রাত পেরিয়ে কেবল ভোর হয়েছে। প্রতিদিনকার অভ্যাসমতো কলকাতার এরিয়ানস ক্লাবের মাঠে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন বাংলা সিনেমার মহানায়ক উত্তমকুমার। ততোদিনে ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘শাপমোচন’, ‘সাগরিকা’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’-এর মতো একের পর এক হিট সিনেমার আত্মবিশ্বাসী এক নায়ক তিনি। কে জানতো সেদিনের ভোরটি তার জীবনে এক গভীর ট্রমা বয়ে নিয়ে আসবে!
পুলিশের গাড়ি থেকে নামানো হলো একজন মানুষকে। তারপর গুলি। সাক্ষী হয়ে গেলেন উত্তম কুমার। অথচ যাকে মারা হলো, তাকে তিনি চিনতেন না।
কেউ কেউ এই কাহিনিকে বলেন আরবান লেজেন্ড বা নগর কিংবদন্তি। কেউ কেউ মনে করেন, ঘটনাটি সত্যি। তবে এর পক্ষে একটি নির্দিষ্ট স্মৃতিচারণ আছে। মিলনসাগরে সংকলিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ১৯এ নভেম্বর ‘জলার্ক’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, উত্তম তাকে ময়দানে পুলিশকে গাড়ি থেকে একজনকে নামিয়ে গুলি করতে দেখার কথা বলেছিলেন। কিন্তু নিহত ব্যক্তি যে সরোজ দত্ত, সেটি উত্তম নিজে বলেননি। সেই পরিচয় পরে অন্যরা মিলিয়েছেন।
সৌমিত্রের স্মৃতিচারণে উত্তমের আতঙ্কিত হয়ে পড়ার কথাও আছে। পুলিশের গুলিতে এমন তরতাজা প্রাণের হত্যাদৃশ্য দেখে বিমর্ষ উত্তম কিছুদিনের জন্য নাকি বোম্বেতে (এখন মুম্বাই) ছিলেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।
তারিখটা ১৯৭১ সালের ৫ই আগস্ট। সীমানার এপারে বাংলাদেশে তখন স্বাধীনতার যুদ্ধ চলছে। ওপারে কলকাতায় নকশাল দমনের নামে চলছে পুলিশি নির্যাতন, গোপন হত্যা ও অন্তর্ধান।
বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের শিকার সরোজ দত্ত কেবল কবি বা সাংবাদিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী), সংক্ষেপে সিপিআই (এম-এল)-এর প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের একজন। নকশালবাড়ি আন্দোলনের পক্ষে তার লেখালেখি ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা তাকে সেই সময়ের সংঘাতের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল।
তার হত্যাকাণ্ড দুই বাংলার স্মৃতিতে বিচারবহির্ভূত হত্যার এক আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে। তাকে প্রথম বলার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। কিন্তু তার ঘটনা সেই পুরোনো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়: রাষ্ট্র কি কাউকে বিচারের মুখোমুখি না করেই তার জীবন কেড়ে নিতে পারে?
‘ক্রসফায়ার’ এই আলোচনার ওপরের আবরণ। তার নিচে আছে এমন এক ‘খুনে’ চিন্তা, যেখানে রাষ্ট্র মনে করে, কিছু মানুষকে বিচারের মুখোমুখি করার চেয়ে চিরনিদ্রায় ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া সহজ।
আইজিপির বক্তব্য এবং ‘রূপক’-এর ব্যাখ্যা
‘ক্রসফায়ার’ এবং ‘বিচারবহির্ভুত হত্যা’র বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ পুলিশের প্রধানের একটি বক্তব্যে। ২৬এ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকার চকবাজারে একটি অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, “যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেইটা করব।”
বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ‘সরকার যদি অ্যালাও করে।’ এখানে পুলিশের ক্ষমতার উৎস হিসেবে সরকারের অনুমোদন সামনে চলে এসেছে। অথচ সরকারও আইনের অধীন। নির্বাহী অনুমোদন এমন কোনো কাজকে বৈধ করতে পারে না, যা আইন অনুমোদন করে না।
এই সরকারের আইনমন্ত্রীই ১৪ই সেপ্টেম্বর বলেছিলেন, ‘‘সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের প্রয়োজন নেই, বিদ্যমান আইনই যথেষ্ট।’’ ছয় সপ্তাহের ব্যবধানে পুলিশ প্রধানের কথা সেই অবস্থানের সঙ্গে মেলে না।
সমালোচনার পর পুলিশ সদর দপ্তর ব্যাখ্যা দেয়, আইজিপি আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি “রূপক অর্থে” ব্যবহার করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যার কথা বোঝাননি। একই ব্যাখ্যায় পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকারের কথাও বলা হয়।
ব্যাখ্যাটি মেনে নিলেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। কঠোর আইন প্রয়োগের রূপক হিসেবে ‘ক্রসফায়ারই’ কেন মনে পড়ল? পেশাদার তদন্ত, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কিংবা সাক্ষীর নিরাপত্তা কেন কঠোরতার প্রতীক হয়ে ওঠে না?
বাংলাদেশে ‘ক্রসফায়ার’ নিছক একটি শব্দ নয়। এর সঙ্গে বহু পরিবারের মৃত্যুসংবাদ জড়িয়ে আছে। শব্দটি উচ্চারণ করলে মানুষ অভিধান খোলে না, অতীতের অভিজ্ঞতা মনে করে।
আইজিপি’র বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা টিআইবিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল। বক্তব্য প্রত্যাহার, জবাবদিহি এবং অপসারণের দাবিও উঠেছে। টিআইবি বলছে, ‘‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান হিসেবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে সামনে আনা যায় না।’’
এই প্রতিবাদ প্রয়োজনীয়। তবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আরেকটি প্রশ্নও তোলে। বিরোধী অবস্থানে থেকে যে দল ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে কথা বলে, ক্ষমতায় গিয়ে সেই অবস্থান ধরে রাখে কি-না।
সামরিক শব্দ থেকে মৃত্যুর সরকারি ভাষা
‘ক্রসফায়ার’ মূলত সামরিক পরিভাষা। দুই বা একাধিক অবস্থান থেকে এমনভাবে গোলাবর্ষণ, যাতে গুলির গতিপথ কোনো এলাকায় পরস্পরকে ছেদ করে। এর আভিধানিক অর্থ বিচারবহির্ভূত হত্যা নয়। ইংরেজি Cross (পরস্পরছেদী/আড়াআড়ি) ও Fire (গোলাবর্ষণ) যুক্ত হয়ে শব্দটি তৈরি।
ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক অভিধান অনুযায়ী, ১৭৬৩ সালের দিকে (সাত বছরের যুদ্ধ শেষের সময়) ইউরোপীয় সামরিক নথিপত্রে কৌশলগত আড়াআড়ি গোলাবর্ষণ বোঝাতে এটি প্রথম লিখিতভাবে ব্যবহৃত হয়। একাধিক দিক থেকে শত্রুকে কোণঠাসা করার একটি কৌশলগত সামরিক পদ্ধতিই হলো ‘ক্রসফায়ার’। তবে ১৬৩১ সালের ব্রেটেনফেল্ডের যুদ্ধে সুইডিশ বাহিনী শত্রুর কামান ঘুরিয়ে দুদিক থেকে আড়াআড়ি গোলাবর্ষণ করে এই কৌশলের বড় ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করে।
‘এনকাউন্টার’ শব্দটির সাধারণ অর্থ মুখোমুখি সংঘাত। প্রতিটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সাজানো নয়।
কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অভিধানে শব্দ দুটি অন্য অর্থ বহন করে। ভারতে ‘এনকাউন্টার’, বাংলাদেশে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বহু ক্ষেত্রে এমন মৃত্যুর ব্যাখ্যা হিসেবে এসেছে, যেখানে পরিবারের অভিযোগ, মানুষটিকে আগেই আটক করা হয়েছিল।
তারপর প্রায় একই বয়ান: অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়া, সহযোগীদের গুলি, পাল্টা গুলি, মাঝখানে পড়ে মৃত্যু।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০০৬ সালের অনুসন্ধানে র্যাবের বহু মৃত্যুর বিবরণে এই পুনরাবৃত্তির কথা উঠে আসে। তাদের তদন্তে আটক অবস্থায় নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়। প্রশ্নটি তাই শুধু শব্দের ব্যবহার নিয়ে নয়। ঘোষিত সংঘর্ষটি সত্যিই ঘটেছিল কি না, প্রশ্ন সেটি নিয়ে।
সরোজ দত্তের আগেও এই প্রশ্ন উঠেছিল। ১৯৭০ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি কেরালায় নকশাল নেতা এ. ভার্গিস নিহত হন। পুলিশ ঘটনাটিকে এনকাউন্টার বলেছিল। প্রায় চার দশক পরে তার হত্যার দায়ে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কে. লক্ষ্মণা দোষী সাব্যস্ত হন। আদালত কথিত সংঘর্ষের বয়ানকে হত্যার অজুহাত হিসেবে চিহ্নিত করেন।
সরোজ দত্তের হত্যার ক্ষেত্রে এমন কোনো বিচার হয়নি। একটি মৃত্যুর সত্য বের হতে চল্লিশ বছর লেগেছে, আরেকটির ক্ষেত্রে সত্য আজও অমীমাংসিত। ঘটনার পরদিন বাহিনী যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়, সেটিই ইতিহাসের শেষ কথা নয়।
সিরাজ সিকদার থেকে ফিরে ফিরে আসা হত্যা
স্বাধীন বাংলাদেশের আলোচিত ইতিহাসে শুরুতেই আসে সিরাজ সিকদারের নাম। পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির এই নেতা ১৯৭৫ সালের ২রা জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নিহত হন। তার মৃত্যু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক বিরোধী দমনের সম্পর্ক নিয়ে অন্যতম গুরুতর প্রশ্ন হয়ে আছে।
তখন ‘ক্রসফায়ার’ আজকের মতো পরিচিত শব্দ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু প্রশ্নের কাঠামো একই। একজন মানুষ রাষ্ট্রের হেফাজতে যাওয়ার পর জীবিত ফিরলেন না কেন? তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালতে প্রমাণ না করে তার মৃত্যু ঘটল কীভাবে?
পরে সরকার বদলেছে। সামরিক ও বেসামরিক শাসন এসেছে। অপরাধ দমনের নামে বিশেষ অভিযান হয়েছে। ২০০৪ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে র্যাব গঠনের পর ‘ক্রসফায়ার’ বাংলাদেশের দৈনন্দিন সংবাদভাষায় স্থায়ী জায়গা করে নেয়। বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ শুরুর বছরগুলো থেকেই নথিবদ্ধ হতে থাকে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই ব্যবস্থা বন্ধ করেনি। বরং দীর্ঘ শাসনে গুম, গোপন আটক, নির্যাতন ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের অভিযোগ রাষ্ট্রীয় দমননীতির আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
সমস্যাটিকে তাই একটি বাহিনীর কয়েকজন সদস্য কিংবা একটি সরকারের বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ধারাবাহিকতাটি বোঝা যায় না। এক সরকার যে ক্ষমতা তৈরি করেছে, পরের সরকার সেটি ব্যবহারের ধারাবাহিকতা রেখেছে। কোনও একটি দল বিরোধী দলে থাকাকালে যে পদ্ধতির সমালোচনা করেছে, ক্ষমতায় গিয়ে সেটির সুবিধা নিয়েছে। বিচারবহির্ভূত এই হত্যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এমন অভ্যস্ততা পেয়েছে, এটিকে ছাড়া বিকল্প কোনও কড়া পদ্ধতিও তারা ভাবতে পারছে না।
শুধু র্যাব নয়, সংখ্যায় সামনে পুলিশও
ক্রসফায়ারের আলোচনা উঠলে প্রথমে চোখে ভেসে ওঠে কালো পোশাকের র্যাব। তবে পরিসংখ্যান বলছে, পুলিশের নিয়মিত ইউনিটগুলোকেও আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে হবে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত কথিত ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও এনকাউন্টারে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮০৪। এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মৃত্যু ৯৮১, ডিবি পুলিশের সঙ্গে ৬৮ এবং র্যাবের সঙ্গে ৬০৩। অন্য বাহিনী ও যৌথ অভিযানের হিসাব আলাদা।
মাদকবিরোধী অভিযানের বছর ২০১৮ সালে পার্থক্যটা আরও স্পষ্ট। একই সংস্থার হিসাবে ওই বছর কথিত বন্দুকযুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মৃত্যু ২৭০, ডিবির সঙ্গে ৪৫ এবং র্যাবের সঙ্গে ১৩৬। সব বাহিনী ও যৌথ অভিযান মিলিয়ে এই শ্রেণিতে মৃত্যু ৪৫৮। বিচারবহির্ভূত হত্যার সব শ্রেণি মিলিয়ে মোট ছিল ৪৬৬। সব বিচারবহির্ভূত হত্যাকে ‘ক্রসফায়ার’ বললে এই পার্থক্য হারিয়ে যায়।
২০২২ সালের ১২ মার্চ ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনের শিরোনামই ছিল, ‘Police more involved than Rab in extrajudicial killings: Study’। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের গবেষণা উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের গবেষণাভুক্ত ঘটনায় ডিবিসহ পুলিশের সংশ্লিষ্টতা ছিল ৫১ দশমিক ২৪ শতাংশ, র্যাবের ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
অর্থাৎ একটি বিশেষ বাহিনীর নাম বদলালে কিংবা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। একই পদ্ধতি নিয়মিত পুলিশের মধ্যেও থাকলে সংস্কারের পরিধি অনেক বড় হতে হবে।
নেত্র নিউজের ‘Body Count: Extrajudicial Killings in Bangladesh’ অনুসন্ধানেও এই বিস্তৃত চিত্র পাওয়া যায়। ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২ হাজার ৫৯৭টি মৃত্যুর বিবরণ বিশ্লেষণ করেছে তারা। এর মধ্যে আছে কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতনে মৃত্যু এবং বিক্ষোভে গুলিতে মৃত্যুর মতো পৃথক ধরন। সবগুলোকে অবশ্য ‘ক্রসফায়ার’ বলা যাবে না, তবে তার ‘ভাই-ব্রাদার’ তো বলা যাবেই।
বাহিনীভিত্তিক হিসাবে নিয়মিত পুলিশ ইউনিটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মৃত্যু ১ হাজার ৫৪৭টি, র্যাবের ৭২৮টি। যৌথ অভিযান আলাদা রাখা হয়েছে। নেত্র নিউজ প্রতিটি ঘটনার স্বতন্ত্র মাঠতদন্ত করেনি। মূলত সংবাদ প্রতিবেদন মিলিয়ে তথ্য যাচাই করেছে। এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেও বলা যায়, সংখ্যাগুলো সমস্যাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনার বাইরে নিয়ে যায়।
নীলনকশা, পুরস্কার এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুন
নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় র্যাবের হাতে বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের শিকার সাতটি লাশ ভেসে ওঠার অনেক আগেই বিপদের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল।
২০০৬ সালের ২২এ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে সাংবাদিক আবু সুফিয়ানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়, ‘Blueprint for Crossfire Deaths’; বাংলায়, ক্রসফায়ারে মৃত্যুর নীলনকশা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সেই প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে জানায়, র্যাবের নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী সন্দেহভাজন অপরাধীদের পরিচিতির সঙ্গে শাস্তির সুপারিশও তৈরি করা হচ্ছিল। তার মধ্যে ছিল ‘ক্রসফায়ারে মৃত্যু।’
অভিযোগটি ভয়াবহ। অপরাধের তদন্ত এবং শাস্তির সিদ্ধান্ত একই জায়গায় চলে আসছে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণের আগেই অভিযুক্তের পরিণতি ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
২০১২ সালের ৩রা জানুয়ারি আবু সুফিয়ানের আরেকটি প্রতিবেদনের বিষয় ছিল বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুকে কৃতিত্ব হিসেবে দেখিয়ে পদক দেওয়ার বিবরণ। তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমানের পদকের বিবরণে নয়জন ‘চরমপন্থি’ নিহত হওয়ার কথা ছিল। সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদক তুলে দেন। মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিতর্কিত মৃত্যুকে এভাবে পুরস্কৃত করা বিচারবহির্ভূত হত্যাকে উৎসাহ দেওয়া নয় কি?
‘হত্যার লাইসেন্স’ বলতে এই পরিবেশটিকেই বোঝাতে হয়। এটি কোনো আইনে লেখা অনুমতিপত্র নয়। অভিযোগের যথাযথ বিচার না হওয়া, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রশ্রয় এবং মৃত্যুকে সাফল্য হিসেবে দেখানোর মধ্য দিয়ে তৈরি একটি অলিখিত সুযোগ।
তারপর এল ২০১৪ সালের ২৭এ এপ্রিল। নারায়ণগঞ্জ থেকে অপহৃত হলেন কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজন। পরে তাদের লাশ পাওয়া গেল শীতলক্ষ্যায়। বিচারিক অনুসন্ধানে উঠে আসে, নজরুলের প্রতিদ্বন্দ্বী নূর হোসেনের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে হত্যায় অংশ নিয়েছিলেন র্যাবের কর্মকর্তারা। নিহত আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালককে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, কারণ তারা অপহরণের দৃশ্য দেখে ফেলেছিলেন।
একজন আইনজীবী আর তার গাড়িচালক কোনো বন্দুকযুদ্ধের প্রতিপক্ষ ছিলেন না। শুধু এমন কিছু দেখে ফেলেছিলেন, যা হত্যাকারীরা গোপন রাখতে চেয়েছিল।
২০১৭ সালে বিচারিক আদালত ৩৫ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। তাদের মধ্যে ২৫ জন ছিলেন র্যাবের সাবেক সদস্য। পরে হাইকোর্ট নূর হোসেন ও সাবেক তিন র্যাব কর্মকর্তাসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
সাত খুনকে সরাসরি ক্রসফায়ার বলা ঠিক হবে না। সেটি ছিল অপহরণ, হত্যা ও লাশ গোপনের ঘটনা- যার শুরুটা হয়েছিল র্যাবের কাছে ‘ক্রসফায়ার’ নামক অস্ত্রটি তুলে দেওয়ার মাধ্যমেই। বছরের পর বছর হত্যার অভিযোগে কার্যকর জবাবদিহি থাকলে নিজেদের এতটা ধরাছোঁয়ার বাইরে ভাবা কি সহজ হতো?
সংবাদে কার কথা, কার সত্য
গুলির পরে জনসমক্ষে যে ঘটনা হাজির হয়, সেটি তৈরি হয় ভাষা দিয়ে। সেই ভাষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয় সংবাদমাধ্যম।
কোনো বাহিনী যখন বলে ‘বন্দুকযুদ্ধে নিহত’, সেটি প্রথমে ওই বাহিনীর বক্তব্য। যাচাইয়ের আগে সেটিকে প্রতিবেদকের নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে ছাপলে একটি পক্ষের ব্যাখ্যা সংবাদমাধ্যমের সত্য হয়ে যায়। নিহত ব্যক্তি নিজের কথা বলতে পারেন না। তার অপরাধ, অস্ত্র, সহযোগী, এমনকি শেষ মুহূর্তের আচরণ পর্যন্ত বর্ণনা করেন তারাই, যাদের হাতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ।
তাই ‘সন্ত্রাসী নিহত’ আর ‘সন্ত্রাসের মামলার আসামি নিহত’ এক কথা নয়। ‘বন্দুকযুদ্ধে নিহত’ আর ‘পুলিশের দাবি, বন্দুকযুদ্ধে নিহত’ও এক কথা নয়। সূত্র উল্লেখ করার এই সামান্য পার্থক্য সংবাদমাধ্যমকে তদন্তকারী বাহিনীর মুখপাত্র হয়ে যাওয়া থেকে কিছুটা দূরে রাখে।
তবে উদ্ধৃতিচিহ্ন বসালেই দায় শেষ হয় না। মানুষটিকে আগে আটক করা হয়েছিল কি না, পরিবার কখন থেকে খুঁজছিল, প্রত্যক্ষদর্শীরা কী বলছেন, ময়নাতদন্তে কী আছে, ঘোষিত ঘটনাস্থলে সংঘর্ষের চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে কি না, এসব প্রশ্নও করতে হয়। ঘটনার পরদিনের খবরের বাইরে তদন্তের অগ্রগতি অনুসরণ করাও সাংবাদিকতার কাজ।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শুধু সরকারি বয়ান পুনরাবৃত্তি করেনি। আবু সুফিয়ানের অনুসন্ধান, ডেইলি স্টারের পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিবেদন এবং নেত্র নিউজের কাজ সেই বয়ানের বিপরীতে নথিও তৈরি করেছে।
২০২০ সালে ডেইলি স্টার দেখিয়েছিল, অনেক বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় মামলা কিংবা কার্যকর তদন্তই হয়নি। সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর দ্রুত তদন্ত শুরু হয়েছিল।
র্যাবের অভিযানে নিহত টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের স্ত্রী আয়েশা তখন প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার স্বামীর মৃত্যুর পর একই তৎপরতা দেখা গেল না কেন?
সেই প্রশ্নের একটি উত্তর এসেছে ছয় বছর পর। ২০২৬ সালের ২৬এ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একরামুল হক হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে। তাতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এটি বিচারের সূচনা, রায় নয়।
২০২৩ সালের ৩রা এপ্রিল ডয়েচে ভেলে ও নেত্র নিউজের যৌথ অনুসন্ধানে র্যাবের দুই সাবেক কমান্ডার পরিকল্পিত হত্যা ও ঘটনাস্থল সাজানোর অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সাংবাদিকেরা তাদের বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ পুলিশি নথি, ময়নাতদন্ত ও অন্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তবে অনুসন্ধানটি জানিয়েছে, সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ের অনুমোদনসংক্রান্ত অভিযোগও নিশ্চিত করা যায়নি। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
এই সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করা অনুসন্ধানকে দুর্বল করে না। বরং কোনটি নথিতে পাওয়া তথ্য, কোনটি সাক্ষ্যের দাবি আর কোনটি এখনো অপ্রমাণিত, পাঠক তা বুঝতে পারেন।
গণমাধ্যমের কাজ অপরাধীকে নির্দোষ ঘোষণা করা নয়। বাহিনীর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিকে রায় বানিয়ে দেওয়াও নয়। তার কাজ ক্ষমতাবানের বক্তব্যকে যাচাইয়ের বাইরে না রাখা।
‘ক্রসফায়ারের’ আরেক ভাই গুম
ক্রসফায়ারে অন্তত মৃত্যুসংবাদ আসে। গুমের শিকার পরিবারের কাছে অনেক সময় সেটুকুও আসে না। মানুষটি বেঁচে আছেন কি-না, কোথায় আছেন, কার কাছে আছেন—কোনো উত্তর নেই।
২০২২ সালের ১৪ই আগস্ট নেত্র নিউজের ‘Secret prisoners of Dhaka’ অনুসন্ধানে আয়নাঘর নামে পরিচিত গোপন বন্দিশালার বিবরণ প্রকাশিত হয়। সাবেক বন্দীদের সাক্ষ্যসহ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে ডিজিএফআই পরিচালিত গোপন আটককেন্দ্রের অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
অধিকারের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত গুমের শিকার হিসেবে নথিবদ্ধ হন ৫৫৩ জন। তাদের মধ্যে ৭৪ জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, ৩১২ জন জীবিত ফিরে আসেন এবং প্রতিবেদন তৈরির সময় ১৬৭ জনের অবস্থান অজানা ছিল। এটি ওই সময়কার হিসাব।
এই সংখ্যাকে হত্যার হিসাবের সঙ্গে সরাসরি যোগ করা যাবে না। গুমের পরে মৃত অবস্থায় পাওয়া কোনো ব্যক্তি হত্যার তালিকাতেও থাকতে পারেন। কিন্তু দুটি অপরাধের রাজনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। দুটিতেই মানুষকে আইনের স্বাভাবিক সুরক্ষা থেকে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আছে।
পালাবদলের পর এই গোপনীয়তার ওপর আলো পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুম তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল, যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত, তার আলামত ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর নষ্ট করা হয়েছে।
কমিশন তার অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে গুমের ঘটনায় জড়িতদের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু এবং র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। বিচারের কাজ কিছুটা এগিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে র্যাবে প্রেষণে থাকা সেনা কর্মকর্তারা গুমের মামলায় হাজির হয়েছেন, আর আয়নাঘরের মামলায় প্রসিকিউশন ১৩ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে। তবু এগুলো মামলার ধাপ, রায় নয়।
গুমের কারণে পরিবারের শাস্তি দীর্ঘ হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হলে শোকের একটি পরিচিত ভাষা থাকে। অনিশ্চয়তায় সেই ভাষাও থাকে না। ফোন বাজলে আশা জাগে, অজ্ঞাত লাশের খবর এলে ভয় হয়। বছরের পর বছর কেটে যায় অপেক্ষায়।
দ্রুত সমাধানের জনপ্রিয়তা
অপরাধে অতিষ্ঠ মানুষ দ্রুত ফল চান। চাঁদাবাজকে প্রতিদিন টাকা দিতে হলে, থানায় গিয়ে প্রতিকার না পেলে, মামলা বছরের পর বছর চললে কঠোর ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি আকর্ষণীয় লাগবেই। সোশাল মিডিয়ার এই যুগেও আমরা দেখি তাৎক্ষণিক কোনও বড় অপরাধের ঘটনায় ‘ক্রসফায়ার’-কেই সমর্থন ও সমাধান মনে করেন অনেক নেটিজেন।
‘পপুলিস্টদের’ এই ক্রসফায়ারের দাবির যে হাতছানি সেটি সরকারের জন্যও কাজে লাগানো সহজ। তদন্তব্যবস্থা সংস্কারের ফল পেতে সময় লাগে। বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো কঠিন। কিন্তু কয়েকটি অভিযান, কয়েকটি মৃত্যুসংবাদ আর নেতার কঠোর বক্তৃতা দিয়ে তাৎক্ষণিক দৃশ্যমানতা তৈরি করা যায়।
ক্রসফায়ারের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, এতে কাজ হয়। কিন্তু এই লেখায় আলোচিত সময়ের দিকেই তাকানো যাক। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসাবে এক দশকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ মানুষ কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। তবু চাঁদাবাজি, মাদক আর সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে মানুষের ক্ষোভ থামেনি। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন ঘটেছে এই পরিবেশেই। অপরাধের শিকড়, অর্থের উৎস আর পৃষ্ঠপোষকদের গায়ে হাত না দিয়ে অভিযুক্তদের একে একে সরিয়ে দিলে অপরাধ বন্ধ হয় না, বদলে যায় শুধু চেহারা।
বিপদ শুরু হয় যখন সেই জনপ্রিয়তা দিয়ে আইনের সীমা সরানো হয়। প্রথমে বলা হয়, ভয়ংকর অপরাধীদের ক্ষেত্রে একটু ছাড় দিতে হবে। তারপর সেই ছাড়ের মধ্যে ঢুকে পড়েন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সাংবাদিক এবং সরকারের সমালোচকেরা।
ফিলিপাইনে রদ্রিগো দুতের্তে মাদক নির্মূলের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসেন। তার মাদকবিরোধী অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানে এমন ঘটনা পাওয়া যায়, যেখানে পুলিশ হত্যা করে পরে আত্মরক্ষার দাবি তুলেছে। একই সময়ে সাংবাদিক ও সমালোচকদের ওপর চাপ বাড়ে। তবু দুতের্তের উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন ছিল।
এল সালভাদরে নায়িব বুকেলের গ্যাং দমন অভিযান তাকে বিপুল জনপ্রিয়তা দিয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাপক আটক, অধিকার স্থগিত এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫ সালে তার দলনিয়ন্ত্রিত আইনসভা অনির্দিষ্টবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পথ খুলে দেয়।
পেরুতে আলবের্তো ফুজিমোরি বিদ্রোহ দমন ও রাষ্ট্রকে কার্যকর করার যুক্তি সামনে আনেন। ১৯৯২ সালে তিনি কংগ্রেস ভেঙে দেন এবং বিচারব্যবস্থার ওপর আঘাত হানেন। পরে বারিওস আলতোস হত্যাকাণ্ড ও লা কান্তুতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপহরণ-হত্যাসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০০৯ সালে তার ২৫ বছরের কারাদণ্ড হয়।
দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এক নয়। প্রত্যেক কঠোর সরকারকে একই অর্থে ফ্যাসিবাদী বলাও ঠিক নয়। তবে মিলটি স্পষ্ট। নিরাপত্তার জন্য মানুষ যে সমর্থন দেয়, শাসক সেটিকে নিজের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ সরানোর অনুমতি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
এর পেছনে কাজ করে একটি চিন্তা, যেখানে মানুষের নিরাপত্তার প্রধান উপায় হিসেবে ধরা হয় কিছু মানুষের মৃত্যুকে। কিছু মানুষকে মেরে ফেললে বাকিরা ভয় পাবে, অপরাধ কমবে, সমাজ নিরাপদ হবে, এই ধারণা সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তখন অপরাধের কারণ, অপরাধীর পৃষ্ঠপোষক, অর্থের উৎস কিংবা তদন্তের ব্যর্থতা পেছনে পড়ে যায়। সামনে থাকে শুধু মানুষটিকে সরিয়ে দেওয়া।
বাংলাদেশের সমস্যা তাই শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতা নয়। বলপ্রয়োগকে প্রথম সমাধান ভাবার প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাসও এখানে কাজ করে। সেই অভ্যাস ভাঙা হয়নি বলেই নতুন পরিস্থিতিতেও পুরোনো শব্দটি ফিরে আসে।
‘হাজার চুরাশির মা’: সংখ্যার আড়ালে মানুষ
মহাশ্বেতা দেবীর বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’ মানুষ মুছে ফেলার এই সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়ায়। যে মৃত তরুণের পরিচয় নম্বরে নেমে এসেছে, মা তাকে আবার মানুষ হিসেবে চিনতে চান।
উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ব্রতী নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক তরুণ। তার মৃত্যুর পর মা সুজাতার সামনে খুলতে থাকে ছেলের এমন একটি জীবন, যার অনেকটাই তার অজানা ছিল। ছেলের বন্ধু, বিশ্বাস, সম্পর্ক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বুঝতে গিয়ে তিনি নিজের পরিবার এবং শ্রেণির সুবিধাজনক নীরবতাও দেখতে পান।
উপন্যাসের অস্বস্তি শুধু হত্যায় নয়। হত্যার পরও সমাজ কত অনায়াসে স্বাভাবিক থাকতে পারে, সেখানেও। কারও কাছে পরিবারের সম্মান বড়, কারও কাছে সামাজিক অবস্থান। একজন তরুণের মৃত্যু চারপাশের আয়োজন থামায় না।
উপন্যাসে প্রশ্ন ওঠে, “কেন, কাগজে বেরোয় না বলে ধরপাকড় হচ্ছে না? গুলি চলছে না?”
বাংলাদেশের পাঠকের কাছেও প্রশ্নটি অপরিচিত নয়। সংবাদ না হলে কি ঘটনা ঘটে না? নিহত ব্যক্তির নামের পাশে ‘সন্ত্রাসী’ লেখা হলে কি তার মায়ের শোকের গুরুত্ব কমে যায়? পরিবার ভয়ে মুখ বন্ধ রাখলে কি রাষ্ট্র নির্দোষ হয়ে যায়?
সুজাতার খোঁজ শেখায়, নিহত ব্যক্তিকে জানার চেষ্টা নিজেই একটি প্রতিবাদ। কারণ বিচারবহির্ভূত হত্যার ভাষা মানুষটির পরিচয় ছোট করতে চায়। নাম, সম্পর্ক, বিশ্বাস, ভুল আর সম্ভাবনাকে ঢেকে দেয় একটি শব্দ: অপরাধী। মা সেই শব্দের নিচে নিজের সন্তানকে খোঁজেন।
বাস্তবেও তো এমন ঘটনা ঘটেছে এই দেশেই। ছাত্রদল নেতা নুরুজ্জামান জনি ২০১৫ সালের ২০এ জানুয়ারি ঢাকার খিলগাঁওয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। পুলিশ বলেছিল বন্দুকযুদ্ধ। কিন্তু তার আগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বাবা ইয়াকুব হেফাজতে মৃত্যু প্রতিরোধ আইনে মামলা করেন। আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর্যাপ্ত কারণ না পেয়ে মামলা খারিজ করে। ২০২৫ সালের জুনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে অভিযোগ দায়ের হয়। একজন বাবা এক দশক ধরে ‘সন্ত্রাসী’ নামের একটি শব্দ ভেতর থেকে ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন।
আইন কি পুলিশকে অসহায় করে রাখে?
ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে কথা উঠলেই পাল্টা প্রশ্ন আসে: অপরাধীরা গুলি করলে পুলিশ কি দাঁড়িয়ে মার খাবে?
প্রশ্নটি অমূলক নয়। পুলিশের ঝুঁকি বাস্তব। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ৪৪ জন সদস্য নিহত হন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬০০টি ঘটনায় পুলিশ অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালে এমন ঘটনা ছিল ৬০১টি। এই ঝুঁকি আড়াল করে কোনো সংস্কার-আলোচনা টেকে না।
পুলিশকে আত্মরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কথা এখানে বলা হচ্ছে না। বাংলাদেশের দণ্ডবিধি সেই অধিকার স্বীকার করে। তবে ৯৯ ধারায় আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্ষতি করার সীমা টানা আছে। প্রাণঘাতী প্রতিরোধের ক্ষেত্রও নির্দিষ্ট শর্তের অধীন।
পুলিশ রেগুলেশনস, বেঙ্গলের ১৫৩ বিধিতে আত্মরক্ষা, বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ এবং গ্রেপ্তারের মতো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিধান আছে। এগুলো শর্তযুক্ত ক্ষমতা। গুলি চালানোর প্রয়োজন, পরিস্থিতি এবং বলপ্রয়োগ নিয়ন্ত্রণের বিধানও মানতে হয়।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ ধারায় গ্রেপ্তার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উপায় ব্যবহারের কথা আছে। এই ধারার সীমাবদ্ধতাকে উল্টো করে এমন ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না যে, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলেই পুলিশ তাকে মেরে ফেলতে পারে। গ্রেপ্তার কার্যকর করার ক্ষমতা বিচার করে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা নয়।
তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী বিপদ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণে থাকা কাউকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে পরে সংঘর্ষের গল্প বলা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
তাহলে বিকল্প কী? বিচারের আওতায় আনতে হলে কয়েকটি কাজ করতেই হবে।
- তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
- সাক্ষীকে নিরাপদ রাখতে হবে এবং প্রসিকিউশনকে কার্যকর করতে হবে।
- রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে তদন্তের বাইরে রাখা যাবে না।
- পুলিশের গুলিতে বা হেফাজতে প্রতিটি মৃত্যুর তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বাইরের কোনো স্বাধীন সংস্থাকে দিয়ে করাতে হবে। হেফাজতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিচারিক তদন্ত বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
- কথিত বন্দুকযুদ্ধের পর ঘটনাস্থলের নথি, অস্ত্র ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশযোগ্য ও যাচাইযোগ্য হতে হবে।
এসবের জন্য অর্থ ও শ্রম তো লাগেই। তবে পরিকল্পনাটি হতে হয় সুদূরপ্রসারী। রাষ্ট্রের কাজই তো এই ব্যবস্থা তৈরি করা। নিজের ব্যর্থতার ক্ষতিপূরণ হিসেবে অভিযুক্তের জীবন নেওয়া তার কাজ হতে পারে না।
আরেক ৫ই অগাস্ট
সরোজ দত্তের হত্যার তারিখ ৫ই অগাস্ট, ১৯৭১। তিপ্পান্ন বছর পরে, ২০২৪ সালের আরেক ৫ই অগাস্টে আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার শাসনের পতন ঘটে।
তারিখের এই মিল নিয়ে অলৌকিক তাৎপর্য খোঁজার দরকার নেই, রাজনৈতিক তাৎপর্যই যথেষ্ট। দীর্ঘ শাসনে জমা হওয়া গুম, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও জবাবদিহির অভাব সরকারের প্রতি আস্থার ক্ষয়ে ভূমিকা রেখেছিল। আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ ক্ষোভ আরো তীব্র করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানেও ২০২৪ সালের বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
পালাবদলের পর সংখ্যা বদলেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে ২০২৪ সালে ২১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর শিকার হন। এর মধ্যে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে মারা যান ছয়জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮-এ। নির্যাতন, যৌথ বাহিনীর হেফাজত এবং কথিত গুলি ও বন্দুকযুদ্ধে মারা যান ২৬ জন। থানার হেফাজতে মৃত্যু অন্তত ১২টি।
আগের দশকের হিসাবের সঙ্গে এগুলো সরাসরি তুলনীয় নয়। সংস্থা আলাদা, শ্রেণিবিভাগও আলাদা। ২০২৪ সালের প্রায় সাত মাস আবার আগের সরকারের আমল। তবু পার্থক্যটি চোখে পড়ে। ২০১৮ সালে শুধু কথিত বন্দুকযুদ্ধেই মৃত্যু ছিল ৪৫৮। এখন সংখ্যা দুই অঙ্কে। কিন্তু সংখ্যা কমা মানে অভ্যাস ভাঙা নয়। হেফাজতে মৃত্যু থামেনি, আর ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালে সংখ্যাটি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
কাঠামোও পুরোপুরি বদলায়নি। গুম কমিশন র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল, কিন্তু সরকার বাহিনীটিকে বিলুপ্ত না করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নাম দিয়ে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করায়।
আরেকটি রূপ সামনে এসেছে। আসক-এর হিসাবে গণপিটুনি বা ‘মব’ সহিংসতায় ২০২৪ সালে নিহত হন ১২৮ জন, আর ২০২৫ সালে অন্তত ১৯৭ জন। এখানে হত্যাকারী রাষ্ট্র নয়, ভিড়। কিন্তু দাবির চেহারা একই: বিচারের জন্য অপেক্ষা নয়, এখনই শাস্তি। আসক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদাসীনতাকে উদ্বেগের কারণ বলেছে। যে সমাজে বিচার ধীর, সেখানে ‘এখনই’ শাস্তির ডাক কখনো পুলিশের মুখে ফিরে আসে, কখনো ভিড়ের মুখে।
আওয়ামী লীগ আমলের এই দায় আলোচনা করতে গিয়ে বিএনপি আমলে র্যাবের সূচনা ভুলে যাওয়ার দরকার নেই। আবার পূর্বসূরির কথা তুলে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের দায়ও কমানো যায় না।
এক সরকারের হাতে জনপ্রিয় হওয়া পদ্ধতি আরেক সরকার আরও বিস্তৃত করতে পারে। আজ যারা এই কঠোরতায় হাততালি দিচ্ছেন, কাল তাদেরই কেউ এর শিকার হতে পারেন। নারায়ণগঞ্জের আইনজীবী চন্দন সরকারের মতো শুধু কোনো দৃশ্য দেখে ফেলাও বিপদের কারণ হতে পারে।
তাই শুধু শাসক বদল যথেষ্ট নয়। সরকার বদলের পরও অপরাধ দমনের কথায় যদি প্রথমে ক্রসফায়ার মনে আসে, বুঝতে হবে রাষ্ট্রের পুরোনো অভ্যাস রয়ে গেছে।
‘হলুদ হিমু কালো র্যাব’: মানুষ ক্যান্সার সেল নয়
২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি। র্যাবের বয়স তখন দুই বছর। ‘ক্রসফায়ারে মৃত্যুর নীলনকশা’ প্রতিবেদন ছাপা হতে আরও আট মাস বাকি। সেই বইমেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে বেরোল হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘হলুদ হিমু কালো র্যাব’। অর্থাৎ নথি জমে ওঠার আগেই একজন লেখক প্রশ্নটি তুলেছিলেন। পদক-বিতর্ক আর নারায়ণগঞ্জের সাত খুন তো আরও অনেক পরের কথা।
উপন্যাসে র্যাব বারবার হিমুকে তুলে নেয়, আবার ছেড়ে দেয়। এক কথোপকথনে র্যাবের কর্মকর্তা অপরাধীদের তুলনা করেন ক্যান্সারের কোষের সঙ্গে। শরীর বাঁচাতে যেমন ক্ষতিকর কোষ কেটে ফেলতে হয়, সমাজ বাঁচাতেও তেমন কিছু মানুষকে সরিয়ে দিতে হবে।
হিমুর উত্তর: “স্যার মানুষ ক্যান্সার সেল না। প্রকৃতি মানুষকে অনেক যত্নে তৈরি করে।”
তারপর সে মানুষের জন্মের কথা তোলে। একটি প্রাণ বড় হয়ে উঠতে কত আয়োজন, কত যত্ন লাগে। সেই মানুষকে বিনা বিচারে ক্রসফায়ারে শেষ করে দেওয়া যায় কি না, প্রশ্ন সেখানেই। কর্মকর্তা যখন বলেন, “পিশাচের আবার বিচার কিসের?”, হিমু তখনো অভিযুক্তের কথা শুনতে চায়। সে বুঝতে চায়, মানুষটি কেন এমন হলো। অপরাধকে সে নির্দোষ বানায় না। শুধু মানুষটির মানুষ থাকার অধিকার ছাড়তে রাজি হয় না।
ক্যান্সারের উপমা বিপজ্জনক এই কারণেই। মানুষকে রোগ ভাবলে তাকে সরিয়ে দেওয়াকে চিকিৎসা মনে হয়। তখন যিনি গুলি চালান, তিনি নিজেকে হত্যাকারী ভাবেন না, ভাবেন সমাজের উপকার করছেন। দর্শকও হাততালি দিতে পারেন, কারণ তার চোখে একজন মানুষ নয়, একটি সমস্যা শেষ হয়েছে। হিমু সেই স্বস্তি নষ্ট করে। সে মানুষটিকে আবার সামনে আনে, যেমন সুজাতা লাশের নম্বরের আড়াল থেকে ব্রতীকে ফিরিয়ে আনেন।
ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে তাই নিহত ব্যক্তিকে আগে নিষ্পাপ প্রমাণ করতে হয় না। ভয়ংকর অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তার বিচার প্রয়োজন। বিচারেই অভিযোগ যাচাই হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হবে। তার বিচারের অধিকার রক্ষা করা মানে তার অপরাধ সমর্থন করা নয়। এর অর্থ রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা অক্ষুণ্ণ রাখা।
আজ যে সীমা অন্য একজনের জন্য তুলে দিচ্ছি, কাল সেটিই আমার সুরক্ষার জন্য দরকার হতে পারে।
উত্তমকুমারের সেই ভোরের কাহিনি আমাদের নিয়ে যায় একজন সাক্ষীর আতঙ্কের কাছে। সুজাতা নিয়ে যান একজন মায়ের কাছে। আর হিমু সশস্ত্র কর্মকর্তার সামনে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে সহজ কথাটি মনে করিয়ে দেয়— যাকে মেরে ফেলার কথা হচ্ছে, তিনি একজন মানুষ।
রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র আছে বলেই এই কথাটি তার সবচেয়ে বেশি মনে রাখা দরকার।