সাহাব এনাম খান: গত দেড় দশক ধরে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ককে সমালোচকরা দেখেছেন ‘এক-দলীয় অংশীদারিত্ব’ হিসেবে। তাদের দাবি, ভারতের বাংলাদেশ নীতি মূলত একটি নির্দিষ্ট দলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। প্রশ্ন হলো, আমরা এখন যা দেখছি, তা কি শুধুই একটি নতুন শুরু, নাকি দুই সার্বভৌম প্রতিবেশীর মধ্যে একটি ‘পরিপক্ক পুর্নবিন্যাস’?
অভিজিৎ আইয়ার-মিত্র: আমার মনে হয়, ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরোধী দলগুলোর সাথেও খুব ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছে। আপনার যদি মনে থাকে, মালদ্বীপের বর্তমান প্রেসিডেন্ট কিন্তু ‘ভারত-বিরোধী’ প্ল্যাটফর্ম থেকে এসেছিলেন, কিন্তু এখন তিনি বেশ ‘ভারতপন্থী’ হয়ে উঠেছেন। শ্রীলঙ্কায় যখন কমিউনিস্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, সবাই বলতে শুরু করলো, ‘ওহ, আমরা তো শ্রীলঙ্কাকে স্থায়ীভাবে চীনের কাছে হারিয়ে ফেললাম।’ অথচ আজ শ্রীলঙ্কা আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, বিষয়টিকে ‘এক-দলীয় নীতি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে কারণ শেখ হাসিনা প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। আর নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় প্রায় ১১ বছর। ফলে শেখ হাসিনাই ছিলেন একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, যার সাথে মোদিকে কাজ করতে হয়েছে। তবে আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে, বেগম খালেদা জিয়ার সরকার যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনও ভারতের সাথে অত্যন্ত জোরালো যোগাযোগ ছিল।
প্রশ্ন হলো, তখন কি সমস্যা ছিল? অবশ্যই ছিল। দুটি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে উত্থান-পতন থাকবেই। ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে তারেক রহমানের নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত সময়কালকে আমি একটি ‘ব্যতিক্রম’ হিসেবে ধরবো,এবং কেন সেটা বলছি।
এ সময়ে বাংলাদেশে কোনো গণতান্ত্রিকভাবে দায়বদ্ধ সরকার ছিল না। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি নিয়ে ভারতের কোনো সমস্যা নেই। আমাকে এমন একটি উদাহরণ দেখান, যেখানে শেখ হাসিনা ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ছিলেন না, বা যেখানে তিনি ভারতের স্বার্থে বাংলাদেশের কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ত্যাগ করেছেন। সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করা কীভাবে বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী হয়? কারণ আমরা সবাই জানি, অবৈধ কাজগুলো একে অপরের পরিপূরক। সীমান্তে ভারতের কাছে যা অবৈধ, তা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কাছেও অবৈধ হবে।
উদাহরণ দিয়ে বলি, গরু পাচার নেটওয়ার্ক, যা বাংলাদেশে গিয়ে গরুর মাংস হচ্ছে। এই চক্রটিই আবার ভারতে মাদক এবং অস্ত্র ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়ে। তাই এদের ভারতের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং এটি বাংলাদেশের স্বার্থেও হতো যদি আমরা কোনোভাবে দু’দেশের মধ্যে একটি এই পণ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য চালু করতে পারতাম। তবে ভারতে এটি রাজনৈতিক কারণে সম্ভব নয়।
তাই আমি মনে করি না, খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনা, কেউই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ইস্যুতে কখনো আপস করেছেন। সমস্যা ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার চারপাশের অনির্বাচিত লোকজন। তাদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না। জনগণের কাছে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না। তারা সবাই ছিল (শব্দটি ব্যবহারের জন্য দুঃখিত) অনির্বাচিত ‘জোকার’, যাদের গায়ে ছিল শুধু ‘সাদাদের অনুমোদনের সিল’। আর আমরা জানি এই সাদারা কেমন সিল দেয়। যেমন ধরুন, মালালা ইউসুফজাই বা অরুন্ধতী রায়। ভারতের বিষয়ে অরুন্ধতী রায়ের কথা শোনা মানে হলো যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিখ্যাত শেফ, যেমন জুলিয়া চাইল্ডকে দিয়ে আমেরিকার সামাজিক নীতি বা কূটনীতি নিয়ে কথা বলানো। এটা তো হওয়া উচিত নয়, অথচ এমনটাই ঘটে। তো এই লোকটির (ইউনূস) ওপর এক ধরনের ‘অনুমোদনের সিল’ ছিল, মানে হলো তিনি সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে গেলেন, যার কোনো জবাবদিহিতা নেই, চরম অর্থলোভী এবং দুর্নীতিপরায়ণ, এবং তিনি নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন।
শেষ পর্যন্ত ভারতের শেষ প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধু অর্থাৎ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, তারাই এসে কঠোর অবস্থান নিল এবং বলল, বস, আপনাকে নির্বাচন দিতেই হবে, ব্যস। এবং এটি খুব ভালো হয়েছে, কারণ আমরা ঠিক এটাই প্রত্যাশা করি। আমরা প্রতিষ্ঠান-টু-প্রতিষ্ঠান যোগাযোগ আশা করি। আমার দৃষ্টিতে তারেক রহমান চমৎকার কাজ করছেন। তার মধ্যে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা সবার আগে বাংলাদেশ নীতির সব ধারণাই আছে, কিন্তু তার মায়ের মধ্যে যেসব ব্যক্তিগত বোঝা বা ‘ব্যাগেজ’ ছিল, সেই ব্যাগেজের অনেকটাই তার মধ্যে নেই।
প্রয়াত খালেদা জিয়ার ভারতের প্রতি যে নেতিবাচক মনোভাব বা ‘ব্যাগেজ’ ছিল, তা আমি পুরোপুরি বুঝতে পারি। আবেগ কূটনীতির একটি অংশ, আপনি এটি এড়াতে পারবেন না। প্রশ্ন হলো, পরিপক্ক মানুষরা একে কীভাবে সামাল দেন? আমি মনে করি, যতক্ষণ পর্যন্ত গণতন্ত্রের ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ভারসাম্য বজায় থাকবে, ততক্ষণ ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিটি ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ এর সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এবং আমি মনে করি এটি একটি সুন্দর এবং নতুন করে শুরু হওয়া বন্ধুত্বের সূচনা।
সাহাব: যখন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং ভারত, চীন বা আমেরিকার স্বার্থ নিয়ে না ভেবে বরং জনগণ কী চায় তা বিবেচনা করা হবে, সেটা কি ভারতের জন্য কোনো উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে?
অভিজিৎ: শতভাগ। এবং কেন তা আমি বলছি। দেখুন, ধরা যাক, সাহাব এবং অভিজিতের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতভেদ হচ্ছে? অবশ্যই আমাদের সবসময়ই তা হয়। আর আপনি যদি তখন কিছু গোপন করেন, পুরো বিষয়টা না বলেন কিংবা আপনার আসল স্বার্থটা কী সেটা প্রকাশ না করেন; তাহলে আমরা কখনই সেই সমস্যার সমাধান করতে পারব না।
যখন কিছু গোপন না রেখে কোনো স্বার্থ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয় এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা হয় তখন সেই স্বচ্ছতা বা স্পষ্টতা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দারুণভাবে কাজ করে। চীন তার চারপাশের প্রায় সবার সাথেই খারাপ সম্পর্ক রাখে, এমনকি যাদের সাথে ভালো সম্পর্ক আছে তারাও চীনকে গভীরভাবে সন্দেহ করে। এর অন্যতম কারণ হলো, তারা এমন সব জটিল পরিভাষা এবং গোলমেলে ভাষা ব্যবহার করে যে কেউ তাদের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারে না। এরপর সেই নীতির ব্যাখ্যাকারীরা যখন এসে বলেন, আমরা তো ভেবেছিলাম বিষয়টি খুব স্পষ্ট, তখন আসলে দেখা যায় যে সেটি মোটেও স্পষ্ট ছিল না।
তাই তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের নীতির ক্ষেত্রে এটি যদি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়, যেমন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা কি বাংলাদেশের স্বার্থে? হ্যাঁ। পারমাণবিক শক্তি কি বাংলাদেশের স্বার্থে? হ্যাঁ। অফশোর গ্যাস ফিল্ডগুলোর উন্নয়ন কি বাংলাদেশের স্বার্থে? হ্যাঁ। বাংলাদেশের শিল্পায়ন এবং মানব উন্নয়ন সূচক ও মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি কি একটি চমৎকার বিষয়? হ্যাঁ।
ভারত কি এগুলোর কোনোটির সাথে দ্বিমত পোষণ করে? কারণ আমাদের মূল বক্তব্যই হলো, বাংলাদেশের শিল্প যত বিকশিত হবে এবং বাংলাদেশ যত বেশি সমৃদ্ধ হবে, ততই তারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে একীভূত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে। আর শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে কোনো এক ধরনের ‘মুক্ত সীমান্ত’ চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হবে। তাই আমি একে মোটেও খারাপ কিছু হিসেবে দেখছি না। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারত না।
সাহাব: ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য তুলনামূলকভাবে অনেক কম। একদিকে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার বাজার, অন্যদিকে ১৮ কোটির বাজার। চীন এখনও বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। এখন বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দিল্লি কি ভূ-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রটি বিশেষ করে সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার ভারসাম্য নতুন করে সমন্বয় করার সুযোগ পাবে? নাকি বাংলাদেশে চীনের এই কাঠামোগত প্রভাব এখন এক ধরনের সরকার পরিবর্তনের প্রভাবমুক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিজিৎ: আমি মনে করি না কোনো দেশেই চীনের অনুপ্রবেশ ‘গভর্নমেন্ট-প্রুফ’ বা সরকার পরিবর্তনের প্রভাবমুক্ত হতে পারে। আমরা দেখেছি যে শেষ পর্যন্ত চীন অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব খুব বেশি খাটাতে চায়, যা তাদের ওপরই উল্টো প্রভাব ফেলে।
তবে আমি বলবো, ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের বাজারের ধরন এবং শিল্পায়নের কারণেই ভারতের তুলনায় চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য অনেক বেশি। বাংলাদেশের যে পণ্য যে দামে প্রয়োজন, ভারত আসলে সেই দামে উৎপাদন করে না। আমাদের নিজস্ব সরকারি নীতির কারণেই ভারতের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং শিল্প অনেক ক্ষেত্রেই অদক্ষ। আমরা আবার সেই ইন্দিরা গান্ধীর ‘রেগুলেশন রাজ’ এবং ‘বাবু রাজ’-এ ফিরে গেছি, যেখানে উচ্চপদস্থ আমলারা রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে আর নিম্নপদস্থরা জনগণের ওপর।
আপনি এটা জানেন কারণ আমার ধারণা ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসনামলে বাংলাদেশের অবস্থাও একই ছিল। এখন যা ঘটছে তা হলো, কিছু জিনিস আছে যা ভারতীয় এবং বাংলাদেশি উভয়েরই প্রয়োজন, যেমন- সস্তা মোবাইল ফোন, সস্তা ইলেকট্রনিক্স এবং সস্তা টিভি। এগুলো আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। এসব আমরা বিপুল পরিমাণে চীনাদের কাছে খুঁজি। আর একারণেই চীন বিশ্বের প্রধান সরবরাহকারী। আমার মনে হয় তারা সবারই বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। এমনকি তারা সম্ভবত আমেরিকার পর ভারতেরও বৃহত্তম বা দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। অর্থাৎ এতে আশঙ্কাজনক কিছু নেই।
আমাদের জন্য একমাত্র ভয়ের বিষয় হলো যখন চীন ‘সুদমুক্ত’ অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব দেয়, যা শেষ পর্যন্ত একটি ‘ঋণের ফাঁদ’। এক্ষেত্রে সতর্ক করা আমাদের দায়িত্ব, কিন্তু কাউকে বাধা দেওয়া নয়। যেমন, তারা যখন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় গেল, আমরা সেখানকার সরকারকে বলেছিলাম, শুনুন, আপনারা কি এর লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণ করেছেন? এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কোনো প্রকল্প নয়। কয়েক বছর পর দেখা গেল সেটি সত্যিই অর্থনৈতিকভাবে একটি অকেজো প্রকল্প হিসেবে রয়ে গেছে যা কোনো সুফল বয়ে আনেনি। পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর এবং পাকিস্তান-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।
আমাদের একমাত্র কাজ হলো বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা, যে তারা তাদের লাভ-ক্ষতির হিসাব ঠিকমতো করেছে কিনা। এর অর্থ বাংলাদেশকে থামিয়ে দেওয়া, বাধা দেওয়া বা নিরুৎসাহিত করা নয়; এবং আপনি দেখবেন তেমনটা ঘটছেও না।
এমনকি তিস্তা প্রকল্পের বিষয়েও আমরা হয়তো অসন্তোষ প্রকাশ করব, কিন্তু আমরা কি সেটা থামাতে কিছু করবো? একদমই না। আমার মনে হয় ভারতের পররাষ্ট্রনীতি এখন এমন এক পরিপক্কতায় পৌঁছেছে যেখানে আমরা প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে ঝগড়া করার প্রয়োজন মনে করি না। ষাট, সত্তর বা আশির দশকে যখন ভারত ক্ষুধা ও অভাবের দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন প্রতিবেশীদের ওপর খবরদারি করা আমাদের শক্তি দেখানোর একটা কৌশল ছিল।
ভারত এখন আর সেই দেশ নেই। নেপাল হোক বা মালদ্বীপ, আমরা এখন আর প্রতিবেশীদের ওপর খবরদারি করি না। মালদ্বীপের কথাই ধরুন, আশির দশকের পর কি আমরা কখনো তাদের ‘বুলি’ করেছি? না। আশির দশকের পর শ্রীলঙ্কাকে কি বুলি করেছি? না। বাংলাদেশ? বাংলাদেশিরা হয়তো বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনা ভারতের গভীর কোনো ‘প্ল্যান্ট’ ছিলেন, কিন্তু তিনি আসলে ভীষণ বাংলাদেশ-ঘেঁষা ছিলেন। আমরা যা যা চেয়েছিলাম, তার অনেক কিছুই তিনি দেননি। তাই আমি মনে করি এটি বাণিজ্যের ধরন মাত্র। শেষ পর্যন্ত আমাদের ধরে নিতে হবে যে, বাংলাদেশ নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করার মতো যথেষ্ট পরিপক্ক এবং তাদের নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসাব করার সক্ষমতা আছে। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে এটি একটি ভালো পরিবর্তন। একারণেই আমরা ভারত-ভুটান চুক্তিটি নবায়ন করিনি, যা ছিল এক ধরনের ‘নব্য-ঔপনিবেশিক’ চুক্তি যেখানে ভারতের অনুমতি ছাড়া ভুটান অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারত না।
আমরা সব পুরনো শর্ত তুলে দিয়েছি এবং এটি এখন দুটি বন্ধু দেশের মধ্যে একটি স্বাভাবিক চুক্তি। অথচ দেখুন, ভুটানে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিক্রিয়াও ছিল না। সুতরাং, একে আপনি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির পরিপক্কতা হিসেবে দেখতে পারেন। আর আমার মনে হয় তারেক রহমান এই কাজের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি। তিনি বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের স্বস্তি বয়ে এনেছেন, কারণ এটি শেখ হাসিনার সরকার নয়; এবং এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্যও স্বস্তিদায়ক। কারণ তিনি একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান, কোনো স্বঘোষিত একনায়ক নন।
সাহাব: সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণ করেছিলেন। এমনকি ১৯৭৫ সাল পরবর্তী সময়ে জেনারেল জিয়াউর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গিতেও তীব্র জাতীয়তাবাদ ছিল। এ কারণেই তারা সংসদে ২০০-এর বেশি আসন পেয়েছেন; কারণ সেই জাতীয়তাবাদের বয়ানটি নতুন করে ফিরে এসেছে।
অভিজিৎ: দেখুন, ভারত সম্পর্কে বাংলাদেশিদের ধারণার বিষয়ে একটি কথা বলি। আমি আজ পর্যন্ত এমন কোনো বাস্তবসম্মত যুক্তি শুনিনি যে কেন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতা থাকা উচিত।
সাহাব: সত্যি বলতে, আমিও প্রতিযোগিতার কোনো বয়ান খুব একটা শুনি না। আমাদের মধ্যে সেই প্রতিযোগিতার বিষয়টি নেই। কিন্তু সমস্যা হলো দুই দেশের মধ্যকার ‘নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার’ বা অশুল্ক বাধাগুলো। আর পানি সমস্যা তো দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণ। এখন আমার প্রশ্ন, অবৈধ অভিবাসন কি দিল্লির জন্য এখনও বড় উদ্বেগের কারণ? নাকি এটি শুধু পশ্চিমবঙ্গের একটি নির্দিষ্ট সমস্যা? দ্বিতীয় বিষয় হলো, বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর কর্মকাণ্ড সবসময়ই বিরোধের কারণ।
অভিজিৎ: এখন আপনি যে দুটি ইস্যু তুললেন। প্রথমত, আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমরা দুজনেই তৃতীয় বিশ্বের দুটি দেশ, যেখানে দুর্নীতি দীর্ঘস্থায়ী এবং শিকড় গেড়ে বসেছে। আর উন্নয়ন না হওয়া পর্যন্ত এই দুর্নীতি কোথাও যাচ্ছে না। এটি অনেকটা ‘মুরগি আগে না ডিম আগে’র মতো অবস্থা। উন্নয়ন না হলে আপনি দুর্নীতি দমন করতে পারবেন না, আবার দুর্নীতি দমন না করলে ঠিকঠাক উন্নয়ন হবে না। আর বিএসএফ একটি আগাগোড়া দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা। আমার আর আপনার বন্ধু জয়ীতা ভট্টাচার্য, যিনি কোভিডের সময় মারা গেছেন, অত্যন্ত মেধাবী গবেষক ছিলেন। তিনি গরু পাচার নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। সেখানে তিনি মূলত ইঙ্গিত দিয়েছিলেন কীভাবে বিএসএফ এই পাচারকারী চক্রের সাথে জড়িত। যদিও তিনি লিখতে পারেননি, তবে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন এবং আমার ধারণা আপনাকেও বলেছিলেন। এখন এই ক্ষেত্রে আপনি কী করবেন? সমস্যা শুধু বাংলাদেশিদের অনুপ্রবেশ নয়, বিএসএফ-এর নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাও এক বড় সমস্যা। এখন এটি কি বড় কোনো সমস্যা? আমি বলব পশ্চিমবঙ্গের চেয়েও এই সমস্যাটি মূলত আসামের। সেখানে প্রায় ১৯টি জেলায় জনসংখ্যার এক অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা গেছে এবং স্থানীয় মুসলমানরাই অভিযোগ করছেন যে বাংলাভাষী মুসলমানরা সেখানে এসেছে।
আপনাকে বুঝতে হবে যে, ভারতে রাজ্যগুলো ভাগ করা হয়েছে ভাষার ভিত্তিতে। তাই প্রতিটি রাজ্যের জন্য ভাষাগত জাতীয়তাবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর যেহেতু বাঙালি বনাম অসমীয়া সংঘাতের একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে, তাই এটি আরও একটি বাড়তি সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যা রাজনীতিকরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করবেন। বাস্তবতা হলো, দুটি তৃতীয় বিশ্বের দেশে রাজনীতিকরা যদি আইডেন্টিটি পলিটিক্সে ফিরে না আসেন, তবে সেটা হবে অবাক করা বিষয়।
এমনকি প্রথম বিশ্বের দেশগুলোও আইডেন্টিটি পলিটিক্সে ফিরে আসে, আর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তো এটি আরও প্রকাশ্য। এখন এর সমাধান কী? প্রবৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন, যাতে অভিবাসনের প্রয়োজনই আর না থাকে। এটাই সেই সমাধান, যা নিয়ে আসলে কেউ কথাই বলছে না।
কেন আমরা নেপালিদের আগমনে খুশি? আপনি জানেন, নেপালের সাথে আমাদের বিশ্বের অন্যতম উদার ব্যবস্থা চালু আছে। একজন নেপালি নাগরিক ভারত সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যন্ত হতে পারেন। ভারতীয় নির্বাচনে নেপালিদের ভোট দেওয়া নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না; তারা আধার কার্ড পেতে পারে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে, দুই দেশের মধ্যে অবাধ যাতায়াত করতে পারে, এমন আরও অনেক কিছুই আছে। একমাত্র শর্ত হলো, যদি কোনো নেপালি ভারত থেকে বা কোনো ভারতীয় নেপাল থেকে অন্য কোনো দেশে যেতে চায়, তবে দূতাবাস থেকে একটি অনুমতিপত্রের প্রয়োজন হয়। তা ছাড়া বাকি সব কিছুই বৈধ, এই ক্ষেত্রে সম্ভবত একে ‘হালাল’ বলা যায়। এগুলো সমাধানযোগ্য ইস্যু। সমস্যা হলো, আমরা বিষয়টি যে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা দরকার তা থেকে দেখছি না, এটি মূলত সম্পদের প্রতিযোগিতা। একারণে প্রয়োজন প্রবৃদ্ধি, আর এই প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার জন্য অর্থনীতিগুলোকে একে অপরের পরিপূরক হতে হবে।
সাহাব: বাংলাদেশ বা ভারতের কিছু মিডিয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, বাস্তবে যা ঘটেছে তার চেয়ে অনেক বেশি অতিরঞ্জিত খবর প্রচার করেছে। বিএনপি বা সর্বশেষ ড. ইউনূস সরকার, এবং অনেক ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে এক ধরনের ফ্রেমিং দেখতে পাবেন। দিল্লির সুশীল সমাজ অথবা কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিবিদরা কি এই অতিরঞ্জিত চিত্র বিশ্বাস করে?
অভিজিৎ: দেখুন, যেহেতু আমি সরাসরি আমার সরকারের সাথে কথা বলি এবং আপনার ও অন্যদের মাধ্যমে সরাসরি বাংলাদেশ সরকারের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি, তাই আমি কখনই মিডিয়ার বয়ানে বিভ্রান্ত হই না। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে যে, মিডিয়াকে একটি ব্যাখ্যা বিক্রি করতে হয়। তারা লাভজনক প্রতিষ্ঠান, এনজিও নয়। তাদের ব্যবসা করতে হয়। দুর্ভাগ্যবশত আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে বিজ্ঞতা বা দূরদর্শিতা নয়, বরং চটকদার খবর বেশি মুনাফা এনে দেয়। ভারতে আপনি হয়তো ‘টাইমস নাও’ (Times Now) বা ‘রিপাবলিক’ (Republic)-থেকে এক ধরনের খবর পাবেন, আবার ‘দ্য ওয়্যার’ (The Wire) বা ‘স্ক্রল’ (Scroll) থেকে পাবেন একেবারে ভিন্ন কোনো খবর। কিন্তু আসলে তারা উভয়েই সমানভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ; কারণ তারা একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরু হলেও আসলে একে অপরের প্রতিচ্ছবি মাত্র, পুরোপুরি না হলেও কাছাকাছি।
আর আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কথা যদি বলেন, নিউইয়র্ক টাইমস বা ওয়াশিংটন পোস্টকে আমি কোনো বিষয়েই গুরুত্ব দিই না। কারণ আমি বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বুঝতে পেরেছি যে তারা আসলে কিছুই বুঝতে পারে না। কোনো বিষয় সম্পর্কেই তাদের ডিটেইলস জ্ঞান নেই। আমি সাতবার ইরান গিয়েছি, আর সেখানে গিয়ে বুঝেছি যে নিউইয়র্ক টাইমস বা ওয়াশিংটন পোস্ট ইরান নিয়ে যা লেখে তার বেশিরভাগই ভিত্তিহীন। সিরিয়ার আসাদ সরকারের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে, যদিও আমি নতুন সিরিয়ায় যাইনি। আফগান তালেবানদের কথাই ধরুন, যেখানে আমার অনেক ভালো বন্ধু আছে। আমি তাদের সাথে পুরো এক মাস কাটিয়েছি, তাদের সাথে হাশিশ (গাঁজা) টেনেছি এবং আরও অনেক কিছু করেছি। আর উত্তর কোরিয়া? এই দুটি সংবাদপত্র বা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর মত বড় বড় সংবাদপত্র উত্তর কোরিয়া নিয়ে যেভাবে লিখেছে, তার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই। একারণেই আমি মিডিয়াকে তেমন গুরুত্ব দেই না। একজন শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি তিন-চার বছরের জন্য আপনার দেশে এসে আপনার দেশের মানুষের চেয়েও বেশি বুঝে ফেলবে, এমন দাম্ভিকতা মেনে নেওয়া অসম্ভব। এটা হতে পারে না। আমার বয়স এখন ৪৮ এবং আমি এখনও নিজের দেশ সম্পর্কে এমন সব নতুন জিনিস আবিষ্কার করছি যা দেখে মনে হয় তিন বছর আগে দেশ নিয়ে যা ভেবেছিলাম, তার পুরোটাই বোকামি। আমার মনে হয়, সব দেশের ক্ষেত্রেই বিষয়টি এমন।
দেশ অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়, যা ৭০০ থেকে ১০০০ শব্দের কোনো উপসম্পাদকীয় বা মতামত দ্বারা বোঝানো যাবে না, যেটা সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলগুলো প্রায়ই করার চেষ্টা করে। তাই আমি তাদের গুরুত্ব দিই না।
এখন প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষের কী করণীয়? এক্ষেত্রে আমি মনে করি জনগণের সাথে সরকারের যোগাযোগের প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সাধারণত মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে না। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এই বিজেপি সরকার যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত আনাড়ি। তারা একের পর এক নির্বাচনে জিতে যাচ্ছে শুধু এই কারণে যে, বিরোধীদলে রাহুল গান্ধীর মতো কেউ আছে। আসলেই, আমার মনে হয়, বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পেছনে নরেন্দ্র মোদি বা অমিত শাহের চেয়ে রাহুল গান্ধীই বেশি অবদান রেখেছেন।
বর্তমানের ২৪০টি আসন, তার আগের ৩০৩টি এবং তারও আগের ২৮২টি আসনের মধ্যে অন্তত ১০০টি আসন বিজেপি শুধু রাহুল গান্ধীর কারণেই পেয়েছে। আমাদের এখানে কিছুই করার নেই। আর বয়ানের কথা বলতে গেলে, কোনো ভালো যোগাযোগ মাধ্যম বা গভীর সমাজতাত্ত্বিক কমিউনিকেটরস না থাকলে, আপনি কীভাবে এটি কাটিয়ে উঠবেন? মিডিয়ায় বলা হয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কমছে, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাড়ছে, কিন্তু আপনি শুধু ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর পরিসংখ্যানগুলো দেখুন। সেখানে দেখবেন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বা সংঘর্ষের ঘটনা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। এটি প্রকৃত পরিসংখ্যানগত তথ্য। এখন তারা বলবে, পরিসংখ্যানগুলোই ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু মোদি আসার আগে তো আপনারা বলতেন পরিসংখ্যান সংস্থাগুলো খুব ভালো। একই পদ্ধতি ব্যবহার করে কাজ করা সেই একই সংস্থা মোদি আসার পর হঠাৎ করে খারাপ হয়ে গেলো কীভাবে?
আপনাকে বুঝতে হবে কখন লোকে আজেবাজে কথা বলছে এবং সেটি সরাসরি ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে।
সাহাব: দিল্লি ইউনূস সরকার এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে এই ঘনিষ্ঠতাকে কীভাবে দেখছে? এটি কি ভারতের স্বার্থের পরিপূরক? মধ্যপ্রাচ্য বা আফগানিস্তানে যা ঘটছে তার পরও এধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে কি দিল্লি উদ্বিগ্ন, নাকি এটি দিল্লির কৌশলগত স্বার্থকেই সমর্থন করছে?
অভিজিৎ: এখানেই আমাকে বাস্তবতা আর মিডিয়ার ব্যাখ্যাকে আলাদা করতে হবে, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’ রূপ নেয়। চীন-যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে অন্তত গত তিন দশক ভারতের তেমন মাথাব্যাথা ছিল না।
আমরা সবসময়ই এ বিষয়ে স্বাভাবিক ছিলাম। আর আমি আপনাকে বলছি, এটি আমাদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাস। এমনকি ভুটানে একটা চীনা দূতাবাস খোলার জন্য আমরা তাদের উৎসাহিত করেছি। কিন্তু সমস্যা হলো ভুটানের নিজস্ব কিছু বিষয় আছে, তারা ভারতের উদাহরণ দেখেছে যেখানে সর্দার প্যাটেলের পরামর্শ উপেক্ষা করে সীমান্ত বিরোধ সমাধান করার আগেই ভারত চীনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে অনেক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার জন্ম দেয়। তাই ভুটান এখন আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে তাদের সীমান্ত সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে চায়। সেটা তাদের সমস্যা, আমাদের নয়।
আমরা অন্তত গত ৩০ বছর ধরে এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। যখন সাংবাদিকরা, যারা নিজেদের একটা দুনিয়ায় (bubble) থাকেন, বিশ্বাস করেন যে তারা সরকার বা নীতি পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখেন, আর যখন কিছু কর্মহীন সাবেক আমলা শুধু প্রচারের লোভে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করতে শুরু করেন, তখনই সমস্যাটা হয়।
সেই মুহূর্তে আপনি কী করবেন? এই জায়গাতেই আমি বলবো সরকারে-সরকারে যোগাযোগটা স্বচ্ছ হতে হবে এবং সেখানে জনগণের সমর্থন থাকতে হবে। আমি কেন এটি বলছি? কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে ভারত এবং বাংলাদেশ উভয়ই প্রজাতন্ত্র, আমরা গণতন্ত্র নই। সুইজারল্যান্ড হলো আসল গণতন্ত্র। সেখানে প্রতিটি সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর জনগণের গণভোট ডাকার অধিকার আছে। কিন্তু আমরা জানি, এ ধরনের সরকারই অ্যাথেনীয় আগোরায় সক্রেটিসকে হেমলক পানে বাধ্য করেছিল। আপনি এ ধরনের অস্থিরতাকে প্রশ্রয় দিতে পারেন না। এদিকে প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থায় প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন হয় এবং তারা জনমতের এই অস্থিরতাকে সামলে রাখতে পারে।
আমার ঠিক মনে নেই কখন, গত সপ্তাহে বা এই সপ্তাহের শুরুর দিকে বাংলাদেশ গোয়েন্দা প্রধানের দিল্লি সফরের বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয় যে, আমরা আবারও রাষ্ট্রপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠানের সরাসরি আলাপ আলোচনা শুরু করছি। এটি অত্যন্ত ভালো একটি লক্ষণ।
আমরা উভয়ই পরিপক্ক দেশ, আমাদের মধ্যে মতের অমিল থাকবেই। প্রশ্ন হলো- আপনি সেই দ্বিমতগুলো কীভাবে সামাল দিবেন? বন্ধুদের মধ্যে দ্বিমতগুলো সাধারণত জনসমক্ষে আসে না; সেগুলো নিজেদের মধ্যেই সমাধান করা হয় এবং সমাধানের পর জনসাধারণকে তার একটা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে যে যার মতো বুঝে নেয়।
সাহাব: ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে। আমাদের জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই একটি বাস্তববাদী পদক্ষেপ, কিন্তু আমি যখনই দিল্লি যাই, সেখানে এটাকে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আপনার কী মনে হয়, বাংলাদেশ কি শুধু তার কৌশলগত সম্পর্কের পরিধি বাড়াচ্ছে? নাকি ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক যে স্বাভাবিক হচ্ছে, এমনকি তা যদি সামান্যও হয়, সেটা কি নিরাপত্তা সমীকরণকে এমনভাবে বদলে দিবে যা নিয়ে দিল্লির সত্যিই চিন্তিত হওয়া উচিত? অথবা এটি কি ঢাকা-বেইজিং-ইসলামাবাদ সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লির জন্য নতুন কোনো কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে?
অভিজিৎ: ঠিক। দেখুন, দিল্লিতে আমরা যে বিষয়টির মুখোমুখি হই, বা বিশেষ করে জনসমক্ষে যে আলোচনা হয়, সেখানে বাংলাদেশ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত শোচনীয়। ভারতের প্রায় সব গবেষণার টাকা খরচ হয় ইভেন্ট বা অনুষ্ঠানের পেছনে, প্রকৃত গবেষণার পেছনে কিছুই খরচ হয় না। মানুষ যদি বলে তারা বিভিন্ন দেশ সফর করেছে, তবে দেখা যাবে তারা সাধারণত বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করে এক থেকে আরেক ফাইভ স্টার হোটেলের লবিতে সময় কাটিয়েছে। কেউ যদি বলে, ‘আপনি কি রাশিয়া গিয়েছেন?’ সে বলবে, ‘হ্যাঁ, আমি অ্যারোফ্লট বিজনেস ক্লাসে গিয়ে ক্রেমলিনের কেম্পিনস্কি হোটেলে উঠেছিলাম। ক্রেমলিনের চারপাশে একটু হেঁটে ফিরে এসেছি।‘ ব্যস, তাদের রাশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এটুকুই। তো এই ধরনের অভিজ্ঞতাই পাচ্ছেন, যেখানে আপনি বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন, প্রকৃতপক্ষে এখানে কোনো মৌলিক গবেষণা হয় না।
তো আমি ভুল বললে ঠিক করে দিবেন, কারণ আমি এখানে নিজেকে সরাসরি যাচাই করতে চাই। পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল ‘সবকিছুর ঊর্ধ্বে ইসলাম’ এই ধারণার উপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশ বলেছিল, ‘হ্যাঁ, ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’ এখন বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের অবস্থান যদি দেখি, আমি বলব আওয়ামী লীগের কাছে ‘বাঙালি পরিচয়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ’। বিএনপির কাছে ‘ইসলামের চেয়েও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ’, বিশেষ করে যখন উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো সামনে আসে। আর জামায়াতে ইসলামী, যাদের কাছে ‘সবার উপরে ইসলাম’। এটি মূলত আত্মপরিচয়ের একটি বিতর্ক, যা আমরা (ভারতীয়রা) বুঝি না এবং মোকাবিলাও করতে পারি না।
আমি মনে করি জামায়াত যখন আসবে, তখন আমাদের সামনে ভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হবে। কিন্তু বিএনপি কোনো সমস্যা নয়, কারণ এটি মূলত একটি জাতীয়তাবাদী সরকার। এখন, আমরা খালেদা জিয়ার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলেছি এবং সত্যি বলতে গেলে, তিনি বিশ্বাস করতেন তার স্বামীর (জিয়াউর রহমান) মৃত্যুর জন্য ভারত দায়ী ছিল। অন্যদিকে শেখ হাসিনারও নিজস্ব ব্যাগেজ ছিল; তিনি বিশ্বাস করতেন তার পরিবারকে হত্যার পেছনে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর কিছু অংশ বা তাদের (পাকিস্তানের) মদদ ছিল।
তাই আমার মনে হয় পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দূরত্বও ঠিক সেই তিক্ততা থেকেই তৈরি হয়েছিল যেমনটা খালেদা জিয়ার ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছিল। বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো হওয়া বা মিটমাট করে নেওয়াতে ভারতের কোনো সমস্যা নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তানিরা যেন বাংলাদেশে এসে এমন কোনো সুযোগ না পায় যা ভারতের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে, যা পাকিস্তান বেশ স্পষ্ট ও খোলামেলাভাবেই প্রকাশ করে থাকে।
আমি কোনো মিডিয়ার বয়ানের উপর ভর করে এ কথা বলছি না। আমি পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্য শুনেই বলছি, ইউটিউবে এমন অনেক ভিডিও আছে যেখানে তারা বলছে, ‘আমরা বাংলাদেশে দ্বিতীয় একটা ফ্রন্ট খুলব’। তাই এটি স্রেফ মিডিয়ার কথা নয়। আমরা সবাই জানি পাকিস্তানে সেনাবাহিনীই দেশ চালায় এবং তারা যখন কিছু বলে তখন তারা বেশ গুরুত্ব দিয়েই বলে। তাই প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ বিষয়টি নিয়ে কতটা গভীরভাবে ভেবে দেখেছে। ভারত ও বাংলাদেশ একে-অপরের কোনো ক্ষতি না করেই ‘উইন-উইন’ বা উভয়ের জন্য লাভজনক হবে, এমন সম্পর্ক রাখতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ‘উইন-উইন’ মানেই হলো তৃতীয় কোনো পক্ষের ক্ষতি করা। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ কীভাবে পাকিস্তানের সাথে তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে?
সাহাব: আমার মনে হয় একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যে কোনো সম্পর্কের সীমা বোঝে, তা ইসলামাবাদের সাথেই হোক বা বেইজিংয়ের সাথে। এখন আমি নিশ্চিত যে ইসলামাবাদের বিষয়টি যখন আসবে, বাংলাদেশ দিল্লির মতোই ইসলামাবাদের সাথে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে। আবার আমরা যখন ইসলামাবাদের সাথে কথা বলি, তারাও আপনার মতোই একই কথা বলে। তাই আমরা সবসময় এই দুই পক্ষের কথার মাঝে পড়ে যাই। এখানে আরেকটি সমস্যা সামনে আসে। ইসরায়েলের সাথে ভারতের সম্পর্ক, ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্ক, আবার সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি, এই সব কিছুই বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়ের উপরই এক ধরনের চাপ তৈরি করে। এই সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইস্যু দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করবে বলে আপনি মনে করেন?
অভিজিৎ: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের ক্ষমতা শূন্য। দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলিদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ভারত সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ঠিক ততটাই কম যতটা কম নিউ ইয়র্ক টাইমস বা ওয়াশিংটন পোস্টের; এমনকি পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও তাই। তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং গোয়েন্দা সক্ষমতা মূলত আমেরিকা, কানাডা এবং ইউরোপের রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে সীমাবদ্ধ; এছাড়া উত্তর আফ্রিকার মাগরেব অঞ্চলের একটা বড় অংশ, আর মধ্যপ্রাচ্যের ইরান এবং দক্ষিণে ইয়েমেন পর্যন্ত তাদের প্রভাব আছে। এর একটি কারণ আছে: এই জায়গাগুলোতেই ইহুদিদের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এক সময় বাস করতো, এখনো করে। তারা সবাই যখন ইসরায়েলে ফিরে এসেছে, সাথে করে সেই সব অঞ্চলের স্থানীয় জ্ঞান নিয়ে এসেছে।
ফলে তারা সেখানে গোয়েন্দা তৎপরতা চালাতে পারে, যেমন ইরানি ইহুদিরা ফার্সি ভাষা জানে, তারা সেখানে গিয়ে সমাজের সাথে মিশে যেতে পারে এবং ছদ্মবেশে থাকতে পারে। কিন্তু পাকিস্তান বা ভারতে ইহুদি জনসংখ্যা ছিল অতি সামান্য; তাই ভারত সম্পর্কে তাদের জ্ঞান খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের। আরও পূর্বে যদি বড় মুসলিম দেশগুলোর দিকে তাকান, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, এসব দেশ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান বলতে গেলে একেবারেই নেই। একদমই নেই। তাই ইসরায়েল মূলত আমেরিকার ওপর তাদের নিরাপত্তার অগ্রাধিকারগুলো চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই প্রভাব বিস্তার করে। এখন এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে, যে ইসরায়েল কি আসলেই আমেরিকার ওপর এই অগ্রাধিকারগুলো চাপাচ্ছে নাকি সে নিজেই আমেরিকাকে অনুসরণ করছে? কারণ এমন অনেক ইঙ্গিত আছে যে এটি মূলত ট্রাম্প-চালিত একটি প্রচারণা, ইসরায়েল-চালিত নয়। এর সাথে ভেনেজুয়েলার তেলের আগের অযোগ্যতার অনেক সম্পর্ক আছে, যেই তেল অতিরিক্ত পরিশোধন এবং পরিবহন খরচ সত্ত্বেও এখন হঠাৎ করেই খুব লাভজনক হয়ে উঠেছে।
বলা বাহুল্য, আমেরিকা আজ এমন কী করছে যা ওবামা, ক্লিনটন, জর্জ বুশ বা বাইডেন করেননি? তারা সবাই এই ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কাজ করেছে, যারা চায়নি তাদের ওপরও বোমা মেরে ‘স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র’ চাপিয়ে দিয়েছে। তারা গিয়ে ইরাককে নরকে পরিণত করেছে, আফগানিস্তানকে ধ্বংস করেছে, সিরিয়া এবং লিবিয়ার বারোটা বাজিয়েছে। এত কিছুর পরও তারা এখন ইরানের সাথেও ঠিক তা-ই করছে। তারা তাদের আগের ভুলগুলো থেকে কিছুই শিখেনি।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো, যখন কোনো দেশ আত্মঘাতী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, নিজের ভুলের ওপর অটল থাকে এবং মূলত নিজের সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে চায়, তখন তাদের সেটা করতে দেওয়া উচিত। কারণ যারা নিজের ক্ষতি করতে চায় তাদের বাঁচানো আমাদের কাজ নয়। তবে এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না? আমি নিকট ভবিষ্যতে তাদের পক্ষ থেকে কোনো জোরপূর্বক সরকার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা দেখছি না।
আমার মনে হয় শেষবার আমরা এমন পরিস্থিতির কাছাকাছি গিয়েছিলাম যখন মিয়ানমারে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস আঘাত হেনেছিল। তখন ভারত মিয়ানমারকে যে কোনো ধরনের বৈদেশিক হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কারণ ব্রিটিশ এবং ফরাসিরা তখন প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিল; তারা মিয়ানমার উপকূলে দুটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল, একটি হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার এবং অন্যটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার। তারা হুমকি দিচ্ছিল যে মিয়ানমার যদি মানবিক সাহায্য গ্রহণ না করে তবে তারা হস্তক্ষেপ করবে। তখন ভারত প্রচুর হেলিকপ্টার এবং ত্রাণ পাঠিয়েছিল যা গ্রহণ করতে মিয়ানমারের কোনো সমস্যা ছিল না। এবং এটি অনেক দিক থেকেই ফরাসি ও ব্রিটিশদের পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল।
আমরা বলেছিলাম, আপনারা আমাদের কাছে সাহায্য দিন, আমরা সেটা মিয়ানমারে পৌঁছে দেব, এবং ঠিক তা-ই ঘটেছিল। আমি মনে করি অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও, যতটুকু সম্ভব প্রতিবেশীদের বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে যতটা সম্ভব রক্ষা করার এই নীতিটি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে আছে। এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি খারাপ কিছু? এটি কি ‘বিগ ব্রাদার’-এর মতো বা অভিভাবকসুলভ কোনো আচরণ? হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় না এটি ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের সময় যতটা চরম পর্যায়ে গিয়েছিল, ততটা আর যাবে। মনে রাখবেন, সেটি ছিল সেই চরম বোকামিপূর্ণ ‘রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট’ মতবাদের স্বর্ণযুগ, যা তারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করার জন্য তৈরি করেছিল।
সাহাব: ধন্যবাদ, অভিজিৎ। এই আলোচনা শেষ করার আগে একটি ছোট প্রশ্ন করতে চাই। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লিকে কোন বিষয়টি ঠিক করার জন্য পরামর্শ দিবেন?
অভিজিৎ: সত্যি বলতে, এই প্রথমবার আমি বলবো যে আমার দেওয়ার মতো কোনো পরামর্শ নেই। আমার মনে হয় তারা ৯৯.৯৯ শতাংশ সঠিক পথেই আছে, শুধু সংবাদ ব্যবস্থাপনা ছাড়া। তবে এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, ঘরোয়া রাজনীতি হোক বা পররাষ্ট্রনীতি, সবক্ষেত্রেই তাদের প্রচার ও যোগাযোগের কৌশল অত্যন্ত দুর্বল। তারা যদি তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিক করতে পারে, তবে তাদের বাকি নীতিগুলো ঠিক আছে। আমি আসলে গর্বিত যে দিল্লির নীতিগুলো বাইরের শোরগোল বা ভুল বয়ান দ্বারা প্রভাবিত হয় না এবং তারা প্রায় সব ক্ষেত্রেই সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে। আর বিশেষ করে এখন তারা তারেক রহমান এবং এই নির্বাচিত সরকারের সাথে কাজ করার বিষয়ে অত্যন্ত উৎসাহী।
সাহাব: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, অভিজিৎ।
অভিজিৎ: অনেক ধন্যবাদ।