কে এই শুভেন্দু অধিকারী?

নন্দীগ্রামের আন্দোলনের মাটিতে যিনি একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে ভরসাযোগ্য সৈনিক ছিলেন, তিনিই পরে হয়ে উঠলেন তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।

কাঁথির এক রাজনৈতিক পরিবারের ছেলে থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে, শুভেন্দু অধিকারী যেন বাংলা রাজনীতির আলোচিত উত্থানগুলোর একটি।

রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা

১৫ই ডিসেম্বর ১৯৭০, পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি শহর। বঙ্গোপসাগরের হাওয়া লাগা সেই জনপদেই জন্ম শুভেন্দুর। রাজনীতি যেন তার রক্তেই ছিল। বাবা শিশির অধিকারী ছিলেন মেদিনীপুরের পরিচিত কংগ্রেস নেতা। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা সেই পুরনো ঘরানার রাজনীতিকের বাড়িতেই বড় হওয়া তার।

ছাত্র রাজনীতি দিয়েই শুরু। কলেজে ছাত্র সংসদের সেক্রেটারি নির্বাচিত হওয়ার পর খুব দ্রুতই স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পৌরসভায় কংগ্রেস থেকে কাউন্সিলর হিসেবে প্রথমবার নির্বাচিত প্রতিনিধি হন।

তবে শুভেন্দুর রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে যায় নন্দীগ্রামে।

নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সংগঠক

২০০৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের শিল্প প্রকল্পের জন্য জমি দখলের পরিকল্পনায় উত্তাল হয়ে ওঠে নন্দীগ্রাম। রাস্তায় নেমে আসেন কৃষকরা। আর সেই আন্দোলনের সামনের সারিতে উঠে আসেন শুভেন্দু অধিকারী।

ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্ব দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আন্দোলনের সম্মুখ সারির মুখ। কলকাতায় আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আর গ্রামে গ্রামে সংগঠন গড়ে তুলছিলেন শুভেন্দু।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নন্দীগ্রাম শুধু বামফ্রন্ট সরকারের ভিতই কাঁপায়নি, বদলে দিয়েছিল শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক ভবিষ্যতও।

প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্ব দিয়ে সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক হয়ে ওঠেন শুভেন্দু। আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতৃত্বে ছিলেন মমতা। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস শক্ত অবস্থান তৈরি করে এবং রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেত্রী হিসেবে উঠে আসেন মমতা।

জঙ্গলমহল থেকে দিল্লি

নন্দীগ্রাম আন্দোলনের পর শুভেন্দুকে পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া নিয়ে গঠিত জঙ্গলমহলের দায়িত্ব দেয় তৃণমূল কংগ্রেস। মাওবাদী প্রভাবিত সেই এলাকায় সংগঠনের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

২০০৯ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন শুভেন্দু। সিপিআই(এম)-এর প্রভাবশালী নেতা লক্ষ্মণ শেঠ কে প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার ভোটে হারিয়ে রাজনৈতিক মহলে নিজের শক্ত অবস্থান জানান দেন। ২০১৪ সালেও তিনি একই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন।

২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের পরিবহনমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। একই সময়ে তিনি দলের যুব সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবেও পরিচিতি পান।

তৃণমূল ছাড়ার সিদ্ধান্ত

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের পর দলের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায় বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়।

প্রথমে শুভেন্দু হুগলি রিভার ব্রিজ কমিশনের চেয়ারম্যান পদ ছাড়েন ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে। তারপর পরিবহনমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন। সেই বছরেরই ডিসেম্বর মাসে বিধায়ক পদ এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও ইস্তফা দেন।

তার পরপরই ১৯এ ডিসেম্বর ২০২০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ দেন।

নন্দীগ্রামে মমতাকে হারানো

২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত লড়াই ছিল নন্দীগ্রামে। সেখানে মুখোমুখি হন শুভেন্দু ও মমতা । শেষ পর্যন্ত প্রায় ১,৯৫৬ ভোটের ব্যবধানে জয় পান শুভেন্দু। যদিও আদালতে গিয়েছিলেন মমতা।

বিজেপি সেবার সরকার গঠন করতে না পারলেও শুভেন্দু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা হন। এরপর দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক নানা ইস্যুতে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তিনি।

২০২৬: মুখ্যমন্ত্রীর আসনে

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর, দুই কেন্দ্র থেকেই বিজেপির প্রার্থী হন শুভেন্দু অধিকারী। দুটি আসনেই জয় পান তিনি। ভবানীপুরে মমতাকে ১৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেন বলে বিজেপির দাবি।

বিজেপি ২৯৪টির মধ্যে ২০৭টি আসন জিতে ইতিহাস গড়ে। অন্যদিকে তৃণমূল নেমে আসে মাত্র ৮০ আসনে। 

আটই মে ২০২৬-এ কলকাতায় বিজেপি বিধায়ক দলের বৈঠকে তাকে নেতা নির্বাচিত করা হয়। এরপর ৯ই মে পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শুভেন্দু অধিকারী। এই প্রথম বিজেপির কোনো নেতা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হলেন। প্রথমবারের মতো কোন বিজেপি নেতার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেব শপথ নেওয়ার সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহসহ দলটির শীর্ষ নেতারা। 

বিতর্ক সমালোচনা

তবে রাজনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি শুভেন্দু অধিকারীর ক্যারিয়ার বিতর্কেও ঘেরা।

সারদা গ্রুপের আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্তে তার নাম উঠে আসে। ২০১৪ সালে সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। যদিও তার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো চার্জশিট দাখিল হয়নি।

২০২০ সালে সারদা গ্রুপের চেয়ারম্যান সুদীপ্ত সেন অভিযোগ করেন, শুভেন্দু তার প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নিয়েছিলেন। তিনি অবশ্য এসব অভিযোগকে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে দাবি করেন।

নারদ স্টিং অপারেশন মামলাতেও তার নাম উঠে আসে। অভিযোগ ছিল, গোপন ক্যামেরায় তাকে নগদ অর্থ নিতে দেখা গেছে। তবে শুভেন্দু ভিডিওর সত্যতা অস্বীকার করেন। মামলাটি এখনও তদন্তাধীন।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তার মন্তব্য রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনী প্রচারে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য নির্বাচন কমিশনের নোটিশ পান তিনি। মুসলিম বিধায়কদের নিয়ে মন্তব্য, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ ইস্যু এবং ধর্মীয় মেরুকরণ নিয়ে তার বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।

২০২৪ ও ২০২৫ সালে তার একাধিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করে তৃণমূল কংগ্রেস। যদিও শুভেন্দুর দাবি, তিনি জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মাত্র।

এরপর ২০২৫ সালে ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন নিয়ে তার মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করে, তার বক্তব্য ঘৃণাত্মক ও উসকানিমূলক। অন্যদিকে বিজেপি নেতারা বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি এ ধরনের মন্তব্য করেছেন।

সমর্থকদের কাছে শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের প্রধান মুখ এবং পরিবর্তনের প্রতীক। আর সমালোচকদের চোখে বিভাজনমূলক রাজনীতির প্রতিনিধি।

তবে এটা স্পষ্ট, নন্দীগ্রামের আন্দোলন থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে পৌঁছানো, শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক যাত্রা পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।