জুলাই গণঅভু্ত্থ্যানে ‘বিদেশি মদদে রেজিম চেঞ্জ’ এমন ধারণার প্রমাণ নেই: জন ড্যানিলোউইচ

সাহাব এনাম খান: বাংলাদেশে আপনি কাজ করেছেন। বাংলাও বলতে পারেন। আমার মনে হয় এই বিষয়টি আপনাকে বাঙালি করে তোলে।

জন ড্যানিলোউইচ: বাংলাদেশে আমার প্রথম আসা হয় ১৯৯০ সালে। তিনবার দায়িত্ব পালন করেছি।

নব্বইয়ের দশকে আমি একজন জুনিয়র অফিসার ছিলাম। মার্কিন দূতাবাসে আমি ছিলাম সবচেয়ে কনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং এক বছর কনস্যুলার সেকশনে, এক বছর পলিটিক্যাল সেকশনে কাজ করেছি। 

আমি অবশ্য বাংলায় সাবলীল নই। তবে কেউ আমার সম্পর্কে বলছে কিনা, তা বোঝার মতো যথেষ্ট বাংলা আমি বুঝি।

সাহাব: ১৯৯০ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। আপনি তো জেনারেল এরশাদের আমল থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে উত্তরণ দেখেছেন। আপনার বিভিন্ন সময়ে  লেখা আর কথোপকথন থেকেই উদ্ধৃতি দিচ্ছি। আপনি বলেছেন, ‘২০০৭ সালে ওয়াশিংটনের অবস্থানে বড় একটি ভুল ছিল।' সে সময় আপনি ঢাকাতেই দায়িত্ব পালন করছিলেন। এখন আপনি অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে খোলামেলাভাবে আলোচনা করছেন, যারা মাত্র নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার থেকে অন্তর্বর্তী সরকার, এবং এরপর বিএনপি সরকার—এই রূপান্তর সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? এটি কি এমন কিছু ছিল যা ওয়াশিংটন চেয়েছিল?

ড্যানিলোউইচ: শুরুতেই বলে নেই, একজন সাবেক কূটনীতিক হওয়া দারুণ ব্যাপার। আমি এখন আর মার্কিন সরকারের প্রতিনিধিত্ব করি না। এখন স্বাধীনভাবে নিজের মতামত দিতে পারি। বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি যা বলে আসছি এবং আপনি যে উদ্ধৃতি দিলেন—সে অনুযায়ী এটি বাংলাদেশের জন্য চতুর্থ সুযোগ।

প্রথম সুযোগ ছিল ১৯৭১। ওই ঘটনা একটি রূপান্তর ছিল, তারপর ১৯৯০-এ আরেকটি; এরশাদের আমলের শেষে, ১৯৯১ সালে। এরপর ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমল এবং তার পর যা যা হলো। সবশেষে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনা এবং তার পরবর্তী ফলাফল। আমি প্রায় এক বছর আগে বাংলাদেশে এসেছিলাম। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি ছিল আমার প্রথম সফর।

সৌভাগ্য হয়েছিল আমার সাবেক বস, অ্যাম্বাসেডর উইলিয়াম বি মাইলাম, যিনি বাংলাদেশে সুপরিচিত, তার সাথে আসার। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি এখানে আমার অ্যাম্বাসেডর ছিলেন এবং পরে পাকিস্তানেও আমার অ্যাম্বাসেডর ছিলেন।

বিল (উইলিয়াম) এবং আমি যখন এখানে ছিলাম, আমরা ১৯৯০-৯১ সালের অভিজ্ঞতা এবং সেই সময়ের পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেছিলাম। এসব তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। আমার মনে আছে সেই সময় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আমি রংপুরে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশি রাজনীতির এক বিশেষ দিক দেখেছিলাম; সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ রংপুরে যে পাঁচটি আসনে লড়াই করেছিলেন, তার সবগুলোতে জয়ী হয়েছিলেন। সেইটা থেকে বোঝা যাচ্ছিল সবকিছুর পরও নিজের এলাকায় তার জনসমর্থন ঠিক ছিল। এ ঘটনা ওই সময়ে শিক্ষণীয় বিষয় ছিল।

২০০৭-০৮-এর সময়ে, মানে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ঢাকায় ছিলাম না। সে বছরের অগাস্টে আসি, অর্থাৎ প্রায় ছয় মাস পর।

এরপর আমি এখাকার পরিবর্তন এবং মার্কিননীতির ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল তা দেখেছি। আপনি যেমনটি বলেছেন আর আমি খোলাখুলিভাবেই বলেছি, আমার মতে সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ভুল করেছিল। আর সেটা আমি ২০০৭ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকের কথা বলছি না। আমি এখনো বিশ্বাস করি না যুক্তরাষ্ট্রর তখনকার ভূমিকা তা ছিল, যেটা অনেকে মনে করেন। বরং সেটা ছিল তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মিথস্ক্রিয়া এবং আমরা যে নীতিগুলো অনুসরণ করেছিলাম সে বিষয়ে।

আমি এটাও জোর দিয়ে বলেছি যে, ১৯৭১ সালেও যুক্তরাষ্ট্র ভুল পক্ষ নিয়েছিল। একইসঙ্গে তাদের নীতির দিক দিয়েও বিশাল ভুল করেছিল। যখন অতীত এবং বর্তমানের মার্কিননীতিগুলো দেখি, আমি স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে যুক্তরাষ্ট্র কখন ভুল করেছে তা দেখিয়ে দেই। আবার তারা কখন ঠিক কাজ করেছে, তাও বলি।

২০২৪ সালের পরিবর্তন সম্পর্কে বলতে গেলে—আমি তাদের একজন যারা একে ‘জুলাই বিপ্লব’ বা ‘মনসুন রেভোলিউশন’ হিসেবে বলি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এটি ‘বিপ্লব’ ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করেন, কিন্তু আমার কাছে এটিকে বিপ্লব হিসেবে দেখার করার একটি বিশেষ যৌক্তিকতা রয়েছে।

আমাদের ছোট অলাভজনক মানবাধিকার গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করার সময়, আমরা বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে সমর্থন করার চেষ্টা করছিলাম। ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় এবং তার আগে আমাদের সম্পূর্ণ মনোযোগী ছিলাম কীভাবে তাদের প্রচেষ্টায় সহায়তা করা যায়, যারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ফিরিয়ে আনা নিশ্চিত করতে চাইছিলেন। একইসঙ্গে যারা ২০২৪ সালের নির্বাচন যেভাবে এগোচ্ছিল তার বিরোধিতা করছিলেন। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর যেভাবে পরিস্থিতি এগোচ্ছিল, সেটি দেখে সবাই খুব হতাশ ছিলাম।

মার্কিন সরকার ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর সরকারের সাথে কাজ করতে প্রস্তুত, যা কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক অবস্থান থেকে ভিন্ন ছিল। কিন্তু খুব স্পষ্টভাবে মনে আছে ২০২৪ সালের কথা, যখন বিক্ষোভ এবং কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু হচ্ছিল, সম্ভবত জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত আমরা কেউ বুঝতে পারিনি যে কিছু একটা ঘটছে। আবু সাঈদের মর্মান্তিক মৃত্যু ছিল একটি অনুঘটক, যা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সূচনা করে। পুরো বিশ্বের নজর বাংলাদেশের দিকে তখন ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

সেই সময় স্টেট ডিপার্টমেন্টের বন্ধু ও সহকর্মীদের সাথে কথোপকথনের কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। তারাও আমাদের আর সবার মতই বোঝার চেষ্টা করছিল আসলে কী ঘটছে। স্বাভাবিকভাবেই ঢাকার দূতাবাস থেকে তারা তথ্য পাচ্ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবে এই ঘটনাগুলো সাজানোর পেছনে ছিল বা এটি কোনো বিদেশি মদদপুষ্ট ‘রেজিম চেঞ্জ’ ছিল, এমন ধারণার কোনো প্রমাণ নেই। আপনি একটি নেতিবাচক বিষয় অবশ্যই প্রমাণ করতে পারেন না। আমি প্রমাণ করতে পারবো না যুক্তরাষ্ট্র জড়িত ছিল না। কিন্তু আমার মতে, যারা অভিযোগ করেন, প্রমাণের দায়ভার তাদের ওপর।

এক বছর আগে মার্কিন সরকার কিছু ছোটখাটো গণতন্ত্র বিষয়ক প্রোগ্রাম, নাচের অনুষ্ঠানকে সমর্থন করেছিল, যেগুলো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে আমি মনে করি না।

তবে এটি বলতে হয় যে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, তার পালানোর পর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর মার্কিন সরকার খুব দ্রুত সমর্থন জানিয়েছে। সংস্কার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে। শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রে ফিরে আসার পথকে সমর্থন জুগিয়েছে। তাই আমি বাইডেন প্রশাসনকে সেসময় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ভালো নম্বর দেব।

এরপর অনেকে ধারণা করেছিলেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর মার্কিন নীতিতে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু তেমন কিছু ঘটেনি। প্রকৃতপক্ষে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্কিন নীতি তুলনামূলকভাবে ধারাবাহিক ছিল। বাংলাদেশে মার্কিন সম্পৃক্ততা নিয়ে এমনও সময় ছিল যখন যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কাজ করেছে, আবার এমনও হয়েছে যে তারা ভুল করেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে আমি যদি ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্ট থেকে এখন পর্যন্ত দেখি, তাহলে আমার মনে হয় ঠিক পথেই ছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নিলেন, তখন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে নিশ্চিতভাবেই একটি পরিবর্তন এসেছে: জন ড্যানিলোউইচ

সাহাব: আমরা শুনি যে, আমেরিকা চায় বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকুক, গণতন্ত্র ফিরুক এবং সংসদ কার্যকর হোক। নতুন সংসদ এনসিপি, জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি আছে। ওয়াশিংটন কি বিশ্বাস করে, এই সংসদ একটি প্রকৃত ‘ডেমোক্রেটিক রিসেট’ বা গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন? যদি পুনর্গঠন মনে করে, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন ঢাকার কাছে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে কৌশলের দিক দিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কী আশা করে?

ড্যানিলোউইচ: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নিলেন, তখন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে নিশ্চিতভাবেই একটি পরিবর্তন এসেছে। প্রথম মেয়াদে কিছু পরিবর্তন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রথাগত ধারা বজায় ছিল। এমনকি যারা যুক্ত ছিলেন তাদের ক্ষেত্রেও। ফলে মানুষ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে যা প্রত্যাশা করতো, তার অনেক কিছুই তখন দেখা গেছে।

কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে সেটি বদলে গেছে। এবারের ট্রাম্প প্রশাসন অনেক দিক থেকেই ভিন্ন। কিছু ক্ষেত্রে এটি সরল, কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্তত যা নিয়ে ভাবেন বা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেসব সরাসরি বলে দেন। 

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পাঠানো তার অভিনন্দন পত্রেও দেখেছি। সাধারণত অভিনন্দন পত্রগুলো আনুষ্ঠানিক ধরনের হয়। কিন্তু এই চিঠিতে একটি সারবস্তু ছিল, যা ছিল খুবই ‘ট্রাম্পিয়’। 

তিনি সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিকগুলোর গুরুত্ব দিয়ে শুরু করেছেন। বিশেষ করে বাণিজ্যচুক্তির কথাও তুলে ধরেছেন। তিনি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে পার্টনারশিপের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছেন। কিছু ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার গুরুত্ব নিয়েও বলেছেন। আবারও বলছি, এগুলোই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এখন গণতন্ত্রের দিক থেকে বিষয়টি কিছুটা জটিল। প্রথমত আমি বলবো, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি আসলে কী এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সাথে জড়িত অন্যান্য পক্ষগুলো কী ভাবছে— এসবের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। স্পষ্টতই কংগ্রেসেরও এখানে একটি ভূমিকা আছে। 

গত এক বছরে সেই ভূমিকা হয়তো ততটা দৃশ্যমান ছিল না, তবে আমি আশা করি ভবিষ্যতে আমরা আরও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফিরবো যেখানে কংগ্রেস পররাষ্ট্রনীতিতে আরও সোচ্চার ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া বিভিন্ন প্রেসার গ্রুপ আছে। গণমাধ্যম আছে। আরও অনেক পক্ষ রয়েছে। সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রসারের পক্ষে এখনও একটি শক্তিশালী পক্ষ কাজ করে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, গণতন্ত্র নিজেই তাদের কাছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। কিছু দেশের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচন এবং গণতন্ত্র নিয়ে আরও স্পষ্টভাবে কথা বলে।

এটি বিশেষ করে পশ্চিম গোলার্ধের দেশগুলোর ক্ষেত্রে ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এটি কেবল গণতন্ত্রের বিষয় ছিল না। 

ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে সংস্কার ততটা গুরুত্বপূর্ণ না, যতটা হয়তো বাইডেন প্রশাসনের কাছে ছিল। নিশ্চিতভাবেই অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এক অর্থে, একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল অনিবার্য। 

সময় নিয়ে প্রশ্ন ছিল ঠিকই, কিন্তু বেশ কিছু সময় ধরেই এটি স্পষ্ট ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এর জন্য অপেক্ষা করছিল। আমার মনে হয় এটি সাধারণভাবেই স্বীকৃত ছিল যে, জনগণের ম্যান্ডেট আছে এমন একটি নির্বাচিত সরকার আরও ভালো অবস্থানে থাকবে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে।

অন্তর্বর্তী সরকার নিজেও স্বীকার করেছিল যে তারা একটি দুর্বল সরকার ছিল। এটি ছিল কার্যত একটি কোয়ালিশন সরকার। আমরা দেখেছি যখন অন্তর্বর্তী সরকার কিছু নীতি এগিয়ে নিতে চেয়েছিল তখন তাদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। কারণ তাদের সেই ম্যান্ডেট বা শক্তি ছিল না। যা নির্বাচিত সরকারের থাকে।

তবে আমি মনে করি, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে মার্কিন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন বেশ ভালো একটা অবস্থায় আছে। বাণিজ্য চুক্তির আলোচনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। অনেক দেশই লাইনে ছিল। 

কিন্তু বাংলাদেশ অন্যদের তুলনায় অনেক আগেই চুক্তিটি সম্পন্ন করতে পেরেছে। এখন এর যেমন ইতিবাচক দিক আছে, তেমনি নেতিবাচক দিকও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পরিবর্তন এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কারণে, যেসব দেশ এখনও লাইনে আছে, তারা হয়তো সেই সমস্যার সম্মুখীন হবে না, যা চুক্তি করা দেশগুলোতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন শুল্ক ঘোষণা করার পর, তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিতে পারাটাও ছিল মূল্যবান। বাণিজ্য আলোচনার এই অগ্রগতি কারণে শুল্ক হার ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। পরে চুক্তির মাধ্যমে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি আরও কিছু প্রণোদনা যোগ করা হয়েছিল। এই পুরো বিষয়টি ছিল বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য।

আমার মনে হয় অন্যান্য ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পর্ক ও অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে এক অসাধারণ ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। 

সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন ছিল নিঃসিন্দেহে। কিন্তু শেখ হাসিনার আমলেও নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব শক্তিশালী ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এর কোনো অবনতি ঘটেনি। আমার ধারণা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

আমার মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার ছিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর মনোযোগ দেওয়া। মানুষ এগুলোকে ‘লেনদেন-ভিত্তিক’ সম্পর্ক বলে থাকে। যদিও বিষয়টি নেতিবাচক শোনায়। আমার মনে হয় ভারতের অভ্যন্তরীণ কিছু কারণে তারা বাংলাদেশের মতো অতটা তৎপরতা দেখাতে চায়নি: জন ড্যানিলোউইচ

সাহাব: ওয়াশিংটনের কাছে ভারত সরকার, সুনির্দিষ্টভাবে নরেন্দ্র মোদি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ক থেকে ভারতকে আলাদা করা কি আসলে বাস্তবসম্মত? অথবা ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে যদি বাস্তবসম্মত হয়ও, তবে ঢাকা কীভাবে এটি মোকাবিলা করবে? এমনভাবে কাজটা করা যেন দেশের ভেতরে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া না হয় কিংবা দিল্লি, ইসলামাবাদ, বেইজিং বা ওয়াশিংটনে কোনো শঙ্কা তৈরি না হয়?

ড্যানিলোউইচ: এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে গত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত তাদের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। স্নায়ুযুদ্ধের প্রায় পাঁচ দশকে সময় ওয়াশিংটন-দিল্লি সম্পর্ক প্রায়ই সংঘাতময় ছিল। অনেক ক্ষেত্রেই সেই যোগাযোগের অভাব ছিল যা বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং প্রাচীনতম গণতন্ত্রের মধ্যে থাকবে বলে মানুষ আশা করতো।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে, ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা এবং জোটনিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিতভাবেই সেই সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। পাকিস্তানের সাথে মার্কিন সম্পর্কও বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।

স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়া এবং তার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাওয়ার পর চীনের উত্থান। চীনের সাথে প্রতিযোগিতাকে কীভাবে সামলানো যায় এবং সংঘাত কীভাবে এড়ানো যায় অথবা সংঘাত হলে মার্কিন স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়—সেদিকে নজর দেওয়া হয়। মার্কিন নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্র নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে চীনের উত্থানের বিপরীতে ভারতের সাথে সম্পর্ক অতি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান উভয় প্রশাসনের ক্ষেত্রেই এটি দেখেছি। ভারতের সাথে মার্কিন অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি দিক তো ছিলই, কিন্তু এর পেছনে নিরাপত্তাও একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে কাজ করেছিল।

সম্প্রতি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার এবং মার্কিন ক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য ভূমিকা ছিল। তাই মার্কিন সরকারের ভেতরে এবং বাইরে এমন অনেকে ছিলেন যারা যুক্তি দিয়েছিলেন যে দিল্লির সাথে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন, এমনকি যদি তা দক্ষিণ এশিয়া বা তার বাইরের অন্যদের সাথে সম্পর্কের বিনিময়েও হয়। বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছিল, যেহেতু ভারত খুব জোরালোভাবেই চাইতো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে দ্বিপাক্ষিক রাখতে। 

সুতরাং এসব আলোচনা হয়েছে। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রায় সব জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্র সেই দেশের উন্নয়ন নিয়ে অন্যান্য সহযোগী বা সমমনা দেশগুলোর সাথে আলোচনা করে। 

আমার দক্ষিণ সুদানে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। সেখানেও তাও দেখেছি। অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতো। সুতরাং এটি অস্বাভাবিক নয়, তবে এমনও হয়েছে যখন যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের সাথে সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

এটা আমার মনে হয় বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে পরিবর্তন হয়েছে। যা কিছুটা বিস্ময়কর ছিল কারণ অনেকই ভারতীয় বিশ্লেষক এবং পর্যবেক্ষকসহ ধারণা করেছিলেন যে জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রশ্নে বাইডেন প্রশাসনের সাথে স্পষ্টতই টানাপোড়ন ছিল। 

বাইডেন প্রশাসন বাংলাদেশের নীতি বাস্তবায়ন করছিল ঢাকার দূতাবাসের মাধ্যমে। এটি প্রায়ই বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়াতো। যেমন, গণতন্ত্রের পক্ষে প্রচার। সুতরাং এক ধরনের হতাশা ছিল আর তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের ঘটনায়।

অনেকেই ধারণা করছিল যে ট্রাম্প প্রশাসন আসার পর এটি বদলে যাবে। আমার মনে আছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি যখন প্রথম দিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে দেখা করলেন, তখন যে বিতর্কগুলো উঠেছিল। তাদের প্রতিটি শব্দের চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছিল। 

অনেকে দাবি করছিলেন, ট্রাম্প কি মোদিকে বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা দিচ্ছেন কিনা, অথবা যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কতটা সম্পৃক্ত থাকছে। কিন্তু আমার মনে হয় মানুষ যা মিস করে গেছে তা হলো, ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আসবে।

ট্রাম্প প্রশাসন বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। যেমন, শুরুর দিকে যে শুল্ক আরোপ করা হয়, অনেকের কাছেই বিস্ময়ের ছিল। যারা ভেবেছিলেন ভারতের সাথে সম্পর্কের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবটি ‘কোয়াড’-এর মতো ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ঢাকা পড়ে যাবে। সেক্রেটারি রুবিও তার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করেছিলেন। এসব প্রাথমিক ইঙ্গিত দিয়েছিল যে মার্কিন সরকার আবারও ভারতের সাথে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু বেশ কিছু কারণে প্রথম কয়েক মাসেই সেই সম্পর্কে বড় ধরনের অবনতি ঘটে। কোনোভাবে এটি হয়তো বাংলাদেশের জন্য এবং মার্কিন-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য কিছুটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করে দিয়েছিল। তবে এর জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কৃতিত্ব দিতে হয়, কারণ শুরু থেকেই বাংলাদেশের সরকার বুঝতে পারছিল ওয়াশিংটনে কিছু একটা বদলে গেছে।

ফলে ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর যখন বাণিজ্য আলোচনা শুরু হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ তাদের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার জন্য সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। এই সম্পর্কের ‘লেনদেনমূলক’ প্রকৃতি এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ফ্যাক্টরগুলো এমনভাবে কাজ করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তার নিজস্ব যোগ্যতার ভিত্তিতে দেখেছে। অবশ্যই একটি প্রতিযোগিতামূলক দিকও ছিল, কারণ অনেক দেশই বাণিজ্য চুক্তির পেছনে ছুটছিল।

কিন্তু ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের আলোচনা অনেক দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। দুই দেশের অর্থনীতির আকার দেখলে আপনি হয়তো এটি ভাবতেন না। আমার মনে হয় ভারতের অভ্যন্তরীণ কিছু কারণে তারা বাংলাদেশের মতো অতটা তৎপরতা দেখাতে চায়নি। সুতরাং সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে বাংলাদেশকে দেখছে এবং ভারতের সাথে যেভাবে মিথস্ক্রিয়া করছে—অন্তত ট্রাম্প প্রশাসনের সময় পর্যন্ত—তাতে মার্কিন-বাংলাদেশ সম্পর্ক সম্ভবত ওই ধরনের চাপ থেকে মুক্ত থাকবে।

আমার মনে হয় এখনো আমলাতন্ত্রের ভেতরে তা সে স্টেট ডিপার্টমেন্ট হোক, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল, প্রতিরক্ষা বিভাগ বা মার্কিন সামরিক কমান্ডগুলো হোক, এখনও অনেকে বিষয়গুলোকে একটু ভিন্নভাবে দেখেন, বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, অথবা যুক্তরাষ্ট্র কোয়াডকে যেভাবে দেখে এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের গুরুত্ব বিবেচনা করে। সুতরাং এমন অনেকে থাকতে পারেন যাদের নজর এখনও মূলত চীনের দিক থেকে আসা হুমকির ওপরই আটকে আছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেক বড় পরিসরে বিষয়টি দেখেছেন। অন্য যে বিষয়টির পরিবর্তন হয়েছে, সেটি হলো এশিয়ায় আমেরিকার যে বিশেষ মনোযোগ ছিল, সেটি ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে সরে গিয়েছে। এমনকি উল্টেও গেছে। আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দলিলে নিশ্চিতভাবেই ‘পশ্চিম গোলার্ধ’কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আমরা তার প্রতিফলন দেখেছি শুধু ভেনিজুয়েলার ঘটনায় নয়, বরং অভিবাসন নীতি এবং পশ্চিম গোলার্ধের দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। এছাড়া সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যা যা ঘটছে এবং ইরানের পরিস্থিতির পাশাপাশি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপটে, সেই বিষয়টিও আছে।

আবারও, আমি জানি আমরা পরে পাকিস্তান প্রসঙ্গে যাবো। তবে পাকিস্তান বিষয়টির সাথে জড়িয়ে আছে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যে উদ্বেগ ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো তো আছেই। তাই আমি মনে করি, এসব ঘটনা মিলে ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের মনোযোগ এই অঞ্চল থেকে সরিয়ে নিয়েছে। আর যেহেতু এই বৃহত্তর অঞ্চলটির গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়েছে, তাই ভারত এবং ভারত-মার্কিন সম্পর্কের গুরুত্বও হ্রাস পেয়েছে। এটি বাংলাদেশকে কিছুটা হাঁফ ছাড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

সাহাব: আপনি পাকিস্তানে পেশাওয়ারে কাজ করেছেন। পাকিস্তানের হিসাব-নিকাশ বেশ ভালো করেই বোঝেন। দেখা যাচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকার ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের  ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। তারা দিল্লির সাথে দূরত্ব বজায় রাখা শিখেছে, যদিও ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক যথেষ্ট উন্নত হবে। কিন্তু একই সাথে ঢাকা এমন দুটি পরমাণু শক্তিধর দেশের মাঝে আটকে আছে, যাদের সম্পর্ক গত বছরের সামরিক সংঘাতের পর থেকে এখন সবচেয়ে তিক্ত। ওয়াশিংটনের কি এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কোনো পরিষ্কার ধারণা আছে? আর একই সাথে, এই দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের মাটিতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কতটা বাস্তব?

ড্যানিলোউইচ: আমি বলবো যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফর এবং অন্যান্য কার্যক্রম মিলিয়ে একটি কূটনৈতিক আলাপ আছে। আবারও, আমরা ঢাকা দূতাবাসে অত্যন্ত দক্ষ কূটনীতিক পেয়েছি। একইভাবে বাংলাদেশেরও ওয়াশিংটনে খুব যোগ্য ও দক্ষ কূটনীতিক আছেন। যারা এই আলোচনাগুলো চালিয়ে যাচ্ছেন।

আমার মনে হয় একটি কাজ যেটা অন্তর্বর্তী সরকার খুব ভালোভাবে করেছে, তা হলো তাদের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের সময় ওয়াশিংটনকে সব বিষয়ে অবগত রেখেছে। যেমন, অধ্যাপক ইউনূসের চীন সফর নিয়ে তখন অনেক আলোচনা ও উদ্বেগ ছিল। কিন্তু এই সফরের আগে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা ওয়াশিংটনকে বুঝতে সাহায্য করেছে। তারা বুঝতে পেরেছে অন্তর্বর্তী সরকারের চিন্তা ও উদ্দেশ্য কী। এই আলোচনা ওয়াশিংটনের উদ্বেগ দূর করতে সাহায্য করেছে।

একইভাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অন্তর্বর্তী সরকার ওয়াশিংটনের কাছে বেশ স্বচ্ছ ছিল। সম্পর্কটি কীভাবে এগোচ্ছে, কেন কিছু টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে এবং ভারতের সাথে যোগাযোগের জন্য সরকার কী ধরনের চেষ্টা করেছে- এসব বিষয়ে তারা অবগত করেছে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির বিবর্তন দেখাটা বেশ মজার ছিল। 

আমি সবসময়ই ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ এই ধরনের মামুলি পররাষ্ট্রনীতির সমালোচক ছিলাম। আমার কাছে এটি একটি অর্থহীন কথা। তবে তার মানে এই নয় বৈদেশিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজন নেই। অবশ্যই বাংলাদেশকে তার উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী সম্পর্ক রাখতে হবে। সেটা তা হোক যুক্তরাষ্ট্র, হোক ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান বা অস্ট্রেলিয়া। 

চীনের উত্থান একটি বাস্তবতা। অবশ্যই অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে চীনের সাথে বাংলাদেশের একটি স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। এরপর ভারতের প্রশ্নটি আসে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক থাকতেই হবে। এটি একটি ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা। 

কিন্তু আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ আমলে একটা জায়গায় ভারসাম্য নষ্ট হয়েছিল। সেটি হলো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অতিরিক্ত অগ্রাধিকার দেওয়া। আমার দৃষ্টিতে এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বা নিরাপত্তার স্বার্থের জন্য নয়, বরং ক্ষমতাসীন দল এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য হয়েছিল। মনে করা হতো ভারতের সমর্থন তাদের ক্ষমতার প্রধান একটি খুঁটি। তাই ওই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে লেনদেনের উপাদান খুব স্পষ্ট ছিল।

অন্যদিকে ভারতও নিরাপত্তা, কানেকটিভিটি বা ট্রানজিট নিয়ে তাদের স্বার্থ ও উদ্বেগের কথা স্পষ্টভাবেই বলেছে। হাসিনা আমল শেষ হওয়ার পর এতে পরিবর্তন আসাটা স্বাভাবিক। হাসিনা এবং তার অনেক প্রধান সহযোগীর ভারতে আশ্রয় নেওয়া এই সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। সেখানে তারা শুধু আশ্রয় নেয়নি, বরং সেই আশ্রয়কে ব্যবহার করে বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করেছে।

আরেকটি ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন বাংলাদেশ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছে ঠিকই, যেমন বিমসটেক-এর মতো উপ-আঞ্চলিক জোটে সম্পৃক্ত থেকেছে। তবে সার্ক ভারত-পাকিস্তান বিরোধের কারণে অকেজো হয়ে পড়েছিল। 

ঘরোয়া রাজনৈতিক কারণ এবং পররাষ্ট্রনীতির কারণে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাই এখানে একটি স্বাভাবিক পুনর্গঠন হওয়ারই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা সেটিই দেখেছি। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে উষ্ণ হয়েছে। সেটি শুধু নিরাপত্তা খাতে নয়, বরং সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও শিক্ষার মতো ক্ষেত্রেও সম্পৃক্ততা বেড়েছে। 

আপনারা দেখেছেন বাংলাদেশ সেই সম্পর্কগুলো এগিয়ে নিয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু মাত্রায় সীমাবদ্ধতা ছিল। কারণ মানুষ জানতো একটা পরিবর্তন আসবে। তবে তাদের একটি বড় সুবিধা ছিল অধ্যাপক ইউনূস আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। 

বিএনপি সরকারের শুরুর দিনগুলোতে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার আকাঙ্ক্ষা দেখা যাচ্ছে। যেহেতু দিন শেষে সার্ক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ ছিল। তাই অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। 

তবে ‘ইসলামাবাদও নয়, দিল্লিও নয়’—এই ধারণাটির মধ্যে একটি বিশেষ সুর আছে। আমরা আশা করতে পারি ঢাকা এ বিষয়ে সিরিয়াস। তারা দিল্লির সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করলেও পাকিস্তান বা অঞ্চলের অন্যদের সাথে সম্পর্ক আগের মতো নষ্ট হতে দেবে না। আমি আশা করি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য অংশীদারদের সাথে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া অব্যাহত রাখবে। নির্ধারণ করতে হবে চীনের সাথে কীভাবে সম্পর্ক উন্নয়ন করা যায়।

বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল পরিস্থিতি। তবে আমার বিশ্বাস নতুন সরকার সফলভাবে পরিচালনা করতে পারবে। এখন পর্যন্ত সরকারের সিগন্যালগুলো, মিথস্ক্রিয়াগুলো বেশ ভালো এবং এসব বিষয়ে যে গুরুত্ব দিচ্ছেন এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে কৃতিত্ব দিই।

চীনের সাথে সম্পর্ক এবং কিছু ক্ষেত্রে চীন যা দিতে পারবে সেটা বাংলাদেশ ত্যাগ করবে, এমনটা যুক্তরাষ্ট্রের আশা করা অবাস্তব বলে আমার মত: জন ড্যানিলোউইচ

সাহাব: ওয়াশিংটন কোন ধরনের আঞ্চলিকতা নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে? এটি কি বেইজিং-ইসলামাবাদ-ঢাকা ত্রিপক্ষীয় কোনো বিষয়? নাকি সার্ক বা বিমসটেক-কে নতুন করে সাজানো? এখন বেইজিং ও ওয়াশিংটনের ভূ-কৌশলগত দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে আমাদের জন্য কোন ধরনের আঞ্চলিকতা আদর্শ হওয়া উচিত?

ড্যানিলোউইচ: আপনি মূল চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন। বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো চীনের সাথে সম্পর্ক সামলানো। চীন ও পাকিস্তানের সাথে এই ত্রিপক্ষীয় সমীকরণটি এই অঞ্চলে এবং ওয়াশিংটনের কিছু মহলে নিশ্চিতভাবেই উদ্বেগ তৈরি করবে। আমি উল্লেখ করেছি, বিশেষ পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে যারা চীনের সাথে প্রতিযোগিতার বিষয়ে ফোকাসড, তাদের মধ্যে। তাই এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি।

আমি এখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ঐক্যমত বা স্বার্থকে হয়তো আলাদা করে দেখবো। আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও একটি বড় গোষ্ঠী আছে যারা বাংলাদেশকে এবং এই অঞ্চলকে দেখে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর আঙ্গিকে। 

ট্রাম্প প্রশাসন জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্বকে ছোট করে দেখেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেকের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন প্রধান চ্যালেঞ্জ। নিশ্চয়ই কংগ্রেসে অনেকেই এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এছাড়া অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে অস্থিতিশীল হওয়ার ঝুঁকিও আছে। 

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর পক্ষে আমেরিকায় শক্তিশালী একটি সমর্থক গোষ্ঠীও আছে। 

এই অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে কম সমন্বিত অঞ্চলগুলোর একটি। তাই আলোচনা চলছে। যার অনেকগুলোয় আমার অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে। 

আরেকটি বড় ফ্যাক্টর আমার মতে হলো যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রবাসীদের ভূমিকা। সে জায়গা থেকে ভারতীয়রা একটা বড় অংশ এবং তারা সফল। অন্যান্যরাও একইরকম। পাকিস্তানি-আমেরিকান এবং বাংলাদেশি-আমেরিকানরাও এখন বেশ শক্তিশালী। সুতরাং তারাও এসব সমস্যার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অংশীদার। তারা এখনই রেমিট্যান্সের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ দেশ বা অঞ্চলে ভূমিকা রাখছে। তবে আমার মনে হয় এর বাইরেও যোগাযোগ, সম্ভাব্য বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যে সম্পর্কের মাধ্যমে এবং নলেজ ট্রান্সফারের মাধ্যমে তারা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

এসব বিষয় মার্কিন সরকার আগে যেভাবে ইউএসএইডের মাধ্যমে চেক লিখে টাকা দিতো, সেটা ছাড়াই এখন উদ্দেশ্যগুলো এগিয়ে নিতে হবে। তাই কীভাবে আগায়, সেটা হবে ইন্টারেস্টিং। 

সাহাব: যদি শূন্যতা ও ভঙ্গুরতা অব্যাহত থাকে, নাগরিক পরিসর সংকুচিত হতে থাকে, তবে রাজনৈতিক দুর্বলতা চলতেই থাকবে। আর একই সময়ে, স্বৈরাচারী প্রবণতা ফিরে আসতে পারে। আমরা কীভাবে নিশ্চিত করবো যে বাংলাদেশের সকল ভঙ্গুরতার জন্য ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সমর্থনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে?

ড্যানিলোউইচ: আমি আগেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ভুলের কথা উল্লেখ করেছি। কিন্তু বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ইউএসএইডে’র পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে দীর্ঘদিনের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্কের কারণে। 

একজন কূটনীতিক বা পররাষ্ট্রনীতির চর্চার দৃষ্টিকোণ থেকে, এই কর্মসূচিগুলোর ক্ষতি কূটনীতিকদের কাজকে অনেক বেশি কঠিন করে তোলে। ভাগ্যক্রমে, নিরাপত্তা এবং মানবিক ক্ষেত্রে কিছু বৈদেশিক সহায়তা অব্যাহত আছে। তবে আগের মতো নেই। যা  সরকারের কাজকে জটিল করে তোলে। তবে এর মূল চাবিকাঠি হলো, সম্ভাব্য ঘাটতি চিহ্নিত করে সমাধান খুঁজে বের করা।

রোহিঙ্গা ইস্যু একটি স্পষ্ট উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মানবিক সহায়তা প্রদানের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত উদার ছিল, শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য জায়গায়ও।

মানবিক সহায়তায়, বিশেষ করে খাদ্যে সব সময়ই বড় সহায়তা করে থাকে। কিন্তু এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে এই বিষয় রাজনৈতিকভাবে ‘আনসাস্টেইনেবল’ হয়ে যায়। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই, শরণার্থীরা, বাংলাদেশে বা অন্য যে কোনোখানে, তারা ভয়াবহ ধরনের মানবিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।

সম্পূর্ণ পরোপকারী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যরা এগুলো পূরণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। তাই এক অর্থে, ইউএসএইডে’র পরিবর্তন বা বিলুপ্তি এবং সহায়তার হ্রাস হলো এক ধরনের ‘শক থেরাপি’। আর এখন যা করা যায় তা হলো, নতুন সমাধানের দিকে যাওয়া, এমন কিছু যা আগে বিবেচনা করা হতো না। আর ইতিমধ্যেই বেশ কিছু ক্ষেত্রে এমন দেখেছি। তাই আমি মনে করি বাংলাদেশে সুযোগ রয়েছে।

তবে বাংলাদেশকে একা এই বোঝা বওয়া উচিত নয়। এ বিষয়ে এই অঞ্চলের অন্যান্য পক্ষ এবং বাইরের দেশগুলোর একটি ভূমিকা ও দায়িত্ব রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন এই পরিস্থিতির দিকে নতুন করে দৃষ্টি দেয়া। 

সাহাব: ওয়াশিংটন কি ঢাকাকে বেইজিংয়ের সাথে সম্পৃক্ততার একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প দিচ্ছে নাকি একটি ‘কৌশলগত আত্মত্যাগ’ করতে বলছে? আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই সেখানকার ছাত্ররা এটাকে আত্মত্যাগ মনে করে।

ড্যানিলোউইচ: অবশ্যই। না, মানে, ‘কৌশলগত আত্মত্যাগ’ একটি ইন্টারেস্টিং ধারণা। আমি এর আগে এটি শুনিনি।

সাহাব: আচ্ছা, আপনাকে বুঝতে হবে এটি জেন জি-দের থেকে আসছে।

ড্যানিলোউইচ: এইটা আমার মনে থাকবে। চীনের সাথে সম্পর্ক এবং কিছু ক্ষেত্রে চীন যা দিতে পারবে সেটা বাংলাদেশ ত্যাগ করবে, এমনটা যুক্তরাষ্ট্রের আশা করা অবাস্তব বলে আমার মত। আবার এমন কিছু বিষয় আছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রতিযোগিতায় যাবেই না। যেমন, বড় অবকাঠামো প্রকল্প।

আর যুক্তরাষ্ট্র যা চাইবে, তা হলো বাংলাদেশ একটি সমান সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি করবে। যেন মার্কিন কোম্পানি চীনা প্রতিপক্ষদের সাথে ন্যায্যভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে। আবারও আমি যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে ‘সরাসরি আলোচনার’ বিষয়ে ফিরে আসছি। এটাই সুযোগ। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে, যেখানে আপনাদের কার্ডগুলো টেবিলে রেখে বলতে পারেন— এই হলো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ। আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্র তখন স্পষ্ট করে বলতে পারবে- এই হলো বাংলাদেশের স্বার্থ।

তারপর আপনি কীভাবে অন্যদের অন্তর্ভুক্ত করবেন? কীভাবে আপনি অন্যান্য আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থকে বিবেচনায় নেবেন? অন্যান্য অঞ্চলের বাইরের শক্তি বা খেলোয়াড় কারা, যারা এতে অংশ নিতে সক্ষম? 

আমি মনে করি এখানে এমন একটি ফ্যাক্টর রয়েছে যেখানে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কটিকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে। আবারও বলি, আমরা এমন এক সময়ে আছি যখন বাংলাদেশের নতুন সরকার এখনো গুছিয়ে উঠছে। নতুন লোকজন এমন সব পদে আসছেন যাদের সেই ভূমিকায় অভ্যস্ত হতে হবে, নিজেদের বিকশিত করতে হবে।

আর মার্কিন পক্ষের অবস্থা সবসময় পরিবর্তনশীল, তাই না? ট্রাম্প প্রশাসন তাদের প্রথম বছর শেষ করেছে। আমাদের সামনে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন আসছে।

কে জানে কী হতে যাচ্ছে! বেশিরভাগেরই ধারণা, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষই দখল করতে পারে। সেটি এমনকি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও একটি ভিন্ন গতিশীলতা তৈরি করবে।

আর মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়া মাত্রই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হয়ে যাবে। ট্রাম্প আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এটিই তার শেষ মেয়াদ। সুতরাং যখন একটি নতুন দল বা নতুন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আসবে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। তাই আমি মনে করি বাংলাদেশের জন্য এটিই চ্যালেঞ্জ।

আবারও, আমরা বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে কিছুটা কথা বলেছি। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে একটি স্পষ্টতা রয়েছে। আর আমার কাছে শেষ পর্যন্ত ঠেকছে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে কতটা গুরুত্ব দিবে, সেই সিদ্ধান্তে। আর ট্রাম্প প্রশাসন এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, তাদের কাছে এটিই সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। চুক্তি থেকে সরে আসার সার্বভৌম অধিকার বাংলাদেশের অবশ্যই আছে।

কিন্তু এর ফলে কিছু মূল্য দিতে হবে, যা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তার চেয়েও বেশি কিছু । সহযোগিতার অন্যান্য ক্ষেত্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে যদি বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটে। এখন অন্যান্য সম্পর্ক বা অংশীদারিত্বের ওপর বাণিজ্য সম্পর্কের প্রভাব অনস্বীকার্য। 

বাংলাদেশ যদি এয়ারবাসের পরিবর্তে বোয়িংয়ের কাছে উড়োজাহাজ কেনা শুরু করে, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য এর প্রভাব কী দাঁড়াবে? চীনের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কী হবে যদি বাংলাদেশ কিছু সংবেদনশীল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ মানতে সম্মত হয়? তাই কিছু বিষয় রয়েছে যা নিয়ে যুক্তিযুক্তভাবে আলোচনা ও বিতর্ক হতে পারে, এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ তার নিজের সর্বোচ্চ স্বার্থের ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেবে।

সাহাব: বর্তমানে বাংলাদেশের বিষয়ে ওয়াশিংটন সবচেয়ে বড় কোন ভুল করছে? আবার কোন একটি কাজ ঢাকার করা উচিত ছিল, কিন্তু করার মতো ‘সাহস’ পায়নি বলে আপনার মনে হয়?

ড্যানিলোউইচ: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিষয়ে কী ভুল করেছে বা করছে সেক্ষেত্রে, আবারও, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র মনোযোগের বিষয়টি আছেন। আবার শাসনব্যবস্থার মান, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়গুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।

আমি মনে করি, শেষ পর্যন্ত এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভুল। আপনি এই দুটি বিষয়কে আলাদা করতে পারেন না। যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানেই ফিরে যাচ্ছি আমি  তা হলো, যদি বাংলাদেশের ঠিক পথে ফেরার চতুর্থ সুযোগ হয়, তবে তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কোনো কিছু করার যত বেশি সুযোগ আপনি পাবেন, তাতে সফলতার সম্ভাবনা তত বাড়ে এবং যতবার আপনি ভুল করবেন, আবার ভুল করার সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ উভয়ের জন্যই এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি ঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিশ্বাস যে ২০২৪ সালের জুলাই এবং অগাস্টে যা ঘটছিল তা ছিল একটি বিপ্লব। অন্য একজনের শব্দ ধার করে বলি, তা হলো একটি ‘অসমাপ্ত বিপ্লব’।

পুরো সময়টি ছিল বিপ্লবী মুহূর্ত। ৮ই অগাস্টের পর বিপ্লবী পথে না যাওয়ার একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। নতুন রিপাব্লিক ঘোষণা করা হয়নি। সংবিধান বাতিল করা হয়নি। ঢাকার রাস্তায় কোনো গিলোটিন ছিল না। কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি ছিল একটি রক্ষণশীল পদ্ধতি গ্রহণ করার। এটিই আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে।

তাই আবারও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই লক্ষ্যগুলো এগিয়ে নিতে সাহায্য করে সেই প্রশ্নে ফিরে আসি। গণতন্ত্র এবং শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে অতীতে তাদের যে পদক্ষেপ ছিল, সেগুলো এখনও থাকলে ভালো হতো। 

আমি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলাম। সেখানে কিছু খুব ভালো দিক ছিল। আবার তার কিছু উদ্বেগজনক দিকও ছিল। তবে এটা স্পষ্ট বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য আছেন যাদের সংসদে খুব বেশি অভিজ্ঞতা নেই। অতীতে কেউ চাইলে সংসদ সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সমর্থনের জন্য মার্কিন সরকারের তাকাতে পারতো। এখন হয়তো অন্য কেউ এগিয়ে আসবে এবং এই শূন্যতা পূরণ করবে। অবশ্যই বাংলাদেশ সরকার নিজেই সম্পদ বরাদ্দ করতে পারে। কিন্তু আমার ভয় হলো, সেই সম্পদগুলো হয়তো সহজলভ্য হবে না।

আপনার দ্বিতীয় প্রশ্ন, এই সরকারের কী ধরনের সাহস দেখানো প্রয়োজন, এটি অনেকটা মুদ্রার উল্টো পিঠের মতো। আমি প্রধানমন্ত্রী এবং তার দলকে পূর্ণ কৃতিত্ব দেই গত ১৮ মাস বা তারও বেশি সময় ধরে এই দিনটির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টার জন্য। তারা তাদের দলের ইশতেহার তৈরি করেছেন। তাদের সংস্কার কর্মসূচি রয়েছে। তারা প্রার্থী নির্বাচন এবং দেশ পরিচালনার প্রস্তুতির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি। তিনি যা করেছেন এবং বলেছেন তা দেখে আমি খুব মুগ্ধ হয়েছি। আবারও বলছি, তিনি যা করেছেন তাতে দোষ ধরার মতো আসলে কিছুই নেই।

কিন্তু তার মানে এই নয় যে সামনের পথটি একদম পরিষ্কার। আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো সেই কঠিন সিদ্ধান্তগুলো নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করা। যেন সত্যিই নিশ্চিত করা যায়, এবার বিষয়গুলো ভিন্নভাবে কাজ করবে, যেন তারা স্বাভাবিক কার্যক্রম বা ‘স্বাভাবিক রাজনীতি’তে ফিরে না যায়। 

আমার তুলনায় বাংলাদেশের জেন জি এবং তরুণদের সাথে আপনার যোগাযোগ অনেক বেশি। কিন্তু অনলাইন মিথস্ক্রিয়াসহ আমার যা ধারণা হয়েছে তা হলো জেন জি’র অনেক বাংলাদেশি চিরকাল ২০২৪ সালের জুলাই এবং অগাস্টকে তাদের জীবনকে সংজ্ঞায়ন করার মুহূর্ত হিসেবে ফিরে দেখবে। দায়িত্বের একটি অংশ তাদের ওপরও বর্তায়।

এখন, কেউ হয়তো রাজনীতির মাধ্যমে তা করবে। কেউ নির্বাচনে দাঁড়াবে। কেউ রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হবে। কিন্তু অন্যরা তাদের ক্যারিয়ার নিয়ে এগিয়ে যাবে। তারা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হবে। কিন্তু তাদের একটি ভূমিকা পালন করার আছে।

সুতরাং দায়িত্বের একটি অংশ তাদের ওপরও আছে। অন্য দায়িত্বটি সিস্টেমের ওপর, এবং এই ক্ষেত্রে সরকারের ওপর; তাদের সেই অবদান রাখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য জায়গা করে দেওয়া।

তাই আমি যদি বর্তমান সরকারকে সাহসের বিষয়ে কোনো পরামর্শ দিতে চাই তা হলো এই তরুণদের জায়গা দেওয়ার মতো যথেষ্ট সাহসী হওয়া; যারা নির্ভুল নয়, যারা চলার পথে ভুল করবে। যেমনটি আমরা সবাই তরুণ বয়সে করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারাই বাংলাদেশ। তারা দেশ এবং এই অঞ্চল দুটোকেই পরিবর্তন করতে সক্ষম। আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও এই প্রজন্মের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার একটি আকাঙ্ক্ষা ও সদিচ্ছা রয়েছে।