নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর যে তাৎক্ষণিক বিশ্বজোড়া খ্যাতি তৈরি হয়, তা অনেক সময় বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমনটাই বলেছেন ডুসেলডর্ফ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা ইতিহাস, তত্ত্ব ও নীতি বিভাগের অধ্যাপক নিলস হ্যানসন।
'নোবেলাইটিস'-এর শিকার নোবেলজয়ীরা কোনো প্রমাণ ছাড়াই ছড়াতে শুরু করেন অবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। মানুষও সেগুলো সহজেই বিশ্বাস করতে শুরু করে। কারণ, সেই কথাগুলো বলেছেন একজন নোবেল বিজয়ী।
একে ‘নোবেল ডিজিজ’ও বলেন কেউ কেউ। এই নোবেল ডিজিজ অফিসিয়ালি কোনো চিকিৎসাগত রোগ নয়, বরং এমন এক অবস্থাকে বোঝায় যেখানে একজন নোবেলজয়ী জীবনের শেষভাগে এসে শিকার হন অতি-অহংকার বা বিভ্রান্তির।
এমন অবস্থার জন্য ‘নোবেলাইটিস’ শব্দটির প্রচলন প্রথম শুরু করেন পল নার্স। পল নিজেও ছিলেন নোবেলজয়ী। ছিলেন ইউকে ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সেসের প্রেসিডেন্টও।
‘সকল রোগের মহৌষধ ভিটামিন সি’
নোবেলাইটিসের ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে ধরা হয় আমেরিকান রসায়নবিদ লাইনাস পাউলিংকে। দুইটি ভিন্ন বিভাগে নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন পাউলিং। রাসায়নিক বন্ধনের প্রকৃতি নিয়ে গবেষণার জন্য কেমিস্ট্রিতে ১৯৫৪ সালে এবং পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনে অবদানের জন্য এবং ১৯৬২ সালে শান্তিতে নোবেল পান তিনি। এককভাবে দুইটি নোবেল জয়ের কৃতিত্ব বিশ্বমঞ্চে রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে পাউলিংকে।
এর পরই অদ্ভুত এক দাবি করে বসেন এই বিজ্ঞানী। বলেন, কেবল ভিটামিন সি’তেই আছে ক্যানসার থেকে শুরু করে হৃদ্রোগ, আলঝেইমার্স, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো জটিল রোগেরও নিরাময়। এমন দাবি করেই থেমে থাকেননি এই রসায়নবিদ। নিজেই চালু করেন ‘অর্থোমলিকিউলার মেডিসিন’ নামের এক বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিও।
পাউলিংয়ের সেই দাবির দীর্ঘ ষাট বছর পেরিয়ে গেলেও আজও এর পক্ষে পাওয়া যায়নি কোনো পোক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।
সন্দেহ করুন সবকিছুকে
পল নার্স একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, একজন ভালো বিজ্ঞানীর মূল গুণ হওয়া উচিত সবকিছু নিয়ে সন্দেহ করা। আর সেই সন্দেহের তালিকায় থাকতে হবে নিজের ভাবনাচিন্তা ও আইডিয়াও। কিন্তু নোবেলাইটিসে আক্রান্ত হলে সেই আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিটাই সবার আগে লোপ পায়।
ভাইরোলজিস্ট লুক মন্টেইনারের গল্পটাও প্রায় একইরকম। যে এইচআইভি আবিষ্কারের জন্য নোবেল পেয়েছিলেন, দাবি করেন, সেটা কমানো যাবে কেবল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থেকে পুষ্টিকর খাবার খেলেই।
কোভিড ১৯ মহামারি শুরু হলে আরও এক বিতর্কিত দাবি নিয়ে আসেন মন্টেইনার। কোনোরকম প্রমাণ না দিয়েই দাবি করে বসেন, সার্স কোভ ২ ভাইরাসটি ল্যাবরেটরিতে বানানো হয়েছে এইচআইভির জিনগত কোডের অংশ দিয়েই। সেসময় জার্মানির বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট ক্রিশ্চিয়ান ড্রসটেন অবশ্য এই দাবিকে খারিজ করে দেন ‘সম্পূর্ণ অর্থহীন’ বলে।
ডিএনএ অণুর গঠন আবিষ্কারের জন্য মরিস উইলকিন্স এবং ফ্রান্সিস ক্রিকের সাথে নোবেল পেয়েছিলেন জেমস ওয়াটসন। এর আগে বিনয়ী না হলেও পরে হয়ে যান উগ্রপন্থী। শুরু করেন বর্ণবাদী তত্ত্ব প্রচার। দাবি করেন, কৃষ্ণাঙ্গরা কম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন শ্বেতাঙ্গদের তুলনায়।
ওয়াটসনের উদাহরণ দিয়ে চিকিৎসা ইতিহাসবিদ হ্যানসনের বলেন, নোবেল পাওয়া মানেই এই নয় যে সেই ব্যক্তি ‘‘সমাজের রোল মডেল।’’ একটা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করলেই কেউ ‘‘সব বিষয়ে জিনিয়াস’’ হয়ে যায় না।
সমালোচনা হোক নোবেলজয়ীরও
নোবেলজয়ীদের এই সময় নোবেলাইটিসের পেছনে ভূমিকা রাখে সাধারণ মানুষের আকাশছোঁয়া প্রত্যাশাও। চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়ার পর পল নার্সকে যখন বিভিন্ন বিষয়ে ইন্টারভিউ দেওয়ার অনুরোধ করা হতো, তখন তারও মনে হত, তিনি ‘পৃথিবীর সবকিছুর কর্মপদ্ধতি ও মানবপ্রকৃতির’ পুরোটা জেনে ফেলেছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই অন্য গবেষকদের পরামর্শ দেন পল। বলেন, ‘‘যা নিয়ে আপনার নির্দিষ্ট জ্ঞান আছে, শুধু সেই বিষয়েই কথা বলুন।’’
নোবেলজয়ীরা নিঃসন্দেহে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সেরা। নিজেদের কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই তারা পেয়েছেন এই সম্মান। কিন্তু দিনশেষে তারাও সাধারণ মানুষ। ফলে মেগালোম্যানিয়া বা অতিরিক্ত অহংকার এবং অন্যান্য আচরণগত সমস্যা থেকে মুক্ত নন তারাও।
সে কারণেই কোনো এক নোবেল জেতা ব্যক্তি কোনো বিকল্প চিকিৎসা বা অপবিজ্ঞানকে সমর্থন করলেই তা সত্য ও গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না।