরিস্থিতি কোভিড মহামারীর সময়ের চেয়েও শতগুণ বেশি ভয়াবহ।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই বিদ্বেষের সূত্রপাত হয় গত মে মাসে। মেটা এবং টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে একটি রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর পশুবলির আচার নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ব্যাপক অপপ্রচার শুরু হয়।

মালয়েশিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের অধীনে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা নিবন্ধিত থাকলেও, দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, বরং তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবেই গণ্য করা হয়।

দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের প্রতি মালয়েশিয়ার সাধারণ মানুষের সহানুভূতি থাকলেও, করোনা মহামারির সময় থেকে সেই ধারণায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে।

ওই সময় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ভাইরাস ছড়ানো, স্থানীয় সংস্কৃতিকে অসম্মান করা এবং স্থানীয়দের চাকরির বাজার দখল করার অভিযোগ ওঠে।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী লুকানিসমান আওয়াং সাউনি সংসদে স্বীকার করেছেন যে, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে সামলাতে গিয়ে সাধারণ জনগণ নিজেদের ভারাক্রান্ত মনে করছে।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল জানিয়েছেন, অনলাইনে নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও সরকার ইচ্ছেমতো কাউকে বিতাড়িত করতে পারে না। তারা জাতীয় নিরাপত্তা এবং মানবিকতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই পদক্ষেপ নেবেন।

মালয়েশিয়ার জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় রোহিঙ্গা শিশুদের পড়াশোনার কোনো আইনি অধিকার নেই। একইসাথে প্রাপ্তবয়স্ক শরণার্থীদেরও সেখানে কাজ করার অনুমতি নেই।

তাই রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার একমাত্র ভরসা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বা কমিউনিটি পরিচালিত অনানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়গুলো। কিন্তু অনলাইনে বিদ্বেষ ছড়ানোর পর কর্তৃপক্ষ এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

বৈধ অনুমতি না থাকার অভিযোগে সম্প্রতি উত্তরের কেদাহ রাজ্যে একটি স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যে স্কুলগুলো এখনও কোনোমতে টিকে আছে, সেখানকার শিক্ষকরা চরম আতঙ্কে দিন পার করছেন।

শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম পরে আসতে নিষেধ করা হচ্ছে এবং বাইরের সব খেলাধুলা ও কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুলের শিক্ষক জানান, তারা কেবল শিশুদের মৌলিক শিক্ষা দিতে চান, যাতে ভবিষ্যতে অন্য দেশে পুনর্বাসন বা নিজ দেশে ফেরার পর তারা নিজেদের তৈরি করতে পারে।

মালয়েশিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করা বা স্থানীয়দের চাকরি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ তিনি পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলমান এই বিদ্বেষ ঠেকাতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। মুক্তমত নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা 'আর্টিকেল নাইনটিনের'-এর মতে, মেটা বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর কনটেন্ট মডারেশন ব্যবস্থা মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

যদিও বার্তাসংস্থা রয়টার্সের চিহ্নিত করা বেশ কিছু বিদ্বেষমূলক পোস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সরিয়ে নিয়েছে, তবুও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রায়শই সাংকেতিক ভাষা বা ভাষার সূক্ষ্ম বিদ্বেষ ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক ক্ষতিকর কনটেন্ট অনলাইনে থেকে যাচ্ছে।

আর্টিকেল নাইনটিন আরও জানিয়েছে, সরকারের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে উলটো ক্ষতি করছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাও অনলাইনে ছড়ানো এই অপপ্রচার ও অমানবিক মন্তব্যের বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা স্থানীয় ও শরণার্থী দুই জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি কমানোর ওপর জোর দিয়েছে।

তবে সবচেয়ে বেশি মূল্য চোকাতে হচ্ছে নূরের মতো হাজারো রোহিঙ্গা শিশুকে, যাদের কাছে শিক্ষার আলো এখন সুদূর পরাহত।

(রয়টার্স অবলম্বনে)