দুই মাস আগে ভারতের জেন-জিরা যখন ‘ককরোচ আন্দোলন’ শুরু করে, তখন অনেকেই সেটাকে ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্রচারণা হিসেবেই দেখেছিলেন।
কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে ভিন্ন। আন্দোলনের ধরন ও প্রকৃতি বদলাচ্ছে দ্রুত। ৬৮ দিনের মাথায় সেই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনই এখন পরিণত হয়েছে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিতে।
জেন-জিদের বিক্ষোভে প্রতিদিনই উত্তাল হচ্ছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সাধারণ জনতা ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো।
গত সোমবারের বিক্ষোভে আনুমানিক ২০ হাজার মানুষ অংশ নেয় বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতো বড় বিক্ষোভ কর্মসূচির মুখোমুখি হয়নি ভারত।
ব্যঙ্গ থেকে বিক্ষোভ-মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। বল প্রয়োগ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সোমবারের সংঘর্ষে নিরাপত্তা কর্মী ও বিক্ষোভকারীসহ আহত হন প্রায় ২০০ জনের কাছাকাছি। মেট্রো ও ইন্টারনেটের মতো জরুরি পরিষেবাও কিছু সময়ের জন্য আংশিকভাবে বন্ধ থাকে।
তরুণদের প্রতিবাদকে সরকার প্রথমে যতোটা নিছক ব্যঙ্গাত্মক হিসেবে দেখেছিলো, এখন এই সংগঠিত আন্দোলনকে দেখা হচ্ছে তারচেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে।
ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে সরকারের ঊর্ধ্বতন মন্ত্রী গিয়ে দেখা করেছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিনিধিদের সাথে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএর সংসদীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে জোটসঙ্গীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। আশ্বাস দিয়েছেন প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দেওয়ারও।
এমনকি তরুণদের সঙ্গে আলোচনা করতে এবং ‘সংসদ অধিবেশনে যুবসমাজের প্রতিটি যৌক্তিক উদ্বেগ নিরসন করতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ থাকারও অঙ্গীকার করা হচ্ছে।
আর এসব থেকেই প্রশ্ন উঠছে, জেন-জিদের এই আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতেও কি সরকার পতন ঘটবে? নরেন্দ্র মোদী কি পদত্যাগ করবেন?
এই প্রশ্ন তীব্রভাবে আসার কারণ হলো, ২০২৪ সালে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে জেন-জিদের আন্দোলনের তীব্রতায় বাংলাদেশ ও নেপালে সরকার পতন ঘটে।
ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’-এ ভারতীয় কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনজীবী সরায়ু পানি এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনে দক্ষিণ এশিয়ায় সবশেষ কোনো দেশের সরকার পতনের উদাহরণ হয়ে আছে নেপাল। কিন্তু ওই প্রেক্ষাপটে গত এক দশকে ভারতের গণআন্দোলনগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে রয়েছে, যা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ আছে।
আন্দোলনে ভারতের সরকার বদলের ইতিহাস
১৯৭৪ সালে ‘নবনির্মাণ আন্দোলন’ নামে একটি গণজাগরণ কাঁপিয়ে দিয়েছিলো গুজরাটকে। দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হয় বিশাল আন্দোলন।
তীব্র বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন গুজরাটের তখনকার মুখ্যমন্ত্রী চিমনভাই প্যাটেল। এরপর রাজ্যটিতে জারি করা হয় রাষ্ট্রপতির শাসন।
তীব্র গতিতে ওই আন্দোলনের রেশ ছড়িয়ে পড়ে একাধিক রাজ্যে। বিহারেও শুরু হয় একই ধরনের ছাত্র আন্দোলন, যার নাম ছিলো ‘জেপি আন্দোলন’ বা ‘বিহার আন্দোলন’।
গুজরাটের সেই ছাত্র আন্দোলন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এতোটাই যুগান্তকারী ঘটনা ছিলো, যা পরে সমগ্র উত্তর ভারতজুড়ে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের বিরুদ্ধে বিশাল জাতীয় গণজাগরণে রূপ নেয়।
গুজরাটের ছাত্রদের সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে বিহারের ছাত্ররাও শুরু করে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে আন্দোলন। তারা প্রবীণ সমাজতান্ত্রিক নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণকে (জেপি) আন্দোলনের নেতৃত্ব আনেন। জয়প্রকাশ নারায়ণ আন্দোলনকে শুধু বিহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশব্যাপী ‘টোটাল রেভোলিউশন’-এর ডাক দেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন এবং ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের রূপরেখা উত্থাপন করেন।
বিহার আন্দোলনের রেশ ধরেই ১৯৭৪ সালের মে মাসে দেশব্যাপী রেল ধর্মঘটের ডাক দেন জর্জ ফার্নান্দেজ। তখন তিনি ছিলেন নিখিল ভারত রেল কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি। রেল ধর্মঘটে প্রায় অচল হয়ে পড়ে ভারতের যোগাযোগ ও অর্থনীতি।
জেপির নেতৃত্বে আন্দোলনে যোগ দিয়ে একতাবদ্ধ হতে থাকে ভারতের অন্যান্য বিরোধী দলগুলোও। এদের মধ্যে ছিলো জনসংঘ, সোশ্যালিস্ট পার্টি, সংগঠন কংগ্রেস। এই দলগুলোই পরে ‘জনতা পার্টি’ গঠনে মূল ভূমিকা রাখেন এবং আরও পরে জনতা পার্টির ভাঙন থেকেই তৈরি হয় বিজেপি।
গুজরাট ও বিহারের ওই আন্দোলনের জেরে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয় পুরো ভারতজুড়ে। এরই মধ্যে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ইন্দিরা গান্ধীকে নির্বাচনি দুর্নীতি বা অসদুপায় অবলম্বনের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে তার ১৯৭১ সালের লোকসভা নির্বাচনের জয়কে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন।
সার্বিক রাজনৈতিক অবস্থা এতোটাই টালমাটাল হয়ে যায় যে, ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন মধ্যরাতে পুরো ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করেন ইন্দিরা গান্ধী। জেপি, মোরারজী দেসাইসহ হাজার হাজার বিরোধী নেতা ও ছাত্র আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয়।
জয়প্রকাশ নারায়ণের (জেপি) নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকে দেখা যায় ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী সবচেয়ে বড় আন্দোলন হিসেবে।
ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে নির্বাচন দেন। আন্দোলনের তরঙ্গে ওই নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী ও কংগ্রেসের শোচনীয়ভাবে পরাজয় ঘটে।
রাজপথে সরাসরি পতন না হলেও, আন্দোলনের রাজনৈতিক ধাক্কাতেই পতন হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর দীর্ঘ শাসনের।
ভারতে আরও কয়েকটি গণআন্দোলন হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১১ সালে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্না হাজারের নেতৃত্বে ‘ইন্ডিয়া এগেইন্সট করাপশন’ আন্দোলন।
পুরো ভারতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল এই আন্দোলন। ভিত নাড়িয়ে দেয় তখনকার কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের। সরাসরি সরকারের পতন না ঘটলেও, সেই আন্দোলনে যে গণঅসন্তোষের দেখা দিয়েছিল, তার ওপর ভর করেই ২০১৪ সালের ভোটে কংগ্রেসের বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে এবং নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসে।
সাম্প্রতিক সময়ের কৃষক আন্দোলন নিয়েও আলোচনা হয়। ২০২০ থেকে ২০২১ সালের ওই আন্দোলনের প্রভাবে সরকারের পতন না হলেও জনগণের দাবির মুখে নতি স্বীকার করতে হয়েছে সরকারকে।
নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিতর্কিত তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে প্রায় এক বছর ধরে দিল্লির সীমানা অবরোধ করে রাখেন ভারতের কৃষকরা। অনড় আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত মোদী নিজে ক্ষমা চেয়ে আইনগুলো প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।
ভারতে নানা সময়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস বেশ পুরোনো। আন্দোলনের কারণে ভারতে রাজ্য সরকারের পতন, সরকারের বড় ধরনের নীতি পরিবর্তন বা নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন দলের ব্যাপক ভরাডুবির একাধিক ঐতিহাসিক নজির রয়েছে।
কিন্তু দেশটিতে গণআন্দোলনের মুখে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকার পতন হয়েছে কিংবা প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এমন নজির নেই।
ককরোচদের আন্দোলনে কি মোদীর পতন হবে
বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার মতো তুলনামূলক ছোট ও এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে রাজধানী অবরুদ্ধ করে সরকার পতন সম্ভব হলেও, ভারতের ক্ষেত্রে সেই সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের গণআন্দোলনের মাধ্যমে কেন কেন্দ্রীয় সরকার পতন হয় না, তার কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জননীতি পরামর্শক কৃতান্ত মিশ্র।
ইউরেশিয়া রিভিউয়ের এক বিশ্লেষণে তিনি লিখেছেন, রাজপথের আন্দোলনে ভারতে সরকারপ্রধানের পতন না হওয়ার মূল কারণগুলো হলো- দেশটির নির্বাচনের প্রতি জনগণের গভীর আস্থা, ক্ষমতা কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ, নিরবচ্ছিন্ন ও বহুস্তরভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক কাঠামো, বিশাল ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈচিত্র্য এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
এছাড়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ন্যারেটিভ ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ সহায়ক ভূমিকা হিসেবে কাজ করে বলে মনে করেন কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সরায়ু পানি।
‘দ্য ওয়্যার’-এ তিনি লিখেছেন, রাজনৈতিক ও আদর্শিক দিক থেকে বর্তমান ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অত্যন্ত সুসংহত। মূলধারার গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ সরকারের অনুকূলে থাকায় যেকোনো আন্দোলনকে সহজেই ‘দেশবিরোধী’, ‘বিদেশি মদদপুষ্ট’ বা ‘উন্নয়নের পরিপন্থি’ বলে প্রচার করা সম্ভব হয়।
এর ফলে সাধারণ নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ আন্দোলনগুলোর প্রতি নৈতিক সমর্থন হারিয়ে ফেলে বলেও মনে করেন এই বিশ্লেষক।
সাম্প্রতিক আন্দোলনের উদাহরণ টেনে সরায়ু পানি লিখেছেন, “এই ধরনের বিক্ষোভগুলোতে প্রত্যেক গোষ্ঠী লড়াই করে একাকী। তারা শুধু নিজেদের উদ্বেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং দাবি পূরণ হওয়া মাত্রই আন্দোলন শেষ করে দেয়।”
বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সংহতির অভাবের কারণে যেকোনো ইস্যু বড় আকার ধারণ করে সরকার পরিবর্তনের মতো সম্মিলিত দাবিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা এখন খুবই ক্ষীণ বলেও মনে করেন তিনি।
ভারতে এমন দৃষ্টান্তও আছে যে, অনেকগুলো সরকার নির্ধারিত ৫ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে না পেরে আগেই ভেঙে গিয়েছিল। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত এক দশকেই ভারতে সরকার পরিবর্তন হয়েছিল ৫ বার।
তবে সেসবের পেছনেও ছিল না কোনো গণঅভ্যুত্থান বা সংগঠিত আন্দোলন। মূলত সংসদীয় গণতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ, জোট সরকারের কোন্দল এবং সমর্থন প্রত্যাহারের খেলায় নড়ে যায় সরকারের গদি।
নরেন্দ্র মোদীর বর্তমান সরকারের নেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। জোটসঙ্গীদের সমর্থনের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়েই তারা টিকে আছে।
বিজেপি সরকারকে টিকিয়ে রাখার মূল তিন খেলোয়াড় হলো- অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলুগু দেশম পার্টি, বিহারের নীতীশ কুমারের জনতা দল এবং মহারাষ্ট্রের একনাথ শিন্ডের শিবসেনা।
আবার ভারতের জোট রাজনীতির সমীকরণে চন্দ্রবাবু নাইডু ও নীতীশ কুমারকে 'কিংমেকার' বা সরকার ভাঙা-গড়ার কারিগর বলা হয়। নাইডু অন্তত চারবার এবং নীতিশ অন্তত পাঁচবার ক্ষমতার জোট ভাঙা-গড়ায় ভূমিকা রেখেছেন।
তাই ককরোচদের আন্দোলন যদি আরো তীব্র হয় এবং ভারতের পার্লামেন্টে যদি অনাস্থা ভোট হয়, সেখানে নাইডু-নীতিশরা ভূমিকা কোনদিকে থাকবে, তার ওপর নির্ভর করছে এনডিএ জোট ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভবিষ্যত।