যদি কিন্তুর হিসাবে যদি ইসরায়েলের মসনদ বদলেও যায়, তাতে কি গাজার ভবিষ্যত বদলাবে 

১৯৯৭ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর। জেরুজালেমের বেন ইয়েহুদা স্ট্রিটে হামাসের আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হলো ১৩ বছরের স্মাদার। তার বাবা রামি এলহানান, একজন ইসরায়েলি ইহুদি। ঠিক দশ বছরের মাথায় ২০০৭ সালে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সীমান্ত পুলিশের গুলিতে মারা গেল ১০ বছরের আবির। তার বাবা বাসাম আরামিন, একজন ফিলিস্তিনি।

দুই বাবা, দুই মেয়ে। দুই প্রতিপক্ষের সহিংসতায় দুইটি অকাল মৃত্যু। অথচ সন্তান হারানোর পর দুই বাবা প্রতিশোধের বদলে শান্তির আন্দোলনে যোগ দিলেন। পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠলেন।

তাদের জীবন নিয়ে আইরিশ লেখক কলাম ম্যাকক্যান লিখেছেন অ্যাপেইরোগন উপন্যাস। অ্যাপেইরোগন এমন এক বহুভুজ, যার বাহুর সংখ্যা অসীম। ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাতের অসংখ্য মৃত্যু, ইতিহাস ও বেদনার সঙ্গে নামটির অদ্ভুত সাযুজ্য রয়েছে।

২০২৩ সালের ৭ই ডিসেম্বর গাজায় আরও এক বাবা হারালেন তার সন্তানকে। তিনি গাদি আইজেনকট, ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান। তার ২৫ বছর বয়সী ছেলে গাল মেইর আইজেনকট নিহত হন গাজায় সামরিক অভিযানের সময়। বাবা তখন নিজেই যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য।

তিন পিতা, তিনটি শোক। কিন্তু পথ এক নয়।

রামি ও বাসাম খুঁজেছেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে শান্তির পথ। আইজেনকট খুঁজেছেন হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক লক্ষ্য অর্জনের আরও কার্যকর পথ। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার সমালোচনা করেছেন, কিন্তু সামরিক শক্তি প্রয়োগের নীতি প্রত্যাখ্যান করেননি।

এবার ইসরায়েলের নির্বাচনে সেই আইজেনকটই নেতানিয়াহুর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন।

২৭এ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের সংসদ নির্বাচনে দুই নেতার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর একের পর এক টেলিভিশন চ্যানেলের এক্সিট পোল অর্থাৎ বুথফেরত জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সংশোধিত প্রক্ষেপণেও বদলেছে আসনের অঙ্ক। কোথাও নেতানিয়াহুর শিবির এগিয়েছে, কোথাও তার বিরোধীরা।

এক্সিট পোল বা বুথফেরত জরিপ হলো ভোট দিয়ে বেরিয়ে আসা কিছু মানুষের কাছে তারা কাকে ভোট দিয়েছেন, তা জেনে সম্ভাব্য নির্বাচনী ফল নির্ধারণের জরিপ। এটি প্রকৃত ভোট গণনা নয়।

ভোটের আগের অধিকাংশ জনমত জরিপে আইজেনকটের নতুন মধ্যপন্থি দল ইয়াশার এগিয়ে থাকলেও নির্বাচনের রাতের প্রধান জরিপগুলোতে সবচেয়ে বড় একক দল হিসেবে উঠে এসেছে নেতানিয়াহুর লিকুদ।

Israel Polls (2)

ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান, বেসরকারি চ্যানেল টুয়েলভ ও চ্যানেল থার্টিনের প্রথম জরিপের হিসাবে নেতানিয়াহুর লিকুদ ২৪ থেকে ২৫টি এবং আইজেনকটের ইয়াশার ২১ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে। কিন্তু দলের হিসাব আর জোটের হিসাব এক নয়।

এই তিনটি চ্যানেলের প্রাথমিক প্রজেকশনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর জোট প্রায় ৫০টি, তার বিরোধী আইজেনকটের শিবির ৫২ থেকে ৫৩টি এবং আরবপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ১৭ থেকে ১৮টি আসন পেতে পারে বলে উঠে আসে।

পরবর্তী সংশোধিত এক্সিট পোলে কয়েকটি আসনের হেরফের হয়েছে। কোনো কোনো প্রজেকশনে দুই প্রধান শিবির সমান ৫১টি করে আসন পেয়েছে। অন্যদিকে চ্যানেল ফোর্টিনের হিসাবে নেতানিয়াহুর জোট ৬০ আসন পর্যন্ত পেতে পারে। এটি অবশ্য নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি তুলনামূলকভাবে অনুকূল একটি সংবাদমাধ্যম।

এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ভোটের চূড়ান্ত গণনা থেকে সরকার গঠনের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়নি।

তবে এক্সিট পোলগুলোর অধিকাংশেই একটি বিষয় স্পষ্ট। প্রধান দুই শিবিরের কেউ এককভাবে ৬১ আসনের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত ফল কী হবে, সেটি অবশ্য প্রকৃত গণনাই নির্ধারণ করবে।

বাংলায় একটা কথা আছে, ‘যাহাই বায়ান্ন তাহাই তিপ্পান্ন’। ইসরায়েলের নির্বাচনী অঙ্কে কথাটি যেন নতুন অর্থ পেয়েছে। একটি শিবির ৫২টি আসন পেল, নাকি ৫৩টি, তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো পক্ষেরই যদি সরকার গঠনের মতো সমর্থন না থাকে, তাহলে সেই এক আসনের ব্যবধান ক্ষমতার নিশ্চয়তা দেয় না।

বরং সরকার গঠনের জন্য দরকার অন্য দলের সমর্থন, রাজনৈতিক সমঝোতা, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে আপস এবং কখনো এমন দলের ভোটদানে বিরত থাকা, যে দলকে নিজের সরকারে নিতেই রাজি নয় ক্ষমতাপ্রত্যাশী পক্ষ।

এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর চেয়ে আইজেনকটের সামনে সরকার গঠনের সুযোগ বেশি না কম, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত আসনসংখ্যা ও অন্য দলগুলোর অবস্থানের ওপর।

তবে এটা বলাই যায়, গাজায় সন্তান হারানো তৃতীয় পিতা আইজেনকট এবার নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন।

৩৭টি দল, ১২০টি আসন, কিন্তু সরকার কার?

কোন-দল-কোন-শিবিরে.jpg

এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ৩৭টি প্রার্থী তালিকা। সব তালিকাই আলাদা রাজনৈতিক দল নয়। কোনো কোনোটিতে একাধিক দল জোট বেঁধে অংশ নিয়েছে।

তবে সংসদে ঢোকার জন্য একটি নির্বাচনী তালিকাকে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ বৈধ ভোট পেতে হয়। সেই সীমা পার করতে না পারলে লাখ লাখ ভোট পেয়েও কোনো আসন নাও মিলতে পারে।

ইসরায়েলের পুরো ভূখণ্ড একটিই নির্বাচনী এলাকা। বাংলাদেশের মতো আলাদা আলাদা সংসদীয় আসন থেকে প্রার্থী নির্বাচিত হন না। ভোটাররা দলের তালিকাকে ভোট দেন, দল ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন পায়।

১২০ আসনের নেসেটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।

কিন্তু ৩৭টি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তালিকা থাকলেও এক্সিট পোলের হিসাবে মাত্র ১১টির মতো তালিকা ভোটের ন্যূনতম সীমা পেরিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব পেতে পারে। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণ নির্ধারিত হবে মূলত ওই দলগুলোর মধ্যে।

নেতানিয়াহুর নিজের দল লিকুদ। তার প্রধান শরিকদের মধ্যে রয়েছে আরিয়ে দেরির অতি-ধর্মীয় শাস, আশকেনাজি অতি-ধর্মীয় ইহুদিদের ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম, ইতামার বেন-গভিরের কট্টর ডানপন্থি ওৎজমা ইয়েহুদিত এবং বেজালেল স্মোট্রিচ ও মোশে ফেইগলিনের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী জোট রিলিজিয়াস জায়নিজম-জেহুত।

অন্যদিকে আইজেনকটের মধ্যপন্থি ইয়াশারের পাশাপাশি নেতানিয়াহুবিরোধী শক্তির মধ্যে রয়েছে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদের যৌথ নির্বাচনী জোট বেইয়াখাদ, ইয়াইর গোলানের বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস এবং আভিগদোর লিবারম্যানের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী দল ইসরায়েল বেইতেনু।

এর বাইরে রয়েছে আরবপ্রধান তিন দলের জোট জয়েন্ট লিস্ট এবং মুসলিম আরব নেতা মনসুর আব্বাসের দল রাআম।

এই আরবপ্রধান দলগুলোর সম্ভাব্য ১৭ থেকে ১৮টি আসন কোনো প্রধান শিবিরের স্বয়ংক্রিয় অংশ নয়।

ফলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে থাকা দলগুলো সংখ্যায় এগিয়ে গেলেও তাদের পক্ষে সরকার গঠন নিশ্চিত হয়ে যায় না।

দলীয় ভোট কিন্তু সংসদে যায় কারা

ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আরেকটি মজার বিষয় রয়েছে। ভোটাররা তো দলকে ভোট দেন, কিন্তু সেই দলের হয়ে সংসদে যাবেন কারা? এর জন্য প্রতিটি দল নির্বাচনের আগেই প্রার্থীদের একটি ক্রমিক তালিকা তৈরি করে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়। 

ধরা যাক, নেতানিয়াহুর লিকুদ ২৫টি আসন পেল। তাহলে দলটির তালিকার প্রথম ২৫ জন নেসেটের সদস্য হবেন। ২৬ নম্বরে থাকা প্রার্থী সংসদে যেতে পারবেন না। আবার আইজেনকটের ইয়াশার ২২টি আসন পেলে তার তালিকার প্রথম ২২ জন নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ ভোটাররা দলের তালিকায় ভোট দিলেও সেই তালিকার ভেতরে কোন প্রার্থীকে বেশি পছন্দ করেন, তা আলাদাভাবে জানানোর সুযোগ পান না।

কিন্তু তালিকায় কে ১ নম্বরে, কে ২৫ নম্বরে থাকবেন, তা ঠিক করেন কারা? এখানেও দলভেদে নিয়ম আলাদা। নেতানিয়াহুর লিকুদে নিবন্ধিত দলীয় সদস্যরা অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে, যাকে প্রাইমারি বলা হয়, প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন। 

অন্যদিকে আইজেনকটের ইয়াশারে প্রার্থীদের তালিকা নির্ধারণ করেন মূলত আইজেনকট নিজেই। আবার নেতানিয়াহুর শরিক অতি-ধর্মীয় শাস দলের প্রার্থী তালিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ধর্মীয় নেতাদের পরিষদ। আর মুসলিম আরব নেতা মনসুর আব্বাসের রাআমে দলের অভ্যন্তরীণ প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করা হয়। 

ফলে একই সংসদে কেউ আসেন দলের সাধারণ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত তালিকা থেকে, কেউ দলীয় প্রধানের মনোনয়নে, আবার কেউ ধর্মীয় নেতৃত্বের নির্ধারিত তালিকা থেকে। তবে শেষ পর্যন্ত সবাইকে সংসদে যেতে হয় জাতীয় নির্বাচনে নিজের দলের পাওয়া আসনসংখ্যার ভিত্তিতে।

তিন বছরে পাঁচ নির্বাচন: বিভক্তির রাজনৈতিক মূল্য

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট।

প্যালেস্টাইনে আক্রমণ বা আগ্রাসন চালানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই শিবিরের দলগুলো একাট্টা থাকলে দেশটির রাজনীতি কিন্তু বেশ অস্থির এবং অস্থিরতাও নতুন নয়।

২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দেশটিতে পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। প্রথম নির্বাচন ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল। দ্বিতীয়টি সেই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর। তারপর ২০২০ সালের ২ মার্চ, ২০২১ সালের ২৩ মার্চ এবং ২০২২ সালের ১ নভেম্বর।

পাঁচটি নির্বাচন, অথচ স্থিতিশীল সরকার গঠন বারবার কঠিন হয়ে উঠেছে।

কারণ দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন শুধু ডান ও বামে বিভক্ত নয়। নেতানিয়াহুর পক্ষে ও বিপক্ষে রাজনৈতিক বিভাজনও গভীর। আবার ডানপন্থিদের মধ্যেও ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক সেবা, রাষ্ট্রের ধর্মীয় চরিত্র এবং বিচার বিভাগের ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ রয়েছে।

নেতানিয়াহুর বিরোধী হলেই কেউ বামপন্থি হন না। বরং তার বিরোধীদের মধ্যেও এমন ডানপন্থি নেতা রয়েছেন, যারা স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী।

এমনকি আরবপ্রধান দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা যাবে কি-না, সেই প্রশ্নেও নেতানিয়াহুবিরোধী শিবির একমত নয়।

ফলে নির্বাচনে একসঙ্গে নেতানিয়াহুকে সরাতে চাওয়া দলগুলো সরকার পরিচালনার সময় পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে।

এর উল্টো উদাহরণও রয়েছে। এমন দল সরকারকে সমর্থন করতে পারে, যারা সেই সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দেবে না।

এ কারণেই ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বারবার নির্বাচন হয়েছিল। কখনো সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন মেলেনি, কখনো সমঝোতায় গঠিত সরকার বাজেট ও নীতিগত বিরোধে ভেঙে পড়েছে।

ইসরায়েলের গণতন্ত্রের এই বৈশিষ্ট্যই এবারের নির্বাচনের ফলকে জটিল করে তুলেছে।

এক আসন কম পেয়েও প্রধানমন্ত্রী, সাত আসন পেয়েও প্রধানমন্ত্রী

ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় দল হওয়া মানেই সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রী হবেন সেটি নয়। অতীতের দুটি ঘটনা তা স্পষ্ট করে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছিল জিপি লিভনির কাদিমা পার্টি। আসন পেয়েছিল ২৮টি। নেতানিয়াহুর লিকুদ পেয়েছিল ২৭টি। অথচ প্রধানমন্ত্রী হলেন নেতানিয়াহু।

কারণ অন্য ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ তার বেশি ছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শিমন পেরেস তাঁকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন।

আর ২০২১ সালে আরও আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বড় দল লিকুদ হয়েও নেতানিয়াহু সরকার গঠন করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হলেন নাফতালি বেনেট, যাঁর ইয়ামিনা দল পেয়েছিল মাত্র সাতটি আসন।

তার সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন মধ্যপন্থি ইয়াইর লাপিদ। আর সেই সরকারের অন্যতম শরিক ছিলেন মুসলিম আরবপ্রধান দল রাআমের নেতা মনসুর আব্বাস।

সরকারটি সংসদে ৬০-৫৯ ভোটে আস্থা পেয়েছিল।

এবারও তাই প্রশ্ন কেবল নেতানিয়াহুর লিকুদ বেশি আসন পাবে, নাকি আইজেনকটের ইয়াশার।

প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকটের বাইরে আর কোন কোন নেতা সংসদের সমর্থন জোগাড় করতে পারবেন?

এমনকি অন্য কোনো সংসদ সদস্যকে ঘিরে অপ্রত্যাশিত সমঝোতা তৈরি হয় কি না, সেই সম্ভাবনাও ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় পুরোপুরি বন্ধ নয়।

সবশেষে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজগের। তিনি সংসদীয় দলগুলোর সুপারিশ শুনে সরকার গঠনের উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন করবেন।

তবে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত পছন্দে নয়, শেষ পর্যন্ত সংসদের আস্থা অর্জনের ওপরই নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রিত্ব।

আর সেই অঙ্কে আবারও সামনে চলে আসতে পারেন মনসুর আব্বাস, যার নিজের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাস্তব রাজনৈতিক সুযোগ না থাকলেও তার দলের কয়েকটি আসন অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী হতে সাহায্য করতে পারে।

রাষ্ট্রপতির হাতে চাবি, কিন্তু দরজা খুলবে কে

রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজগের ভূমিকা বুঝতে একটি পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না। তিনি এমন একজন সংসদ সদস্যকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন, যার পক্ষে সংসদের আস্থা অর্জন সম্ভব বলে মনে হয়।

এই সিদ্ধান্তের আগে সংসদে নির্বাচিত দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি আলোচনা করেন। দলগুলো কাকে সরকারপ্রধান হিসেবে দেখতে চায়, সেই সুপারিশ শোনেন।

এখানেই শুরু হয় রাজনৈতিক দর-কষাকষি।

ধরা যাক, লিকুদ সবচেয়ে বড় দল হলেও নেতানিয়াহুর পক্ষে অন্য দলগুলোর সমর্থন জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে আইজেনকটের দল কিছুটা ছোট হলেও তার পক্ষে বেশি সংসদ সদস্য সমর্থন দিতে প্রস্তুত। সে ক্ষেত্রে আইজেনকট সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে পারেন।

আবার নেতানিয়াহু ও আইজেনকট, দুজনেই ব্যর্থ হলে অন্য কোনো সংসদ সদস্যকে ঘিরেও সমঝোতা হতে পারে।

তবে শুধু রাষ্ট্রপতির ইচ্ছায় তৃতীয় কাউকে প্রধানমন্ত্রী করা সম্ভব নয়। তাকেও সংসদের আস্থা অর্জন করতে হবে।

প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা সাধারণত ২৮ দিন সময় পান। রাষ্ট্রপতি চাইলে আরও ১৪ দিন বাড়াতে পারেন। এরপর বিকল্প প্রার্থী খোঁজা এবং সংসদ সদস্যদের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অন্য কাউকে সামনে আনার সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে।

ইসরায়েলের রাজনীতিতে তাই রাষ্ট্রপতির দরজায় যিনি প্রথম প্রবেশ করলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই।

৬১ আসন নেই, তবু সরকার সম্ভব?

এবার চ্যানেল টুয়েলভের প্রথম এক্সিট পোলের হিসাব ধরা যাক। নেতানিয়াহুর জোট ৫০টি আসন পেতে পারে। আইজেনকটসহ বিরোধী শিবির ৫২টি। আর আরবপ্রধান দলগুলোর সম্ভাব্য আসন ১৮টি।

কারও হাতে ৬১ আসন নেই। তাহলে কি আবার নির্বাচন দিতে হবে? অবশ্যই নয়। এই পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু সরকার বা মাইনরিটি গভর্নমেন্ট গঠনের পথ খোলা রয়েছে।

ধরা যাক, আইজেনকটের শিবিরের ৫২ জন নতুন সরকারের পক্ষে ভোট দিলেন। নেতানিয়াহুর শিবিরের ৫০ জন বিপক্ষে ভোট দিলেন। আর আরবপ্রধান দলগুলোর ১৮ জন ভোটদানে বিরত থাকলেন।

তাহলে ৫২-৫০ ভোটে সরকার সংসদের আস্থা অর্জন করতে পারে। এর কারণ, নতুন সরকারের আস্থাভোটে সব সময় ৬১টি ইতিবাচক ভোট প্রয়োজন হয় না। পক্ষে ভোট বিপক্ষের চেয়ে বেশি হওয়াই যথেষ্ট হতে পারে।

তবে এই অঙ্কটি শুধু নিয়ম বোঝানোর উদাহরণ। বাস্তবে বিরোধী শিবিরের সবাই একসঙ্গে ভোট দেবেন কি না, আরব দলগুলো সত্যিই বিরত থাকবে কি না এবং কোন দল কাকে প্রধানমন্ত্রী মেনে নেবে, তার ওপর ফল নির্ভর করবে।

এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নতুন সরকার গঠনের আস্থাভোট আর ক্ষমতাসীন সরকারকে সরানোর আনুষ্ঠানিক অনাস্থাভোট এক জিনিস নয়। ইসরায়েলে গঠনমূলক অনাস্থাভোটে বিকল্প সরকার গঠনের পক্ষে ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।

সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হলেও সেটি টিকিয়ে রাখা সহজ নয়।

বাজেট, গুরুত্বপূর্ণ আইন কিংবা নীতিগত সিদ্ধান্তের জন্য বারবার সমর্থন সংগ্রহ করতে হয়। এতে সংসদীয় দর-কষাকষি ও জবাবদিহির সুযোগ বাড়তে পারে।

আবার উল্টো ফলও হতে পারে। সমঝোতা না হলে বাজেট আটকে যায়, আইন পাস হয় না, সরকার অচল হয়ে পড়ে।

ইসরায়েলের সংসদ সদস্যরা নিজের দলের অবস্থানের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার আইনগত সুযোগও রাখেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের মতো প্রতিটি দলবিরোধী ভোটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্যপদ হারানোর বিধান নেই।

তবে আনুষ্ঠানিক দলত্যাগ ও দল ভাঙার ক্ষেত্রে পৃথক আইনগত বিধিনিষেধ রয়েছে।

ফলে ১২০ সদস্যের নেসেটে একটি আসন তো বটেই, কখনো একজন সদস্যের অবস্থান পরিবর্তনও বড় রাজনৈতিক ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।

মনসুর আব্বাস: প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আইনগত সুযোগ, রাজনৈতিক পথ বন্ধ

মনসুর আব্বাস

মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের মুসলিম আরবপ্রধান রাজনৈতিক দল রাআমের নেতা। ইসলামপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই দল ২০২১ সালে বেনেট-লাপিদ সরকারে অংশ নিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছিল।

এবারের প্রধান তিনটি এক্সিট পোলেই রাআম সাতটি আসন পেতে পারে বলে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আব্বাসের গুরুত্ব শুধু এই সাত আসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার রাজনৈতিক কৌশলও আলাদা।

ইসরায়েলের আরবপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের জাতীয় অধিকার, দখলদারত্বের অবসান এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিকে রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্রে রেখেছে।

আব্বাস এসব প্রশ্ন পুরোপুরি বাদ দেননি। কিন্তু ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনেও পরিবর্তন আনার ওপর জোর দেন।

তার দাবি, আরব শহরগুলোতে বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও সড়কের উন্নয়ন করতে হবে। বাসস্থানের সংকট কমাতে হবে। সরকারি চাকরি ও নাগরিক সেবায় বৈষম্য দূর করতে হবে। সংগঠিত অপরাধ ও হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা নিতে হবে।

এসব দাবি আদায়ে প্রয়োজনে সরকারে অংশ নেওয়ার পক্ষেও তিনি। এই অবস্থানের সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন, যে রাষ্ট্রের নীতি অধিকৃত ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই রাষ্ট্রের সরকারের অংশ হয়ে কতটা বিরোধিতা করা সম্ভব?

আব্বাসের সমর্থকেরা পাল্টা বলেন, সংসদের বাইরে থেকে প্রতিবাদ করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়াও নাগরিক অধিকার আদায়ের একটি পথ।

কিন্তু একটি প্রশ্ন বাংলাদেশের পাঠকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করতে পারে। একজন মুসলিম কি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন? উত্তর হলো, আইনগতভাবে পারেন।

ইসরায়েলের মৌলিক আইনে প্রধানমন্ত্রীকে ইহুদি হতে হবে, এমন কোনো শর্ত নেই। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য সংসদ সদস্য হতে হবে এবং সংসদের আস্থা অর্জন করতে হবে।

কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বে সরকার গঠন করার মতো সমর্থন নেই। প্রধান ইহুদি নেতৃত্বাধীন দলগুলোও তার প্রধানমন্ত্রিত্বের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। আব্বাস নিজেও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দাবি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেননি।

ইসরায়েলের ইহুদি রাষ্ট্রীয় পরিচয়, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান এবং ফিলিস্তিনি আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এই বাস্তবতার অংশ।

অর্থাৎ একজন মুসলিম আরব নেতার সাতটি আসন ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অথচ তার নিজের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাস্তব রাজনৈতিক পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ।

আরবপ্রধান দলগুলোর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

রাআমের বাইরে আরবপ্রধান তিনটি রাজনৈতিক দল এবার জয়েন্ট লিস্ট নামে যৌথ নির্বাচনী তালিকায় অংশ নিয়েছে।

প্রথম শরিক হাদাশ। এটি আরব-ইহুদি যৌথ বামপন্থি রাজনৈতিক ধারা। দলের নেতা ইউসুফ জাবারিন যৌথ তালিকার শীর্ষে রয়েছেন।

দ্বিতীয় শরিক তাআল। এর নেতা আহমদ তিবি। দলটি ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সক্রিয়।

তৃতীয় শরিক বালাদ। এটি ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সব নাগরিকের সমান অধিকারের প্রশ্নে দলটির নিজস্ব অবস্থান রয়েছে।

তিনটি প্রধান এক্সিট পোলে জয়েন্ট লিস্ট ১০ থেকে ১১টি আসন পেতে পারে। রাআমের সাতটি আসন যোগ করলে আরবপ্রধান দলগুলোর সম্ভাব্য সম্মিলিত আসন ১৭ থেকে ১৮টি।

তবে এই দলগুলোকে একই রাজনৈতিক অবস্থানের মনে করা ঠিক হবে না।

রাআম সরকারি বাজেট ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আরব নাগরিকদের জন্য বাস্তব সুবিধা আদায়ের ওপর বেশি জোর দেয়। জয়েন্ট লিস্টের শরিকদের মধ্যে দখলদারিত্ব, ফিলিস্তিনি জাতীয় অধিকার এবং ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে তুলনামূলকভাবে কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান দেখা যায়।

এই পার্থক্যের কারণেই আরব দলগুলোর সব আসন একসঙ্গে কোনো একটি জোটকে সমর্থন করবে, এমন ধরে নেওয়া যায় না।

তবু সরকার গঠনের জন্য তাদের প্রয়োজন হলে আরব নাগরিকদের অধিকার নিয়ে দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সংখ্যালঘু সরকার হলে কি ফিলিস্তিনিদের কোনো লাভ হবে?

ইসরায়েলের ইতিহাসে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির রয়েছে। ১৯৯২ সালে ইৎজাক রাবিনের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। পরে ধর্মীয় শরিক দল সরকার থেকে বেরিয়ে গেলে রাবিনের জোট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়।

এরপর তার সরকার টিকে থাকতে আরবপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে। সেই সময়ে আরব নাগরিকদের জন্য সরকারি বরাদ্দ, শিক্ষা, স্থানীয় প্রশাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে অসলো শান্তিপ্রক্রিয়াও এগিয়ে যায়।

তবে এই দুটি ঘটনাকে এক করে দেখা যাবে না।

আরব নাগরিকদের জন্য সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো মানেই তাদের সব ধরনের বৈষম্যের অবসান নয়। আর অসলো শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু হলেও তা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

বর্তমান নির্বাচনের পরও যদি কোনো সংখ্যালঘু সরকার আরব দলগুলোর সমর্থন বা ভোটদানে বিরত থাকার ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে এই দলগুলোর দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়তে পারে।

আরব শহরগুলোর বিদ্যালয়, হাসপাতাল, পৌরসেবা ও বাসস্থানে বরাদ্দ বৃদ্ধি, বেদুইন জনগোষ্ঠীর গ্রামগুলোর স্বীকৃতি, বাড়িঘর উচ্ছেদ বন্ধ, চাকরিতে সমান সুযোগ এবং আরব নাগরিকদের মধ্যে সংগঠিত অপরাধ দমনের দাবি গুরুত্ব পেতে পারে। গাজার জন্যও কিছু প্রশ্নে চাপ তৈরি হতে পারে।

মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার, বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, পুনর্গঠনের সুযোগ, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি আরব দলগুলো তুলতে পারে। কিন্তু সরকার এসব দাবি মেনে নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

বিশেষ করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রশ্নে আইজেনকটের অবস্থান এবং তার সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের মতভিন্নতা বড় বাধা হয়ে থাকতে পারে।

আরেকটি পার্থক্য এখানে মনে রাখা জরুরি।

ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের জন্য সরকারি বাজেট ও নাগরিক অধিকার আদায় করা এবং গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা এক বিষয় নয়।

প্রথমটির জন্য প্রশাসনিক ও বাজেটসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় ও ভূখণ্ডগত নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন।

যে ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির ভোট নেই

ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রায় ১২ লাখ ভোটদানের বয়সী ফিলিস্তিনি আরব নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে।

কিন্তু গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমের প্রায় ৩০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের নেসেট নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না। কারণ তারা ইসরায়েলের নাগরিক নন।

অথচ ইসরায়েলি সরকারের সিদ্ধান্ত তাদের সীমান্ত, চলাচল, নিরাপত্তা, ভূমি এবং দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।

পূর্ব জেরুজালেমের অধিকাংশ ফিলিস্তিনির অবস্থান কিছুটা আলাদা। তাদের অনেকেই ইসরায়েলের স্থায়ী বাসিন্দা, নাগরিক নন। তারা স্থানীয় পৌর নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন, কিন্তু নাগরিকত্ব ছাড়া নেসেট নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট।

সেখানে একজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন। অথচ তার পাশের জনপদে বসবাসকারী একজন ফিলিস্তিনি, যিনি ইসরায়েলি নাগরিক নন, সেই ভোট দিতে পারেন না।

ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী পৃথক ফিলিস্তিনি আইনসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য মানুষ প্রায় ২৯ লাখ ৭০ হাজার।

এই হিসাবে গাজায় প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার, পশ্চিম তীরে প্রায় ১৫ লাখ ৯০ হাজার এবং জেরুজালেমের পরিচয়পত্রধারী প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার ভোটার রয়েছেন।

এটি অবশ্য ইসরায়েলের সংসদ নির্বাচনের ভোটারসংখ্যা নয়। পৃথক ফিলিস্তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থার হিসাব।

আরবপ্রধান ইসরায়েলি দলগুলো ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে সমর্থন করে। তবে তারা সবাই গাজা ও পশ্চিম তীরের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ককে সরাসরি ইসরায়েলের নেসেটে ভোট দেওয়ার অধিকার দিতে চায়, এমন নয়।

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ধারণা হলো, ফিলিস্তিনিরা নিজেদের রাষ্ট্রের সরকার নির্বাচন করবেন।

অন্যদিকে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রে সব নাগরিকের সমান ভোটাধিকারের ধারণা আলাদা রাজনৈতিক প্রস্তাব।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইসরায়েলের সরকার পরিবর্তন হওয়া আর ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়।

আইজেনকট কি স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র চান?

গাদি আইজেনকট

ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর বিরোধী শিবিরের দলগুলো একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাদের অবস্থান এক নয়।

নেতানিয়াহুর লিকুদ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী অবস্থানে রয়েছে।

তার কট্টর ডানপন্থি শরিক ইতামার বেন-গভিরের ওৎজমা ইয়েহুদিত এবং বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়নিজম পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ ও বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী।

আভিগদোর লিবারম্যানের ধর্মনিরপেক্ষ ডানপন্থি দল ইসরায়েল বেইতেনুর অবস্থানও প্রচলিত দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে নয়।

অন্যদিকে ইয়াইর গোলানের নেতৃত্বাধীন বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা ও দুই রাষ্ট্রের ধারণার প্রতি তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত।

ইয়াইর লাপিদ অতীতে জাতিসংঘের মঞ্চে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান নির্বাচনে বেনেটের সঙ্গে তার যৌথ রাজনৈতিক অবস্থান আগের বক্তব্যের সঙ্গে হুবহু এক নয়।

আইজেনকটের অবস্থানও আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

তিনি পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সমালোচনা করেছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নেও নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি নেতানিয়াহুর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে নেই।

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের হামলার পর দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মত মনে করছেন না বলে জানিয়েছেন আইজেনকট।

তার রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে হামাসকে গাজার শাসন থেকে সরানো, ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামরিক সাফল্যকে কার্যকর রাজনৈতিক লক্ষ্যে রূপান্তর করা।

তাই শুধু নেতানিয়াহুবিরোধী হলেই কোনো দল বা নেতাকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার সমর্থক বলা যায় না।

এখানেই আইজেনকটের রাজনৈতিক উত্থানকে বোঝার জন্য তার সামরিক অতীত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

দাহিয়া ডকট্রিন: ধ্বংসযজ্ঞ যখন সামরিক দর্শন

২০০৬ সালের জুলাইয়ে লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়।

হিজবুল্লাহর হামলায় ইসরায়েলি সেনা নিহত ও বন্দি হওয়ার পর লেবাননে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল।

বৈরুতের দক্ষিণের দাহিয়া এলাকা ছিল হিজবুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক উপস্থিতির কেন্দ্র। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ওই এলাকার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।

যুদ্ধের পর এই ধ্বংসযজ্ঞকে ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য একটি সামরিক কৌশল হিসেবে দেখার ধারণা সামনে আসে।

২০০৮ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের প্রধান গাদি আইজেনকট একটি বিতর্কিত বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে লেবাননের যেসব গ্রাম থেকে ইসরায়েলে হামলা চালানো হবে, সেখানে দাহিয়ার মতো ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করা হবে।

তার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, এ ধরনের এলাকাকে সাধারণ বেসামরিক গ্রাম হিসেবে নয়, সামরিক ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনার ধারণা।

এই সামরিক দর্শনই পরবর্তী সময়ে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘দাহিয়া ডকট্রিন’ নামে। এর মূল যুক্তি শুধু প্রতিপক্ষের চলমান হামলা প্রতিহত করা নয়। প্রতিপক্ষকে এত বড় ক্ষতির মুখে ফেলা, যাতে ভবিষ্যতে নতুন হামলার কথা ভাবার আগে সে সেই মূল্য নিয়ে চিন্তা করে।

অর্থাৎ ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতাকে প্রতিরোধের একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা। কিন্তু এখানেই আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

যুদ্ধের আইন অনুযায়ী সামরিক লক্ষ্য ও বেসামরিক মানুষকে আলাদা করতে হয়। সামরিক অভিযানে আনুপাতিকতা বজায় রাখতে হয়। বেসামরিক মানুষের ক্ষতি কমানোর জন্য সতর্কতা গ্রহণের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। কোনো এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকলেই পুরো জনপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ সামরিক লক্ষ্য হয়ে যায় না। দাহিয়া ডকট্রিনের সমালোচকেরা তাই এই ধারণার মধ্যে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে নির্বিচার আক্রমণ ও সমষ্টিগত শাস্তির ঝুঁকি দেখেন।

তবে এই সামরিক দর্শনের সমালোচনা এবং নির্দিষ্ট কোনো সামরিক অভিযানে আইজেনকটের ব্যক্তিগত অপরাধমূলক দায় প্রমাণ করা আলাদা বিষয়। একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের হিসাবও রয়েছে।

দাহিয়া ডকট্রিন নিয়ে আইজেনকটের প্রকাশ্য বক্তব্য ২০০৮ সালের। তার ছেলে গাল নিহত হয়েছেন ২০২৩ সালে।

অর্থাৎ সন্তান হারানোর ব্যক্তিগত শোক থেকে আইজেনকটের কঠোর সামরিক দর্শনের জন্ম হয়নি। সেই দর্শন তার ছেলের মৃত্যুর অন্তত ১৫ বছর আগের।

ফলে গাজায় সন্তান হারানো পিতার পরিচয়ের পাশাপাশি তার পূর্ববর্তী সামরিক দর্শন ও নেতৃত্বও বিচার করতে হবে।

২০১৮ সালের গাজা সীমান্ত: সেনাপ্রধান আইজেনকটের আরেক বিতর্ক

২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ছিলেন গাদি আইজেনকট।

তার দায়িত্বকালের একটি বড় বিতর্ক ২০১৮ সালে গাজার সীমান্তে ফিলিস্তিনিদের ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ বিক্ষোভ। ভূমির অধিকার, বাস্তুচ্যুতি এবং গাজার অবরোধের বিরুদ্ধে এই বিক্ষোভে অসংখ্য মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভ চলাকালে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে বহু ফিলিস্তিনি নিহত ও আহত হন।

নিহতদের মধ্যে ছিলেন তরুণী চিকিৎসাসেবা কর্মী রাজান আল-নাজ্জার। ২০১৮ সালের ১লা জুন তার মৃত্যু আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন পরবর্তী সময়ে বিক্ষোভের বিভিন্ন ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।

কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়টিও তদন্ত কমিশনের আলোচনায় আসে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, সীমান্তে সহিংসতা, অনুপ্রবেশের চেষ্টা এবং নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার জন্য বাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে। রাজান আল-নাজ্জারের মৃত্যুর বিষয়েও ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষ তদন্ত করেছিল।

কিন্তু সেই তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতভিন্নতা ছিল। আইজেনকট তখন সেনাপ্রধান।

ফলে সামগ্রিক সামরিক নেতৃত্ব ও নীতিগত জবাবদিহির প্রশ্নে তার ভূমিকা আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। তবে রাজান আল-নাজ্জার বা কোনো নির্দিষ্ট বিক্ষোভকারীকে হত্যার ব্যক্তিগত নির্দেশ আইজেনকট দিয়েছিলেন, এমন অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া করা যাবে না।

এই পার্থক্য বজায় রেখেই তার সামরিক নেতৃত্বের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

কারণ আইজেনকটের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে শুধু একজন সেনাসন্তানের পিতার ব্যক্তিগত শোক নেই। রয়েছে ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক ইতিহাস, প্রতিরোধের জন্য ব্যাপক শক্তি ব্যবহারের দর্শন এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক।

ইরানের ক্ষেত্রেও কি একই সামরিক দর্শন?

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে ইরানকে দেশটির প্রধান নিরাপত্তা হুমকিগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেছেন।

প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সক্ষমতা ঠেকানোর পক্ষে তিনি অবস্থান নিয়েছেন। আইজেনকটও ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিরোধী।

কিন্তু নতুন সামরিক অভিযান চালানোর প্রয়োজনীয়তা, যুদ্ধের পরিধি, কূটনৈতিক পথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রশ্নে তার অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে।

সামরিক হামলা করে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নেও আইজেনকট সংশয় প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ দুই নেতার মধ্যে সামরিক ও নিরাপত্তাগত লক্ষ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিল থাকলেও সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে।

এই পার্থক্যকে গুরুত্বহীন বলা যায় না। একটি সামরিক অভিযান সীমিত করা, নতুন যুদ্ধ এড়ানো কিংবা কূটনৈতিক সমঝোতার সুযোগ তৈরি করা মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

একইভাবে গাজায় মানবিক সহায়তা, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা ও পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল বদলানো আর যুদ্ধের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বদলানো এক নয়।

বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে এই পার্থক্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নেতানিয়াহু হেরে গেলে কি তার বিচার হবে?

বেনজামিন নেতানিয়াহু।

এই নির্বাচনের সঙ্গে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আইনি পরিস্থিতিও জড়িয়ে রয়েছে।

তার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আদালতে তিনটি বহুল আলোচিত দুর্নীতির মামলা চলছে।

প্রথমটি কেস ১০০০; এই মামলায় ধনী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মূল্যবান উপহার নেওয়া এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারি ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

দ্বিতীয়টি কেস ২০০০; এতে একটি সংবাদপত্রের মালিকের সঙ্গে অনুকূল সংবাদ প্রচারের বিনিময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সংবাদমাধ্যমকে দুর্বল করার সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।

তৃতীয়টি কেস ৪০০০; এই মামলায় একটি টেলিযোগাযোগ ব্যবসায়ীগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রক সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সংবাদমাধ্যমে অনুকূল প্রচার পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তিনটি মামলাতেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। কেস ৪০০০-এ ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে। অবশ্য তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এখন প্রশ্ন, নির্বাচনে হেরে গেলে কি তার বিচার শুরু হবে? বিষয়টি তা নয়। কারণ তার বিচার আগেই শুরু হয়েছে এবং চলমান রয়েছে। নির্বাচনে পরাজিত হলে বিচার নতুন করে শুরু হবে না। আবার নির্বাচনে জিতলেও মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে না।

তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকা বা না থাকার কারণে তার রাজনৈতিক প্রভাব, বিচারকে ঘিরে পরিস্থিতি এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো ক্ষমা। নেতানিয়াহু রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমার আবেদন করেছেন। কিন্তু বিচার চলমান থাকা অবস্থায় এবং কোনো চূড়ান্ত দণ্ডাদেশ ছাড়াই ক্ষমা দেওয়ার প্রশ্নে ইসরায়েলের আইনগত বিতর্ক রয়েছে। ফলে নির্বাচনের ফল তার রাজনৈতিক অবস্থান বদলাতে পারলেও আদালতের রায়ের বিকল্প হতে পারে না।

এ ছাড়া রয়েছে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অভিযোগ।

২০২৪ সালের ২১এ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

ইসরায়েল এই আদালতের এখতিয়ার ও অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি মামলার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা প্রক্রিয়া। তাই নেতানিয়াহু নির্বাচনে হারলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে বা কারাগারে যেতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না।

কিন্তু ক্ষমতা হারালে দুর্নীতি মামলা, আন্তর্জাতিক অভিযোগ এবং ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে তার রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন নতুন গুরুত্ব পেতে পারে।

মুখ বদলাক বা না বদলাক, গাজার জন্য মাপকাঠি কী

আবার শুরুর তিন পিতার কাছে ফিরে যাই।

রামি এলহানান ও বাসাম আরামিন হারিয়েছেন তাদের মেয়েদের, স্মাদার ও আবিরকে। গাদি আইজেনকট হারিয়েছেন তার ছেলে গালকে।

কারও সন্তান আর ফিরবে না।

শোক এক, কিন্তু পথ আলাদা। রামি ও বাসাম খুঁজেছেন প্রতিপক্ষের মানুষের সঙ্গে কথা বলার পথ। আইজেনকট বলেছেন, যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে দরকার ভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

ক্ষমতার মুখ বদলালে বিচারব্যবস্থা, ধর্মীয় দলগুলোর প্রভাব, গাজার প্রশাসন, সামরিক অভিযান আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে পরিবর্তন আসতে পারে। সংখ্যালঘু সরকার হলে বাড়তে পারে আরব দলগুলোর প্রভাবও।

কিন্তু ফিলিস্তিনিদের জন্য পরিবর্তনের মাপকাঠি আলাদা। গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু কমছে কি না। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো বাড়ি ফিরতে পারছে কি না। মানবিক সহায়তা পৌঁছাচ্ছে কি না। পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও সম্প্রসারণ থামছে কি না। ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে বাস্তব অগ্রগতি হচ্ছে কি না।

এই হিসাবের মাঝখানে আবার এসে দাঁড়ান মনসুর আব্বাস। তার দল রাআমের কয়েকটি আসন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণের অঙ্ক বদলে দিতে পারে। অথচ তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো সমর্থন পান না।

ইসরায়েলের আইনে মুসলিম প্রধানমন্ত্রী নিষিদ্ধ নন, কিন্তু দেশটির ইহুদি রাষ্ট্রীয় পরিচয় আর প্রচলিত জোট-রাজনীতিতে তার পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ।

এই বৈপরীত্যের পাশেই আছে আরও গভীর এক প্রশ্ন। ২০০৯ সালে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি, এক আসন কম পাওয়া নেতানিয়াহু সরকার গড়েছিলেন। ২০২১ সালে মাত্র সাত আসনের দলের নেতা নাফতালি বেনেট বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে।

এবারও একটি আসন, একজন সংসদ সদস্য, কিংবা আরব দলগুলোর ভোটদান থেকে বিরত থাকার একটি সিদ্ধান্ত সরকার গঠনের অঙ্ক বদলে দিতে পারে। ১২০ আসনের সংসদে একটি ভোটও কখনো ক্ষমতার পাল্লা ঘুরিয়ে দেয়।

অথচ সেই সংসদ যে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের লাখ লাখ মানুষের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তাঁদের হাতে সেই নির্বাচনে একটি ভোটও নেই।

যে সংসদের একজন সদস্যের একটি ভোটও সরকার বদলে দিতে পারে, সেই নির্বাচনে লাখ লাখ ফিলিস্তিনির একটিও ভোট নেই।

ইউনিসেফের হিসাবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত গাজায় অন্তত ২১ হাজার ২৮৯ শিশু নিহত এবং ৪৪ হাজার ৫০০ শিশু আহত হয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর, ২০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত, নিহত হয়েছে আরও ৩৫১ জন।

নবী মুসার (আ.) প্রতিশ্রুত ভূমির কথা ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমান, তিন ধর্মেই আছে। সেই ভূমিকে সবাই বলেন পুণ্যভূমি।

ইসরায়েলের ভোটে যিনিই জিতুন, একটি প্রশ্নের উত্তর আমরা এখনো জানি না। যে ভূমিকে তিন ধর্মের মানুষ পুণ্যভূমি বলেন, সেখানে আর কত শিশুর প্রাণ গেলে থামবে এই হিসাব?