ওয়ারপ্রিনারশিপ: যেভাবে যুদ্ধ দিয়ে ধনী হয় এক শ্রেণির মানুষ

বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে যুদ্ধ যখন মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়, তখন কিছু মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে সেই যুদ্ধই এক অভাবনীয় ব্যবসায়িক সম্ভাবনা। 

ইতিহাসের বড় বড় সংঘাতগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের আড়ালে দাঁড়িয়ে একদল মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের নেপথ্যে তেল ও অস্ত্রের রাজনীতি আজ ওপেন সিক্রেট।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো উইলিয়াম ডি. হার্টুং এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ২০০১ সালের পরের যুদ্ধগুলো থেকে পেন্টাগনের শীর্ষ পাঁচটি ডিফেন্স কন্ট্রাক্টর বা প্রতিরক্ষা ঠিকাদার আয় করেছে ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা রপ্তানি রেকর্ড ১৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে।  যার বড় একটি অংশ অর্জিত হয়েছে গাজা ও পশ্চিম তীরে ব্যবহৃত ‘ব্যাটল প্রুভেন’ ড্রোন ও নজরদারি প্রযুক্তি বিক্রির মাধ্যমে।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে অনেকে দেখছেন সামরিক প্রযুক্তির ‘ল্যাবরেটরি’ হিসেবে।

ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি তেল কোম্পানি ২০২২ সালে নিট মুনাফা করে প্রায় ১৯৬ বিলিয়ন ডলার।

কেবল অস্ত্র বা তেল নয়, যুদ্ধের অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে ‘ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের’ মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে কিছু ব্যক্তি।

সম্প্রতি ইরান-আমেরিকা যুদ্ধে যখন টালমাটাল বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা, অনিশ্চিত কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা, ইরানে যখন বাড়ছে মৃত্যু ও ধ্বংসের আখ্যান, ঠিক তখনই এই যুদ্ধ কিছু মানুষের কাছে আবির্ভূত হয়েছে ‘অর্থনৈতিক সুযোগ’ হিসেবে। 

ভূরাজনৈতিক এই সংকট তাদের কাছে হয়ে উঠেছে মুনাফা লাভের মহোৎসব।

মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের জন্য ইরান সংঘাত প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার হুমকির মুখে বিপুল পরিমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।

ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করায় বিশ্ববাজারে নাটকীয়ভাবে বাড়ে তেলের দাম। ক্রুড অয়েলের দাম পৌঁছায় প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার পর্যন্ত।

এই সংকটকে বিশ্ব তেলের বাজারের ইতিহাসের সব থেকে বড় ‘সাপ্লাই ডিজরাপশন’ হিসেব ঘোষণা করে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি। অথচ এই বিপর্যয়ের মধ্যেও তেল কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফা আগের তুলনায় বাড়ছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।

কারা লাভবান হচ্ছে এইসব সংঘাত থেকে?  কীভাবেই বা মানুষের রক্ত পরিণত হচ্ছে মুনাফাতে?

তেল কোম্পানিগুলোর 'যুদ্ধকালীন মুনাফা'

যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা দেখা দিয়েছে জ্বালানির বাজারে। ইউক্রেন-রাশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করছে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম, শেল বা এক্সন মবিলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো।

দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুদ্ধের প্রথম মাসে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৩০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত মুনাফা করেছে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি তেল ও গ্যাস কোম্পানি। 

শুধু মার্চ মাসেই কোম্পানিগুলোর মোট 'উইন্ডফল প্রফিট' বা অপ্রত্যাশিত মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারে। 

এই বাড়তি মুনাফার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী সাউদি আরামকো, গ্যাজপ্রম এবং এক্সনমোবিলের মতো কোম্পানিগুলো। যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয় কোম্পানিগুলো। যাকে বলা হচ্ছে ‘ওয়ার উইন্ডফল’।

প্রতিবেদন বলছে, এই যুদ্ধ চলতে থাকলে ২০২৬ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লাভ করবে তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো।

যুদ্ধ চলতে থাকলে ২০২৬ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লাভ করবে তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো

রমরমা অস্ত্র ব্যবসা

যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেকগুলো দেশ তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে। আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার দেশগুলো সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়েছে রেকর্ড পরিমাণে।

দেশগুলো অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনতে তাদের জনগণের ট্যাক্সের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। আর এই বিপুল অর্থের বড় অংশই যাচ্ছে লকহেড মার্টিন, রেথিওন এবং বোয়িংয়ের মতো গুটিকয়েক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পকেটে। 

ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমেরিকা ও ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের একটি চিত্র তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে ৬৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করেছে মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহেড মার্টিন। যা আগের বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। মূলত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং মিসাইল সিস্টেম তৈরি করে তারা। একইবছর ৪৩ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে টমাহক ও প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেমের নির্মাতা আরটিএক্স। পাশাপাশি নর্থরপ গ্রামম্যান প্রায় ৩৮ বিলিয়ন, জেনারেল ডায়নামিক্স ৩৩ বিলিয়ন এবং বোয়িং তাদের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রোগ্রাম থেকে ২০২৪ সালে আয় করেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

ইসরায়েলের বৃহত্তম সামরিক কোম্পানি এলবিট সিস্টেমস ২০২৪ সালে আয় করেছে ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। মূলত ড্রোন ও নজরদারি সরঞ্জাম তৈরি করে এলবিট সিস্টেমস। ইসরায়েলের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ আয় করেছে ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। আর আয়রন ডোম তৈরির জন্য বিখ্যাত রাফায়েল ২০২৪ সালে আয় করেছে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। 

যুদ্ধের কারণে এই কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামও বেড়েছে নাটকীয়ভাবে। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আরটিএক্স এর শেয়ারের দাম বেড়েছে ১১০ শতাংশ। নর্থরপ গ্রামম্যান ৬০ শতাংশ, জেনারেল ডায়নামিক্স ৫৭ এবং লকহেড মার্টিনের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। 

আর এইসব কোম্পানির বানানো অস্ত্রই ব্যবহার করা হচ্ছে ইরানের বিরুদ্ধে। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় বেড়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। টাকার অংকে যার পরিমাণ ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। যার একটি বড় অংশ আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই কোম্পানিগুলোর পকেটে যাচ্ছে।

ইনসাইডার ট্রেডিং: যুদ্ধের খবর টাকার বাজারে

যুদ্ধের প্রথম গুলির আগেই তার প্রভাব পড়তে শুরু করে বাজারে। আগাম তথ্যের ভিত্তিতে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলে এক শ্রেণির প্রভাবশালী মানুষ। যারা ক্ষমতা বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কাছাকাছি থাকে, তারা গোপন তথ্য ব্যবহার করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঠকিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। 

বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ডনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার আগমুহূর্তে আর্থিক বাজারে হওয়া কিছু সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনাগুলো ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’ বা অভ্যন্তরীণ গোপন তথ্য ফাঁসের জোরালো ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯ মার্চ ইরান - আমেরিকা যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প সিবিএস নিউজকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি যুদ্ধ ‘প্রায় শেষ পর্যায়ে’ এবং শত্রুতা নিরসনের সম্ভাবনা আছে বলে ইঙ্গিত দেন। এই সাক্ষাৎকারটি টিভিতে প্রচার হওয়ার ঠিক ৪৭ মিনিট আগে তেলের ‘ফিউচার মার্কেটে’ বিশাল অঙ্কের লেনদেন হয়। কিছু ব্যক্তি বাজি ধরেন যে তেলের দাম কমবে। সাক্ষাৎকারটি প্রচার হওয়ার পর তেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যায়। ফলে বাজি ধরা ব্যক্তিরা কয়েক মিনিটের ব্যবধানে মিলিয়ন ডলার লাভ করেন।

ফিউচার মার্কেট হলো এমন একটি বাজার, যেখানে কোনো পণ্য বর্তমান দামে কেনা-বেচা হয় না। এর পরিবর্তে ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দামে ওই পণ্যটি কেনা বা বেচার  চুক্তি করা হয়।

ইরানের সাথে একটি ‘সম্পূর্ণ সমাধান’ এবং ইতিবাচক অগ্রগতির কথা ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করেন ট্রাম্প। ২৩এ মার্চ করা এই পোস্টের ঠিক ১৪ মিনিট আগে তেলের বাজারে দেখা যায় অস্বাভাবিক লেনদেন। এবারও কিছু লোক নিশ্চিতভাবে জানতেন যে তেলের দাম কমতে যাচ্ছে।

এই ঘটনাকে ‘নিশ্চিতভাবেই অস্বাভাবিক’ এবং ‘ইনসাইডার ট্রেডিং’য়ের ‘টেক্সটবুক উদাহরণ" হিসেবে বর্ণনা করেছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

বিশ্বজুড়ে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে কিছুদিন পরই সেটি ৯০ দিনের জন্য স্থগিতের করেন ট্রাম্প। কিন্তু এই ঘোষণা আসার ১৮ মিনিট আগে থেকে শেয়ার বাজারে বিপুল বিনিয়োগ শুরু হয়। কিছু ট্রেডার ওই ১৮ মিনিটে ২০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে প্রায় ২ কোটি ডলার মুনাফা করেন। একদিনে সূচক ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছিলো। যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সূচক বাড়ার অন্যতম বড় ঘটনা।

এছাড়াও পলিমার্কেট এবং কালশি’র মতো অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মেও অস্বাভাবিক কিছু অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার কয়েক ঘণ্টা আগে বাজি ধরে লাখ লাখ ডলার আয় করার ঘটনাও ঘটেছে।

এই ঘটনায় গ্যানন কেন ভ্যান ডাইক নামক মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করার ঘটনাও ঘটেছে। গ্যানন ৩৩ হাজার ডলার বাজি ধরে ৪ লাখ ডলারেরও বেশি জিতেছিলেন বলে জানা যায়।

দেশটির সিকিউরিটিজ অ্যাক্ট অনুযায়ী ইনসাইডার ট্রেডিং দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, লেনদেনের ধরন দেখে বোঝা যায় কেউ গোপন তথ্য পেয়েছে। কিন্তু আদালতে অপরাধী সাব্যস্ত করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ জোগাড় করা দুঃসাধ্য।

মাদুরোর গ্রেফতার নিয়ে বাজি ধরে ৪ লাখ ডলারেরও বেশি জিতেছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্য গ্যানন কেন ভ্যান

ওয়ারপ্রেনিওরশিপ: যুদ্ধের নতুন ব্যবসা

যুদ্ধের এই বাণিজ্যিক রূপকে 'ওয়ারপ্রেনিওরশিপ' হিসেবে অভিহিত করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং গবেষক জেরাল্ড পিটার মুতোনি। এক গবেষণাপত্রে মুতোনি দেখান, আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ এখন শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি পরিকল্পিত ব্যবসায়িক মডেল।

ওয়ারপ্রেনিওরশিপ ব্যবস্থায় যুদ্ধকে একটি পণ্য হিসেবে দেখা হয়। যেখানে অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, প্রাইভেট সিকিউরিটি ফার্ম বা ভাড়াটে সেনাবাহিনী এবং প্রভাবশালী লবিস্টরা একজোট হয়ে কাজ করে। তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করা। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, অস্ত্রের চাহিদা তত বাড়বে। আবার অনেক যুদ্ধের পেছনে আসল কারণ থাকে খনিজ সম্পদ যেমন, তেল, সোনা বা হীরা দখল করা।

মুতোনি দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর ও অবকাঠামো তৈরির জন্য বড় বড় নির্মাণ কোম্পানিগুলোকে বিশাল অংকের কনট্রাক্ট দেওয়া হয়। অর্থাৎ, প্রথমে ধ্বংস করে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা লাভ করে, আর গড়ার নামে লাভ করে নির্মাণ ব্যবসায়ীরা।

গবেষণাপত্রে মুতোনি দাবি করেন, যুদ্ধ অল্প কিছু শক্তিশালী মানুষ এবং বড় বড় কোম্পানিকে ট্রিলিয়ন ডলার মুনাফা দেয়।

যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন পাওয়ার জন্য তারা দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়। যদিও এর মূল লক্ষ্য থাকে অর্থনৈতিক লাভ।

চিরস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনীতি: ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু

কখনো কখনো সংঘাতকে একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক কাঠামোতে রূপান্তর করা হয়। এর অন্যতম উদাহরণ হলো ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু। প্রজেক্ট অন মিডল ইস্ট পলিটিক্যাল সায়েন্সে প্রকাশিত ‘ফরএভার ওয়ার ফর প্রোফিট’ নামক নিবন্ধে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে চলমান সংঘাত এখন একটি ‘গ্লোবাল করপোরেট সিকিউরিটি ইকোনমি’তে পরিণত হয়েছে। 

নিবন্ধে উল্লেখ করা হয় যে, ফিলিস্তিন বা গাজা অনেক ক্ষেত্রে নতুন সামরিক প্রযুক্তি ও নজরদারি যন্ত্রের 'পরীক্ষাগার' হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে সফলভাবে পরীক্ষিত প্রযুক্তিগুলো পরে সারা বিশ্বের কাছে 'ব্যাটল-টেস্টেড' হিসেবে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা করা হয়।

প্রমাণ হিসেবে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা হয় নিবন্ধে। যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। 

যুদ্ধের পেছনে যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হয়, তার মূল উৎস জনগণের দেওয়া ট্যাক্স। যুদ্ধের ফলে সেই টাকা করপোরেট মুনাফায় রূপান্তরিত হয়। 

এই ব্যবস্থায় শান্তি স্থাপন করা হলে ব্যবসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বজায় রাখাটাই স্বার্থ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য লাভজনক।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ থেকে লাভবান হওয়া পক্ষটি এতটাই শক্তিশালী যে তারা পৃথিবীর আইন ও নীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। বড় কোম্পানিগুলো তাদের অর্থ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে  এমন সব আইন পাস করিয়ে নেয় যা সংকটের সময় তাদের মুনাফাকে রক্ষা করে। যুদ্ধের যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য তারা মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী এবং থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ব্যবহার করে। আর এসবের বিনিময়ে যুদ্ধে ঝরা প্রতিটি রক্তবিন্দুর বিপরীতে বাড়ে তাদের সম্পদ ও ক্ষমতা।

যুদ্ধ থেকে লাভবান হওয়া এই পক্ষটির কাছে যুদ্ধ হলো একটি বিনিয়োগ। অস্ত্র বিক্রি, পুনর্গঠনের কাজ বা খনিজ সম্পদ, তাদের পক্ষে সবই পাওয়া সম্ভব যুদ্ধের মাধ্যমে। তাই অর্থনীতি যতদিন এমনভাবে কাজ না করবে, যেখানে 'শান্তি থাকলেই বেশি আয় হবে', ততদিন তারা পৃথিবীকে বারবার সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে।

‘যুদ্ধ কেবল তখনই থামে যখন এটি আর লাভজনক থাকে না’।